সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১, ০৮:৫৭ অপরাহ্ন

জাতিসংঘ দিবস হোক সকলের জন্য শান্তির বার্তা

জাতিসংঘ দিবস হোক সকলের জন্য শান্তির বার্তা

জাতিসংঘ দিবস | তারিক মোহাম্মদ

জাতিসংঘ দিবস হোক সকলের জন্য শান্তির বার্তা

প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী ২৪ অক্টোবর তারিখটি ‘জাতিসংঘ দিবস’ হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে পালিত হয়ে থাকে। ১৯৪৫ সালের ২৪ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে জাতিসংঘ সৃষ্টি হয় এবং ঐ একই দিনে ‘জাতিসংঘ সনদ’ তৎকালীন সদস্য রাষ্ট্রসমূহের অনুমোদনক্রমে কার্যকারিতা লাভ করে। ১৯৪৭ সালে জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ এই মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে, প্রতিবছর ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ সনদের কার্যকারিতা লাভের দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্য দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদার সাথে পালন করা হবে। পরবর্তীতে ১৯৭১ সালে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে গৃহীত প্রস্তাব অনুযায়ী বিশ্বব্যাপী জাতিসংঘের সকল সদস্য রাষ্ট্র দিবসটি আন্তর্জাতিকভাবে পালন করে থাকে।

জাতিসংঘ গঠনের তাৎপর্য যথাযথভাবে অনুধাবন করতে হলে আমাদেরকে ১ম বিশ্বযুদ্ধ ও ২য় বিশ্বযুদ্ধ এবং এর মধ্যবর্তী লীগ অব নেশনস এর ব্যর্থতা সম্যকভাবে উপলব্ধি করতে হবে। বিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে ২৮ জুলাই ১৯১৪ তারিখে ১ম বিশ্বযুদ্ধ আরম্ভ হয় এবং ১১ নভেম্বর ১৯১৮ তারিখে এর পরিসমাপ্তি ঘটে। সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ বা League of Nations ১ম বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। ১৯২০ সালের ২১ জানুয়ারি প্যারিস শান্তি আলোচনার ফলস্বরূপ এ সংস্থাটির জন্ম। বৈশ্বিক শান্তিরক্ষায় সর্বপ্রথম সংস্থাটি হলো সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ। সংস্থাটির প্রতিষ্ঠাকালীন অঙ্গীকারপত্র অনুযায়ী এর প্রাথমিক উদ্দেশ্য ছিলো সম্মিলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও বেসামরিকীকরণের মাধ্যমে যুদ্ধ এড়ানো এবং সমঝোতা ও সালিশের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক দ্বন্দ্বের নিরসন করা। অন্যান্য লক্ষ্যের মধ্যে শ্রমিক অধিকার নিশ্চিতকরণ, আদিবাসীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ, বৈশ্বিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিতকরণ, মাদক ও মানব পাচার রোধ, অস্ত্র কেনা-বেচা রোধ এবং ইউরোপের সংখ্যালঘু ও যুদ্ধবন্দিদের অধিকার নিশ্চিতকরণ অন্যতম। ২৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪ ও ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৩৫ এর মধ্যে সংস্থাটির সর্বোচ্চ সদস্য সংখ্যা ছিল ৫৮টি। বহু বছরের কূটনৈতিক শৃঙ্খল ভেঙে সম্পূর্ণ নতুন ও মৌলিক কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি ধারণার ফসল ছিল সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ। সংস্থাটির অধীনে কোনো আলাদা সৈন্যবাহিনী ছিল না। বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সংশোধন ও সংস্কার, অন্যদেশের ওপর অর্থনৈতিক শাস্তি আরোপ বা প্রয়োজনবোধে শক্তি প্রয়োগের বেলায় সংস্থাটি পুরোপুরি বৃহৎ শক্তিবর্গের ওপর নির্ভরশীল থাকত। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে বিজয়ী মিত্রশক্তি পরবর্তীকালে যাতে যুদ্ধ ও সংঘাত প্রতিরোধ করা যায়— এই উদ্দেশ্যে জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা করতে উদ্যোগী হয়। তখনকার বিশ্ব রাজনীতির পরিস্থিতি জাতিসংঘের সাংগঠনিক কাঠামোতে এখনও প্রতিফলিত হচ্ছে যার লক্ষ্য হলো আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আইন, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সামাজিক অগ্রগতি এবং মানবাধিকার বিষয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করা।

