বৃহস্পতিবার, ০৬ মে ২০২১, ১০:১৩ অপরাহ্ন

শবে মেরাজ ও রজব মাস

শবে মেরাজ ও রজব মাস

শবে মেরাজ ও রজব মাস

কিছু ভিত্তিহীন বিশ্বাসের খণ্ডন

আ হ ম দ যা কা রি য়া

শবে মেরাজ উপলক্ষে সমাজে রজব মাস এবং শবে মেরাজের ফযীলত ও আমল নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে অনেক কাঁদা ছোড়া ছুড়ি হয়ে থাকে। তাই বিষয়টা উম্মতের সামনে খোলাসা হওয়ার প্রয়োজন মনে করছি। পাশাপাশি ‘রজব’ মাসের বিশেষ আমল ও শবে মেরাজ সংক্রান্ত কয়েকটি হাদিসের শাস্ত্রীয় ‘মান’ (দালিলিক গ্রহনযোগ্যতা) নিয়েও সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হবে।

১.”জান্নাতে রজব নামে একটি নদী আছে। যার পানি দুধের মতো সাদা। যে ব্যক্তি রজব মাসে রোজা রাখবে, আল্লাহ পাক তাকে কেয়ামতের দিন ওই নদীর পানি পান করাবেন এবং জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবেন।” সুত্রঃ মকছুদুল মোমেনিন-২৪১ (রাহমানিয়া লাইব্রেরী)

এই রেওয়ায়েতটি সম্পুর্নরূপে জাল ও ভিত্তিহীন।

(দেখুনঃ আল ইলালুল মুতানাহিয়া- ২/৫৫৫ মিযানুল ই’তিদাল-৪/১৭৩ লিসানুল মিযান-৮/১৭০ ফয়যুল কাদির-২/৪৭০ আল মুগীর লি আহমাদ আল গুমারী-২৯ আল মুদাভী লি আহমাদ গুমারী-২/৩৬২)

২.”যে ব্যাক্তি রজবের সাতাশ তারিখে রোজা রাখবে, আল্লাহ পাক তার আমলনামায় ষাট মাস রোজা রাখার সাওয়াব লিখে দিবেন।” সুত্র-খোতবাতুল আহকাম-১৪৮। অথচ এই হদিসটি কোন সুত্রেই প্রমানিত নয়।

(দেখুনঃআল আবাতিল ওয়াল মানাকির-৩৪৬-৩৪৭ আহাদিসু মুখতারা মিন মওযুআতিল জাওরাকানী ওয়া ইবনুল জাওযী লিয যাহাবী-৭৮ আলইলালুল মুতানাহিয়া-১/২২৬ আলবিদায়া ওয়ান নিহায়া- ৭/৬৮০-৬৮১,১১/৭৪ তাবয়ীনুল আযাব ৩২,৪২-৪৫ জুযউ ইবনে আসাকির ৩১৬ শুয়াবুল ঈমান ৩/৩৭৩)

৩. প্রসিদ্ধ আছে যে, “পনের রজব রাতে যে চৌদ্দ রাকাত নামাজ পড়বে।প্রতি রাকাতে একবার সুরা ফাতেহা, এগারো বার সুরা ইখলাস, তিনবার সুরা নাস পাঠ করবে, এরপর সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, ত্রিশবার করে পড়বে। আল্লাহ তায়ালা তাঁর সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।তার জন্য আকাশ থেকে……….।”
এই বর্ননাটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও জাল।

আল্লামা ইবনুল জাওযী, জালালুদ্দিন সুয়ুতী, ইবনে ওয়াররাক কিনানী, আল্লামা তাহের পাটনী, মুহাম্মাদ বিন আলি আশ শাওকানী, আব্দুল হাই লাখনূভী রহ. প্রমুখ এই বর্ণনাকে জাল বলেছেন।
(দেখুনঃ কিতাবুল মউযুআত- ২/৪৩৮-৪৩৯ তাবয়িনুল আযাব ২৭ আল লাআলিল মাসনুআহ-২/৫৭ তানযিহুশ শারিয়াহ -২/৯২ তাযকিরাতুল মাউযুআত-৪৪ আল ফাওয়ায়েদুল মাজমুয়াহ-৫০)

মোটকথা , রজব মাসের নির্দিষ্ট কোন নামাজ বা রোজা নেই। এই মাসে নির্দিষ্ট কোন দিনে নফল নামাজ বা রোজা পালনের বিশেষ কোন ফযিলতের কথা নির্ভরযোগ্য কোন হাদিসের দ্বারা প্রমানিতও নয়। অষ্টম শতকের বিখ্যাত হাদিস বিশারদ আল্লামা ইবনে রজব হাম্বলী রহ. বলেন, “রজব মাসের নির্দিষ্ট কোন নামাজ প্রমানিত নেই।” আরও বলেন, “রাসুল সা. বা সাহাবায়ে কেরাম থেকে নির্দিষ্টভাবে রজব মাসে রোজা রাখার কোন ফযিলতের কথাও প্রমানিত নয়।” (সুত্র:লাত্বায়েফুল মাআরেফ-২২৮)
আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী র. বলেন “রজব মাসের ফযিলত, রজব মাসে রোজা রাখার ফযিলত, রজব মাসের নির্দিষ্ট কোন রাতে ইবাদত করার ফযিলত সম্পর্কে প্রমান হওয়ার উপযুক্ত কোন হাদিসই নেই।”

