সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১, ০৯:০৪ অপরাহ্ন

রাজধানীর বস্তিবাসীর দুঃসহ জীবন

রাজধানীর বস্তিবাসীর দুঃসহ জীবন

রাজধানীর বস্তিবাসীর দুঃসহ জীবন

সেলিমা খাতুন

নগরায়ন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও পারিবারিক নির্যাতনের কারণে অনেক নারী ও শিশু বিভিন্ন শহরে অভিবাসিত হচ্ছে। রংপুরের কোহিনুর বেগম নেশাগ্রস্ত স্বামীর নির্যাতনে সংসার ছেড়েছে প্রায় দশ বছর আগে। বাবার সংসারে আর্থিক অনটন থাকায় এক নিকট আত্মীয়ের সাথে ঢাকায় চলে আসে কোহিনুর কাজের খোঁজে। তেজগাঁওয়ের বস্তিতে ছোট্ট একটি ঘর ভাড়া নেয়। বুয়ার কাজ করে কোনোরকমে চলছিল কোহিনুর বেগমের জীবন। এক বছর আগে আগুনে ঘর পুড়ে গেলে উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে। পরে অনেক চেষ্টায় ঠাঁই হয় শাহজাহানপুর বস্তিতে। বস্তির ঘিঞ্জি পরিবেশে খুপরি ঘরগুলোতে ঠাসাঠাসি করে বাস করতে হয়।

মহাখালীর বস্তিতে প্রায় পাঁচ বছর ধরে বাস করে আসছে কুড়িগ্রামের সুফিয়া খাতুন। অনেক আগেই স্বামী মারা গেছে। স্বামীর যেটুকু ভিটা মাটি ও ফসলি জমি ছিল, সেটুকুও নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এরপর সে একমাত্র মেয়েকে নিয়ে ঢাকা শহরে কাজের সন্ধানে আসে। মা মেয়ে দু’জনই একটি গার্মেন্টসে কাজ নেয়। এক ঘরে তারা থাকে আটজন। ভাড়া দিতে হয় মাসে দুই হাজার টাকা। সুফিয়া জানায়, আটজনের দুই শিফটে কাজ থাকায় মানিয়ে নিতে খুব সমস্যা হয় না। স্বল্প বেতন দিয়ে ভালোভাবে থাকা সম্ভব হয় না। এসব নারীরা কেউ প্রাকৃতিক দুর্যোগে নিঃস্ব হয়ে, কেউবা স্বামী পরিত্যক্ত হয়ে অভাব অনটনের কারণে জীবন ও জীবিকার তাগিদে শহরমুখো হয়।

ঢাকাসহ বিশ্বের উন্নয়নশীল ও অনুন্নত শহরগুলোতে বস্তিতে বসবাস একটি পরিচিত দৃশ্য। কখনও আগুন লাগা বা বস্তি উচ্ছেদের মত আকষ্মিক ঘটনায় তারা বিপদে পড়ে যায়। গত দুই তিন বছরের মধ্যে রাজধানীর আগারগাঁও, কল্যাণপুর, তেজগাঁও, বেগুনবাড়ি, কড়াইল ইত্যাদি বস্তিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। দীর্ঘদিন একই জায়গায় বসবাস করার পর হঠাৎ এমন দুর্ঘটনায় অসহায় হয়ে পড়ে বস্তির ছিন্নমূল মানুষ। তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে উন্মুক্ত আকাশের নিচে খাদ্য, পানীয় জল ও কাজবিহীন অবস্থায় বস্তিবাসীকে দুঃসহ জীবনযাপন করতে হয়। ছোট ছোট শিশুদের অবস্থা হয় আরো ভয়াবহ।

