রবিবার, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৯:৫৮ অপরাহ্ন

পরকালীন জীবনের ভয়াবহতা

পরকালীন জীবনের ভয়াবহতা

পরকালীন জীবনের ভয়াবহতা

রাশেদ নাইব

বিশ্ব ভূখণ্ড সময়ের ব্যবধানে বিলীন হয়ে যাবে। ফিরতে হবে সবাইকে সেই কাক্সিক্ষত আখিরাতের দিকে। জবাব দিতে হবে প্রতিটি কর্মের। সেখানেই ফায়সালা হবে, আমরা চির প্রশান্তিস্থান জান্নাতে নাকি মহা আজাবের জায়গা জাহান্নামে যাবো! ইসলামের মূল তিনটি ভিত্তি যেমন: তাওহিদ; আল্লাহর একত্ববাদের প্রতি বিশ্বাস, রিসালাত; নবী-রাসূলদের প্রতি বিশ্বাস এবং আখিরাত; পরকালের প্রতি বিশ্বাস। কোনো মুসলিম যদি এর উপর বিশ্বাস না রাখে তাহলে সে কোনোভাবেই মুসলিম হিসেবে সাব্যস্ত হবে না।

দুনিয়ার দৃশ্যমান জীবন যেমন সত্য, তদ্রুপ ঈমানদারের কাছে, আখিরাতের জীবনও মহাসত্য। প্রতিটি মুমিন এটা বিশ্বাস করেন যে, দুনিয়ার জীবন সংক্ষিপ্ত এবং আখিরাতের জীবন চিরস্থায়ী। অনন্তকাল সেখানেই থাকতে হবে। দুনিয়ার জীবন নিয়ে মগ্ন থাকা একজন প্রকৃত মুমিনের কাজ হতে পারে না। দুনিয়াটা হচ্ছে অভিলাষী, দুনিয়া যখন কারো লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হয়ে যায় তখন সে ব্যক্তি আখিরাতের জীবনের ব্যাপারে অসচেতন হয়ে পড়ে। এই অসচেতনতা তাকে বেসামাল করে তোলে।

সেজন্য উত্তম উপায় হচ্ছে, দুনিয়ার মাঝেও আখিরাতকে প্রাধান্য দিতে হবে এবং সেই ব্যাপারে সর্বদা সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। আখিরাতের ব্যাপারে পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, আর দুনিয়ার জীবন তো খেল-তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয় এবং যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য আখিরাতের আবাসই উত্তম; অতএব, তোমরা কি অনুধাবন কর না? (সূরা আনআম আয়াত : ৩২)

আমরাও ক্রমেই সেই খেল-তামাশায় মগ্ন হয়ে পরকালীন চিরস্থায়ী জীবনের প্রতি অচেতন হয়ে যাচ্ছি। তাকওয়ার পথ ছেড়ে মন্দের পথে প্রতিনিয়ত নিজেকে ধাবিত করছি। ন্যূনতম অনুতাপ, অনুশোচনা হৃদয়কে নাড়া দেয় না। অন্যত্রে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, “বলুন, তোমরা যে মৃত্যু হতে পলায়ন কর সে মৃত্যু তোমাদের সাথে অবশ্যই সাক্ষাত করবে। তারপর তোমাদেরকে ফিরিয়ে নেয়া হবে গায়েব ও প্রকাশ্যের জ্ঞানী আল্লাহর কাছে। অতঃপর তোমরা যা আমল করতে সে সম্পর্কে তিনি তোমাদেরকে জানিয়ে দিবেন। (সূরা জুমুআ, আয়াত ০৮)

