মঙ্গলবার, ০৩ অগাস্ট ২০২১, ১২:৩৮ পূর্বাহ্ন

যে শহরে উদ্বাস্তু আমি | লাবীব আব্দুল্লাহ

যে শহরে উদ্বাস্তু আমি | লাবীব আব্দুল্লাহ

যে শহরে উদ্বাস্তু আমি | লাবীব আব্দুল্লাহ

প্রিয় ময়মনসিংহের সৌন্দর্য দেখেছি গতরাতে৷ রাতের শহর৷ আনজুমানে ঈদগাহ জামে মসজিদে ঈশার নামায আদায় করে দেখিছি রাতের ঈদগাহ৷ আলো ঝলমল মিনার৷ ইমাম ও খতীব মুফতী মামুন সাহেবের সঙ্গে কিছুক্ষণ কাটিয়ে থানাঘাটে৷ থানাঘাটে সেই বস্তি আজ আর নেই৷ নেই আশ্রয়হীনদের কোলাহল৷ উদ্বাস্তুদের ভিটা৷ মহানগরের উন্নয়ণের স্বার্থেই তাদের নির্বাসনে পাঠানো হয়েছে৷ কেউ কেউ দুলাল বাড়ি চরে৷ শান্তিনগরে৷ এই শান্তিনগরে কতটা শান্তি তা বলতে পারবো না৷ আশ্রয়ণ প্রকল্পে ঠাই পেয়েছে কেউ কেউ৷ কে কোথায় হারিয়েছে জানি না৷ সন্ধ্যার সরগম, চায়ের কাপের আওয়াজ নেই আগের মতো৷ আমি রাতের অন্ধকারে হেঁটে হেঁটে অনেকক্ষণ মৃত নদীর শবদেহ দেখলাম৷ মরা গাঙের কান্নার আওয়াজ পেলাম৷

শহরের বর্জ্য নদীতে! নদীর কান্না শোনার কেউ নেই৷ বালি উঠিয়ে তৈয়ার হচ্ছে বালির পাহাড়৷ এই পাহাড়ে হবে লোহা লক্করের ভবন৷ দুর্নীতিবাজদের আশ্রয়৷ কিছু ভালো মানুষও এই বালি খরিদ করবে হয়তো৷ নদীর ওপারে চরঈশ্বরদিয়া৷ এই চরে ঈশ্বরের সন্ধান না করে দেখলাম মানুষের রাতে ঘরে ফেরা৷ নৌকায় পাঁচ টাকা৷ এক মিনেটের নদী পথ৷ নদীপাড়ে মটরসাইকেল৷

কিছু বেকার বা সকার ছেলে অপেক্ষায় নৌযাত্রীদের৷ চরাঞ্চলে রাতে ছুটবে তিন আরোহীসহ মটরসাইকেল৷ বালির পথ ধরে৷ গরু দুধে চা পান এবং গরীবের বার্গার বনরুটি ভক্ষণ করে ঐতিহ্যবাহী চকবাজারে৷ বড় বাজার, ছোট বাজার, প্রেসপাড়া হয়ে গাঙ্গিনার পাড়ে প্রেস ক্লাবে৷ তখন রাত এগারোটা৷ থানাঘাটে নৌকা চলে রাত একটা তক৷

