সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১, ০৮:০৫ অপরাহ্ন

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও বাংলাদেশের প্রস্তুতি

জাহেরুল ইসলাম

ময়মনসিংহের ভালুকায় এনভয় গ্রুপের টেক্সটাইল কারখানায় ৪২০ টি রোবট কাজ করছে। রোবট ব্যবহারের ফলে কারখানাটির উৎপাদন আগের চেয়ে অনেক বৃদ্ধি পেয়েছে। এনভয় গ্রুপের এ কারখানাটিতে টেক্সটাইলে উৎপাদন শুরু হয় ২০০৮ সাল থেকে। এখানে সাধারণ শ্রমিকরাই কাজ করতো। বস্ত্র উৎপাদন প্রক্রিয়ায় মাঝেমধ্যেই লাইনের সুতা ছিড়ে যায়। শ্রমিকদের নিজ হাতে সুতায় জোড়া লাগাতে অনেক সময় লেগে যায়। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয়। কর্তৃপক্ষ ২০১৯ সালে এ সমস্যা সমাধানের জন্য সাধারণ শ্রমিকের জায়গায় রোবট ব্যবহার শুরু করেন। রোবট চোখের পলকেই ছিড়ে যাওয়া সুতা জোড়া লাগিয়ে দেয়। এতে উৎপাদন ব্যাহত হয় না। দিনশেষে কর্তৃপক্ষ তাদের কাঙ্ক্ষিত উৎপাদন পাচ্ছে। ময়মনসিংহের ভালুকায় এনভয় গ্রুপের এ কারখানাটি বিশ্বের ইউএসজিবি লিড সনদপ্রাপ্ত প্রথম বস্ত্র কারখানা। এ কারখানায় ৪২০ টি রোবট কাজ করে। তাদের নিয়ন্ত্রণের জন্য ১৪ টি কর্নার রয়েছে। কারখানাটিতে প্রতিদিন ৫ শত টন ডেনিম সুতা উৎপাদন হয়। রোবটগুলো জার্মানি ও সুইজারল্যান্ড থেকে আমদানি করা হয়েছে। এগুলোর প্রতিটির দাম গড়ে ৬ লাখ ইউরো। সাধারণ মেশিনারিজের তুলনায় রোবট ব্যবহারে আনুমানিক চারগুণ বেশি বিনিয়োগ করতে হয়। তবে একবার বিনিয়োগের পর নতুন করে আর বিনিয়োগের তেমন প্রয়োজন হয় না। ১০ জন শ্রমিকের কাজ একটা রোবট করতে পারে। ফলে রোবট ব্যবহার তুলনামূলক অনেক সাশ্রয়ী। সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের এ কারখানাটিতে শ্রমিক সংখ্যা মাত্র এক হাজার। আমাদের দেশে দক্ষ জনবলের অভাব রয়েছে। প্রযুক্তি পরিচালনায় দক্ষ শ্রমিক তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে। শ্রমিকের কাজ রোবট দিয়ে করালে উৎপাদনে সময় ও অর্থের সাশ্রয়ের পাশাপাশি উৎপাদিত পর্ণের কোয়ালিটি ভালো হয়।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব আমাদের দোরগোড়ায় কড়া নাড়ছে। ইতিমধ্যেই আমরা সেই পথেই হাটতে শুরু করেছি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা জনাব সজীব ওয়াজেদ বলেছেন ‘ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবে বিশ্বকে নেতৃত্ব দেবে বাংলাদেশ এটা কোনো স্বপ্ন নয়, বাংলাদেশের সেই সক্ষমতা আছে।”এরই ধারাবাহিকতায় আমাদের সরকারি – বেসরকারি সকল প্রতিষ্ঠানই এলক্ষ্যে ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করে দিয়েছে।

