মঙ্গলবার, ০৪ মে ২০২১, ০৯:১৯ অপরাহ্ন

তাহাফ্ফুজে মাদারিসে কওমিয়ার আহ্বান

তাহাফ্ফুজে মাদারিসে কওমিয়ার আহ্বান

তাহাফ্ফুজে মাদারিসে কওমিয়ার আহ্বান

১. তাহাফ্ফুজে মাদারিসে কওমিয়া বাংলাদেশ- মনে করে যে, দেশের সামাজিক, রাজনৈতিক পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, দীনী মাদরাসাসমূহের তালীম, দরস, দো’আ, কালাম ইত্যাদি চলমান ও জারী থাকা জরুরী। নতুবা দেশের উপর আল্লাহ পাকের রহমত বন্ধ হয়ে যাবে। বিশেষত হিজফখানা ও মকতব যেখানে কুরআন পাকের সরাসরি তালীম হয়ে থাকে সেটি কখনো বন্ধ রাখা যায় না। কাজেই মকতব হিফজখানা খোলার আশু-ব্যবস্থা গ্রহণ অতীব জরুরি।

২. কওমী মাদরাসাসমূহ হল সমাজে প্রতিষ্ঠিত দীন ইসলামের খালেছ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ইলম ও আমলের মারকায। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ সর্বদা যেন উৎসাহ উদ্দীপনা পেয়ে সর্বদা আল্লাহর দীনের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকতে পারেন সে জন্য এই মাদরাসাগুলো কাজ করে থাকে। কওমী মাদরাসার মাধ্যমেই এদেশে ধর্মচর্চার কাজ প্রধানতভাবে প্রতিষ্ঠিত আছে। কাজেই রোজার পর যথানিয়মে কিতাবখানা খোলা এবং পরীক্ষা গ্রহণ ও ছাত্রভর্তির কার্যক্রম অব্যাহত থাকে সেজন্য আগে-ভাগেই উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।

৩. কওমী আলেমদের কোন কোন আলিম বয়ান বক্তৃতার সময় নিজ জযবাকে নিয়ন্ত্রিত রাখতে ব্যর্থ হন। অনেক সময় তাদের যবান থেকে অসাবধানে এমন কোন বাক্য কিংবা বক্তব্য বেরিয়ে আসে যাকে শত্রু দুশমনেরা সরকার বিরোধী, উগ্রবাদী বক্তব্য বলে প্রচারের সুযোগ হিসাবে গ্রহণ করে নেয়। এ ধরণের অসাবধান বক্তব্য নি:সন্দেহে কওমী মাদরাসাসমূহের জন্য অস্তিত্বের সংকট ডেকে আনবে। বিধায় বয়ান বক্তৃতার অসাবধান বাক্য ও বক্তব্য পরিহার করা এবং বক্তৃতায় সাবধানতা অবলম্বন আশু প্রয়োজন।
৪. এই অসাবধান বক্তৃতার ছুতা ধরে কোথাও কোথাও দেখা যায় কওমী আকীদার শত্রু দুশমনারা মাদরাসাগুলিকে নানা রকমের হয়রানীর মধ্যে ফেলে দিচ্ছে। কোথাও কোথাও রাজনৈতিক প্রতিহিংসার মধ্যে আলিমদেরকে জড়িয়ে দিচ্ছে। কোথাও কোথাও স্থানীয় পূর্ব শত্রুতার প্রতিশোধ নেয়ার সুযোগ নিচ্ছে। পরিণামে মাদরাসাও মাদরাসার কর্তৃপক্ষ নানাভাবে হয়রানীর মুখোমুখি হচ্ছেন। এমতবস্থায় মাদরাসাগুলোকে উপরোক্ত নানাবিদ হয়রানীর মধ্যে পতিত হওয়া থেকে উদ্ধার করা আশু প্রয়োজন।

৫. কওমী মাদরাসা আবহমানকাল থেকেই একটি পূর্ণাঙ্গ ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য পূর্ণ পরিবেশ, গভীর পড়াশুনার জায়গা, ইলম ও আমলের সুন্দরতম মিলনক্ষেত্র, আদব ও আখলাকের সুন্দরতম আদর্শের ক্ষেত্র হিসাবে পরিচিত ছিল। এখানে ছাত্ররা কখনো উস্তাদের সাথে বেআদবী করা, উস্তাদের নির্দেশের অমান্য করার চিন্তাও করত না। কিন্তু বর্তমানে দেখা যায় কোন কোন কওমী মাদরাসায় আদব আখলাকের এই শৃংখলা ভয়ানক ভাবে লঙ্গিত হতে চলেছে। পড়াশুনার চেয়ে মোবাইলের অপব্যবহার; মোবাইলের মাধ্যমে নিজস্ব চিন্তাচেতনার প্রচার এমনকি মোবাইলের মাধ্যমে বাইরের কদর্য রীতিনীতির অনুসরণের দিনে ঝুকে যাচ্ছে। কোন সন্দেহ নেই যে, কওমী মাদরাসাগুলি ক্রমে ক্রমে নিজ আদর্শ ঐতিহ্য ও আখলাক থেকে সরে যাচ্ছে তা এই মুহুর্তেই পতিরোধ করা আবশ্যক। নতুবা এটি কওমী মাদরাসাকে দ্রুত অস্তিত্বের সংকটে ফেলে দিতে পারে।