(সুত্র:তাবয়ীনুল আযাব-১১ ফতহুল মুলহিম- ৫/৩০৬-৩০৭ (১১৫৭নং হাদিসের অধিনে)
৪. সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হচ্ছে যে, ২৭ ই রজবে ইসরা ও মেরাজ সংঘটিত হওয়ার কথাটাই ভিত্তিহীন। এর কোন প্রামানিক ভিত্তি নেই। একটি ঐতিহাসিক বর্ননার আলোকে কথাটি প্রসিদ্ধি লাভ করেছে। কিন্তু তা আদৌ নির্ভরযোগ্য নয়। আল্লামা ইবনে কাসির, হাফেজ ইবনে রজব হাম্বলী, ইবনে নাসিরুদ্দিন দিমাশকি রহ. এর মত হাদিস বিশারদগন একে ভিত্তিহিন সাব্যস্ত করেছেন। তৃতীয় শতকের বিখ্যাত ইমাম শাইখ ইবরাহিম হারাবী রহ. ২৭ ই রজব মেরাজ হওয়াকে অস্বীকার করেছেন।

(দেখুনঃ যাদুল মাআদ লি ইবনিল কায়্যিম আল জাওযি-১/৫৭-৫৮ লাতায়েফুল মাআরেফ লি ইবনে রজব আল হাম্বালী-২৩৩ জামিউল আছার লি ইবনে নাসিরুদ্দিন আদ দিমাশকি-৩/১৬-৫১ আল বিদায়া ওয়ান নিহায়া লি ইবনে কাসির-৩/৩৪০ আল মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়াহ লিল ইমাম কাস্তালানী-৩/১৪ শরহুল মাওয়াহিব-৮/১৭-১৯ ইসলাহি খুতুবাত লি ত্বাকী উসমানী-১/৪৮-৫৫)

মোট কথা; মেরাজের দিন তারিখ সম্পর্কে সাহাবা, তাবেয়ী, ঐতিহাসিক কারও থেকেই নির্ভরযোগ্য কোন বর্ননা নেই। তাই এ বিষয়ে চুপ থাকাই শ্রেয়। কারন, রাসুল সা. বলেছেন, “যা শোনা তাই বলা (তাহকিক করে নিশ্চিত হওয়া ছাড়া) মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য যথেষ্ট।” (সুত্র: মুসলিম, পৃ:৮ ও মেশকাত শরীফ।)

৫. শবে মেরাজ উপলক্ষে সমাজে কিছু নামাজ এবং রোজা প্রসিদ্ধ রয়েছে। বিশেষত মেরাজের রাতে মসজিদের মিম্বরে মিম্বরে কিছু হাদিস এ রাতের বিশেষ ফজিলত সম্পর্কে শুনানো হয়।

‘মকসুদুল মুমীনীন’ এবং ‘বারো চান্দের ফযীলত’ নামক অনির্ভরযোগ্য কিতাবাদির কারণে এ ধরণের বেদআতি আমল সমাজে প্রচলিত হয়ে গেছে। প্রথমে ‘বারো চান্দের ফযীলত’ থেকে বর্ণনাগুলো শুনি। সেখানে বলা হয়েছে যে, “এক বর্ণনায় রয়েছে: শবে মি’রাজের রাত্রিতে দুই রাকায়াতের সূরা ফাতিহার পরে তিনবার করিয়া সূরা ইখলাস পাঠ করিবে। এবং দুই রাকায়াতের পর ২০০ বার দরুদ শরীফ পাঠ করিবে এবং হাত তুলিয়া আল্লাহর কাছে মুনাজাত করিবে। এই নামাযী ব্যক্তি অসংখ্য সওয়াব লাভ করিবে, তাহার ঈমান মুজবুত হইবে এবং আল্লাহর রহ,ত বর্ষিত হইতে থাকিবে। অন্য এক বর্ণনায় বর্ণিহ হইয়াছে, শবে মি’রাজের রজনীতে দুই রাকাতের নিয়তে মোট চার রাকয়াত নামায আদায় করিবে। এই নামাযের প্রত্যেক রাকাতে সূরা ফাতিহার পরে যেকোন সূরা মিলাইয়া পাঠ করিবে। নামায শেষ করার পর কালেমায়ে তামজীদ, দরুদ শরীফ ও তাওবায়ে ইস্তিগফার প্রত্যেকটি ১০০ বার করিয়া পাঠ করিবে। অতঃপর সিজদায় যাইয়া আল্লাহ তায়ালার দরবারে যেই সমস্ত বিষয় নেক আকাংখা করিবে, তিনি তাহা কবুল করিবেন”। (বার চান্দের ফযীলত, পৃষ্ঠা নং ২৩)