মানুষের কাজ করছে রোবটে। বিকাশ, নগদে মাধ্যমে বদলে গেছে প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্হা। পাঠাও বা উবারের নিজস্ব কোনো গাড়ি নেই, অথচ যাত্রী পরিবহণের প্রচলিত সকল ধারণা তারা পাল্টে দিয়েছে। আলি বাবার নিজস্ব কোনো পণ্য নেই, অথচ এমন কোনো পণ্য নেই যা তারা বিক্রি করে না। ফেসবুকের নিজস্ব কোনো কন্টেন্ট নেই, তবুও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে তাদের তুলনা নেই, পুঁজি বাজারে তাদের অবস্থান অনেক উপরে। কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীনস্থ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর থেকে ‘কৃষকের জানালা’ অ্যাপের মাধ্যমে কৃষকদের সেবা দিচ্ছে। ভূমি মন্ত্রণালয় নামজারির প্রচলিত পদ্ধতির পরিবর্তে ‘ ই- নামজারি’ পদ্ধতি চালু করে জনগণকে সেবা দিচ্ছে। জনগণ ঘরে বসেই ঝামেলামুক্তভাবে দ্রুত জমির নামজারির সুযোগ পাচ্ছে। এ কাজের স্বীকৃতি হিসেবে বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো জাতিসংঘের সর্বোচ্চ মর্যাদাপূর্ণ ‘ ইউনাইটেড ন্যাশনস পাবলিক সার্ভিস অ্যাওয়ার্ড-২০২০’ অর্জন করেছে। এসিআই ‘ রূপালি’ প্রযুক্তির মাধ্যমে ‘প্যাটার্ন অ্যানালাইসিস’ ও ‘আইওটি’ ব্যবহার করে মৎস্যচাষিদের দিচ্ছে অটোমাইজড পরামর্শ সেবা।’ ফসলি’ নামে ডিজিটাল কৃষি সেবাও দিচ্ছে এসিআই।

প্রথম শিল্পবিপ্লব হয় ১৭৮৪ সালে। বাষ্পীয় ইঞ্জিন মানুষের হাতে তুলে দিয়েছিল গতিকে। যান্ত্রিকীকরণের মাধ্যমে যাত্রা শুরু আধুনিক শিল্পায়নের দিকে, বাড়ে কয়লা ও ইস্পাতের ব্যবহার। মূলত পানি আর বাষ্পের ব্যবহার করে উৎপাদন বৃদ্ধি হয় এ বিপ্লবের মাধ্যমে। এর একশ বছরেরও কম সময়ের মধ্যে ১৮৭০ সালে হয় দ্বিতীয় শিল্পবিপ্লব। বৈদ্যুতিক বাতি মানুষকে দেয় এক আলোকিত বিশ্ব।বিদুৎ ব্যবহার করে গণ-উৎপাদনের নতুন অধ্যায় শুরু হয়। ১৯৬৯ সালে বিশ্ববাসীর দেখলো তৃতীয় শিল্পবিপ্লব। ইন্টারনেট বিশ্বকে এনে দিল হাতের মুঠোয়। কম্পিউটারের ব্যবহার হলো শুরু। তৃতীয় শিল্পবিপ্লবের উপর ভর করে এখন বিশ্ববাসীর সামনে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের পদধ্বনি।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ধারণাটি ২০১৩ সালের ১ এপ্রিল জার্মানিতে আনুষ্ঠানিকভাবে উপস্থাপন করা হয়। এরও আগে ২০১১ সালে এটি প্রথম আলোচনায় আসে। এরপর থেকে এ বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মহলে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে মানুষের জীবনে কি প্রভাব ফেলবে তা নিয়ে বিশেষজ্ঞ মহল দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ছে। একদল বিশেষজ্ঞ মনে করেন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে মানুষের জীবনমান আগের তুলনায় অনেক বাড়বে,পণ্য সরবরাহ প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহারে আনবে ব্যাপক পরিবর্তন। অন্যদল মনে করেন চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে মানুষের কাজ রোবট দিয়ে করানো হবে,এতে বেকারত্ব সমস্যা দেখা দেবে।

