সোমবার, ২৩ মে ২০২২, ১০:৩৬ পূর্বাহ্ন

বৈশ্বিক সুখী দেশের সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি

বৈশ্বিক সুখী দেশের সূচকে বাংলাদেশের অগ্রগতি

ফারিহা হোসেন :: সাধারণের ধারণা সুখ ব্যাক্তি অনুভূতি,ব্যাক্তিগত ভালো লাগার উপর নির্ভর করে। আন্তর্জাকিত সংস্থা প্রতিবছর বিশ্বের সুখী দেশের তালিকা প্রকাশ করে। এ জন্য একিটি বিশেষ দিবস পালন করা হয়। গত ২০ মার্চ ছিল বিশ্ব সুখ দিবস। বিশ্বের সুখী দেশের তালিকায় ২০২২ সালে ৭ ধাপ এগিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান এখন ৯৪ তম। গত বছর এ অবস্থান ছিল ১০১ তম। সুখের পরিমাপক হিসেবে একটি দেশের সামাজিক সুযোগ-সুবিধা, সামাজিক উদারতা, ব্যাক্তিগত স্বাধীনতা, মোট দেশজ উৎপাদন-জিডিপি, গড় আয়ু ও দুর্নীতির মতো বিষয়গুলোকে সামনে রাখা হয়।

মূলত ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের বিজয় অর্জন আমাদের জন্য সম্ভাবনার এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে দিয়েছে। বিজয়ের ৫০ বছরে বাংলাদেশ সকল সূচকে অনেক দূরে এগিয়ে গেছে। দারিদ্র্যমোচন, শিক্ষার প্রসার, নারী উন্নয়ন, শিশু ও মাতৃমৃত্যু হার হ্রাসসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ঈর্ষণীয় সাফল্য অর্জন করেছে। উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে এগিয়ে যাচ্ছে প্রিয় স্বদেশ। জাতিসংঘ বাংলাদেশকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। উন্নয়নশীল দেশে উত্তোরণ ঘটেছে।

স্বাধীনতা পরবর্তী বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের যে পরিচিতি ছিল তা পাল্টেছে ব্যাপকভাবে। ৭০ এর দশকে স্বাধীন বাংলাদেশকে খাদ্য ঘাটতি, দুর্ভিক্ষ আর প্রাকৃতিক দুর্যোগে বিপর্যস্ত এক জনপদ হিসেবে জানতো বিশ্ববাসী। ১৯৭৩-১৯৭৪ অর্থবছরে বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় ছিল ১২৯ ডলার। পঞ্চাশ বছর পর এসে মাথাপিছু আয় বেড়েছে ১৬ গুণ, অর্থাৎ ২,৫৯১ ডলার। স্বল্পোন্নত থেকে উন্নয়নশীল দেশের অন্তর্ভুক্ত হতে জাতিসংঘের ৩টি শর্তের প্রথমটি হচ্ছে, মাথাপিছু আয়। এরপর অর্থনৈতিক ঝুঁকি এবং মানবসম্পদ উন্নয়ন। মাথাপিছু আয়ে শর্ত পূরণে ন্যূনতম দরকার এক হাজার ২শ ৩০ ডলার। বর্তমানে ২,৫৯১ ডলার। অর্থনৈতিক ঝুঁকি কতটা আছে, সেটা নিরূপণে ১০০ স্কোরের মধ্যে ৩২ এর নীচে স্কোর হতে হয়। বাংলাদেশ সেখানে নির্ধারিত মানের চেয়েও ভালো রয়েছে। অর্থাৎ ২৫.২ স্কোর করেছে। মানবসম্পদ উন্নয়ন যোগ্যতায় দরকার ৬৬’র উপরে স্কোর। বাংলাদেশ সেখানে পেয়েছে ৭৩.২ স্কোর।

বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় উঠে আসে জন্মের ৫০ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে কীভাবে বাংলাদেশ দ্রুতগতিসম্পন্ন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের মতো সফলতা দেখাতে পেরেছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু কীভাবে সমগ্র জাতিকে স্বাধীনতার জন্য একতাবদ্ধ করেছিলেন যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ গঠনে। ঠিক তেমনি এখন তাঁর সুযোগ্য কণ্যার নের্তৃত্বে স্বপ্নের সোনার বাংলায় পরিণত হতে যাচ্ছে। শেখ হাসিনার গতিশীল নেতৃত্ব, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, লিঙ্গ সমতা, কৃষি, দারিদ্র্যসীমা হ্রাস, গড় আয়ু বৃদ্ধি, রপ্তানিমুখী শিল্পায়ন, ১০০ বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, পোশাক শিল্প, ঔষধ শিল্প, রপ্তানি আয় বৃদ্ধিসহ নানা অর্থনৈতিক সূচকে ঊর্ধমুখী অবস্থান। পদ্মা সেতু, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র, পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দর, মেট্রোরেলসহ দেশের মেগা প্রকল্পসমূহ মেগা উন্নয়নের সাক্ষ্য বহন করে। গত ৫দশকে বাংলাদেশের যেসব অর্জন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পরিচিত করেছে তার মধ্যে জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতিগ্রস্ত দেশের প্রতিনিধি হিসেবে নেতৃত্ব দেওয়া, তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের ওঠে আসা, শান্তিরক্ষা মিশনে ব্যাপক অংশগ্রহণ ইতিবাচক ইমেজ তৈরি হয়েছে। জঙ্গীবাদ দমনে প্রশংসা কুড়িয়েছে বিশ্বের। এ সময়ে দেশে কৃষি-শিল্পের উৎপাদন এবং কর্মসংস্থান বেড়েছে। অবকাঠামো উন্নয়নও হয়েছে। কৃষিখাতে অভূতপূর্ব সাফল্যের জন্য বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশ আলোচিত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্বের ১৫৭টি দেশে বাংলাদেশের কোটি শ্রমিক কর্মরত আছেন। একসময় কৃষি খাত অর্থনীতির চালিকা শক্তি হিসেবে ভূমিকা রাখলেও ৮০’র দশক থেকে ভূমিকা রাখতে শুরু করে পোশাক শিল্প খাত। পোশাকশিল্পে বাংলাদেশ এখন বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহৎ অবস্থানে। এই শিল্পের সিংহভাগ কর্মী হচ্ছে নারী। ক্ষুদ্রঋণ বাংলাদেশে গ্রামীণ উন্নয়নে ও নারীর ক্ষমতায়নে অভূতপূর্ব অবদান রেখেছে। আর ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের মধ্যে ৮০% এর উপর নারী। একটি দেশকে এগিয়ে নিতে হলে শিক্ষার বিকল্প নেই। এ গুরুত্ব বিবেচনায় শিক্ষাকে সর্বস্তরে ছড়িয়ে দেবার জন্য গৃহীত পদক্ষেপের মধ্যে রয়েছে- শতভাগ ছাত্রছাত্রীর মাঝে বিনামূল্যে বই বিতরণ। নারী শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত চালু রয়েছে উপবৃত্তির ব্যবস্থা। বর্তমান ২৬ হাজার ১৯৩টি প্রাথমিক বিদ্যালয়কে নতুন করে জাতীয়করণ করেছে। উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষকের চাকরি জাতীয়করণ করা হয়েছে। ১৯৯০ সালে বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া শিশুর শতকরা হার ছিল ৬১, বর্তমানে তা উন্নীত হয়েছে শতকরা ৯৭.৭ ভাগে। সমাজের প্রতিটি স্তরে নারী অংশগ্রহণকে নিশ্চিত করতে গৃহীত হয়েছে নানামুখী পদক্ষেপ। প্রযুক্তি জগতে নারীদের প্রবেশকে সহজ করতে ইউনিয়ন ডিজিটাল কেন্দ্রের মতো ইউনিয়ন ভিত্তিক তথ্যসেবায় উদ্যোক্তা হিসেবে একজন পুরুষের পাশাপাশি নিয়োগ দেওয়া হয়েছে একজন নারী উদ্যোক্তাকে। পোশাক শিল্পের মতো প্রসার ঘটেছে আবাসন, জাহাজ, ঔষুধ, ও প্রক্রিয়াজাতকরণ খাদ্য শিল্পের।
শিশুদের টিকাদান কর্মসূচির সাফল্যের জন্য এক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বে অন্যতম আদর্শ দেশ হিসেবে স্থান করে নিয়েছে। মাতৃ ও শিশুমৃত্যুহার এবং জন্মহার হ্রাস করা সম্ভব হয়েছে আশাঙ্কাজনক হারে। দেশে মানুষের গড় আয়ু বর্তমানে ৭৩.৬ বছর, যেখানে ভারতে ৬৮, পাকিস্তানে ৬৬ বছর। সামাজিক নিরাপত্তা খাতেও ব্যাপকহারে অগ্রগতি হয়েছে। হতদরিদ্রদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনির আওতায় বয়স্ক, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্ত ও দুঃস্থ মহিলা ভাতা, অস্বচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা, মাতৃকালীন ভাতা হারও এর আওতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। যেভাবে অর্থনৈতিক বিকাশের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তা অব্যাহত থাকলে ২০৩৫ সাল নাগাদ বিশ্বের ২৫তম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হবে বাংলাদেশ। করোনা ভাইরাস মহামারির কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে অনেক বিপর্যয় ঘটেছে, অর্থনৈতিক অগ্রগতি মুখথুবড়ে পড়লেও বাংলাদেশ তা এড়াতে পেরেছে সফলভাবে। দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির পেছনে বড়ো ভূমিকা পালন করেছে নারীর ক্ষমতায়ন। এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৩১ সালের মধ্যে উচ্চ-মধ্যম আয়ের দেশে পৌঁছানোর স্বপ্ন পূরণ হবে। স্বাধীনতার ৫০ বছরে দেশের অর্থনীতি ও সামাজিক ক্ষেত্রে চমকপ্রদ উন্নতি হয়েছে। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ জাতিসংঘ শান্তি মিশনে যোগদানের পর এ পর্যন্ত বিশ্বের প্রায় ৪০ দেশের ৬৪ শান্তি মিশনে খ্যাতি ও সফলতার সাথে তাদের কার্যক্রম পরিচালনা করেছে। দেশের শতভাগ মানুষকে বিদ্যুৎ সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে।