বেসরকারি সংস্থা কোয়ালিশন ফর দ্যা আরবান পুওর (কাপ) ২০১৪ এর তথ্য অনুযায়ী ঢাকা শহরে প্রতিবছর বস্তিবাসী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। আর প্রতিবছর অবৈধ বস্তি উচ্ছেদের ঘটনা ঘটছে। আবার বস্তিতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনাও বেড়েই চলেছে। সরকারি তথ্যানুযায়ী, ঢাকা শহরে বস্তির সংখ্যা চার হাজার সাতশ’র বেশি। বস্তিবাসীর সংখ্যা প্রায় চল্লিশ লাখ, যা ঢাকা মেগা সিটির মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ। সুপেয় পানীয় জলের অভাব, অনুন্নত পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংযোগবিহীন অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ প্রায় প্রতিটি বস্তিতে বিদ্যমান। সেই পরিবেশেই ঝড়-বৃষ্টি এবং অগ্নিকাণ্ডের ভয় মাথায় নিয়ে নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করতে হয় বস্তিবাসীকে। অনেকে নিকটস্থ ডোবা, নালা ও ড্রেন ইত্যাদি অনিরাপদ পানির উৎস থেকে পানি সংগ্রহ করে। ফলে আক্রান্ত হয় বিভিন্ন ধরনের পানিবাহিত রোগে। অসাস্থকর পরিবেশে বসবাসের ফলে বস্তিবাসীদর তো বটেই বিশেষকরে নারী ও শিশুদের ক্ষতিহয় সবচেয়ে বেশি। ফলে স্বাস্থ্যহীনতার প্রকপ এ চক্র চলতেই থাকে। পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয় এ সাথে রেললাইনের পাশে বস্তিতে বসবাস অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ, অথচ রাজধানীর রেললাইনের পাশে গড়ে উঠেছে অনেক বস্তি। তেজগাঁও এফডিসি গেট থেকে কারওয়ানবাজার রেলগেট পর্যন্ত রেললাইনের খুব কাছেই গড়ে উঠেছে বস্তিগুলো, যা স্বাভাবিক জীবনযাপন করার ক্ষেত্রে শুধু ঝুঁকিপূর্ণই নয়, ভয়ঙ্করও বটে। এছাড়া খিলগাঁও থেকে মালিবাগ রেললাইন ঘেঁষে তাবু টাঙ্গিয়ে অসংখ্য ভাসমান মানুষ বসবাস করছে।

রেললাইনের পাশে গড়ে উঠা বস্তিগুলোর পাশ দিয়ে ট্রেন চলে যায় যখন তখন। দ্রুত গতির আন্তঃনগর ট্রেনের হুইসেল বাজার সাথে সাথে বস্তির মানুষগুলো, বিশেষ করে ছোট শিশুরা দিগি¦দিক ছোটাছুটি শুরু করে নিরাপদ স্থানের জন্য। অনেক সময় ট্রেন ঘটিত বিভিন্ন র্দুঘটনারও শিকার হয় বস্তিবাসীরা কিন্তুু ট্রেন চলে গেলেই পুরোনো চেহারায় ফিরে যায় বস্তির জীবন কেউ রেললাইনে বসেই রান্নার কাজ সারে। কেউবা আবার দুই লাইনের মাঝের খালি জায়গায় পসরা সাজিয়ে বসে ব্যবসা করে, আড্ডা দেয়। ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা খেলাধুলা, খাওয়া-দাওয়া করে রেললাইনে। এসব এলাকায় মারাত্নক দুর্ঘটনা ও জীবনহানি যেন স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে। প্রশাসন প্রতিকারের উদ্যোগ নিলেও ফল পাওয়া যাচ্ছে না।

নগরে বসবাস করেও নাগরিক সুবিধাবঞ্চিত এই বিশাল জনগোষ্ঠী রাজধানীর অর্থনীতির চালিকাশক্তি হিসেবে বিশেষ অবদান রেখে আসছে। মিল-কারখানার শ্রমিক, নির্মাণ শ্রমিক, পোশাক শিল্পের শ্রমিক, রিকশা ও অটোরিকশা চালক, পরিচ্ছন্নতা কর্মী, ফেরিওয়ালা, সবজি ও মাছ বিক্রেতা, বাসায় কাজ করা বুয়াসহ বিভিন্ন নিম্ন আয়ের পেশাজীবীরা বস্তিতে বসবাস করে। এসব স্বল্প আয়ের মানুষের বাসস্থানের দাবি দীর্ঘদিনের। রাজধানীর মিরপুরে বস্তিবাসীদের জন্য ১৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে বহুতল ভবনে ৫৩৩টি আধুনিক ফ্ল্যাট নির্মাণ করেছে সরকার। এর মধ্যে প্রথম দফায় ৩০০টি ফ্ল্যাট হস্তান্তর করা হয়েছে। চার হাজার ৫০০ টাকা মাসিক ভাড়া দিতে হবে। প্রতিটি ফ্ল্যাটের আয়তন ৬৭৩ বর্গফুট। প্রতিদিন ১৫০ টাকা কিংবা সপ্তাহে এক হাজার ৫০ টাকা করে ফ্ল্যাটের ভাড়া পরিশোধ করা যাবে।

