মঙ্গলবার, ০৩ অগাস্ট ২০২১, ০১:৩০ পূর্বাহ্ন

মোবাইলের ফেতনা : বাস্তবজীবনের যতকথা

মোবাইলের ফেতনা : বাস্তবজীবনের যতকথা

মোবাইলের ফেতনা

বাস্তবজীবনের যতকথা

সাইফুল ইসলাম রিয়াদ

মোবাইল। যা ইতোমধ্যে বিশ্বজুড়ে এক নীরব বিপ্লবের নাম। বিটিআরসি প্রকাশিত ২০১৯-এর তথ্যমতে বাংলাদেশে মোবাইল ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১৬ কোটি ৫৫ লাখ ৭২ হাজার। যা জনসংখ্যার তুলনায় কাছাকাছি পর্যায়ের। আমার হিসাব মতে কোলের শিশুরা বাদে সবাই মোবাইল ব্যবহার করে।

মোবাইলের সৃষ্টি ও ব্যবহার নিয়ে আগের গবেষণায় যেই ভয়ংকর রিপোর্ট আমরা শুনেছিলাম, তা রীতিমত আঁতকে উঠার মত। এখানে দীর্ঘ লেখার সুযোগ নেই। মানুষ ধৈর্য নিয়ে পড়ে না। তাই সংক্ষিপ্তভাবেই লিখছি। একটি সমাধান ও শরহে সুদুরে পৌঁছুতে আমি খোঁজে পেয়েছি চারটি বিষয়-

১. শারীরিক

২. মানসিক

৩. জাগতিক

৪. পরলৌকিক

এই আলোচনায় আমি প্রতিটা বিষয়ের ভাল ও মন্দ, দুটি দিক নিয়েই কথা বলব। কেননা মূলনীতি হল, কোন কাজে বাধা দিলে তার বিকল্প পথ বাতলে দিতে হয়। আমি সেই চেষ্টাটুকুই করব।

শারীরিক: দেহে মোবাইলের প্রভাব : সাইন্স অব টেকনোলোজি’র ভাষায়, মোবাইলে এক ধরনের রেডিয়েশনের উপস্থিতি বিদ্যমান। সেটা টাচস্ক্রীণ হোক বা বাটনের মোবাইল। স্পিকার থেকে আসা সাউণ্ড বা স্ক্রীণ থেকে আসা আলো দুটিই মানব দেহের জন্য ক্ষতিকর। তারা এব্যাপারে ব্যাখ্যা করেন এভাবে-

Radiation হচ্ছে ‘তেজষ্ক্রীয় রশ্মি’ বা উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন এক প্রকার ত্বড়িৎ চুম্বকীয় বিচ্ছুরিত শক্তি।

ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন এর মতে, অতিমাত্রায় রেডিয়েশনের কারণে কানের নানাবিধ সমস্যা, চোখে ঝাপসা দেখা বা রেটিনা প্রবলেম, ব্রেইনের নিউরোনের ক্ষতি, ব্রেইনের সেল দুর্বল হয়ে যাওয়া। এমনকি ব্রেইন ক্যান্সারও হতে পারে।

মেডিকেল গবেষকদের একটি দল বলেন, এর থেকে মুক্তি পেতে কিছু টিপস গ্রহণ করতে পারেন-

কথা বলার সময় মোবাইল দেহ থেকে ন্যূনতম দূরত্বে রাখা।

কানে হেডফোন বা ব্লুটুথ ব্যবহার করা।

লাউড স্পিকারে কথা বলা।

স্ক্রীণের দিকে দীর্ঘক্ষণ তাকিয়ে না থাকা।

স্ক্রীণে সরাসরি না তাকিয়ে একটু এঙ্গেলে রাখা।

এসএমএস বা ভয়েস কলে কথা বলা।

মানসিক: মননে ঘটায় বিষাদ : মোবাইলের প্রতি মানুষের আসক্তি ড্রাগস থেকেও মারাত্মক। মানসিক চিকিৎসকেরা এর নাম দিয়েছেন ‘ নোমোফোবিয়া’।

নোমোফোবিয়া শব্দটি এসেছে নো (NO), মো (MOBILE) এবং ফোবিয়া (PHOBIA) থেকে। যেটাকে একসাথে করলে হয় মোবাইল ফোন নেই- এমন ফোবিয়া।

নোমোফোবিয়ার উপসর্গগুলো খুব সাধারণ।

১. মোবাইলের কাছ থেকে দূরে থাকলে চিন্তিত হয়ে পড়া, অস্থিরতায় ভোগা।

২. কোনো কাজে বা কারো কথায় মন না দিতে পারা। একটু পরপর ফোন হাতে নিয়ে দেখা কেউ কল দিল কিনা বা বার্তা পাঠালো কিনা।

৩. সেলফোন ভাইব্রেশন সিনড্রোম বা মোবাইলের কম্পন বারবার অনুভব করা।

৪. ফোন না থাকলে নিজেকে একা মনে হওয়া, হতাশ হয়ে পড়া।

এটা থেকে মুক্তি পেতে সমাধান একটিই চোখে পড়ে- মোবাইলকে নিজের উপর নিয়ন্ত্রণহীন করে, মোবাইলকে নিজের নিয়ন্ত্রণাধীন করা।

