রবিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৭:৫৮ অপরাহ্ন

পাকিস্তানের কারাগারে বঙ্গবন্ধু : ফাঁসির রায়েও অটল 

পাকিস্তানের কারাগারে বঙ্গবন্ধু : ফাঁসির রায়েও অটল 

এই সময় । মুহাম্মদ শামসুল হক

পাকিস্তানের কারাগারে বঙ্গবন্ধু : ফাঁসির রায়েও অটল

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর প্রায় ৫৫ বছর জীবনকালে প্রায় ১৩ বছরই কারাগারে কাটিয়েছেন। এর মধ্যে বাঙালি জাতির জন্য সবচাইতে উদ্বেগউৎকণ্ঠা ও শ্বাসরুদ্ধকর সময় কেটেছে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর পাকিস্তানের কারাগারে। সেখানে তিনি বন্দি ছিলেন ২৮৯ দিন। রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে সামরিক আইনে এক প্রহসনের বিচারে তাঁকে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়েছিল। এ সময় তাঁর জীবন নিয়ে শুধু বাঙালি জাতি নয়, আন্তর্জাতিক মহলেও দেখা দিয়েছিল চরম উৎকণ্ঠা ও সংশয়। বাঙালি জাতির দৃঢ় প্রত্যয় এবং আন্তর্জাতিক মহলের চাপ নিজেদের স্বার্থ বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার। তার আগে বঙ্গবন্ধুকে অখণ্ড পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট বা প্রধানমন্ত্রী হওয়ার টোপ দেওয়া হলেও বাংলার স্বাধীনতার প্রশ্নে তাঁর সংকল্প থেকে তিনি বিন্দুমাত্র বিচ্যুত হননি।

১৯৭১ সালের ২৪ মার্চ বাঙালিদের প্রাণের দাবি ছয় দফা তথা স্বাধিকার প্রশ্নে বঙ্গবন্ধু-ইয়াহিয়া খান-ভুট্টোর মধ্যে আলোচনা ভেঙে যায়। ইতোমধ্যে সামরিক সরকার পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী ঢাকা-চট্টগ্রামসহ প্রধান শহরগুলোতে গোপনে ব্যাপক সৈন্য সমাবেশ করে। সন্ধ্যা থেকে খবর পেয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর বিশ্বস্ত সহকর্মীদের আত্মগোপনে গিয়ে শত্রু’র মোকাবিলায় প্রস্তুতি নেয়ার নির্দেশ দিয়ে নিজে ধরা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। কারণ, তিনি আত্মগোপনে গেলে তাঁকে না পেয়ে পাকিস্তানি সৈন্যরা বাড়ি বাড়ি তল্লাশি চালিয়ে ব্যাপক নিরীহ মানুষকে হত্যা করবে। এদিকে ২৫ মার্চ মধ্যরাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পুলিশ, বিডিআরসহ নিরস্ত্র জনতার ওপর গণহত্যা, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও নির্যাতন শুরু করলে বঙ্গবন্ধু ওয়্যারলেসহ একাধিক ব্যবস্থায় স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। এরপর রাত প্রায় দেড়টার দিকে সেনাবাহিনী তাঁর বাসভবন আক্রমণ করে তাঁকে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে যায়। শুরু হয় পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বাঙালিদের মুক্তিযুদ্ধ। পরে জানা যায় বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতারের পর তাঁকে প্রথমে ঢাকা সেনানিবাসে এবং পরদিন পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়। প্রতিরোধ তথা বাঙালির প্রাণপ্রিয় নেতাকে গ্রেফতার করে নিয়ে যাওয়ার খবরটি মানুষ প্রথমদিকে জানতে পারেনি। ইয়াহিয়া-ভুটো ২৫ মার্চ রাতেই পাকিস্তান চলে যান। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান করাচি গিয়ে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ এবং বঙ্গবন্ধুকে দেশদ্রোহী হিসেবে চিহ্নিত করে তাঁকে শাস্তি দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করার কথা কিংবা তিনি কোথায় আছেন তা প্রকাশ করেননি। এ অবস্থায় নেতা-কর্মীসহ সাধারণ মানুষের মধ্যে উদ্বেগউৎকণ্ঠা ও জানার কৌতুহল জাগে বঙ্গবন্ধু কোথায়, কী অবস্থায় আছে জানার জন্য। ২৬, ২৭ ও ২৮ মার্চ চট্টগ্রামের স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধুর যে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করা হয় তার সাথে বলা হচ্ছিল তিনি মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গেই আছেন এবং নেতৃত্ব দিচ্ছেন। এতে অনেকের মনে কিছুটা হলেও স্বস্তি আসে। অনেক বিদেশি সাংবাদিকও ধারণা করছিলেন সেনাবাহিনীর আক্রমণের পর বঙ্গবন্ধু আত্মগোপন করেছেন। ২৭ মার্চ কলকাতার আনন্দবাজার পত্রিকার সংবাদ ভাষ্যে বলা হয়, হয়তো তিনি ইতোমধ্যে ময়মনসিংহের কাগমারীতে মাওলানা ভাসানীর সঙ্গে মিলিত হচ্ছেন এবং এরপর সম্ভবত নিরাপত্তার প্রয়োজনে আসাম সীমান্তের দিকে পূর্ব নির্দিষ্ট কোনো স্থানে চলে যাবেন।’

