সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১, ০৭:৫১ অপরাহ্ন

গুজব প্রতিরোধে প্রয়োজন জনসচেতনতা

গুজব প্রতিরোধে প্রয়োজন জনসচেতনতা

গুজব প্রতিরোধে প্রয়োজন জনসচেতনতা

তানজিনা পারভিন

সম্প্রতি কুমিল্লায় একটি ‘পূজামণ্ডপে কোরআন রাখার ঘটনা ‘ঘটিয়ে’ ও ফেইসবুকে তা ‘রটিয়ে’ দেশব্যাপী অবিশ্বাস্য সাম্প্রদায়িক অপ্রীতিকর অরাজকতার সৃষ্টির অপচেষ্টা করা হলো। আমাদের দেশে এক শ্রেণির দুষ্ট লোক মাঝে মাঝে এ ধরনের ঘটনা সৃষ্টির চেষ্টা করে। এভাবে গুজব রটিয়ে অতীতেও বিভিন্ন সময়ে মানবাধিকার লঙ্ঘনের নানা দুর্ঘটনা ঘটেছে। তাই এখনই যদি গুজবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে আমরা প্রতিরোধ না করি এবং জনসচেতনতা সৃষ্টি না করি তাহলে এই তালিকা আরো লম্বা হবে।

ফেসবুক বা যে কোনো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বা কোনো গণমাধ্যমে এমন কিছু লেখা বা পোস্ট করা বা স্ট্যাটাস দেওয়া বা মন্তব্য করা কিংবা ছবি বা ভিডিও আপলোড করা যা মানহানিকর, বিভ্রান্তিমূলক, অশালীন, অরুচিকর, অশ্লীল, আক্রমণাত্মক উদ্দেশ্যে হয় তা ‘সাইবার অপরাধ’ বলে বিবেচিত হবে। এছাড়া দেশে অরাজক ও অস্থিতিশীল অবস্থা সৃষ্টি করতে, রাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা সম্ভাবনা আছে এ রকম যেকোনো কমর্কাণ্ড কিংবা দেশবিরোধী কোনো কিছু অনলাইনে করলে তাও সাইবার অপরাধ হবে। এ ছাড়া অনলাইনে কারও নামে ভুয়া একাউন্ট খুললে বা হ্যাক করলে, ভাইরাস ছড়ালে, তথ্য চুরি করলে কিংবা ইলেকট্রনিক কোনো সিস্টেমে অনধিকার প্রবেশ করলে ‘সাইবার অপরাধ’ হবে। সাইবার অপরাধ হয় এ রকম কোনো পোস্ট বা স্ট্যাটাস বা মন্তব্য বা ছবি বা ভিডিও শেয়ার, লাইক, কিংবা ট্যাগ দিলেও ‘সাইবার অপরাধ’ হতে পারে। অথার্ৎ অনলাইনে ইচ্ছাকৃতভাবে যেকোনো অপরাধমূলক কমর্কাণ্ড যা কেউ পড়লে বা দেখলে বা শুনলে নীতিভ্রষ্ট বা অসৎ হতে উদ্বুদ্ধ হতে পারে, যার মাধ্যমে মানহানি ঘটে, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটে বা ঘটার সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় বা ধমীর্য় অনুভূতিতে আঘাত করা বা করতে পারে বা এ ধরনের তথ্যাদির মাধ্যমে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের বিরুদ্ধে উসকানি প্রদান করাসহ সবই ‘সাইবার অপরাধ’ বলে বিবেচিত হবে। অনলাইনে প্রকাশিত যে কোনো ছবি, খবর বা তথ্যটি সঠিক কি না বা এর সোর্স কি তা যাচাই করতে গুগলসহ বেশ কিছু সার্চ ইঞ্জিনের সাহায্য নিতে পারেন। এছাড়া বেশ কিছু সফটওয়্যার ব্যবহার করেও তথ্য যাচাই করতে পারেন। প্রথমেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো ছবি, ভিডিও বা তথ্য শেয়ার করতে সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। কোনো তথ্য, ছবি বা ভিডিও সঠিক কি না সেটা বুঝতে হলে শেয়ার করা তথ্যটি কে বা কারা শেয়ার করেছে সেদিক খেয়াল রাখতে হবে।

পরিচিত ও বিশ্বস্ত কোনো বন্ধু, অনলাইন সেলিব্রেটি অথবা কোনো পত্রিকা তথ্যের সূত্র কি তা জানতে হবে। এছাড়া, যে বা যারাই এই তথ্যগুলো শেয়ার করেছে তারা সেটা নিজে দেখেছে, নাকি অন্য কারো কাছ থেকে জেনেছে সেটা জানাও খুব জরুরি। যখন কোনো মুভমেন্ট তথ্য আন্দোলন বা কোনো সংকটকালীন পরিস্থিতি বিরাজ করে তখন কোনো তথ্য সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শেয়ার করার আগে বারবার ক্রস চেক করে নিশ্চিত হয়ে নেয়া উচিৎ। তারপরও যদি মনে হয়, সেই তথ্য শেয়ার করলে দেশ ও জাতির জন্য বিভ্রান্তিকর হতে পারে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে পারে সেক্ষেত্রে এমন তথ্য শেয়ার না করাই ভালো। আরেকটি বিষয়, কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে অবশ্যই একটু সময় নিতে হবে। এক থেকে চারঘন্টা পর্যন্ত অপেক্ষা করে তারপর শেয়ার করলে এই সময়ের মধ্যে ঐ তথ্য সঠিক নাকি গুজব সে সম্পর্কে একটি স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যায়। গুগলে ইমেজ সার্চ করেও ছবি সঠিক নাকি মিথ্যা তা জানা সম্ভব।