আমরা অজ্ঞতার বশবর্তী হয়ে দুনিয়াকে স্থায়ী রূপে মেনে নিতে চাচ্ছি। অথচ আল্লাহ তায়ালা সুস্পষ্ট বর্ণনা দিয়েছে, মৃত্যু থেকে কোনোভাবেই বাঁচা সম্ভব নয় এবং যা কিছুই করি না কেনো, সবকিছু আল্লাহর কাছে প্রকাশ্য। অতএব আখিরাতের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে, তদ্রুপ আমল করা আমাদের জন্য অতিব জরুরি। আখিরাতের ব্যাপার নিয়ে রাসূল (সা.) হাদিসে বর্ণনা করেছেন, যেমন: হযরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছি, কিয়ামতের দিন মানুষকে নগ্ন পায়ে, উলঙ্গ, খাতনাবিহীন অবস্থায় একত্রিত করা করা হবে। আমি বললাম ইয়া রাসূলাল্লাহ (সা.) নারী-পুরুষ এক সাথে? পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকাবে। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, হে আয়েশা! সেদিনকার অবস্থা এত ভয়াবহ হবে যে একজন অন্যজনের দিকে তাকানোর ফুরসত পাবে না। (বোখারী, বাবু কাইফাল হাশর-৬০৬৪) (মুসলিম, বাবু ফানাইদ দুনিয়া ওয়া হাশরি ৫১০২)
অতএব আমরা জেনেই গেলাম সেই ময়দানের অবস্থা সম্পর্কে! কতটা ভয়াবহতার মধ্যে যাবে আমাদের আখিরাতের সেই সময়টা। উত্তম হচ্ছে প্রস্তুতি শুরু করে দেয়া, অন্যথায় সেখান থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় থাকবে না। যেখানে সামান্যতম ফুরসত পাওয়া যাবে না। অপর এক হাদিসে রাসূল (সা.) আরো ভয়াবহতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) নবী (সা.) থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, কিয়ামতের দিন কোন আদম সন্তানের পা এক কদমও নড়তে পারবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তাকে পাঁচটি প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করা না হবেÑ ১. নিজের জীবনকাল সে কোন কাজে অতিবাহিত করেছে? ২. যৌবনের শক্তি-সামর্থ্য কোথায় ব্যয় করেছে? ৩. ধনসম্পদ কোথা থেকে উপার্জন করেছে? ৪. কোথায় ব্যয় করেছে? ৫. এবং সে (দ্বীনের) যতটুকু জ্ঞান অর্জন করেছে সে অনুযায়ী কতটুকু আমল করেছে? (তিরমিযী,বাবু মাজা’আ ফী শানিল হিসাবি ২৩৪০)

এই হাদিস থেকে আমরা স্পষ্ট বুঝতে সক্ষম হচ্ছি যে, ভয়াবহতার মাত্রা নির্ণয় করা অসম্ভব এবং সবাইকে এই পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর যথাযথভাবে দিতেই হবে। কিন্তু পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, সে ব্যাপারে আমাদের প্রস্তুতি কতটুকু? আমরা কি মুক্তি পাবো সেই কঠিন ময়দানে, যেখানে মহান আল্লাহতালা ‘রহমান’ থেকে ‘কাহহার’ রূপে বান্দার হিসাব-নিকাশ করবেন! এই হাদিস জানার পরে এটা ধারণা করার সুযোগ নেই যে আমিতো দ্বীনের ব্যাপারে তেমন কিছুই জানি না! তার মানে আমিতো সেখানে এই হিসাব দেয়া থেকে রুখসত পাবো! এর কোনো সুযোগ নেই। কারণ অন্য এক হাদিসে রাসূল (সা.) এটাও বলে দিয়েছেন, হযরত আনাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, প্রতিটি মুসলিম পুরুষের উপর দ্বীনী ইলম শিক্ষা গ্রহণ করা ফরজ। অন্য রেওয়ায়েতে এসেছেÑ প্রতিটি মুসলিম নর-নারীর উপর দ্বীনী ইলম শিক্ষা গ্রহণ করা ফরজ। (ইবনে মাযাহ, হাদীস নং-২২৪)

অতএব সবাইকে দ্বীনি ইলম অর্জন করতে হবে এবং সেই অনুপাতে আমল করতে হবে। তাহলেই কেবল মুক্তি পাওয়া সম্ভব হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে দুনিয়ার জীবনে বেশি বেশি আমল করে পরকালীন জীবনে মুক্তির ব্যবস্থা করে দিন। আল্লাহুম্মা আমিন।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com