এভাবে নানারকম গুজব ও অনিশ্চয়তার মধ্যে এক সপ্তাহ অতিবাহিত হওয়ার পর বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার করা অবস্থার একটি ছবি করাচির পত্রিকায় ছাপা হলে বিশ্বব্যাপী জানাজানি হয় বাঙালির নেতাকে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এরপর থেকে চারদিকে হৈ-চৈ পড়ে যায়, চলতে থাকে প্রতিবাদ, উঠতে থাকে বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবি। জানা যায়, বঙ্গবন্ধুকে ঢাকায় তাঁর বাসভবন থেকে গ্রেফতার করে প্রথমে লায়ালপুর (পরবর্তী নাম ফয়সালাবাদ) কারাগারে রাখা হয়েছিল।

ইয়াহিয়া খান বারবার বঙ্গবন্ধুকে বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত করে কঠোর শাস্তির হংকার দিয়ে দিচ্ছিলেন।

প্রথম দিকে সাংবিধানিক আদালতে তাঁর বিচার হবে বলে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করলেও পরে তা ভঙ্গ করে বিচার শুরু করেন সামরিক আদালতে। আমেরিকান রাষ্ট্রদূত ফারল্যান্ডকে ২২ মে করাচিতে ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, ‘শেখ মুজিব মহা-অপরাধ করেছেন। সাংবিধানিক আদালতে তাঁর বিচার হবে। তবে বিচার হবে সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ।’ এ সময় ফারল্যান্ড ইয়াহিয়াকে আন্তর্জাতিক মহলের প্রতিক্রিয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন. ‘শেখ মুজিবের প্রতি ব্যাপক মাত্রায় আন্তর্জাতিক সমর্থন রয়েছে। কাজেই তাঁকে দণ্ড দেওয়ার মতো বিষয়ে পাকিস্তানের উচিৎ হবে বিশ্ব জনমতকে গুরুত্ব দেওয়া।’

১১ জুলাই ইয়াহিয়া সামরিক আদালতে বঙ্গবন্ধুর বিচারের জন্য তাঁর ওপর পাকিস্তানি জেনারেলদের চাপ রয়েছে উল্লেখ করেন এবং প্রচ্ছন্ন হুমকির সুরে বলেন, ‘বাঙালি নেতা পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে সুস্থ এবং জীবিত আছেন। তবে আজকের পর শেখ মুজিবের কপালে কী ঘটবে তা আমি হলফ করে বলতে পারব না। তাঁর বিচার করা হবে এবং এই নয় যে আগামীকালই গুলি করবে। স্বাভাবিক মৃত্যুও হতে পারে।’

এর একদিন পর ইসলামবাদ থেকে স্টেট ডিপার্টমেন্টে পাঠানো এক টেলিগ্রামে মার্কিন দূতাবাস জানায় ‘সামরিক আইন প্রশাসক শেখ মুজিবের গোপন বিচারের তোড়জোড় চালাচ্ছে বলে জানতে পেরেছি।’ ১৯ জুলাই লন্ডনের দি ফিনান্সিয়াল টাইমস জানায়, জেনারেল ইয়াহিয়া খান অত্যন্ত গোপনে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বঙ্গবন্ধুর বিচারের ব্যবস্থা করেছেন। বঙ্গবন্ধুর অবস্থা জানার জন্য একমাত্র ভরসা ছিল তখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম। তাঁর বিরুদ্ধে সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচারের কথা জেনে স্বভাবতই বাঙালিদের মনে অস্থিরতা বেড়ে যায়।

