বৃহস্পতিবার, ২৮ অক্টোবর ২০২১, ০৩:৪০ পূর্বাহ্ন

বৃদ্ধাশ্রম : কফিনে বন্দী মানবতা

বৃদ্ধাশ্রম : কফিনে বন্দী মানবতা

বৃদ্ধাশ্রম

কফিনে বন্দী মানবতা

হু মা য়ু ন  আ ই য়ু ব

প্রাচীন চীনে প্রতিষ্ঠিত হয় পৃথিবীর প্রথম বৃদ্ধাশ্রম। হালে পৃথিবীর নানা প্রান্তরে ছড়িয়ে আছে বৃদ্ধাশ্রম ধারণাটি। পাশ্চাত্য সভ্যতা বাতাস দিয়েছে বৃদ্ধাশ্রমের পালে। অতি পাশ্চাত্যভাবীদের রুটি-রুজি জোগাতে বাংলাদেশেও ৫০টিরও বেশি বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠেছে।

প্রবীণ, বৃদ্ধ ও বয়স্ক মানুষের সঙ্গে শ্রদ্ধা-ভক্তি, মানবিক মূল্যবোধ ও নৈতিকতার বন্ধনে আবদ্ধ আবহমান বাঙালির সভ্যতা-সংস্কৃতিকে চপেটাঘাত করতে পশ্চিমা মানিকেরা আমদানি করেছে মানবতার বন্দীশালা বৃদ্ধাশ্রম সভ্যতা। দোহাই সভ্যতা আমাদের ক্ষমা করো। ক্ষমা করো উত্তর-আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা। পায়ে পায়ে তোমার তালে এগোতে পারছি না। আজকের বৃদ্ধাশ্রম সভ্যতার কফিনে বন্দী মানবতা। কৃত্রিম ও পানসে ভালোবাসার রঙিন সময়ে, দিবস বন্দী হয়েছে চিরায়ত ধারার শ্রদ্ধা-ভক্তি ও সম্মান। পশ্চিমা সভ্যতার কল্যাণে হাজার বছরের বাঙালির আদর্শ ও নৈতিকতার পত্রপল্লবে ভরপুর সমাজে বাসা বেধেছে পরকিয়া, সমকাম, লিভটুগেদার, ফ্রিভোগের অন্ধকার।

পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরণ থাকার ঘরে কুকুর তুলে এনেছে, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের জায়গা হয়েছে বৃদ্ধাশ্রমে।

বৃদ্ধাশ্রম বিষয়ে শিল্পী নচিকেতার ‘ছেলে আমার মস্ত মানুষ মস্ত অফিসার/ মস্ত ফ্ল্যাটে যায় না দেখা এপার আর ওপার/ নানান রকম জিনিস আর আসবাব দামী দামী/সবচেয়ে কম দামী ছিলাম একমাত্র আমি’ গানের প্রতিবাদকেও হার মানিয়েছে তথাকথিত পশ্চিমা অনুসারীদের কুকুরপ্রীতি এবং বাবা-মায়ের প্রতি অবহেলা-অবজ্ঞার রূঢ়চিত্র।

কদিন আগে বৃদ্ধাশ্রম থেকে এক মায়ের রক্তভেজা চিঠি আমাকে বেশ কাঁদিয়েছে। অসহায় সেই মা আদরের দুলালকে নাকফুলটা বেচে কাফনের কাপড় কিনে দেওয়ার আকুতি জানিয়েছে। মা চিঠিতে লিখিছেন- আমার আদর ও ভালোবাসা নিও। অনেক দিন তোমাকে দেখি না, আমার খুব কষ্ট হয়। কান্নায় আমার বুক ভেঙে যায়। আমার জন্য তোমার কী অনুভ‚তি আমি জানি না। তবে ছোটবেলায় তুমি আমাকে ছাড়া কিছুই বুঝতে না। আমি যদি কখনও তোমার চোখের আড়াল হতাম মা মা বলে চিৎকার করতে। মাকে ছাড়া কারও কোলে তুমি যেতে না। সাত বছর বয়সে তুমি আমগাছ থেকে পড়ে হাঁটুতে ব্যথা পেয়েছিলে। তোমার বাবা হালের বলদ বিক্রি করে তোমার চিকিৎসা করিয়েছেন। তখন তিনদিন, তিনরাত তোমার পাশে না ঘুমিয়ে, না খেয়ে, গোসল না করে কাটিয়েছিলাম।

এগুলো তোমার মনে থাকার কথা নয়। তুমি একমুহূর্ত আমাকে না দেখে থাকতে পারতে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় আমার বিয়ের গয়না বিক্রি করে তোমার পড়ার খরচ জুগিয়েছি।

হাঁটুর ব্যথাটা তোমার মাঝে মধ্যেই হতো। বাবা… এখনও কি তোমার সেই ব্যথা আছে?

রাতের বেলায় তোমার মাথায় হাত না বুলিয়ে দিলে তুমি ঘুমাতে না। এখন তোমার কেমন ঘুম হয়?

