শুক্রবার, ০৯ ডিসেম্বর ২০২২, ০১:১২ পূর্বাহ্ন

ভারতের আধুনিক নৃত্যগুরু বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত উদয় শঙ্কর

ভারতের আধুনিক নৃত্যগুরু বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত উদয় শঙ্কর

গুণীজন

ভারতের আধুনিক নৃত্যগুরু বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত উদয় শঙ্কর

বিরলপ্রজ এই নৃত্যশিল্পী ১৯৭৭ সালে ২৬ সেপ্টেম্বর কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সাদ বিন ওয়াহেদ

পুরো নাম উদয় শঙ্কর চৌধুরী। তবে উদয় শঙ্কর নামেই সর্বব্যাপী পরিচিতি তার। তিনি ছিলেন একজন প্রথিতযশা ভারতীয় নৃত্যশিল্পী, নৃত্য পরিকল্পক ও অভিনেতা। তিনি ভারতীয় নৃত্যশৈলী, ভারতীয় জাতীয় নৃত্যের ইউরোপীয় থিয়েটারস সমন্বয় পদ্ধতি গ্রহণের জন্য সুপরিচিত। ভারতীয় শাস্ত্রীয় এবং উপজাতীয় নৃত্যের উপাদানগুলোর সাথে সমন্বয় করেন, যা তিনি পরবর্তী কালে ভারত, ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ১৯২০ থেকে ১৯৩০ সাল পর্যন্ত জনপ্রিয় করান। তিনি ভারতের আধুনিক নৃত্যগুরু হিসেবে সমাদৃত। প্রাচ্য নৃত্যকলার আঙিনায় উদয় শঙ্কর স্বয়ং একাই একটি প্রতিষ্ঠানস্বরূপ।

উদয় শঙ্কর একটি বাঙালি পরিবারে উদয়পুর রাজস্থানে জন্মগ্রহন করেন, ১৯০০ সালের ৮ ডিসেম্বর। উদয়পুরে জন্ম বলেই পারিবারিকভাবে তার নাম ‘উদয় শঙ্কর চৌধুরী’ রাখা হয়। তার বাবা প-িত শ্যাম শঙ্কর চৌধুরী ছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন যশোর জেলার নড়াইল মহকুমার (বর্তমানে জেলা) কালিয়ার অধিবাসী। তাদের বাড়ি কালিয়া উপজেলা সদরে জেলা পরিষদ ডাক বাংলোর পাশে অবস্থিত।

প-িত শ্যাম শঙ্কর যখন ঝালওয়ারের মহারাজার ব্যক্তিগত সচিব হিসেবে কাজ করছিলেন তখন উদয় শঙ্করের জন্ম হয়। উদয় তার শৈশবের বেশিরভাগ সময়ই মা হেমাঙ্গিনী দেবী ও ভাইবোনদের সাথে নুসরাতপুরে তার মায়ের বাড়িতে কাটিয়েছিলেন। তার পিতার কাজ তাকে নিয়মিতভাবে শহরে স্থানান্তর করতে বাধ্য করেছিল। ফলস্বরূপ, উসরকে নুসরাতপুর, গাজীপুর, বারাণসী ও ঝালওয়ার মত বিভিন্ন স্কুলে পরিবর্তন করা হতো। যদিও উদয়কে অল্প বয়সে নাচতে দেখা যায় না, তবে গাজীপুরে তার বিদ্যালয়ে সংগীত ও ফটোগ্রাফির মত অন্যান্য শিল্পের সাথে তার সম্পর্ক ছিল।