১১ আগস্ট লায়ালপুর কারাগার-সংলগ্ন একটি বাড়িতে বিশেষ ট্রাইব্যুনালে বঙ্গবন্ধুর প্রহসনের বিচার শুরু হয়। ওই দিন ভারত-সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে মৈত্রী চুক্তি সম্পাদিত হয়। এরপর বিচারকাজ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখা হলেও ৭ সেপ্টেম্বর পুনরায় তা শুরু হয়। বিচার চলাকালে আত্মপক্ষ সমর্থন করার জন্য বঙ্গবন্ধুর পক্ষে তিনজন সহকারীসহ নিয়োগ করা হয় পাকিস্তানি আইনজীবী এ কে ব্রোহীকে। কিন্তু বঙ্গবন্ধু এই প্রহসনের বিচার প্রত্যাখ্যান করেন এবং আত্মপক্ষ সমর্থন কিংবা আইনজীবীর সহযোগিতা নিতে অস্বীকার করেন। কারণ তিনি জানতেন এটা ছিল একটা একতরফা প্রহসনের বিচার। মুক্তির পর লন্ডনে তিনি সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘বিচারের মাঝখানে আমি আত্মপক্ষ সমর্থন করতে অস্বীকৃতি জানাই। আমি বলি এটা একটা সাজানো বিচার। আমি জনাব ব্রোহীকে আদালত কক্ষ ছেড়ে যেতে বলি। কারণ, আমি ন্যায়বিচার আশা করছি না।’
সামরিক আদালতে ফাঁসির আদেশ সম্পর্কে সাংবাদিক ডেভিট ফ্রস্টকে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, -এটা ন্যায়ানুগ কোনো বিচার ছিল না। এটা ছিল কোর্ট মার্শাল। প্রহসনের বিচার অনুষ্ঠানের সভাপতি ছিলেন সেনাবাহিনীর একজন ব্রিগেডিয়ার, ছিলেন দুজন কর্নেল, একজন উইং কমান্ডার, একজন নেভাল কমোডর ও একজন জেলা জজ। মামলা চলে ছয় মাস। ১২টি অভিযোগ আনে ইয়াহিয়া সরকার। এরমধ্যে ছয়টার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড। ২ অক্টোবর অত্যন্ত গোপনে একতরফা বিচারের রায়ে বঙ্গবন্ধুকে দোষী সাব্যস্ত করে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। কিন্তু রায়ের কথা সরকারিভাবে প্রকাশ করা হয়নি।

১৩ অক্টোবর ১৯৭১, নিউইয়র্কের হেরাল্ড ট্রিবিউন জানায়, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের কাছে ট্রাইব্যুনালের সুপারিশ পাঠানো হয়েছে। গোপন এ বিচারের রায় পাকিস্তানের সবকূটনৈতিক মিশনকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন সামরিক ট্রাইব্যুনালের ওই রায় কার্যকর না করার জন্য ই্য়াহিয়া খানের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে।

১ নভেম্বর ইন্টারন্যাশনাল হেরাল্ড ট্রিবিউনে প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ইয়াহিয়া খান বলেন, ‘তিনি (মুজিব) রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ সংঘটিত করেছেন এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন। রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা এবং সেনাবাহিনীর আনুগত্য বিনষ্টের অভিযোগ আনা হয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।’ এদিকে বঙ্গবন্ধুর ফাঁসির রায়ের বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত প্রবল হয়ে উঠে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্ধিরা গান্ধী সোভিয়েত ইউনিয়ন, ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানসহ বিভিন্ন দেশের সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের কাছে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে রায় কার্যকর না করে তাঁর মুক্তির ব্যাপারে চাপ সৃষ্টির জন্য অনুরোধ জানান। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের মুক্তিকামী মানুষ এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকেও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির জোর দাবি ওঠে। তাঁর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পাকিস্তান সরকারকে চাপ দেন বহু রাষ্ট্রনেতা।

