শনিবার, ০২ Jul ২০২২, ০৭:৪৮ পূর্বাহ্ন

সাহিত্য আন্দোলনের পথিকৃৎ মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন

সাহিত্য আন্দোলনের পথিকৃৎ মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন

গুণীজন

সাদ বিন ওয়াহেদ

মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। মুসলিম বাংলার সাময়িক পত্র, সাংবাদিকতা ও সাহিত্য আন্দোলনের পথিকৃৎ এবং বিশিষ্ট সম্পাদক। তিনি ১৮৮৮ সালের ২০ নভেম্বর (১২৯৫ বঙ্গাব্দের ৩ অগ্রহায়ণ) বর্তমান চাঁদপুর জেলার পাইকারদী গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের তেমন কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ছিল না। কিন্তু ব্যক্তিগত পড়াশোনা ও জ্ঞানী-গুণীদের সাথে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে তিনি বিশ শতকের প্রথম দিকে মুসলিম সমাজের একজন বিশিষ্ট সমাজ সংস্কারক ও মুক্ত চিন্তার বুদ্ধিজীবী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন।

কৈশোরেই পেশাজীবনে প্রবেশ করতে হয় নাসিরউদ্দীনকে। প্রথমে তিনি করেছেন সুপারির ব্যবসা। দ্বিতীয় দফায় কাজ পেলেন স্বল্প বেতনে স্টিমার স্টেশনে মাস্টারের সহকারী হিসেবে। তার কাজ ছিল টিকিট বিক্রি ও টিকিট সংগ্রহ করে সেগুলো জমা দেয়া। তারপর বীমা খাতে চাকরি নিয়েছিলেন তিনি। বীমা কোম্পানির প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন। এছাড়াও তিনি তার কর্মজীবনে ছিলেন বাংলা একাডেমির ফেলো এবং জাতীয় জাদুঘর ও নজরুল ইনিস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান।

পত্রিকা প্রকাশের দৃঢ় সংকল্প নিয়ে ১৯১৭ সালে চাঁদপুর ছেড়ে কলকাতা গেলেও মুসলিম যাদের কাছেই তিনি যান, তারা তার কথা শুনে পিছিয়ে পড়েন। হিন্দুদের কাগজের মতো গল্প-উপন্যাস নিয়ে ছবিটবি দিয়ে পত্রিকা বের করতে রাজি নন কেউ। তাই বিফল-মনে নাসিরউদ্দীন ফিরে এলেন চাঁদপুরে। কিছুদিন কাটিয়ে আবার গেলেন কলকাতায়। পত্রিকা বের করার জন্য দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। নানাজনের সঙ্গে দেখা করলেন, কথা বললেন তিনি। শেষে যার সঙ্গে পরিচয় হলো তিনি ছিলেন ব্যারিস্টার আব্দুল রসুল। সব শুনে তিনি বললেন, ‘সাহিত্য পত্রিকা মুসলমান সমাজ থেকে আরো ৫০ বছর আগেই বের হওয়া উচিত ছিল।’

১৯১৮ সালের ২ ডিসেম্বর তিনি কলকাতা থেকে সম্পূর্ণ নিজ উদ্যোগে ও সম্পাদনায় প্রকাশ করেন সচিত্র সাহিত্য পত্রিকা ‘মাসিক সওগাত’। এর সম্পাদক, প্রকাশক, প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে কালের ইতিহাসই বদলে দেন মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন। নাসিরউদ্দীন কালক্রমে হয়ে উঠেন বাঙালির প্রগতি চিন্তার একজন পথিকৃৎ, বোধের মুক্তির অন্যতম দিশারি।

মাসিক সওগাত বেরোল ১ম বর্ষ ১ম খ- সংখ্যা অগ্রহায়ণ ১৩২৫ চিহ্নিত হয়ে। এটিই কোনো মুসলমান সম্পাদিত প্রথম সচিত্র বাংলা পত্রিকা। সওগাত নিয়ে শুরুতেই আলোচনা-সমালোচনার ঝড় বয়ে যায়। প্রগতিশীলসমাজ তাকে দারুণভাবে গ্রহণ করে। প্রথম সংখ্যায় লিখলেন জলধর সেন, ব্রজেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়, সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, মানকুমারী বসু, কুমুদরঞ্জন মল্লিক প্রমুখ। প্রথম সংখ্যাতেই ছিল আরএস হোসেন নামে বেগম রোকেয়ার কবিতা ‘সওগাত’, আর প্রবন্ধ ‘সিসিম ফাঁক’।

নাসিরউদ্দীন জানিয়েছেন, সওগাত প্রকাশিত হওয়ার পর তিনি জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে দেখা করে কবিকে এর একটি কপি উপহার দিয়ে তার পত্রিকার জন্য লেখা প্রার্থনা করেছিলেন।

খোশ মেজাজে রবীন্দ্রনাথ জানতে চেয়েছিলেন-পত্রিকাটির এত সুন্দর নাম রেখেছে কে?