উদয়ের পিতা ছিলেন শিল্পবোদ্ধা প্রাজ্ঞজন। তার কাছে নৃত্যকলা ছিল একাধারে শিল্প ও আরাধনা। উদয় সহজাতভাবে চিত্রকলা ও নৃত্যকলার প্রতি অত্যন্ত অনুরক্ত ছিলেন। উদয় শঙ্করের প্রাথমিক শিক্ষার সূচনা হয় বারাণসীতে। তারপর ১৯১৮ সালে উদয়কে মুম্বাইয়ের জে জে স্কুল অব আর্টস এবং পরে গান্ধর্ব মহাবিদ্যালয়ে প্রশিক্ষণের জন্য পাঠনো হয়। এর পর তিনি উচ্চতর প্রশিক্ষণের জন্য লন্ডনের ‘রয়্যাল কলেজ অব আর্টস্’-এ যান। এখানে তিনি প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের চিত্রকলা ও নৃত্যকলার বিষয়ে তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক জ্ঞান অর্জন করেন। তিনিই প্রথম ভারতীয় ছাত্র যিনি এখান থেকে ‘সেন্সর’ ও ‘জর্জক্লাঝেন’ নামক দুটি পদক লাভের কৃতিত্ব অর্জন করেন। রয়্যাল কলেজ অব আর্টস্ এর বৃত্তি নিয়ে উদয় চিত্রকলা বিষয়ে উচ্চতর অধ্যয়নের জন্য রোমে যান।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের কোনও প্রথাগত প্রশিক্ষণ না থাকলেও উদয় শঙ্কর শৈশব থেকেই ভারতীয় শাস্ত্রীয় এবং লোক নৃত্যের শৈলীর সংস্পর্শে এসেছিলেন। ইউরোপে থাকাকালীন তিনি ব্যালেতে এতটাই আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিলেন যে তিনি উভয় শৈলীর উপাদানগুলোকে সমন্বিত করে নৃত্যের একটি নতুন শৈলী আবিষ্কার করার চিন্তাভাবনা করেছিলেন , যাকে ‘হাই-ডান্স’ বলা হয়ে থাকে।

ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্যের স্বরূপ এবং প্রতীকগুলোতে নৃত্যে রূপ প্রদান করেছিলেন এই গুণী শিল্পী। তিনি ব্রিটিশ যাদুঘরে রাজপুত চিত্রকর্ম ও মোগল চিত্রকলার আঙ্গিক বিষয়ে অধ্যয়ন করেন। ব্রিটেনে থাকাকালীন উদয় শঙ্কর নৃত্য পরিবেশনকারী বেশ কিছু শিল্পীর সংস্পর্শে আসেন ও পরবর্তীকালে ফরাসী সরকারের উপবৃত্তি প্রিক্স ডি রোমে আর্ট বিষয়ে উচ্চ স্তরের গবেষণা হেতু রোমে পাড়ি দিয়েছিলেন।

নৃত্যশিল্পী হিসেবে উদয় শঙ্করের প্রথম আবির্ভাব ঘটেছিল লন্ডনে থাকাকালীন ভারতীয় নৃত্য রচনার মাধ্যমে এবং নৃত্যগুলো সেখানকার প্রদর্শনীতে মঞ্চস্থ হয় এবং ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেছিল। লন্ডনের আইভি হাউসে নৃত্য প্রদর্শনের সময় প্রখ্যাত রাশিয়ান ব্যালেরিনা আনাপাভলোভা তার মনোমুগ্ধকর নৃত্য দেখে মোহিত হন এবং পরবর্তীকালে তার সাথে একটি বৈঠক সংঘটিত হয়েছিল যা উদয় শঙ্করের জীবনে সাফল্য ও এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল। আনাপাভলোভা প্রাচ্য নৃত্যকলার প্রতি আগ্রহী হয়ে প্রাচ্য ওরিয়েন্টাল নৃত্য প্রশিক্ষণ দেয়ার জন্যে উদয় শঙ্করকে তার দলে অন্তর্ভুক্ত করেছিলেন ।

আনাপাভলোভার অনুরোধে ১৯২৩ সালে উদয় শঙ্কর ‘রাধাকৃষ্ণ’ ও ‘হিন্দু বিবাহ’ নামে মনোজ্ঞ দুটি ভারতীয় নৃত্য রচনা করেছিলে যা সর্বপ্রথম মঞ্চস্থ হয়েছিল লন্ডনের কভেন্ট গার্ডেনের রয়েল অপেরা হাউজে। ‘রাধাকৃষ্ণ’ নৃত্যে উদয় শঙ্কর নিজেই রাধার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে পাশ্চাত্য দর্শককুলের হৃদয় জয় করেছিলেন।
পাভলোভার সাথে দীর্ঘ সময় ধরে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে নৃত্য প্রদর্শনের পর উদয় শঙ্কর স্বতন্ত্রভাবে দল প্রতিষ্ঠা করেন। প্রচন্ড প্রতিবন্ধকতার মধ্যে থেকে ও তার মনোবল ভেঙে যায়নি। আনাপাভলোভার উৎসাহ ও অনুপ্রেরণায় তার মনে সঞ্চার ঘটেছিল এক নতুন উদ্যমের। উদয় শঙ্করের নৃত্য সঙ্গিনী ছিলেন সিমকী এবং তার আর্থিক সাহায্য দাতা ছিলেন বিত্তশালিনী চিত্রশিল্পী শ্রীমতি অ্যালিস বোনার।