১৯৩৯ সালে মার্কিন পররাষ্ট্র দফতরের নেতৃত্বে অকার্যকর লীগ অব নেশনসকে প্রতিস্থাপনের জন্য নতুন বিশ্ব সংস্থার প্রথম দৃঢ় পরিকল্পনা শুরু হয়। ১৯৪১ সালের ১২ জুন, যুক্তরাজ্য, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, দক্ষিণ আফ্রিকা ইউনিয়ন এবং বেলজিয়াম, চেকোস্লোভাকিয়া, গ্রীস, লাক্সেমবার্গ, নেদারল্যান্ডস, নরওয়ে, পোল্যান্ড এবং যুগোস্লাভিয়ার নির্বাসিত সরকারগুলির প্রতিনিধিরা, পাশাপাশি ফ্রান্সের জেনারেল শার্লদ্যগলের একজন প্রতিনিধি লণ্ডনে সাক্ষাত করেন এবং সেন্ট জেমস প্রাসাদের ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করেন। এটি ছয়টি সম্মেলনের মধ্যে প্রথম ছিল যা জাতিসংঘ এবং জাতিসংঘের সনদ প্রতিষ্ঠা করে। ১৯৪৬ সালের ১০ জানুয়ারি লন্ডনে ওয়েস্টমিনিস্টারের সেন্ট্রাল হলে সাধারণ পরিষদের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। সুরক্ষা কাউন্সিল এক সপ্তাহ পরে ওয়েস্টমিনিস্টারের চার্চ হাউসে প্রথমবারের মতো মিলিত হয়। ১৯৪৬ সালের ১৮ এপ্রিল লীগ অব নেশনস আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে এবং এর লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যকে জাতিসংঘে স্থানান্তরিত করে। সামাজিক ক্ষেত্রে মানবাধিকার, অর্থনৈতিক বিকাশ, ঔপনিবেশবাদ লোপ, স্বাস্থ্য ও শিক্ষাকে উৎসাহিত করা এবং শরণার্থী পুনর্বাসন ও বাণিজ্য সহজিকরণে আকর্ষণীয়ভাবে জাতিসংঘ যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছে।

২০১৬ সালের তথ্যানুসারে জাতিসংঘ বা রাষ্ট্রসঙ্ঘের সদস্য সংখ্যা ১৯৩। বিশ্বের প্রায় সবস্বীকৃত রাষ্ট্রই এর সদস্য। তবে উল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম হলো তাইওয়ান, ভ্যাটিকান সিটি। জাতিসংঘ ছয়টি দাপ্তরিক ভাষা হলো আরবি, চীনা, ইংরেজি, ফরাসি, রুশ, এবং স্পেনীয় ভাষা। জাতিসংঘ সচিবালয়ে যে দুটি ভাষা ব্যবহৃত হয় তা হলো ইংরেজি ও ফরাসি। জাতিসংঘ প্রধান হিসেবে রয়েছেন মহাসচিব। জাতিসংঘ সনদের ৯৭ অনুচ্ছেদ মোতাবেক মহাসচিবকে ‘প্রধান প্রশাসনিক কর্মকর্তা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ঐ সনদে আরো বলা হয়েছে যে, মহাসচিব যে-কোনো বিশ্ব শান্তিভঙ্গের আশঙ্কা ও নিরাপত্তার খাতিরে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণের লক্ষ্যে নিরাপত্তা পরিষদে প্রস্তাব আনতে পারবেন। জাতিসংঘ সনদ প্রস্তাবনাসহ ১৯ টি অধ্যায় এবং ১১১টি অনুচ্ছেদে বিভক্ত। সনদ অনুসারে সাংগঠনিকভাবে জাতিসংঘের প্রধান অঙ্গ সংস্থাগুলো হলো –সাধারণ পরিষদ; নিরাপত্তা পরিষদ; অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ; জাতিসংঘ সচিবালয়; ট্রাস্টিশিপ কাউন্সিল বা অছি পরিষদ এবং আন্তর্জাতিক আদালত।