এদিকে যতই দিন যায় বাঙালিদের কাছে পাকিস্তানের পরাজয়ের সময়ও ঘনিয়ে আসে। ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারতের অভ্যন্তরে হামলা চালালে ভারতও এ যুদ্ধে সরাসরি যুক্ত হয়ে মুক্তিবাহিনীর সঙ্গে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযানে সামিল হয়। ওই দিনই বঙ্গবন্ধুকে ফয়সালাবাদ কারাগার থেকে মিয়ানওয়ালি কারাগারে সরিয়ে নেওয়া হয়। ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি দেওয়ার পর যৌথ বাহিনীর অভিযান তীব্র হয়ে ওঠে। অবশেষে ১৬ ডিসেম্বর ৯৩ হাজারের বেশি পাকিস্তানি সৈন্যের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করে। বাঙালিরা পাকিস্তানিদের দর্প চূর্ণ করে বিজয় অর্জনের পর ক্ষণিকের আনন্দউল্লাসে মেতে উঠলেও নেতাহীন সে আনন্দ ছিল ক্ষণস্থায়ী। মুক্তিযোদ্ধা-জনতার একটাই দাবি উঠলো বঙ্গবন্ধুকে যে কোনো মূল্যে ফিরিয়ে আনতে হবে। অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমদসহ বাংলাদেশের নেতারা বঙ্গবন্ধুকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান।

এরই মধ্যে পাকিস্তানের জনগণের পক্ষ থেকেও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ব্যাপারে দাবি উঠে। তারপরও ইয়াহিয়া খান বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সুযোগ খুঁজতে থাকেন। ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণের খবর পেয়ে মিয়ানওয়ালি কারাগারে গুজব ছড়িয়ে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়। এ নিয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর যে অভিজ্ঞতা বর্ণনা করেছেন তা এরকম- ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর মিয়াওয়ালি কেন্দ্রীয় করাগারে কতিপয় বন্দি বলাবলি করছিলেন মুজিবের লোকেরা এ এ কে নিয়াজিকে হত্যা করেছে। নিয়াজি ছিলেন পূর্বাঞ্চলীয় কমাণ্ডের প্রধান। মিয়ানওয়ালি ছিল নিয়াজির জন্মস্থান। বন্দিরা ভীষণ ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে এবং প্রতিশোধ নেওয়ার প্রস্তুতি নেয়। তাদের বলা হয়, ভোর ছয়টায় সেলের দরজা খুলে দেওয়া হবে এবং মুজিবকে হত্যা করা হবে। জেলখানার তত্ত্বাবধায়ক আবদুর রশিদ ছিলেন বঙ্গবন্ধুর প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন। তিনি বঙ্গবন্ধুকে তাঁর বাড়িতে নিয়ে কয়েকদিন লুকিয়ে রাখেন। ২০ ডিসেম্বর ইয়াহিয়া খান জুলফিকার আলী ভুট্টোর কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর না করা পর্যন্ত বঙ্গবন্ধু গোপন স্থানেই ছিলেন। পরে ভুট্টোর আগ্রহে তাঁকে সিহালি অতিথিশালায় নিয়ে যাওয়া হয়। ভুট্টোকে ইয়াহিয়া খান বলেছিলেন, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুদণ্ড না দিয়ে তিনি ভুল করেছেন। তিনি ভুট্টোকে রায় কার্যকর করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু ভুট্টো তাতে সাঁয় দেননি। বরং ভুট্টো তখনো বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে নতুন চাল চালতে চেয়েছিলেন।

১৯৭২ সালে দেশে ফেরার পর বঙ্গবন্ধু লন্ডনের অবজারভার পত্রিকার সাংবাদিক গ্যাভিং ইয়াংকে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘তিনি (ভুট্টো) বাঙালির নেতা বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাতের প্রথম সুযোগেই তাঁকে পেসিডেন্ট অথবা প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নিতে বলেন। কিন্তু তাঁর (ভুট্টোর) সে প্রয়াস সফল হয়নি। পাকিস্তানের ভেতর থেকেও ততদিনে মুজিবের মুক্তির দাবি উঠেছে। তারা ভাবতে শুরু করেছিল, বাংলাদেশে আটক (পরে ভারতে স্থানান্তরিত) ১ লাখ তিন হাজার পাকিস্তানিকে ফেরত আনতে হলে মুজিবকে ছেড়ে দিতে হবে।’