ভারতবর্ষে ফিরে এসে তিনি কেরালার গুরাভাযুরের একটি মন্দিরে নৃত্য অনুষ্ঠানে ‘কথাকলি’ নৃত্য দেখে অভিভূত হয়ে পড়ে সেই নৃত্য শৈলীকে শেখা এবং গভীরভাবে জানার জন্যে কথাকলি নৃত্য গুরু শঙ্করণ নামবুদ্রীকে শিক্ষাগুরু হিসেবে তিনি তার জীবনে পান। তিনি সেই সময় ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল পরিদর্শন করে শাস্ত্রীয় ও লোক নৃত্য সংগ্রহ ও করেছিলেন।

অ্যালিস বোনারের সহযোগিতায় ১৯৩০ সালের অক্টোবর মাসে উদয় শঙ্কর তার সাংস্কৃতিক দল নিয়ে প্যারিসের পথে যাত্রা করেন এবং এভাবেই তিনি প্রথমবারের জন্য ভারতীয় সাংস্কৃতিক প্রতিনিধি দলকে বিদেশ যাত্রার সূত্রপাত ঘটিয়েছিলেন। সেখানে ‘দ্য কোম্পানি উদয় শঙ্কর দ্য ড্যান্স মিউজিক হিন্দুজ’ নামে একটি নৃত্য ও সংগীত কোম্পানি স্থাপন করেন। এই দলের সংগীত পরিচালক হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন তিমির বরণ। দলের মধ্যে উল্লেখযোগ্য ব্যক্তি যারা ছিলেন তারা হলেন উদয় শঙ্করের ছোট ভাই প-িত রবিশঙ্কর ও তাদের সহযোগিনী মাতা হেমাঙ্গিনী।

উদয় শঙ্কর নিজের অক্লান্ত পরিশ্রমে গড়ে তুলেছিলেন ‘গন্ধর্বনৃত্য’, ‘সাপুড়েনৃত্য’, ‘রাধাকৃষ্ণনৃত্য, ‘তলোয়ারনৃত্য’ এবং ব্যালে হিসেবে ‘শিবপার্বতী’, ‘লেবার অ্যান্ড মেশিনারি’, ‘রিদম অব লাইফ’ প্রভৃতি নৃত্য। ১৯৩১ সালের ৩ মার্চ প্যারিসে অনুষ্ঠিত এই নৃত্য গোষ্ঠীর নজরকাড়া অনুষ্ঠানের পর থেকেই উদয় শঙ্করের নৃত্য জীবনের জয়যাত্রার শুরু হয়।

দেশে ফিরলে তাকে কলকাতার টাউন হলে দেয়া হয় নাগরিক সম্বর্ধনা যেখানে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আশীর্বাদ লাভ করে তিনি ধন্য হয়েছিলেন। রবি ঠাকুরের অনুপ্রেরণায় উদয় শঙ্কর ১৯৩৯ সালে উত্তরপ্রদেশে হিমালয়ের পাদদেশ আলমোড়ায় ‘শংকর ইন্ডিয়া কালচারাল সেন্টার’ নামে একটি ইনস্টিটিউট স্থাপন করেন। এ কেন্দ্রে তিনি, কথাকলিতে শঙ্করণ নাম্বুদ্রি, ভরতনাট্যমে কন্ডপ্পা পিল্লাই, মণিপুরীতে অমবি সিং এবং সংগীতে ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ প্রমুখ গুরুগণকে শিক্ষাদানের জন্য আমন্ত্রণ জানান। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই উদয়শঙ্করের আলমোড়া কেন্দ্রটি ভারতীয় বিভিন্ন ঘরানার নৃত্য ও সংগীতের একটি সম্মেলন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে। উল্লেখ্য, এ কেন্দ্রের বেশির ভাগ অর্থই সংগৃহীত হতো উদয়ের ইউরোপ ও আমেরিকার বন্ধু ও শুভানুধ্যায়ীদের কাছ থেকে। এ ধরনের পরনির্ভরশীলতার কারণে এক সময় এর ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে এবং সফলভাবে চারবছর চলার পর অর্থের অভাবে ১৯৪৪ সালে কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। এ নাতিদীর্ঘ সময়ে উদয়শঙ্কর কেন্দ্রটি অনেক মহান নৃত্যশিল্পী সৃষ্টি করতে সক্ষম হয়। তাঁদের মধ্যে গুরু দত্ত, শান্তি বর্ধন, সিমকি, অমলা, নরেন্দ্র শর্মা, প্রভাত গাঙ্গুলী, জোহরা সেগাল, উজরা, শচীন শঙ্কর, মোহন সেগাল, সুন্দরী শ্রীধরণী, দেবীলাল সমর এবং ভগবান দাশের নাম উল্লেখযোগ্য।