এ ধরণের কোন নামাজেরর কথা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়। সবগুলো মানুষের বানানো এবং বানোয়াট। প্রথমত শবে মেরাজ কোনদিন? সেটা নির্ধারিত নয়। বিস্তর মতবিরোধ রয়েছে। প্রায় বিশোর্ধ মত হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. নকল করেছেন৷

শবে মেরাজের নামাজ সংক্রান্ত বর্ণনাগুলো সম্পর্কে কিছু মুহাদ্দিসগনের বক্তব্য নিম্নে নকল করছি।

বিখ্যাত মুহাদ্দিস হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. বলেন,
لم يرد في فضل شهر رجب، ولا في صيامه، ولا في صيام شيء منه، – معين، ولا في قيام ليلة مخصوصة فيه – حديث صحيح يصلح للحجة، وقد سبقني إلى الجزم بذلك الإمام أبو إسماعيل الهروي الحافظ، رويناه عنه بإسناد صحيح، وكذلك رويناه عن غيره،
অর্থাৎ রজব মাসের মর্যাদা, সে মাসে রোজা রাখা এবং সে মাসের বিশেষ কোনো রাতের নামাজের ফজিলত সম্পর্কে দলীলযোগ্য কোনো সহিহ হাদিস নেই। আমার পূর্বে দৃঢ়তার সাথে এমনটা বলেছেন হাফেজ ইমাম আবু ইসমাইল আল হারাওয়ী। আমরা তাঁর থেকে সহিহ সনদে এমনটা বর্ণনা করেছি। এমনভাবে অন্য থেকেও এমনটা বর্ণিত হয়েছে। (তাবয়িনুল আজাব বিমা ওয়ারাদা ফি শরহি রজব, পৃষ্ঠা নং ২, মাকতাবাতুশ শামেলা।)

হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী এখানে স্পষ্ট বলেছেন যে, রজব মাসের কোন রাতের বিশেষ নামাজের ফজিলত সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়। শবে মেরাজ যেহেতু আমাদের দেশে ২৭ তারিখে পালন করা হয়, সুতরাং এ রাতের বিশেষ নামাজ সহিহ হাদিস দ্বারা প্রমাণিত নয়।

আল্লামা ইববে রজব হাম্বলি রহ. বলেন,
ومن أحكام رجب ما ورد فيه من الصلاة والزكاة والصيام والإعتمار فأما الصلاة فلم يصح في شهر رجب صلاة مخصوصة تختص به
অর্থাৎ রজব মাসের বিশেষ কোন নামাজ সহিহভাবে প্রমাণিত নয়। (লাতায়িফুল মাআরিফ, পৃষ্ঠা নং ১৬৪, দারুল হাদীস কাহেরা।)

শবে মেরাজের বিশেষ নামাজেরর যে বর্ণনা পূর্বে ‘বার চান্দের ফযীলত’ এর হাওয়ালায় উল্লেখ করা হয়েছে, তার আরবী পাঠ হলো নিম্নরুপ:
من صلى فيه اثنتي عشرة ركعة يقرأ في كل ركعة فاتحة
لكتاب وسورة ويتشهد في كل ركعتين ويسلم في آخرهن ثم يقول سبحان الله والحمد لله ولا إله إلا الله والله أكبر مائة مرة ويستغفر مائة مرة ويصلي على النبي مائة مرة ويدعو لنفسه ما شاء ويصبح صائما فإن الله يستجيب دعاءه كله إلا أن يدعو في معصية
বর্ণনাটি সম্পর্কে আল্লামা আবদুল হাই লাভনবি রহ. বলেন,
أخرجه البيهقي من طريق عيسى غنجار عن محمد بن الفضل بن عطية وهو من المتهمين بالكذب عن أبان وهو أيضا متهم عن أنس مرفوعا وأدخله ابن حجر في تبين العجب في الموضوعات
অর্থাৎ বর্ণানাটি ইমাম বায়হাকি মুহাম্মাদ বিন ফাযল বিন আতীয়া এর সূত্রে বর্ণনা করেছেন। তিনি মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত। মুহাম্মাদ বিন ফাজল বর্ণনা করেন আবান থেকে। তিনিও মিথ্যার অভিযোগে অভিযুক্ত। হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. ‘তাবয়িনুল আযাব’- এ হাদিসটিকে জাল বলেছেন।

(দেখুন, তাবয়িনুল আজাব বিমা ওয়ারাদা ফি শাহরি রাজাব, পৃষ্ঠ নং ২১. মাকতাবাতুশ শামেলা। আল আছারুল মারফুআ, পৃষ্ঠা নং ৪৮)

এ ধরণের আরেকটি বর্ণনা হাফেজ ইবনে হাজার আসকালানী রহ. উল্লেখ করেছেন এবং সেটাকে জাল বলেছেন।

মোটকথা হলো যে, শবে মেরাজ উপলক্ষে কোনো বিশেষ নামাজ বা রোজা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত নয়। এছাড়া রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সাহাবাদের এ উপলক্ষে বিশেষ কোন আমলের নির্দেশও দেননি। এজন্য শবে মেরাজ উপলক্ষে বিশেষ কোন ইবাদত করা বেদআত।

লেখক : কলামিস্ট ও মাদরাসা শিক্ষক

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com