জাগতিক: ঘটে যাওয়া সমাজের চিত্র : পত্রিকার পাতা উল্টালেই ভেসে উঠে আত্মহত্যা, পরকীয়া, ধর্ষণ ও গেমস আসক্তিতে ছেলে-মেয়েদের বিপন্ন জীবনের হাল-চাল।

মোবাইলের অপব্যবহারের মাশুল হল, জীবনে কালো দাগের প্রভাব। মোবাইল শুধু আমাদের চিন্তা চেতনাকেই গ্রাস করেনি, ধ্বংস করেছে জীবনব্যবস্থা। মনে রাখতে হবে, প্রতিটা কাজের রিটার্ন বলতে একটা জিনিস রয়েছে। সেটা ভালো হলে প্রতিদান হবে ভাল। আর মন্দ হলে প্রতিদান তো মন্দই আশা করতে হবে। প্রবাসীদের স্ত্রীদের পরকীয়ার সিংহ ভাগ ঘটছে এই মোবাইলকে কেন্দ্র করে। মোবাইলে নারীদের উলঙ্গ দেহ দেখে দেখে যুবকগুলো দেহ খাবলে খাওয়ার প্রেরণা খোঁজে পায়। ছাত্র-ছাত্রীদের বিষয় তো আর বলার কী আছে? প্রত্যেক মা বাবাই এর সাক্ষী দেবে।

পারলৌকিক : এভাবে কী কখনো ভেবেছি : প্রশ্ন করতে পারেন, মোবাইল আবার পরকালে কী করবে? মোবাইল যেমন আমাদের জন্য আশীর্বাদ, তেমনই অভিশাপও বটে। যন্ত্র একটি, অথচ ব্যবহারকারীর অবস্থানুযায়ী এই ভিন্নতা। এই ভিন্নতা কেন?

ওয়াটসআপ, ভাইবার, ম্যাসেঞ্জার বা ইমোর মত সোস্যাল কমিউনিকেশনের মাধ্যমগুলো আমাদের বহু উপকারে আসে। যা ব্যবহারকারীরা নিশ্চিত বলতে পারবে। পারস্পরিক সম্পর্ক তৈরিতে অনেক ভূমিকা রয়েছে এগুলোর। বিজনেস আলাপচারিতাও হয় দেশের গণ্ডি পেরিয়ে বিদেশে। অনেকে আবার এর থেকে অসৎ ফায়দাও নিচ্ছে আড়ালে-আবডালে। হ্যাকাররা আইডি চুরি করে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা হাতিয়ে নেওয়া থেকে শুরু করে কী হচ্ছে না বলুন!

বিভিন্ন সাইটে অবাধ বিচরণ করে যাচ্ছে দেদারছে। এর কী কোন হিসেব কারো কাছে নেই? মোবাইলের অপব্যবহারের জন্যই আমাদের মাঝে সৃষ্টি হচ্ছে দূরত্ব। জন্ম নিচ্ছে সন্দেহ-সংশয়ের।  গুগল হিস্টোরি ডিলিট করা যায়, কিরামান কাতিবিনের হিস্টোরিও কি ডিলিট করা যাবে?

দেখুন তো কুরআন কী বলে-

یَعۡلَمُ خَآئِنَۃَ الۡاَعۡیُنِ وَ مَا تُخۡفِی الصُّدُوۡرُ
চক্ষুর অপব্যবহার ও অন্তরে যা গোপন আছে সেই সম্বন্ধে তিনি অবহিত। [গাফির : আয়াত ১৯]
আরেকটি আয়াতে চোখ বুলাই-

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَخۡفٰی عَلَیۡہِ شَیۡءٌ فِی الۡاَرۡضِ وَ لَا فِی السَّمَآءِ ؕ
নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট ভূমণ্ডল ও নভোমণ্ডলের কোন বিষয়ই লুকায়িত নেই। [আলে ইমরান : আয়াত ০৫]
দীর্ঘ লেখার ফুরসত নেই। এতটুকুই বলব, কিয়ামত দিবসে সামান্য মোবাইলটি যেন জান্নাত প্রাপ্তিতে বাধা না হয়।

সমাধানের পথ একটিই,

اَوَ لَا یَرَوۡنَ اَنَّہُمۡ یُفۡتَنُوۡنَ فِیۡ کُلِّ عَامٍ مَّرَّۃً اَوۡ مَرَّتَیۡنِ ثُمَّ لَا یَتُوۡبُوۡنَ وَ لَا ہُمۡ یَذَّکَّرُوۡنَ
আর তারা কি লক্ষ্য করেনা যে, তারা প্রতি বছর একবার অথবা দু’বার কোন না কোন বিপদে পতিত হয়? তবুও তারা তাওবাহ করে না, আর না তারা উপদেশ গ্রহণ করে। [সূরা তাওবা : আয়াত ১২৬]

আসুন আমরা তাওবা করে নিই।

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com