সোমবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৬:১৯ পূর্বাহ্ন

মাতৃদুগ্ধই হোক নবজাতকের প্রথম খাবার

মাতৃদুগ্ধই হোক নবজাতকের প্রথম খাবার

মাতৃদুগ্ধই হোক নবজাতকের প্রথম খাবার

মারিয়া জান্নাত মিষ্টি

সন্তান হলো পিতা-মাতার কাছে সৃষ্টিকর্তা প্রদত্ত আশীর্বাদ স্বরূপ। একটা পরিবারে যখন নবজাতকের আগমন ঘটে তখন সবার মাঝে যেন আনন্দের ঢল বয়ে যায়। আর এ সময় প্রয়োজন হয় নবজাতকের বিশেষ যতেœর। শিশু ভূমিষ্ঠ হবার পর মায়ের বুকের দুধ খেয়েই ধীরে ধীরে বেড়ে ওঠে। শিশুর সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার ক্ষেত্রে মায়ের দুধ এতটাই গুরুত্বপূর্ণ যে পুষ্টিবিজ্ঞানীরা একে তরল সোনার সাথে তুলনা করেছে। সেজন্য শিশুর জন্মের পর বাইরের কোনো খাবার না দিয়ে দিতে হবে মায়ের বুকের দুধ।

মায়ের দুধের গুরুত্ব অনুধাবন করে ও শিশুদের জন্মের পর মায়ের দুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করার জন্য ওয়ার্ল্ড অ্যালায়েন্স ফর ব্রেস্টফিডিং অ্যাকশন (ডব্লিউএবিএ) -এর উদ্যোগে এবং ইউনিসেফ এর সহযোগিতায় ১৯৯২ সাল থেকে প্রতিবছর এক থেকে সাত আগষ্ট পর্যন্ত পালিত হয় বিশ্বমাতৃদুগ্ধ সপ্তাহ। বর্তমানে ১২০ টিরও বেশি দেশে এ দিবসটি বিশেষ মর্যাদার সাথে পালন করা হয়। বাংলাদেশেও প্রতিবছর এ দিবস বেশ গুরুত্বের সাথে পালিত হয়ে আসছে।

বাচ্চা প্রসবের পর প্রথম তিনদিন মায়ের বুকে যে ঘন হলুদাভ আঠালো দুধ পাওয়া যায় তাকে সাধারণত শালদুধ বলে। এ দুধে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-‘এ’ ও ‘ডি’ এবং রোগপ্রতিরোধের অনেক উপকরণ থাকে যা শিশুকে জীবাণুর হাত থেকে রক্ষা করে। এজন্য শালদুধকে শিশুর জীবনের প্রথম টিকা বলা হয়। কিন্তু বড়ই অনুতাপের বিষয় হলো অনেক মা এ ব্যাপারে উদাসীন। গ্রামাঞ্চলে প্রচলিত কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে নবজাতকে বঞ্চিত করা হয় শালদুধ পান করানো থেকে। এতে শিশু হৃষ্টপুষ্ট হওয়ার বদলে দিন দিন রোগা ও হারগিলে হয়ে যায়। তাই শিশুকে শালদুধ খাওয়ানোর ব্যাপারে সকল মায়ের সচেতন হওয়া জরুরি। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, জন্মের এক ঘন্টার মধ্যেই নবজাতকে মায়ের বুকের দুধ পান করাতে হবে। জন্মের এক ঘন্টার মধ্যে শিশুকে মায়ের দুধ খাওয়ানো হলে নবজাতকের মৃত্যুর হার ২২ শতাংশ কমানো সম্ভব। মায়ের দুধ খাওয়ানোর মাধ্যমে বছরে ৩৭ হাজার নবজাতকের জীবন রক্ষা পাবে। শিশুর ছয়মাস বয়স পর্যন্ত মায়ের দুধ ছাড়া পানি বা বাড়তি কোনো খাবার দেয়া যাবে না। কেননা, মায়ের বুকের দুধেই আছে শতকরা ৯৫ ভাগ পানি। অন্যান্য পুষ্টিগুণ তো আছেই। এরপর দু’ বছর বা তারও বেশি সময় পর্যন্ত বুকের দুধের পাশাপাশি বাড়তি খাবার দেয়া যাবে।

শিশুকে নিয়মিত মায়ের দুধ খাওয়ালে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যায় ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ সাধিত হয়। ব্রাজিলের বিজ্ঞানীদের দীর্ঘমেয়াদি ও বিশদ এক গবেষণায় দেখা গেছে, যে শিশুরা যথাযথভাবে মায়ের দুধ খেয়েছে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় তারা বেশি মেধাবী। পরীক্ষায় তারাই বেশি ভালো করেছে (বিবিসির সূত্রে প্রথম আলোঃ ১৯-০৩-২০১৫)। কিন্তু বিশ্বে মায়ের দুধ পানের ধারাটি অনেক কমে গেছে। মায়েদের ফিগার নষ্ট হবে এই ভয়ে ও নিজেকে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করার জন্য বর্তমান যুগে এসে অনেক মা-ই সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ায় না। এটা সত্যিই দুঃখজনক একটি তথ্য। জেনে রাখা দরকার যে, সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ালে ফিগারে তেমন ক্ষতিই হয় না বরং স্তন্যদানকারী মায়ের জরায়ু, স্তন ও ডিম্বাশয়ের ক্যান্সারের ঝুঁকি ৫০ শতাংশ কমে যায়। এছাড়া সন্তান দুধ পানের সময় যখন মায়ের চোখের দিকে তাকায় তখন মা ও সন্তানের মাঝে গড়ে ওঠে এক নিবিড় সম্পর্ক যা পরবর্তী জীবনে সুফল বয়ে আনে। এসব সন্তান নিষ্ঠুরের মতো পিতা-মাতাকে পাঠায় না বৃদ্ধাশ্রমে। নিজের সবটুকু দিয়ে আগলে রাখার চেষ্টা করে গর্ভধারিণী মাকে।

আজকের শিশুরাই হলো আগামীদিনের ভবিষ্যৎ তাদের হাতেই গড়ে উঠবে বিশ্বসভ্যতা। সেজন্য শিশুর জন্মের পর এসব সূক্ষাতিসূক্ষ বিষয় খেয়াল রাখতে হবে। অবহেলা বা খামখেয়ালি না করে যথাসময়ে নবজাতককে মায়ের বুকের দুধ খাওয়াতে হবে।

লেখক : শিক্ষার্থী, সমাজবিজ্ঞান বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com