৬. কওমী মাদরাসার ছাত্রদের ভর্তির সময়ে বেশ কিছু ওয়াদা ও অঙ্গিকার নিয়ে ভর্তি করানো হয়। শুরু থেকেই সকল কওমী মাদরাসায় এই নিয়ম চালু আছে। সেই সব ওয়াদা অঙ্গীকারের মধ্যে “মাদরাসার শিক্ষার্থী হিসাবে থাকা অবস্থায় কোন ধরণের রাজনৈতিক দল গঠন করা, রাজনৈতিক দলের সদস্য হওয়া উস্তাদের নেগরানী বিহীন কোন ধরণের মিটিং মিছিলে অংশ গ্রহণ করবে না” এর কথাটিও উল্লেখ আছে। উল্লেখ্য যে, বর্তমানে দেখা যায় কোন কোন মাদরাসায় এই ওয়াদা যথাযথভাবে পালন করা হচ্ছে না। আবার কোথাও উশৃংখলতা এতো বেড়ে গিয়েছে যে, ছাত্ররা শিক্ষক কিংবা কর্তৃপক্ষ কিংবা মুহতামিমের নির্দেশের কোনই তোয়াক্কা না করে ফেইজবুক কিংবা বাইরের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের অনুসরণে বেশী আগ্রহী হয়ে উঠে যা কওমী মাদরাসার ঐতিহ্য ও আদর্শ পরিপন্থি, যা দ্রুত প্রতিরোধ জরুরি।

৭. কওমী মাদরাসার অনেক শিক্ষার্থী ধর্মীয় উচ্চশিক্ষার জন্য ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দসহ মিশর, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব গমনে গভীর প্রত্যাশী। কিন্তু দু:খের বিষয় যে, বাংলাদেশ থেকে কওমী শিক্ষার্থীদের জন্য স্টুডেন্ট ভিসা- এর ব্যবস্থা না থাকার কারণে অনেক যোগ্যতার অধিকারী হওয়া সত্তে¡ও সম্মানজনকভাবে তারা স্টুডেন্ট ভিসা নিয়ে বহির্বিশ্বে গমনের সুযোগ পাচ্ছে না। অনেকে ভিন্ন পথে গমনের চেষ্টা করে পথিমধ্যে নানা রকমের জটিলতার সম্মুখীন হচ্ছে। এমতবস্থায় কওমী শিক্ষার্থীদের জন্য স্টুডেন্ট ভিসা প্রাপ্তির পথ তৈয়ার করে দেওয়া খুবই জরুরি।

৮. কওমী শিক্ষার্থীদের প্রধান কর্মক্ষেত্র হল মাদ্রাসার শিক্ষাকতা। দু:খের সাথে বলতে হয় যে, ভাল ছাত্র হওয়ার মানে ভাল শিক্ষক নয়। একজন মানুষ মেধাবী ছাত্র হয়েও শিক্ষকতায় অদক্ষ হতে পারে। আবার একজন খুব মেধাবী না হয়েও শিক্ষক হিসাবে সুদক্ষ হতে পারে। তাই আমরা মনে করি যে, কওমী শিক্ষার্থীদের যারা শিক্ষকতা করতে আগ্রহী তাদের জন্য শিক্ষক প্রশিক্ষণের দ্রুত ব্যবস্থা করা জরুরী।

৯. কওমী শিক্ষার্থীদের আরেকটি বড় কর্মক্ষেত্র ধর্মীয় বিষয়ে ওয়াজ বয়ান ও বক্তৃতা প্রদান। এ ক্ষেত্রে উপযুক্ত প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা না থাকায় অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, দেওবন্দী মাদরাসায় পড়াশোনা ও সার্টিফিকেট গ্রহণ সত্ত্বেও অনেকে ভিন্ন রকমের চিন্তা চেতনায় আক্রান্ত হয়ে যায়। অনেকে বিকৃত ও বিকার গ্রস্থ দর্শনের প্রচারে লিপ্ত হয় যা উম্মতকে এক জটিল পরিস্থিতির দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এমতাবস্থায় আমরা মনে করি এই শিক্ষার্থীদের জন্য ফিল্ডে ওয়াজ মাহফিল কিংবা বয়ান বক্তৃতা কিভাবে হতে পারে এবং কিভাবে হওয়া উচিত নয় এসবের প্রশিক্ষণের দ্রুত ব্যবস্থা করা।

১০. মাদরাসা কিংবা মাদরাসার শিক্ষকদের উপর অহেতুক কোন হয়রানী যেন হতে না পারে এতদুদ্দেশ্যে শীর্ষস্থানীয় আলেমগণের একটি প্রতিনিধি দল গঠন করা যায়। এই প্রতিনিধি দল সরকারের সাথে বসে অহেতুক হয়রানী বন্ধের ব্যবস্থা করবেন।

১১. মাদরাসাগুলোকে এই মর্মে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হওয়া জরুরী যে, কওমী মাদরাসাকে বোর্ড কর্তৃক প্রদত্তনীতিমালা এবং ভর্তির সময় যেসব ওয়াদা করা হয়েছে যেমন তথাকথিত রাজনৈতিক কর্মকান্ডের সাথে যুক্ত না হওয়া এর যথাযথ বাস্তবায়ন করা। এবং যেসব ছাত্র বা শিক্ষক এই নীতি ভঙ্গ করবে তাদের বিরুদ্ধে মাদরাসাকর্তৃপক্ষ শাস্তিমূলক যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

ধন্যবাদান্তে-
মাওলানা ড. মুশতাক আহমদ (আহ্বায়ক)
মাওলানা ইয়াহইয়া মাহমুদ (যুগ্ন আহ্বায়ক)
মুফতি মোহাম্মদ আলী (সদস্য সচিব)
মাওলানা মুজিবুর রহমান (যুগ্ন সচিব)

তাহাফ্ফুজে মাদারিসে কওমিয়া বাংলাদেশ

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com