সংগীতের পথপ্রদর্শক উদয় শঙ্কর ভারতের বিভিন্ন স্থান ঘুরে ঘুরে সংগ্রহ করেছিলেন বিভিন্ন ধরণের বাদ্যযন্ত্র। সেই সকল ভারতীয় বাদ্যযন্ত্রগুলোর সমন্বয়ে স্বতন্ত্র এবং নিজস্ব শব্দ ঝংকার সৃষ্টি করেছিলেন তিনি। এগুলোর মধ্যে অন্যতম হল বাঁশি, সেতার, একতারা, তানপুরা এস্রাজ, সরোদ, খঞ্জনি, ঢোল ও ড্রাম। বিদেশী যন্ত্রের ব্যবহার উদয় শংকর তার নিজের দলে কখনো করেননি।

উদয় শঙ্কর ১৯৪২ সালে তার নাচের সঙ্গী বাংলাদেশের মাগুরার মেয়ে অমলার সঙ্গে সাতপাঁকে বাঁধা পড়েন। ওই বছরই তাদের প্রথম সন্তান আনন্দ শঙ্কর জন্মগ্রহণ করে এবং ১৯৫৫ সালে কন্যা সন্তান মমতা শঙ্কর জন্মগ্রহণ করে। তিনি তার একমাত্র পুত্র, আনন্দ শঙ্কর খুব অল্প বয়সে গান গাওয়ার আরম্ভ করেছিলেন এবং একজন সংগীতজ্ঞ এবং সুরকার হন। অন্যদিকে, তার একমাত্র কন্যা, মমতা শঙ্কর নৃত্য শেখেন এবং একটি বিখ্যাত অভিনেত্রী হয়ে ওঠেন।

মমতা শঙ্কর সত্যজিৎ রায়, মৃণাল সেনসহ অনেক খ্যাতিমান পরিচালকের পরিচালিত ছায়াছবিতে নায়িকার ভূমিকায় অভিনয় করে যশোরাধিকারিণী হয়েছেন। তিনি বর্তমানে কোলকাতায় মমতা শঙ্কর ব্যালে ট্রুপস -এর কার্যক্রমসহ কয়েকটি নৃত্য প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভারতীয় নৃত্য প্রশিক্ষণ ও প্রচারে নিয়োজিত রয়েছেন।
আনন্দ শঙ্কর সংগীত জগতে এক আন্তজার্তিক খ্যাতি সম্পন্ন ব্যক্তিত্ব হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। তার সেতারের সুর বিশ্বনন্দিত। তিনি বেশ কয়েকটি ছায়াছবিতে সুর সংযোজন ও সংগীত পরিচালনা করেছিলেন। ১৯৭৪ সালে প্রখ্যাত পরিচালক মৃণাল সেনের ‘কোরাস’ ছবিতে সুরারোপের জন্যে তিনি পেয়েছিলেন জাতীয় পুরস্কার। তার স্ত্রী তনুশ্রী শঙ্করও একজন নামকরা নৃত্যশিল্পী ও অভিনেত্রী।

১৯৪৮ সালে উদয় লিখেছিলেন, ‘কল্পনা’, তারই দ্বারা নির্মিত এবং পরিচালিত, ভারতের প্রথম চলচ্চিত্র মূলত শাস্ত্রীয় নৃত্যশিল্পী প্রধান চরিত্রে। তার স্ত্রী প্রধান চরিত্রটি করেন। যদিও চলচ্চিত্রটি বক্স অফিসে ভাল না করলেও, এটি পরে অনেক সমালোচক ও চলচ্চিত্রপ্রেমীদের দ্বারা স্বীকৃত এবং প্রশংসিত হয়, যা ২০০৯ সালে ডিজিটাল পুনঃস্থাপন করা হয়। উদয় শঙ্করের অগণিত সৃষ্টির একটি বিশেষ দিক হল, ‘শ্যাডো প্লে’ যেখানে তিনি সাদা পর্দার ওপর নিজস্ব কৌশলে নতুন আলো ছায়ার ধারা সৃষ্টি করার কৌশল আবিষ্কার করেছিলেন।