টাইমস সাময়িকীর এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সত্যিকার অর্থে মুজিবকে মুক্তি দেওয়া ছাড়া ভুট্টোর উপায় ছিল না। মুজিবকে বন্দি রেখে পাকিস্তানের কোনো লাভ হবে না বলেই মনে করেছিলেন ভুট্টো। আর মুজিবকে মেরে ফেললে পশ্চিম পাকিস্তানিদের প্রতি বাঙালিদের ঘৃণা আরও জোরদার হবে। মুজিবকে মুক্তি দিলে বরং হয়তো পাকিস্তানের সঙ্গে এক ধরনের শিথিল সংযোগ স্থাপনের ব্যাপারে রাজি করানো যাবে বাংলাদেশকে। এ পর্যায়ে করাচির এক সমাবেশে এক লাখেরও বেশি মানুষের সমাবেশে প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর মুক্তির ব্যাপারে তাদের মতামত চাইলে জনতা সম্মতি জানায়। এরপর তিনি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত দেন। এভাবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠকের পাঁচ দিন পর ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি ভুট্টো ইসলামাবাদ গিয়ে একটি ভাড়া করা পাকিস্তানি বিমানে করে বঙ্গবন্ধুকে লন্ডন পাঠিয়ে দেন। সর্বোচ্চ গোপনীয়তার মধ্যে রাত তিনটায় বিমানটি ইসলামাবাদ ছেড়ে যাওযার ১০ ঘন্টা পর সাংবাদিকেরা এ খবর জেনেছিলেন। ততক্ষণে বাঙালির নেতা লন্ডন পৌঁছে গেছেন।

এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনার পর লন্ডনের ক্ল্যারিজ হোটেলের বলরুমে সংবাদ সম্মেলন ডাকেন বঙ্গবন্ধু। হোটেলের বাইরে তখন সমবেত হয়েছে শত শত উৎফুল্ল বাঙালি। সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে বঙ্গবন্ধুর কারাগারে থাকা অবস্থায় দেশের মানুষের জন্য তাঁর উদ্বেগউৎকণ্ঠা, জেলে কি অবস্থায় ছিলেন, তাঁর প্রতি কারা কর্মকর্তাদের ব্যবহার ইত্যাদির চিত্র ফুটে উঠেছে। বঙ্গবন্ধুর ভাষ্যে জানা যায়, দেশের নির্বাচনে নিরঙ্কুশ আসনে বিজয়ী দলের একজন জাতীয় নেতা হিসেবে পাকিস্তান সরকার কারাগারে তাঁর ওপর চরম অন্যায় আচরণ করেছে। মিয়ানওয়ালি জেল ছিল মরু এলাকায় ফাঁসির আসামির জন্য রাখা একটি নির্জন সেল। আলোবাতাসহীন তীব্র গরমে এমন একটি জঘন্য জায়গায় তাঁকে বন্দি রাখা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনেরই সমান। তবে কেউ তাঁর শরীর স্পর্শ করেনি। সরকার তাঁকে কোনো পত্রিকা বা রেডিও দিত না। পৃথিবীর সঙ্গে কোনো যোগাযোগ ছিল না। তবে ভুট্টো আসার পর তিনি এসব সুবিধা দিয়েছেন। কারাগারের দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারাও বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করেছেন। কারাগারে বঙ্গবন্ধুকে বাঙালি খাবার দেওয়ার জন্য একজন বাঙালি রাঁধুনির ব্যবস্থা করা হয়েছিল। একজন চিকিৎসক নিয়মিত তাঁর স্বাস্থ্য পরীক্ষা করতেন। তাঁর দায়িত্বে নিয়োজিত কর্মকর্তারা তাঁর সঙ্গে সুন্দর ও নম্রভাবে সেবা করেছে।