জাতিসংঘ কতিপয় বিশেষায়িত সংগঠন বা সংস্থা সমর্থন ও নির্বাহ করে থাকে। এসব বিশেষায়িত সংস্থার কার্যক্রম ও তহবিল পূর্বোল্লিখিত সংস্থাসমূহ হতে পৃথক এই অর্থে যে – এসব সংস্থাও কার্যনির্বাহী বোর্ড কর্তৃক পরিচালিত হয় কিন্তু তারা সাধারণ পরিষদের নিকট প্রতিবেদন পেশ করেনা, কেবলমাত্র কার্যনির্বাহী বোর্ডে সংস্থা-রাষ্ট্রসমূহের নিকট প্রতিবেদন পেশ করে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- খাদ্য ও কৃষি সংস্থা [FAO] ; আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি সংস্থা [IAEA] ; আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা [ILO] ; আন্তর্জাতিক কৃষি উন্নয়ন তহবিল [IFAD] ; আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল [IMF] ; আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়ন [ITU] ; জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সাংস্কৃতিক সংস্থা [UNESCO] ; বৈশ্বিক ডাক ইউনিয়ন [UPU] ; বিশ্ব ব্যাংক [WB] ; বিশ্ব বুদ্ধিবৃত্তিক মেধাস্বত্ত্ব সংস্থা [WIPO] ; বিশ্ব পর্যটন সংস্থা [WTO] এবং বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা [WHO] প্রভৃতি।
জাতিসংঘ দিবসের পাশাপাশি একই দিনে বিশ্ব উন্নয়ন তথ্য দিবস পালন করা হয়। জাতিসংঘের উদ্যোগে ১৯৭২ সাল থেকে প্রতিবছরের ২৪ অক্টোবর এ দিনটি বৈশ্বিকভাবে পালিত হয়। ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ ২৪ অক্টোবর জাতিসংঘ দিবসের সাথে মিল রেখে বিশ্ব উন্নয়ন তথ্য দিবস প্রতিষ্ঠা করার সিদ্ধান্ত নেয়। সাধারণ পরিষদ প্রতিবছর বিশ্বব্যাপী জনগণের মতামতকে উন্নয়নের সমস্যাগুলির দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার এবং তাদের সমাধানের জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করার প্রয়োজনীয়তা থেকে এটি করা হয়। ১৯ ডিসেম্বর, ১৯৭২ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে গৃহীত এক প্রস্তাব মোতাবেক বিশ্ব উন্নয়নের সমস্যার দিকে বিশ্বব্যাপী মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সহায়তা করার জন্য ‘বিশ্ব উন্নয়ন তথ্য দিবস’ চালু করার আহ্বান জানানো হয়। অধিবেশনে সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছিলো যে এই দিনটি জাতিসংঘের কাজের উন্নয়নের কেন্দ্রীয় ভূমিকার উপর জোর দেওয়ার জন্য জাতিসংঘ দিবসের সাথে মিলিত হওয়া উচিত। বিশ্ব বিকাশের তথ্য দিবসটি সর্বপ্রথম ১৯৭৪ সালের ২৪ অক্টোবর অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং তারপর থেকে প্রতিবছর এই তারিখে অনুষ্ঠিত হয়। বিশ্ব বিকাশ তথ্য দিবসের একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ছিল তরুণদের অবহিত করা এবং উদ্বুদ্ধ করা এই পরিবর্তনটি এই লক্ষ্যটিকে আরো এগিয়ে নিতে সহায়তা করতে পারে। জাতিসংঘ দিবসের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর কাছে জাতিসংঘের লক্ষ্য এবং উদ্দেশ্যকে উৎসর্গ করা হয়েছে। দিবসটি জাতিসংঘ সপ্তাহ যা ২০ থেকে ২৬ অক্টোবর পর্যন্ত চলমান, তার একটি অংশ। সচরাচরভাবে জাতিসংঘ দিবসে বিভিন্ন ধরনের সভাসমাবেশ, আলোচনাঅনুষ্ঠান এবং প্রদর্শনীর মাধ্যমে উদযাপিত হয়। মূলত দিবসটিতে জাতিসংঘের বৈশ্বিক অর্জন ও উদ্দেশ্যকে জনসমক্ষে তুলে ধরা হয়। বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদা এবং উৎসাহউদ্দীপনার মধ্যে দিয়ে দিবসটি পালিত হয়ে আসছে, এ বছরও তার ব্যতিক্রম নয়।

জাতিসংঘের নেতাদের উচ্চ আশা ছিল যে এটি রাষ্ট্রসমূহের মধ্যে দ্বন্দ্ব রোধে এবং ভবিষ্যতের যুদ্ধকে অসম্ভব করে তুলতে কাজ করবে। এই আশাগুলি অবশ্যই পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ১৯৪৭ সাল থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত শীতল যুদ্ধের সময় বৈরী শিবিরে বিশ্বের বিভাজন শান্তিরক্ষার বিষয়ে চুক্তি করাকে অত্যন্ত কঠিন করে তুলে ছিল। শীতল বা স্নায়ুযুদ্ধের সমাপ্তির পরে, বিশ্বশান্তি ও সহযোগিতা অর্জনের জন্য জাতিসংঘকে সংস্থা হিসেবে পরিণত করার জন্য নতুন কাজগুলি শুরু হয়, যেহেতু কয়েক ডজন সক্রিয় সামরিক দ্বন্দ্ব বিশ্ব জুড়ে ক্রমাগত ছড়িয়ে পড়ে। সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার ফলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বৈশ্বিক আধিপত্যের এক অনন্য অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হয় এবং জাতিসংঘের জন্য বিভিন্ন ধরনের নতুন সমস্যা তৈরি করেছে। ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর বিশ্ব বাণিজ্য কেন্দ্রে সন্ত্রাসী হামলা সংঘটিত হওয়ার পর বর্তমানে জাতিসংঘের মূল চ্যালেঞ্জ হলো বিশ্বব্যাপী জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদের প্রসার এবং মৌলবাদের উত্থান। নতুন শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে জাতিসংঘ আরো দৃঢ়পদক্ষেপে অগ্রসর হবে সেটাই এই মুহুর্তে বিশ্ববাসীর প্রত্যাশা। পিআইিড নিবন্ধ

লেখক : উপপরিচালক বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট
২১.১০.২০২১

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com