গুগলে ইমেজ সার্চ অপশনে যে সোর্স থেকে ইমেজগুলো এসেছে সেই সোর্সের লিংক অথবা ছবি গুগল ইমেজে ইনপুট দিলে ওই ছবির সাথে সম্পর্কিত ছবিগুলো দেখা যায়। তখন প্রকৃত ছবি কবে কোনো সাইটে বা অনলাইনে কোথায় আপলোড করা হয়েছে তা জানা যায়। ছবি বা তথ্যটি নতুন নাকি পুরানো, সঠিক নাকি ভুল এবং কতো তারিখের তাও জানা যায়। অনলাইন ব্যবহার করে কেউ কোনো অপরাধ করলে সংক্ষুব্ধ বা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান থানায় অভিযোগ করতে পারে। ওই অভিযোগের ভিত্তিতে অথবা পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের সোশ্যাল মিডিয়া মনিটরিং টিমের পর্যেবেক্ষণে যদি অপরাধ হয়েছে বলে যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকে তাহলে অপরাধীর বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ রয়েছে।

অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ও মিথ্যা তথ্য প্রচার রোধে মানুষকে সচেতন করে তুলতে ‘আসল চিনি’ নামে একটি ক্যাম্পেইন চালু করেছে সরকার। তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের ডিজিটাল সিকিউরিটি এজেন্সি (ডিএসএ) ও বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) এলআইসিটি প্রকল্প যৌথভাবে তিন মাসব্যাপী এ ক্যাম্পেইনে দেশের প্রায় ৭০ লাখ মানুষকে সচেতন করবে। বর্তমানে দেশে চারটি সাইবার নিরাপত্তা ইউনিট কাজ করছে। প্রতিমাসে প্রায় ৩ হাজারেরও বেশি সাইবার অপরাধের অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অভিযোগকারীদের সিংহভাগই নারী। তবে পুরুষ ভুক্তভোগীর সংখ্যাও কম নয়। সাইবার ইউনিটগুলো এ ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে দ্রুত তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

জনসচেতনার পাশাপাশি বর্তমান সরকার গুজব প্ররোধে কার্যকর পরিকল্পনা করে যাচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমসহ ইন্টারনেটভিত্তিক সকল ওয়েবসাইট ২৪ ঘণ্টার নজরদারিতে আনা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে একটি বিশেষ সেল গঠন করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। এই নজরদারির ফলে ভাইরাল হওয়া নেতিবাচক যেকোনো লিংক বা কনটেন্ট দ্রুত অপসরণ করার সুযোগ আছে। নবগঠিত সাইবার সিকিউরিটি সেলের মাধ্যমে ওয়েবসাইট এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সরকার ও রাষ্ট্রবিরোধীসহ বিভিন্ন রকম আপত্তিকর কনটেন্ট নজরদারিতে রাখার ব্যবস্হা করা হয়েছে। পাশাপাশি সামাজিক, রাজনৈতিক, পর্নোগ্রাফি, সাংস্কৃতিক কিংবা ধর্মীয় বিষয়ে উসকানিমূলক ও উগ্রবাদী কনটেন্টও সার্বক্ষণিক নজর রাখতে এ সেলকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বিটিআরসির তথ্যমতে, গত এক বছরে ১৮ হাজার ৮৩৬টি আপত্তিকর ফেসবুক লিংক বন্ধ করার অনুরোধের প্রেক্ষিতে চার হাজার ৮৮৮টি লিংক বন্ধ করা হয়েছে। ৪৩১টি ইউটিউব লিংক বন্ধ করার অনুরোধে ৬২টি ক্ষেত্রে ইউটিউব কর্তৃপক্ষ সাড়া দিয়েছে। গুজবের বিরুদ্ধে জনগণকে সচেতন করার লক্ষ্যে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীনস্ত তথ্য অধিদফতর, গণযোগাযোগ অধিদপ্তর, চলচিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ টেলিভিশন ও বাংলাদেশ বেতারে নিয়মিত সচেতনতামূলক প্রচার করে যাচ্ছে।

সোশ্যাল মিডিয়া বতর্মানে বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী মাধ্যম হয়ে উঠেছে। সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশের নানা সামাজিক প্রতিবাদে সোচ্চার কণ্ঠ হিসেবে এটি ব্যবহার হয়েছে। বেশির ভাগ ঘটনাতেই ইতিবাচক ভূমিকায় ব্যবহার করা হয়েছে। আবার অনেক সময়ই সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহার করে নানাভুল তথ্য, ছবি ও গুজব ছড়ানো হয়েছে। মতপ্রকাশের অধিকার আছে সবার। কিন্তু মতপ্রকাশের স্বাধীনতা মানে যা খুশি তা করা নয়। আইন মেনেই করতে হয়। অনলাইনে মতপ্রকাশের সময় এই দায়িত্ববোধ রয়েছে। সুতরাং ফেসবুক ব্যবহারে এমন সতকর্তা ও দায়িত্বশীল হতে হবে, যাতে একটি পোস্ট বা মন্তব্য যেন আইন লঙ্ঘন না করে। তাই সচেতন নাগরিক হিসেবে আমাদের সকলকে দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে সুনাগরিকের পরিচয় দিতে হবে। পিআইডি নিবন্ধ

লেখক : ফ্রিল্যান্সার
১১.২২.২০২১

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com