পরবর্তীকালে রঞ্জিতমল কাংকারিয়ার সহযোগিতায় ১৯৭০ সালে তিনি প্রযোজনা করেছিলেন ‘শঙ্করস্কোপ’ এবং ১৯৭২ সালে ‘শঙ্করস্কোপ’ ও ‘সামান্য ক্ষতি’ নৃত্য নাট্যের নবসংস্করণ ছিল তার জীবনের শেষ কীর্তি। সৃজনশীল নৃত্য রচনার বাসনায় বৃদ্ধ বয়সেও কালজয়ী নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্কর টালিগঞ্জের রাধা ফিল্মের ফ্লোর ভাড়া নিয়ে নিয়মিত নৃত্যের মহড়া চালিয়ে যেতেন।

১৯৮৩ সালে, উদয়ের ছোট ভাই ও কিংবদন্তী সেতার প-িত রবি শঙ্কর নতুন দিল্লিতে একটি বড় উৎসব পালন করেন, যা চার দিন ধরে চলে। অনুষ্ঠানটি ‘উদয়-ইয়ুথ উৎসব’ নামে পরিচিত এবং অনেক খ্যাতিমান নৃত্যশিল্পী ও সংগীতশিল্পীকে আকর্ষণ করে। উৎসবে উদয় শঙ্করের ছাত্ররা অংশগ্রহণ করেন এবং অর্কেস্ট্রার সংগীত প্রদর্শনী হয়, যা গঠিত করেন প-িত রবি শঙ্কর নিজে।

বিশ্ববরেণ্য নৃত্যশিল্পী উদয় শঙ্কর তার সাংস্কৃতিক অবদানের জন্য বিশ্ববাসীর কাছ থেকে লাভ করেছিলেন অভাবনীয় স্বীকৃতি ও সম্মান। ভারতীয় নৃত্যকলা তথা সাংস্কৃতিক বিকাশে অসামান্য অবদান রাখায় তিনি ১৯৭১ সালে ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার ‘পদ্মবিভূষণ’ লাভ করেন। ১৯৭৫ সালে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বোচ্চ সম্মান ‘দেশিকোত্তম পুরস্কার’ লাভ করেন। এর আগে ‘ক্রিয়েটিভ ড্যান্স’ সৃষ্টির জন্য তিনি ১৯৬০ সালে মর্যাদাপূর্ণ ‘সংগীত নাটক একাডেমি পুরস্কার’, পুরস্কার লাভ করেন। এর দুই বছর পর ১৯৬২ সালে ‘সংগীত নাটক একাডেমি ফেলোশিপ’ এর জন্য মনোনীত হন। এটি ন্যাশনাল একাডেমি অব মিউজিক, নাচ ও ড্রামা কর্তৃক প্রদত্ত সর্বোচ্চ সম্মান। এই পুরস্কারটি তার জীবদ্দশায় কৃতিত্বের জন্য উদয় শঙ্করকে দেয়া হয়। এই মহান নৃত্যশিল্পীর সম্মানার্থে ভারতীয় ডাকবিভাগ তার এবং তার দলের ‘তান্ডব নৃত্যের’ ওপর বেশ কয়েকটি বর্ণাঢ্য ডাকটিকিট প্রকাশ করেছিলেন।

বিরলপ্রজ এই নৃত্যশিল্পী ১৯৭৭ সালে ২৬ সেপ্টেম্বর কলকাতায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ১৯৬০ সাল থেকেই তিনি কলকাতায় স্থায়ীভাবে কলকাতায় বসবাস করছিলেন। ছিয়াত্তর বছর বয়সে তার দেহাবসান ঘটলেও সৃষ্টির মাধ্যমে তিনি প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে বেঁচে আছেন এবং বেঁচে থাকবেন।

তথ্যসূত্র : বাংলাপিডিয়া; বাংলাদেশ জাতীয় তথ্য বাতায়ন, খুলনা বিভাগ, নড়াইল জেলা, কালিয়া উপজেলা, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২২; এনসাইক্লোপিডিয়া ব্রিটানিকা; প্রোজেশ ব্যানার্জি, ‘উদয় শঙ্কর অ্যান্ড হিজ আর্ট’, বি. আর. পাবলিকেশন্স কর্পোরেশন, ভারত, ১৯৮২; মোহান খোকার, ‘হিজ ড্যান্স, হিজ লাইফ : আ পোর্ট্রটে অব উদয় শঙ্কর’, হিমালয়ান বুকস, ভারত, ১৯৮৩; সুকান্ত চৌধুরী, ‘ক্যালকাটা, দ্য লিভিং সিটি : দ্য প্রেজেন্ট অ্যান্ড ফিউচার’, অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, ১৯৯০, পৃষ্ঠা ২৮০; ‘উদয় শঙ্কর’, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য সংগীত একাডেমি প্রকাশিত, পশ্চিমবঙ্গ সরকার, ভারত, ২০০০।

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com