করোনার দুই বছরে শক্তিশালী অর্থনীতির দেশগুলোর প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশের নীচে ছিল, তখন বাংলাদেশে ৬ শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে, এটা নিঃসন্দেহে বড়ো অর্জন। ২০২৩ সালে অনেক দেশেরই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাবে বলে আশঙ্কা করছে গবেষকেরা। এই অবস্থায় বাংলাদেশ অন্যান্য দেশের চেয়ে বৈশ্বিক মন্দার মধ্যেও তার অগ্রগতি ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছে। বাংলাদেশ একদিকে যেমন উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, অন্যদিকে উদীয়মান অর্থনীতির দেশ বা এশিয়ান টাইগার হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে বিশ্ব মানচিত্রে। যারা এক সময় বাংলাদেশকে তলাবিহীন ঝুড়ি হিসেবে আখ্যা দিয়েছে, তারাই আজ বাংলাদেশের অপ্রতিরোধ্য অর্থনৈতিক উন্নয়নের প্রশংসা করছে।

স্বাধীনতা অর্জনের পর বঙ্গবন্ধু জাতিকে দেশ গড়ার ডাক দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে শেখ হাসিনার হাত ধরেই দেশ এগিয়ে চলছে দুর্বার গতিতে। শেখ হাসিনার বড়ো কৃতিত্ব হলো, তার নেতৃত্বে দেশের প্রবৃদ্ধির হার বেড়েছে, অন্যদিকে বৈষম্যকে বাড়তে দেওয়া হয়নি। নারী পুরুষ ভিন্ন লিঙ্গ ভুলে গিয়ে একই সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দেশের অগ্রগতিতে কাজ করছে। এই তালিকায় যুক্তরাষ্ট্র ৫৩তম অবস্থানে রয়েছে। গত কয়েক দশকে নারী-পুরুষের বৈষম্য কমাতে বাংলাদেশ বেশ এগিয়েছে। মাত্র এক যুগের ব্যবধানে ৪১ ধাপ এগিয়েছে বাংলাদেশ। ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সমৃদ্ধ দেশ গঠনের স্বপ্ন আজীবন লালন করে গেছেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তারই সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাত ধরে তার সেই স্বপ্নের বীজ আজ পরিণত হয়েছে সুবিশাল বটবৃক্ষে। ডিজিটাল বাংলাদেশের স্বপ্নকে বাস্তবতায় রূপ দিতে সরকার নিয়েছে যুগান্তকারী পদক্ষেপ। দেশের তৃণমূল পর্যায়ে প্রযুক্তির ব্যবহারের মাধ্যমে সরকারি সেবা পৌঁছে দেবার লক্ষ্যে ৪৫৫০টি ইউনিয়ন পরিষদে স্থাপন করা হয়েছে ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টার। নিকট ভবিষ্যতে বাংলাদেশের বড়ো চ্যালেঞ্জ হবে জলবায়ু পরিবর্তনের সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলা। প্রযুক্তির উন্নয়নের ক্ষেত্রে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের চ্যালেঞ্জ। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যাপক ব্যবহারের পাশাপাশি কর্মসংস্থান বৃদ্ধির উৎসে রূপান্তরের মাধ্যমে প্রান্তিক মানুষের মৌলিক চাহিদা পূরণ করাই হবে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ। আমাদের প্রত্যাশা থাকবে দেশে সমৃদ্ধি,কল্যাণ,উন্নয়ন অগ্রগতির চলমান গতি অব্যাহত রাখা গেলে বিশ্বে সুখী দেশের তালিকায় বাংলাদেশ আরও ইতিবাচক অবস্থানে পৌঁছাবে। এ জন্য প্রয়োজন রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এবং বর্তমান সরকারের ধারাবাহিকতা। পিআইডি নিবন্ধ

লেখক : ফ্রিলান্স সাংবাদিক এবং নারী- শিশু,বায়োকেমেস্ট্রি ও পরিবেশ বিজ্ঞানে অধ্যয়নরত
২৮.০৩.২০২২

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com