জবাবে নাসিরউদ্দীন বলেছিলেন, ‘বহু চিন্তা করে সবার গ্রহণযোগ্য হবে বলে নামটি আমিই নির্বাচন করেছি।’

তখন কবি বললেন, ‘তোমার রুচিবোধ প্রশংসার যোগ্য। মুসলমান সমাজের বর্তমান অবস্থায় তাদের মধ্য থেকে যে এরূপ সুন্দর একখানা মাসিক পত্রিকা বের হতে পারে, এটা আমার ধারণায় ছিল না।’

কিন্তু আর্থিক সংকটের কারণে ১৯২২ সালে সাময়িকীটির প্রকাশনা স্থগিত রাখা হয়। ১৯২৬ সালে অবশ্য এর প্রকাশনা পুনরায় শুরু হয় এবং তখন থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তা অব্যাহতভাবে চলতে থাকে।

গোঁড়া মুসলিমদের ব্যাপক প্রতিবাদ সত্ত্বেও মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন লেখক, সাহিত্যিক, ইতিহাসবিদ ও শিক্ষিত মুসলিম নারীদের ছবি সওগাতে ছাপান। কার্টুনের মাধ্যমে ব্যাজ্ঞাত্মক ভঙ্গিতে সমাজের অব্যবস্থাকে তিনি তীব্রভাবে তুলে ধরেন। তখনকার দিনে মুসলিম নারীর ছবি ছাপানোটা ছিল এক অসাধারণ ঘটনা। নাসিরউদ্দীন মুসলমান নারীদের পাশাপাশি হিন্দু, ব্রাহ্ম ও খ্রিস্টান নারীদের লেখাপড়া, সাহিত্য ও সংস্কৃতি চর্চায় এবং রাজনৈতিক আন্দোলনে উৎসাহিত করতেন। নাসিরউদ্দীন বলতেন, ‘নারী না জাগলে জাতি জাগবে না’।

১৯২৬ সালে তিনি ‘সওগাত সাহিত্য মজলিশ’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর মাধ্যমে তরুণ লেখকদের উৎসাহিত করেন। এটি মূলত ছিল সাহিত্যামোদীদের আড্ডাশালা। এর আসর বসত প্রথমে ৮২ কলুটোলা স্ট্রিটের পত্রিকা দপ্তরেই। এরপর তা চলে যায় ১১ ওয়েলসলি স্ট্রিটে। সেখানে মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীন স্বপরিবারে থাকতেন। দোতলা বাড়ির নিচে করা হয় নিজস্ব ছাপাখানা।

বিদ্রোহী কবি (বর্তমানে বাংলাদেশের জাতীয় কবি) কাজী নজরুল ইসলাম, আবুল মনসুর আহমদ, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, শামসুন্নাহার মাহমুদ, সুফিয়া কামাল, এস ওয়াজেদ আলী, মোহাম্মদ শামসুদ্দিন, গোলাম মোস্তফা, মোহাম্মদ বরকতউল্লাহ, শাহাদাৎ হোসেন, আবুল হোসেন, আবুল মনসুর আহমদ প্রমুখ এবং আরো অনেকে সওগাতকে তাদের প্রগতিশীল ও ভিন্ন মত প্রকাশের প্লাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার করেন। এক পর্যায়ে কাজী নজরুলই হয়ে উঠেন সওগাত’র প্রধান লেখক। পরে নজরুল কাজও নেন সওগাত-এ। তার মোট ৮০টি লেখা ছাপা হয়েছিল এই পত্রিকায়।

১৯৩৩ সালে তিনি আরো প্রকাশ করেন বার্ষিক সওগাত। একই বছর কলকাতায় ‘সওগাত কালার প্রিন্টিং প্রেস’ নামে একটি ছাপাখানা স্থাপন করেন। এছাড়াও তিনি প্রকাশ করেন সাপ্তাহিক ‘সওগাত (১৯৩৪)’, সচিত্র মহিলা সওগাত (১৯৩৭), শিশু সওগাত এবং ১৯৪৭ সালে প্রকাশ করেন সচিত্র সাপ্তাহিক ‘বেগম’ পত্রিকা। দেশ-বিভাগের পর নাসিরউদ্দীন পূর্ব বাংলায় চলে আসেন এবং ঢাকায় স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন।

১৯৮৯ সালে তাকে তার জন্মশতবর্ষপূর্তি উপলক্ষে জাতীয়ভাবে সংবর্ধিত করা হয়। তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য পুরস্কার হল দেশের সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় বেসামরিক সম্মাননা ‘স্বাধীনতা পুরস্কার (১৯৮৪)’, দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় বেসামরিক সম্মাননা ‘একুশে পদক (১৯৭৭)’, ‘বাংলা একাডেমির সম্মাননা পুরস্কার (১৯৭৫)’ এবং ‘ঢাকা মিউনিসিপ্যাল কর্পোরেশন পদক’। উল্লেখ্য, ১৯৭৬ সালে সৃজনশীল কবি, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকদের পুরষ্কৃত করার লক্ষ্যে তিনি নিজ নামে নাসিরউদ্দীন স্বর্ণ পদক প্রদান শুরু করেন।
১০৫ বছর বয়সে ১৯৯৪ সালের ২১ মে (৭ জ্যৈষ্ঠ, ১৪০১ বঙ্গাব্দ) ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন। কাল থেকে কালান্তর নাসিরউদ্দীন মৃত্যুঞ্জয়ী হয়ে বেঁচে আছেন আমাদের মাঝে তার কাজের মধ্য দিয়ে।

(তথ্যসূত্র : বাংলাপিডিয়া; মোহাম্মদ নাসিরউদ্দীনের ১৩১তম জন্মবার্ষিকী, দৈনিক প্রথম আলো, ২০ নভেম্বর ২০১৯; ইমরান মাহফুজ, পাথরচাপা সময়ে ‘সওগাত’ ও কালোত্তীর্ণ নাসিরউদ্দীন, দ্য ডেইলি স্টার বাংলা, ২ ডিসেম্বর ২০২০)

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com