রবিবার, ০৯ মে ২০২১, ১২:৪৬ অপরাহ্ন

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রস্তুতি জরুরি

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রস্তুতি জরুরি

দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় প্রস্তুতি জরুরি

তৌ হি দা আ ক তা র

প্রকৃতির রূপসী কন্যা আমাদের বাংলাদেশ। দুহাত ভরে দেওয়া এই প্রকৃতি সময় অসময়ে কেড়েও নিয়েছে অনেক। প্রকৃতির এই ধ্বংশালী নির্মম রূপটিকে আমরা অভিহিত করি প্রাকৃতিক দূর্যোগ নামে। ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ুর কারণে আমাদের দেশকে প্রায়ই প্রাকৃতিক দূর্যোগের মুখোমুখি হতে হয়। প্রাকৃতিক দূর্যোগের তীব্রতা, ব্যাপকতার কারণে বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী দূর্যোগপ্রবণ দেশ হিসেবে পরিচিত। গ্লোভাল ক্লাইমেট রিস্ক ইনডেক্স-২০২০ অনুযায়ী, দুর্যোগের ঝুঁকির দিক থেকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৭তম। জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, অপরিকল্পিত নগরায়ণ, প্রকৃতিতে মানুষের অপরিকল্পিত হস্তক্ষেপ, নদীশাসন ইত্যাদির প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ নানা প্রভাবজনিত কারণে দুর্যোগে ক্রমেই বাড়ছে বাংলাদেশের বিপদের আশঙ্কা। প্রাকৃতিক দূর্যোগের কারণে দেশ ও জাতির উন্নয়নের ধারা বিঘিœত হছে এবং বিনষ্ট হয়েছে পরিবেশের ভারসাম্য। প্রাকৃতিক দূর্যোগ প্রতিরোধ করা সম্ভব নয়, তবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে প্রকৃতিক দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ অনেকাংশেই হ্রাস করা সম্ভব।

প্রায় প্রতি বছরই এ দেশে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগ আঘাত হানে। এসব দুর্যোগের মধ্যে রয়েছে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোছ¡াস, কালবৈশাখী ঝড়, টর্নেডো, নদীভাঙন, উপকূলভাঙন, খরা, শৈত্যপ্রবাহ ইত্যাদি। এছাড়া সিসমিক জোন অর্থাৎ ইউরেশিয়ান প্লেট, ইন্ডিয়ান প্লেট ও বার্মা প্লেটের মাঝামাঝি অবস্থানে থাকার কারণে বাংলাদেশ ভূমিকম্প ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে বাংলাদেশের অবস্থান অত্যন্ত নাজুক। বন্যা বাংলাদেশের একটি প্রধান প্রাকৃতিক দূর্যোগ। ছোটখাটো প্লাবনকে আমরা বলি বর্ষা, আর সেই প্লাবন যখন বিশাল আকার ধারন করে তখন তাকে বন্যা বলা হয়। ভৌগোলিক অবস্থান, অতি বৃষ্টিপাত, ভু-তাত্ত্বিক কাঠামো, নির্বিচারে বৃক্ষনিধন, একই সময়ে প্রধান নদীসমুহের পানি বৃদ্ধি, পানি নিষ্কাশনে বাধা এবং নদীর নাব্যতা হ্রাস প্রভৃতি সমস্যাগুলো বন্যার প্রধান কারণ। বিগত দশকসমূহে সংঘটিত বন্যার মধ্যে ১৯৮৮ সালের বন্যা ছিল বাংলাদেশের স্মরনকালের ভয়াবহ বন্যা। এ বন্যার ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কাটিয়ে উঠা বাংলাদেশের পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছিল। এসময় সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছিল ফসলের, নষ্ট হয়েছিল হাজার হাজার কোটি টাকার ফসল। এছাড়া গাছপালা, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট, সেতু প্রভৃতি ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। রাস্তাঘাট ডুবে যাওয়ার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্যের ব্যাপক ক্ষতি সাধন এবং বন্যায় মানুষের বিভিন্ন ধরণের স্বাস্থ্য সমস্যা দেখা দিয়েছিল। বন্যার পানির কারণে তখন মারাত্মক ভাবে আশাপাশের পরিবেশ ভীষণ ভাবে দূষিত হয়ে পড়েছিল।

