সোমবার, ২৯ নভেম্বর ২০২১, ০৯:৩৬ অপরাহ্ন

একটি সড়ক : অনেক স্বপ্নের হাতছানি

একটি সড়ক : অনেক স্বপ্নের হাতছানি

একটি সড়ক : অনেক স্বপ্নের হাতছানি

মুস্তাফা মাসুদ

মতিন সাহেব দীর্ঘ পঁয়ত্রিশ বছর পর সরকারি চাকরি থেকে অবসর নিয়েছেন। তার পোস্টিং ছিলো ঢাকাতেই। ভালো পোস্টে চাকরি করেছেন পুরোটা সময়, প্রথম শ্রেণির কর্মকর্তা হিসেবে। পাশাপাশি লেখালেখিও করেন পঞ্চাশের ঊর্ধ্বে প্রকাশিত বই আছে তার। তার স্ত্রী সরকারি ইশকুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক। দুই ছেলেমেয়েও জীবনে প্রতিষ্ঠিত মেয়ে উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তা আর ছেলে গ্রাফিক্স ডিজাইনার।

এমন গোছানো একজন লেখক মানুষ অবসর জীবন ঢাকায় কাটাবেন, বন্ধু এবং স্বজনদের এমনটাই ছিলো স্বাভাবিক প্রত্যাশা। কিন্তু হলো তার উল্টো। স্ত্রীকে নিয়ে তিনি গ্রামে সেটেল্ড হলেন। এতটা বছর ঢাকায় কাটানো একজন মানুষ রাতারাতি যেন পালটে গেলেন। তার গ্রামের পশ্চিম দিকে বিশাল বিল জলেশ্বর। বিলের স্বাধীন-শীতল হওয়া গ্রামকে ছুঁয়ে যায়, যার মায়াময় ছোঁয়া তিনি এবং তার স্ত্রী পান। এদিকে বছর দুয়েকের মধ্যেই তিনি গ্রামের বাড়িটাকে গাছগাছালি-পরিবেষ্টিত চমৎকার এক বাগানবাড়ি বানিয়ে ফেললেন! গ্রামের মধ্যেই এক ভিন্নতর পরিবেশ যেন! অনুভূতিও ভিন্নতর। কারণ, এখনকার গ্রাম তো আর সেই আগেকার প্যাককাদায় ভরা, মশা-ভনভন, বিদ্যুৎবিহীন, অন্ধকারের সঙ্গী জনপদ নয়; বিদ্যুতের আলোঝলমল ছোটো শহর যেন! এখন আর সন্ধে বা অন্ধকার রাতে শ্যাওড়া গাছে ওৎ পেতে থাকা ভূতের ভয়ে কেউ তটস্থ থাকে না; থাকার অবকাশই পায় না।

মতিন সাহেব সকাল-বিকাল গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ঘোরেন পায়ে হেঁটে। সত্তরোর্ধ্ব মানুষটি গ্রামে এসে যেন আরও তরতাজা হয়ে উঠেছেন। ‘ছায়াঘন শ্যাম নয়নাভিরাম’ গ্রামের পথঘাট যেন তাকে তীব্রভাবে আকর্ষণ করে। সেই আকর্ষণে তিনি বেরিয়ে পড়েন রাস্তায়। এতে স্বাস্থ্যরক্ষা ও গ্রাম দেখা, গ্রামের রাস্তাঘাট দেখা উভয় উদ্দেশ্যই সফল হয়। সেইসাথে আরেকটি বাড়তি লাভ নতুন নতুন মানুষ দেখা, তাদের সাথে পরিচিত হওয়া। হাঁটতে হাঁটতে তিনি শালবরাট, ভাতুড়ে, নলডাঙ্গা, রায়পুর, শেখেরবাথান, সাদুল্লাপুর এমনকি ধূপখালি পর্যন্ত চলে যান আর গ্রামীণ জনপদে সরকারের পরিকল্পিত যোগাযোগ নেটওয়ার্ক দেখে বিস্মিত ও পুলকিত হন। প্রত্যন্ত গ্রামের মধ্য দিয়ে এঁকেবেঁকে চলা পিচের রাস্তা এযে স্বপ্নেরও অধিক তার কাছে! একী তার শৈশব-কৈশোরের প্যাককাদাভরা সেইসব কাঁচাপথ বর্ষাকালে যেখানে খালিপায়ে হাঁটাও ছিল অশেষ কষ্টের, ভোগান্তির! আজ গাছগাছালির নিবিড় ছায়ারণ্য ভেদ করে পাকারাস্তার ওপর দিয়ে এদিকওদিকে ছুটছে ভ্যানগাড়ি, মোটর সাইকেল, ইজিবাইক, সিএনজি, প্রাইভেট কার, মাইক্রো, জিপ, পিক আপ এসব। গোরুটানা গাড়ি তো এখন দেখাই যায় না না রাস্তায়, না মাঠে, খেতখামারে।