চকবাজারে ঐতিহ্যবাহী বড় মসজিদে তাকালাম এক লহমা৷ এক নজর৷ এক ঝলক৷ উঁচু মিনার তাওহীদের ঘোষণা করে এই শহরে৷ বড় মসজিদ মার্কেটে বইয়ের দোকান৷ কতুবখানা৷ সবগুলো দোকান বন্ধ হয়েছে রাত এগারোটার আগে৷ মাকতাবাতুল ইসলাম বিসমিল্লাহ এজেন্সির ঠিকানায় বই পাঠিয়েছে আমার লিখিত ও অনূদিত বইগুলো সেই দোকানও বন্ধ৷ আমি রাতের শহরের রুপময় ছবি দেখে দেখে গেলাম ধোপাখলা হয়ে চরপাড়ায়৷ গাঙ্গিনার পাড়ে কী গাঙ ছিলো? ধোপাখলায় কি ধোপা ধুপী? চরপাড়ায় কি ছিলো চর? তাহলে ময়মনসিংহ শহরের মহল্লা ও এলাকার নানে গাঙ পাড়, ধোপা ও চর কেন? এই শহরের অতীতে ফিরে গেলাম আমি৷ দৈনিক বাংলাদেশ খবরের সহ সম্পাদক মাহফুজুর রহমান হোসাইনী চরপাড়ায় সরগরম বা হোটেল রিফাতে তন্দুর ও কফির জেফত দিলেন৷ আমি উদ্বাস্তু হয়ে এতো দামি হোটেলে বসতে পারি না৷ এলাম কাচিঝুলিতে৷ সাহেব কোয়ার্টারে৷ মুজীব রহমান ও যোবায়ের হাসান জেহাদ ও মুরাদ ভাই মধ্যরাতে এলেন রেডচিলিতে৷ লাল মরিচের দোকানে৷ আমি জামিয়া ইসলামিয়া সেহড়ায় উপমহাদেশের সংগ্রামী ও চিন্তাবিদ আলেম মাওলানা আতহার আলী রহ এর কবর জিয়ারত করে এলাম সাহেব কোয়ার্টারে৷ রাতে আমি হাটছি গাছের অন্ধকারময় ছবি দেখে দেখে৷ কাচিঝুলিতে লেখালেখি ও এই শহরের মায়া কায়া ও ছবি নিয়ে গল্প৷ গল্প জীবন নিয়ে৷ স্বপ্ন দেখা ও দেখানো কিছুক্ষণ এই প্রজন্মের তরুণদের৷ আমার সাথে আরেক লাবীব আব্দুল্লাহ৷ আগামী জীবনে কীভাবে আরও পড়ালেখা করবে সেই গল্প করতে এসেছে লালমনির হাট থেকে৷ ডেরাবাসী৷ হাট থেকে ডেরায়! আমরা রুটি ও চায়ের টেবিলে গল্প করছি আগামীর গল্প৷ পথ থেকে পথে৷ ডেরায় ফেরার চিন্তা বাদ! শববেদারি৷ নিশিচর৷ নিশি জাগরণ৷ এই শহরের ক্লান্ত মানুষেরা এখন টকশো না দেখে নিদ্রাজগতে৷ টকশোতে নেই টক ঝাল৷ মধ্যরাতের সিধেৱ চোর! আরও টক নিয়ে রয়েছে নানা গল্প৷ আমরা চায়ের টেবিলে তক্কাতক্কি করছি তখন৷

লালমনির হাটের লাবীব এই প্রথম লাল মরিচের দোকানে! রেডচিলিতে! দোকান থেকে তখন রাস্তায়! পুলিশ বলছে কোথায়! জানি না আমি৷ এই শহর আমার৷ এই নগরী আমার৷ এই সিটি আমার৷ এই মহানগর আমাদের৷ তবুও পুলিশ সাহেবকে বললাম কাঠের গোলায় ঠিনানা! কাঠগোলায় কি কাঠ রয়েছে? কাঠ থাক বা না থাক তবুও হোটেল তাজে রসগোল্লা খেয়ে আমরা তখন তিন রাস্তায়৷ চার রাস্তায়৷ চৌরাঙ্গিতে! চৌ মানে চার৷ জীবন হয়তো তিন রাস্তা বা চার রাস্তা৷

রাতে নদের সঙ্গে গল্প করে ভোরে আবার সেই নদেই৷ নদী থেকে নদীতে৷ নদ থেকে নদে৷ ফজর পড়লাম জেলখানা মসজিদে! নাবীলাকে মাদরাসায় দিয়ে এলাম৷ মুহাম্মদকে পাঠালাম সাইকেলে মাদরাসায়৷ লাবীবা এখন শিক্ষিকা! আবরার শিখেছে মটরসাইকেল! আমি রাতে কিছুক্ষণ ছিলাম দুই লাখ নব্বই হাজার টাকার মোটরসাইকেও!

উদ্বাস্তু কিছুক্ষণ ছিলো অটোতেও৷ এই তো জীবন৷ এই জীবনে সকালে হণ্টন৷ করি এখন গ্রাম থেকে গ্রামেও৷ শরীরযন্ত্রকে মেরামত করতে প্রয়োজন হণ্টন৷ প্রিয় ময়মনসিংহ নিরাপদে থাকো৷ আল্লাহ তোমাকে সমৃদ্ধি দান করুন৷

লৌহিত্য তীরে৷ ডেরা৷
১৬ মার্চ ২০২১

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com