প্রসঙ্গক্রমে ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানিদের হাতে বঙ্গবন্ধুর গ্রেফতার হওয়া নিয়ে কোনো কোনো মহলের একটি নেতিবাচক সমালোচনার জবাব দেওয়া প্রয়োজন মনে করি। তারা বলে থাকেন বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানিদের কাছে আত্মসমর্পণ করেছিলেন এবং আপসের চেষ্টা করেছিলেন। এ ধরনের কথা একবারে যুক্তি ও ভিত্তিহীন, সত্যের অপলাপ মাত্র। বঙ্গবন্ধুর কিশোরকাল থেকে মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত যে কোনো চাপ বা হুমকির মুখে কারও সঙ্গে কোনো আপস বা আত্মসমর্পণের কোনো নজির নেই। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে ইয়াহিয়া-ভুট্টো আলোচনার নামে ঢাকা আসার আগেই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন তাঁকে গ্রেফতার অথবা হত্যা করা হবে। তিনি তাঁর আশঙ্কার কথা বলেছিলেন ‘পাকিস্তান তেহরিকে ইশতেকলাল’ পাটির নেতা এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) আসগর খানকে। আসগর খান তাঁর ‘উই হ্যাভ লার্ন নাথিং ফ্রম হিস্ট্রি’ গ্রন্থে লিখেছেন, ‘আমি মুজিবকে জিজ্ঞাসা করলাম, তিনি কি ভবিষ্যৎ দেখতে পাচ্ছেন? চলমান অচলাবস্থা কীভাবে অবসান করা যায়? মুজিব জবাবে বললেন, ‘পরিস্থিতি খুবই স্পষ্ট, প্রথমে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় আসবেন, তারপর আসবেন জুলফিকার আলী ভুট্টো। তারপর ইয়াহিয়া সামরিক অভিযানের আদেশ দেবেন এবং সেটাই হবে পাকিস্তানের শেষ।’ তাঁর নিজের সম্পর্কে শেখ মুজিব বলেছিলেন, তাঁর ধারণা, তাঁকে গ্রেফতার করা অথবা মেরে ফেলা হবে। আসগর খান লিখছেন, ‘একাত্তরের মার্চের ঘটনার ক্রম মুজিবের পূর্বাভাসের সঙ্গে আশ্চর্যজনকভাবে মিলে যায়, যেটা বিস্ময়কর।’

দ্বিতীয়ত: বঙ্গবন্ধু আত্মসমর্পণ বা স্বাধীনতার প্রশ্নে আপস করলে মুক্তির আগে ভুট্টোর প্রস্তাব অনুযায়ী তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট অথবা প্রধানমন্ত্রী হতে পারতেন। প্রহসনের বিচারে তাঁর ফাঁসির আদেশ হওয়ার পরও তিনি এমন কোনো বার্তা দেনননি যে, তিনি পাকিস্তানের সঙ্গে একটা সমঝোতায় আসতে রাজি। তিনি ঐতিহাসিক ৭ মার্চ ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে যেভাবে শত্রুর মোকাবেলা করার আহ্বান জানিয়েছিলেন এবং গ্রেফতার হওয়ার আগে যে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছিলেন তা থেকেও সরে আসেননি বা বাতিল করেননি।

যদি সেরকম কিছু হতো তাহলেই প্রবাসী সরকার, মুক্তিযোদ্ধা ও দেশ-বিদেশের সরকার ও রাজনৈতিক মহলে এর মারাত্মক প্রভাব পড়তো এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুদূর পরাহত হতো। বরং তিনি তাঁর ফাঁসির রায় এবং তাঁর জন্য কবর খোঁড়ার দৃশ্য দেখেও তা উপেক্ষা করে বলেছিলেন, ‘তোমরা আমাকে হত্যা করো আমার তাতে দুঃখ নেই। কিন্তু আমার লাশটা আমার বাংলার মাটিতে পৌঁছে দিও।’ কাজেই তিনি আত্মসমর্পণ করেছেন এ কথা কেবল তাঁকে এবং তাঁর নেতৃত্বে স্বাধীনতা অর্জনকে যাঁরা মেনে নিতে পারেননি তাঁদের মুখেই শোভা পায়। বরং রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ‘আত্মগোপন না করে গ্রেফতার হওয়ার সিদ্ধান্ত ছিল বঙ্গবন্ধুর জীবনের সবচেয়ে সঠিক সিদ্ধান্তের একটি। তিনি সংবিধান ও নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতির পথে ছিলেন বলেই আন্তর্জাতিক মহলের সমর্থন পান। বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে বিশ্ব জনমত তাঁর পাশে থাকে।’ অবশেষে সাড়ে ৭ কোটি মানুষের দুদিনব্যাপী শ্বাসরুদ্ধকর প্রতীক্ষার প্রহর পেরিয়ে ১০ জানুয়ারি লন্ডন থেকে দিল্লী হয়ে তাঁর ভালোবাসার মানুষদের কাছে ফিরে আসেন স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। পিআইডি নিবন্ধ

লেখক : জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষণাকর্মী, সম্পাদক-ইতিহাসের খসড়া

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com