বৃহস্পতিবার, ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৭:৪৭ অপরাহ্ন

শংকরপাশা শাহী জামে মসজিদ

শংকরপাশা শাহী জামে মসজিদ

সুলতানি আমলের স্থাপত্য

শংকরপাশা শাহী জামে মসজিদ

মুস্তাকিম আল মুনতাজ

সিলেট বিভাগের হবিগঞ্জ সদর উপজেলার রাজিউড়া ইউনিয়নের শংকরপাশা গ্রামে অবস্থিত সুলতানি আমলে নির্মিত ৫১৩ বছরের প্রাচীনতম উচাইল শংকরপাশা শাহী জামে মসজিদ। বর্তমানে মসজিদটি কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এ মসজিদ একনজর দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভ্রমণপিপাসুরা দলে দলে ভিড় জমান এ স্থানে। হবিগঞ্জ শহর থেকে ৬ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করে প্রবেশ করা যাবে উচাইল গ্রামে।

উইকিপিডিয়ার তথ্যমতে, সুলতান আলাউদ্দিন হোসেন শাহের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মজলিশ আমিন ১৫১৩ সালে এ মসজিদটির নির্মাণ কাজ সমাপ্ত করেন। এ মসজিদের পাশেই তার সমাধির দেখা পাওয়া যায়। কালের বিবর্তনে এক সময় মসজিদসহ সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা ঘন অরণ্যভূমিতে পরিণত হয়। পরবর্তীকালে অনাবাদি জঙ্গলবেষ্টিত এ এলাকায় জনবসতি গড়ে উঠার প্রাক্কালে আবারও জনসম্মুখে আসে এ মসজিদটি।

প্রাচীনতম এ মসজিদটি একটি একচালা বিশিষ্ট প্রাচীন পাকা ভবন। যার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ একই পরিমাপের। এর দৈর্ঘ্য সাড়ে ২১ ফুট আবার প্রস্থও ২১ ফুট ৬ ইঞ্চি। এর সম্মুখের বারান্দাটির প্রস্থ তিন ফুটের একটু বেশি এবং এতে চারটি গম্বুজ রয়েছে। এটির মূল ভবনের মধ্যভাগে একটি বিশাল আকৃতির গম্বুজ এবং বারান্দার উপর রয়েছে তিনটি ছোট গম্বুজ। মসজিদটিতে মোট ১৫টি দরজা ও জানালা রয়েছে, যা পরস্পর একই আকৃতির ও সামঞ্জস্যপূর্ণ। উত্তর পূর্ব ও দক্ষিণ, এই তিন দিকের দেয়ালের পুরুত্ব প্রায় পাঁচ ফুট এবং পশ্চিমের দেয়ালটি প্রায় দশ ফুট। এতে মোট ছয়টি পুরাকীর্তি কারুকার্য শোভিত স্তম্ভ রয়েছে, যা প্রধান কক্ষের চারকোণে ও বারান্দার দুই কোণে অবস্থিত। উপরের ছাদ আর প্রধান প্রাচীরের কার্নিশ ধনুক আকৃতির বাঁকানোভাবে নির্মিত। মসজিদের দক্ষিণ পার্শ্বে একটি বড় দীঘি রয়েছে।

মধ্যযুগীয় স্থাপত্য শিল্পের অন্যতম নিদর্শন হবিগঞ্জের এই শংকরপাশা শাহী মসজিদ। মসজিদটি সুলতানি আমলের স্থাপত্য নিদর্শনের চিহ্ন বহন করে। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার অন্তর্গত উচাইল নামক গ্রামে ছোট্ট একটি টিলার উপর প্রায় ৬ একর ভূমির ওপর কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মসজিদটি। জানা যায়, অত্যন্ত চমৎকার ও মনোমুগ্ধকর কারুকাজ সমৃদ্ধ মসজিদটির দৃষ্টিনন্দন নির্মাণশৈলী দেখার মতো। পোড়ামাটির তৈরি নান্দনিক কারুকার্য ও অসাধারণ নির্মাণশৈলী আধুনিকতাকে হার মানায়। এ সমস্ত পোড়ামাটির নকশা কাটা অসংখ্য ফলক এ ইমারতের দেয়ালে সাঁটানো হয়েছে। দেয়ালের বহিরাংশে পোড়ামাটির বিভিন্ন নকশা এবং অলঙ্করণ সহজেই দর্শনার্থীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে। পোড়ামাটির নকশা আঁকা মসজিদটি দৃশ্যত লাল বা রক্তিম বর্ণের হওয়ায় লোকজন এটিকে ‘লাল মসজিদ’ বলে থাকেন। আবার এটির অবস্থান একটি টিলাশৃঙ্গে। এ দুই বৈশিষ্ট্যের সংমিশ্রণে মসজিদটিকে ‘লালটিলা মসজিদ’ও বলা হয়। এ মসজিদটি পুনঃআবির্ভূত হওয়ায় অনেকেই এটিকে গায়েবি মসজিদও বলে থাকেন।

স্থানীয় লোকজন জানান, প্রাচীন এ মসজিদটির রক্ষণাবেক্ষণের সব দায়িত্ব এখন সরকারের প্রতœতত্ত্ব বিভাগের হাতে রয়েছে। তবে এখনও পর্যন্ত দৃশ্যত কোন প্রকার কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। তাই দ্রুততম সময়ে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে তারা সংশ্লিষ্টদের প্রতি আহ্বান জানান।

যেভাবে যাবেন: দেশের যেকোনো প্রান্ত হতে প্রথমে আপনাকে সড়ক বা রেলপথে হবিগঞ্জ জেলায় আসতে হবে। ঢাকার কল্যাণপুর, ফকিরাপুল কিংবা আরামবাগ থেকে সোহাগ, আল-মোবারাকা, গ্রীণ লাইন, এনা, সৌদিয়া, হানিফ ইত্যাদি বাস চড়ে সরাসরি হবিগঞ্জ অথবা সিলেটগামী যেকোনো বাসে হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ আসতে হবে। এছাড়াও কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে যেকোনো ট্রেন চড়ে হবিগঞ্জ জেলার শায়েস্তাগঞ্জ আসতে হবে। শায়েস্তাগঞ্জ মোড় থেকে বাস কিংবা সিএনজি অথবা প্রাইভেটকার নিয়ে যেতে পারেন আপনার কাক্সিক্ষত সেই উচাইল শংকরপাশা শাহী জামে মসজিদে।

লেখক : আলেম, লেখক, সম্পাদক, সংগঠক

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com