সাইক্লোন বা ঘূর্ণিঝড় কথাটি এসেছে গ্রীক শব্দ স্কাইক্লোস থেকে। কোনো অল্প পরিসরে হঠাৎ বায়ূর উষ্ণতা বৃদ্ধি পেলে বায়ূ হালকা হয়ে উপরে উঠে যায় এবং সেখানে নিম্মচাপ কেন্দ্রের সৃষ্টি হয়। তখন চারদিকে শীতল ও ভারী বায়ূ প্রবলবেগে ঐ নিম্মচাপ কেন্দ্রেরে দিকের ছুটে আসে এবং ঘুরতে ঘুরতে কেন্দ্রে প্রবেশ করে। এই কেন্দ্রমুখী প্রবল বায়ূপ্রবাহকে ঘূর্ণিঝড় বলে। ঘূর্ণিঝড়ের কেন্দ্রে বাতাসের চাপ খুব কম থাকায় কেন্দ্রের কাছাকাছি অন্ঞ্চলে সমুদ্রের পানি ফুলে উঠে, যা জলোছ¡াস সৃষ্টির প্রধান কারণ। বাংলাদেশের উপকূলবর্তী এলাকা, যেমন-বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, ভোলা, বরগুনা, লক্ষ্মীপুর, চাঁদপুর, নোয়াখালী, ফেনী, চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারে প্রায়শই ঘূর্ণিঝড় ও জলোছ¡াস আঘাত হানে। এক পরিসংখ্যান থেকে জানা যায়, ১৯৬০-২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রায় ৫০ টি ঘূর্ণিঝড় ও জলোছ¡াস বাংলাদেশে আঘাত হেনেছে। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে প্রাণ হারিয়েছিল প্রায় ৫ লাখ মানুষ। ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশের দক্ষিণান্ঞ্চলে হানা দেওয়া সর্বনাশা সাইক্লোনের প্রচ- আঘাতে উড়িরচর এলাকা বিধ্বস্ত হয়ে প্রায় ১.৫ লাখের মতো মানুষ মারা গিয়েছিল। ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল বাংলাদেশের দক্ষিণান্ঞ্চলের ১৬ টি জেলার প্রায় ৪৭ টি থানায় আঘাত হেনেছিল আরও একটি জলোছ¡াস। এ দানবীয় প্রাকৃতিক দূর্যোগে বিনষ্ট হয়েছিল প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার সম্পদ। ২০০৪ সালের এপ্রিলে স্মরণকালের ভয়াবহ টর্নেডো আঘাত হেনেছিল বাংলাদেশের নেত্রকোনা জেলা ও তার আশেপাশের জেলাগুলোতে। এতে বহু প্রাণহানি ঘটার পাশাপাশি অসংখ্য ঘরবাড়ি ও হাজার হাজার গবাদিপশু ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। বাংলাদেশে ২০০৭ ও ২০০৯ সালে আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় সিডর ও আইলা। এতে যথাক্রমে ১০ হাজার ও ৭ হাজার মানুষের প্রাণহানির পাশাপাশি লক্ষ লক্ষ মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছিল। এতে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ছিল যথাক্রমে ১.৭ বিলিয়ন ও ৬০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার।

প্রাকৃতিক দূর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি হ্রাসকরণে পূর্ব প্রস্তুতির বিকল্প নেই। এলক্ষ্যে বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় টেকসই অবকাঠামো নির্মাণ জোরদার করতে হবে। কিন্তু হতদরিদ্র মানুষ এ ব্যয়ভার বহন করবে কিভাবে? আশার কথা, দেশের হতদরিদ্র মানুষের এসব সমস্যার সমাধানে এগিয়ে এসেছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন-মুজিব বর্ষে কোনো মানুষ ভূমিহীন ও গৃহহীন থাকবেনা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষে দেশের ভূমিহীন ও গৃহহীন ৬ লাখের বেশি পরিবারকে পাকা বাড়ি নির্মাণ করে দেবে সরকার। এ কর্মসূচীতে মোট ব্যয় ২৪ হাজার ৩২০ কোটি টাকা। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় আশ্রায়ন-২ প্রকল্প, ভূমি মন্ত্রণালয়ের গুছ গ্রাম প্রকল্প এবং দূর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে অচিরেই এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হবে। বাংলাদেশে কিছু অসচেতন এবং অপরিণামদর্শী মানুষের বিভিন্ন কর্মকা-ের কারণে পরিবেশ বিপর্যয় বেড়েই চলেছে। সবাই সচেতন এবং দায়িত্বশীল না হলে দূর্যোগের সংখ্যা এবং মাত্রা বেড়ে যেতে পারে। কাজেই দূর্যোগ মোকাবিলায় সরকারি এবং ব্যক্তি ও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ব্যাপক প্রস্তুতি জোরদার করতে হবে। এছাড়াও ব্যক্তি ও সরকারি পর্যায়ে প্রকৃতির সঠিক ব্যবহার এবং সরক্ষণ নিশ্চিত করা গেলে অচিরেই দুর্যোগের সংখ্যা ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ কমিয়ে আনা সম্ভব।

লেখক : শিক্ষার্থী, রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com