অসমতা ও দারিদ্র্য পরিস্থিতি ভয়াবহ আকারে দেখা দেবে। শ্রম বাজারে ব্যপক পরিবর্তন হবে ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সমস্যা দেখা দেবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ফলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ৬০ শতাংশ, আসবাবপত্র শিল্পের ৫৫ শতাংশ, প্রক্রিয়াজাত কৃষিপণ্য শিল্পের ৪০ শতাংশ, চামড়া ও জুতা শিল্পের ৩৫ শতাংশ এবং সেবা শিল্পের ২০ শতাংশ লোক কর্মহীন হয়ে পড়বে মর্মে এক জরিপে বলা হয়েছে। বিশ্বে ২০৩০ সালের মধ্যে ৮০ কোটি লোক বেকার হয়ে যাবে। অন্যদিকে ১ শত কোটি নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। ভবিষ্যতে প্রচলিত অনেক চাকরি থাকবেনা,সেখানে সৃষ্টি হবে নতুন চাকরি। আর এজন্যই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় আইসিটিভিত্তিক শিক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুবিধা অসুবিধা দুটোই আছে। সমস্যাগুলো সমাধান করে সুযোগগুলোকে কাজে লাগাতে হবে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রেক্ষাপটে বিশ্বব্যাপী উৎপাদন প্রক্রিয়ায় জ্বালানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি,ন্যানো টেকনোলজি,কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসহ নতুন নতুন প্রযুক্তির প্রয়োগ বাড়ছে। ফলে দেশে উৎপাদিত শিল্পপণ্য আন্তর্জাতিক বাজারে তীব্র প্রতিযোগিতার মুখোমুখি হচ্ছে এবং হবে। এসব চ্যলেজ্ঞ মোকাবিলায় সরকারি বেসরকারি সকলকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে আসতে হবে। ইতোমধ্যে সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে নানারকম পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে এবং হচ্ছে।

সরকারের আইসিটি বিভাগ কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। ইতোমধ্যে ১ হাজার ৬ শত ইউনিয়ন ডিজিটাল সেন্টারে অপটিক্যাল ফাইবার ক্যাবলের মাধ্যমে দ্রুতগতির ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছে, ইউনিয়ন পর্যায়ে প্রান্তিক গ্রাহকের নিকট তিন হাজারেরও বেশি ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পপ NMS এ এখন সংযুক্ত ২ হাজার ৫ শতের বেশি। সারা দেশের এক হাজারেরও বেশি মেধাবী তরুণ ও তরুণীদের উদীয়মান প্রযুক্তি(Emerging Technology) অর্থাৎ আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সি (AI),ইন্টারনেট অব থিংক (IoT), ব্লকচেইন,রোবটিক্স, বিগ ডাটা, মেডিক্যাল স্ক্রাইব,সাইবার সিকিউরিটি ইত্যাদি বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে এবং হচ্ছে। বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক পরিসরে ( Global Platform) প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলা আইপিএ কনভার্টার ধ্বনি তৈরি করে জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা হয়েছে ওয়েবএড্রেস Ipa.bangla.gov.bd ও www.bangla.gov.bd) ভাষা প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক প্রযুক্তির প্ল্যাটফর্ম। বাংলা ভাষায় তৈরি করা নতুন নতুন সেবা এখানে সংযুক্ত করা হচ্ছে, যা সহজেই পাওয়া যাবে। সবধরনের প্রতিবন্ধীদের জন্য ৩৫০ টি অডিয়ো ও ভিডিয়ো টিউটোরিয়াল তৈরি করা হয়েছে। প্রতিবন্ধীদের জন্য আন্তর্জাতিক ওয়েব কন্টেন্ট এক্সেসিবিলিটি গাইড লাইন অনুযায়ী বিশেষ অভিগম্য(Accessible) সফটওয়্যার ইমপোরিয়া উন্নয়ন করা হয়েছে। আইসিটি পেশাজীবীদের ব্র্যান্ড ইমেজ আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বৃদ্ধির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশনায় বাংলাদেশের উন্নয়নের অভিযাত্রায় ডিজিটাল বাংলাদেশের সুবিধা এখন শহর থেকে প্রান্তিক গ্রাম পর্যায়ে বিস্তৃত হয়েছে। বিশ্ব প্রযুক্তি খাতে নেতৃত্ব দিতে তৈরি হচ্ছে বাংলাদেশ। চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এ সন্ধিক্ষণে জাতীয় উন্নয়ন ও অগ্রগতির জন্য একটি সময়োপযোগী কার্যকর পরিকল্পনা নিয়ে ক্ষুধা দারিদ্র্যমুক্ত সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যায়ে এগিয়ে চলছে বাংলাদেশ। পিআইডি নিবন্ধ
০৮.১১.২০২১
লেখক : কলামিস্ট

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com