২০১৭ সালে এই পরিকল্পনা গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ওই বছরের ২৬ অক্টোবর এ প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়।

বেসরকারি সংস্থা মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক বলেন, বস্তিবাসী মানুষগুলো শুধু শুধু শহরে আসে না। তারা কাজের সন্ধানে আসে। কিন্তু তারা কোনও বস্তিতে বিনা পয়সায় থাকতে পারে না। তাদের ভাড়া দিয়ে থাকতে হয়। তাদের যারা ঘর ভাড়া দেয়, জমি তাদেরও নয়। সুতরাং তারা বেআইনি কাজ করছে। প্রভাবশালী কিছু মানুষ দরিদ্র এসব বস্তিবাসীদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিচ্ছে। তাদের জন্য রাজধানীর আশপাশের এলাকায় সরকারিভাবে বাসস্থানের ব্যবস্থা করা গেলে সরকারও লাভবান হবে, বস্তিবাসীও উপকৃত হবে। এছাড়া, আশপাশের জেলাগুলোর সাথে রাজধানীর যাতায়াত ব্যবস্থা উন্নত করতে হবে। সারাদিন কাজ করে কেউ যদি সন্ধ্যায় রাজধানীর পাশের জেলাগুলোতে ফিরতে পারে তাহলে বস্তির সংখ্যা এমনিতে কমে যাবে। যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করে এবং কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা বিকেন্দ্রীকরণ করে পারলে কাজ শেষে ঢাকা ছেড়ে ঘরে ফেরার ব্যবস্থা বস্তব রূপদেয়া সম্ভব।

বস্তিতে বসবাসকারী নিম্ন আয়ের মানুষদেরও বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে। ঢাকার বাইরে যদি শিল্প প্রতিষ্ঠান ও গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলো স্থানান্তর করা সম্ভব হতো, তাহলে রাজধানীতে বড় বড় বস্তি তৈরি হতো না। ঢাকার প্রয়োজনেই এসব বস্তি তৈরি হয়েছে। এদের জন্য বিকল্প আবাসন ব্যবস্থা একান্ত প্রয়োজন। মানবিক দৃষ্টিকোণ থেকেও সরকারি যে সকল বেদখল জমি রয়েছে, তাতে বিকল্প পুনর্বাসন ব্যবস্থা করে দিলে অনেকাংশেই বস্তিবাসীদের সমস্যার সমাধান হবে।

আমাদের ভুলে গেলে চলবেনা বস্তিবাসীরাও আমাদের অংশ। তাদের সুস্থ জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান করা আমাদের নাগরিক দায়িত্ব। নগরের সঠিক পরিবেশ স্বাস্থ্য সম্মত ও পরিচ্ছন্ন রাখতে বস্তি এলাকার পরিবেশ উন্নয়ন আবশ্যক। বস্তিবাসীদের জীবনের উন্নয়ন করা আমাদের নাগরিক এবং মানবিক দায়িত্ব। এ জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষসহ আমাদের সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা এবং আন্তরিকতা পয়োজন সবার আগে। সকলে মিলে বস্তিবাসীদের দুঃসহ জীবন সুন্দর করতে আমাদের সকলের এগিয়ে আসার কোনো বিকল্প নেই। পিআইডি
লেখক : ফ্রিল্যান্স রাইটার

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com