আমার কথা কি তোমার একবারও মনে হয় না?

তুমি দুধ না খেয়ে ঘুমাতে না। তোমার প্রতি আমার কোনো অভিযোগ নেই। আমার কপালে যা লেখা আছে হবে।

আমার জন্য তুমি কোনো চিন্তা করো । আমি খুব ভালো আছি। কেবল তোমার চাঁদ মুখখানি দেখতে আমার খুব মন চায়।

তুমি ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করবে। তোমার বোন… তার খবরাখবর নিও। আমার কথা জিজ্ঞেস করলে বলো আমি ভালো আছি।

আমি দোয়া করি, তোমাকে যেন আমার মতো বৃদ্ধাশ্রমে থাকতে না হয়। কোনো এক জ্যোৎস্নাভরা রাতে আকাশ পানে তাকিয়ে জীবনের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে একটু ভেবে নিও। বিবেকের কাছে উত্তর পেয়ে যাবে। তোমার কাছে আমার শেষ একটা ইচ্ছা আছে। আমি আশা করি তুমি আমার শেষ ইচ্ছাটা রাখবে। আমি মারা গেলে বৃদ্ধাশ্রম থেকে নিয়ে আমাকে তোমার বাবার কবরের পাশে কবর দিও। এজন্য তোমাকে কোনো টাকা খরচ করতে হবে না। তোমার বাবা বিয়ের সময় যে নাকফুলটা দিয়েছিল সেটা আমার কাপড়ের আঁচলে বেঁধে রেখেছি।

নাকফুলটা বিক্রি করে আমার কাফনের কাপড় কিনে নিও।

পত্রের বোবা কান্নায় হƒদয় ভেঙে যাচ্ছিল আমার। চাপা যন্ত্রণায় দমও ভারী হয়ে উঠছে। চোখের জলে আঁকা মদিনা খাতুনের এই চিঠি বিবেক নাড়া দেওয়ার মতো! জানি না সমাজপতিদের কি হাল। তবে পশ্চিমাদের হালুয়া-রুটিখোররা বিবেকের ঘরে তালা মেরে রেখেছে। একজন নয়, এমন অসংখ্য মা প্রতিদিন চোখের জলে বুক ভাসিয়ে যাচ্ছেন! অসহনীয় কষ্ট-যন্ত্রণা ও বিবেকের বোবা কান্নায় ধুঁকে ধুঁকে মরছেন তারা। অপেক্ষা করছেন কাফনের কাপড়ের জন্য। ধর্মীয় মূলবোধ, সামাজিক বন্ধন, সততা, নৈতিকতার ব্যাপক চর্চা না হলে, মদিনা খাতুনের নাকফুল বরণই করতে হবে আমাদের। জমবে হালুয়া-রুটিওয়ালাদের ব্যবসা। বিবেকের বাড়াভাতে ছাই।

বৃদ্ধাশ্রমের বন্দীশালা থেকে মানবতার মুক্তি মিলবে এতিম নবী মুহাম্মাদ সা.-এর জীবন-আদর্শে। আল ইসাবা গ্রন্থে আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানি উল্লেখ করেছেন, শৈশবেই মা-হারা এতিম নবী মুহাম্মাদের লালন-পালনের ভার ছিল কৃতদাস থেকে সাহাবি হজরত উম্মে আয়মান বারাকার ঘাড়ে। নবীজি শৈশব-কৈশোর পাড়ি দিয়ে যখন পরিণত। বিপরীতে বয়সের ভারে নুয়ে পড়েছেন হজরত উম্মে আয়মান বারাকা। আশি ঊর্ধ্ব উম্মে আয়মান যখন নবীজিকে দেখার ব্যাকুলতায় মক্কা থেকে সারে চারশ মাইল পথ পায়ে হেঁটে মদিনায় পৌঁছলেন, খবর পেয়ে নবীজি দৌড়ে এলেন, দেখলেন উম্মে আয়মানের পা ফোলা, ক্ষত-বিক্ষত। নবীজি কাতার কণ্ঠে বললেন, হে আমার মা! হে উম্মে আয়মান! আবশ্যই আপনি জান্নাতি। নবীজি মায়ের মুখ ও চোখের পানি মুছে দিলেন। পা টিপে দিলেন। ঘাড়ে ম্যাসেজ করলেন। গভীর শ্রদ্ধা ও বিনম্র ভালোবাসায় উম্মে আয়মানের সেবা করলেন।

ওগো আধুনিক পৃথিবী! আমাকে বলো, হাজার বছরের চিরায়তধারা এতিম নবী মুহাম্মাদ সা.-এর সভ্যতা মানবিক নাকি পশ্চিমা মানিকদের বৃদ্ধাশ্রমসভ্যতা! নাকফুল হাতে বৃদ্ধাশ্রমে কাফনের অপেক্ষায় এক মা!

লেখক : সম্পাদক, আওয়ার ইসলাম টোয়েন্টিফোর ডটকম

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com