যোগাযোগব্যবস্থার এমন বৈপ্লবিক অগ্রগতি দেখে মতিন সাহেবের মন এমনিতেই ভারি খুশি আর ফুরফুরে, তার মাঝে হঠাৎ একদিন তিনি অধিকতর বিস্ময় ও আনন্দভরা চোখে দেখলেন তাদের বাড়ির পার্শ্ববর্তী বাঘারপাড়া-রায়পুর-খাজুরা-কালিগঞ্জ রাস্তাটির ব্যাপকভিত্তিক সম্প্রসারণ ও উন্নয়নের কাজ শুরু হয়েছে। আগেও রাস্তাটি ছিলো পিচঢালা, কিন্তু ততটা প্রশস্ত ছিলো না, গ্রামীণ রাস্তা সাধারণত যেমন হয় আর কী! দেখতে দেখতে শুরু হয়ে গেল স্বপ্ন নির্মাণের কর্মযজ্ঞ। কালিগঞ্জ থেকে বাঘারপাড়া উপজেলা সদর পর্যন্ত ৩৮ কিলোমিটার রাস্তাটি একটি মেগাপ্রকল্প হিসেবে যাত্রা শুরু করল এবং প্রশংসনীয় দ্রুততায় নির্মাণকাজ এগিয়ে চলল। অবশেষে কাজও সমাপ্ত হলো একদিন। মতিন সাহেব এবং অন্যদের বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিলো যে, এই নিভৃত পাড়াগাঁয়ের মধ্যে নির্মিত হয়েছে রীতিমতো সুপ্রশস্ত এক পেল্লাই হাইওয়ে! যশোর-ঢাকা বা যশোর-খুলনা-সাতক্ষীরা রোডের মতো এমন প্রশস্ত আর দৃষ্টিনন্দন রাস্তা নির্মাণের জন্য অত্র এলাকার জনগণ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে কৃতজ্ঞ; প্রকাশ্যে শতমুখে তাঁর প্রশংসা করছেন অত্র এলাকার জনগণ। এভাবেই তিনি গ্রাম-শহর, গ্রামীণ সড়ক আর মহাসড়কের ব্যবধান একদিন ঘুচিয়ে দেবেন বলে মতিন সাহেবের মতো অন্যদেরও বিশ্বাস। তাদের আরও বিশ্বাস যে নেত্রী পদ্মা সেতুর মতো এতবড়ো একটা মহাপ্রকল্প বাস্তবায়ন করতে পারেন বিদেশি বড়ো বড়ো শক্তির সমর্থন ও অর্থসাহায্য ছাড়াই; অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক কোনো ষড়যন্ত্র আর চালবাজি যাকে নিজ সংকল্প থেকে একচুল ও টলাতে পারে না, সেই নেত্রী বঙ্গবন্ধু-কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনার হাতে দেশের অভ্যন্তরীণ বিস্তৃত যোগাযোগ অবকাঠামোর সর্বাত্বক উন্নয়ন যে শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র একথা মতিন সাহেবসহ সবাই দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন। বঙ্গবন্ধুর দ্বিতীয়

বিপ্লবের আদর্শেই যে গ্রামীণ যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নের এই সুদূরপ্রসারী উদ্যোগ, তা বুঝতে কষ্ট হয় না মতি

সাহেবের। কারণ, গ্রামীণ রাস্তাঘাটের উন্নয়ন হলে কৃষকদের উৎপাদিত পণ্যের উন্নততর বিপণন সহজ হয়, মানুষের যাতায়াতও হয় সহজ ও আরামদায়ক; সেইসাথে গ্রামীণ জীবনে মান্ধাতা আমলের পশ্চাৎপদতার পরিবর্তে নতুনতর-উন্নততর সম্ভাবনার স্পর্শ লাগে; আধুনিকতা ও প্রগতির মহাসরণিতে শামিল হওয়ার পথ সুগম হয় তাদের জন্য।

কালিগঞ্জ,খাজুরা,রায়পুর ও বাঘারপাড়া সড়কটি মতিন সাহেবের কাছে এক বিশাল সম্ভাবনা ও প্রত্যাশার প্রতীক। সড়কটি অবকাঠামোগতভাবে যতটা না বড়ো, সম্ভাবনা ও উপযোগিতার বিচারে তার চেয়ে আরও অনেক অনেক বড়ো এবং গুরুত্ববাহী। এই সড়কের কালিগঞ্জ পয়েন্টের সাথে ঝিনাইদহ সদরসহ হরিণাকুন্ডু, কোটচাঁদপুর ও সীমান্তঘেঁষা উপজেলা মহেশপুরের সরাসরি সংযোগ যেমন স্থাপিত হয়েছে, তেমনিভাবে চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, কুষ্টিয়ার যোগাযোগও স্থাপিত হয়েছে। স্বপ্নের পদ্মা সেতু চালু হলে এসব অঞ্চলের বাস, ট্রাকসহ অন্যান্য যানবাহন ঝিনাইদহ হয়ে কালিগঞ্জ আসতে পারবে এবং সেখান থেকে খাজুরা,রায়পুর,বাঘারপাড়া,চাঁড়াভিটা,নড়াইল,কালনা,মুকসুদপুরভাঙ্গা হয়ে সরাসরি পদ্মা সেতুতে উঠতে পারবে। তারপর? তারপর ঢাকা তো মাত্র ঘণ্টাখানেকের রাস্তা।

মতিন সাহেব বিস্মিত হন পদ্মা সেতুকে সামনে রেখে কালিগঞ্জ, খাজুরা, রায়পুর ও বাঘারপাড়া রুটের এই সুপ্রশস্ত সড়কটি নির্মাণে সরকারের বাস্তবমুখী দূরদর্শিতা দেখে। মাত্র আটত্রিশ কিলোমিটারের একটি রাস্তা আর্থসামাজিক ও অন্যান্য ক্ষেত্রে যে বিশাল সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত করে দিল, তা পুরোপুরি প্রত্যক্ষ করা যাবে আরও কিছুদিন পরে পদ্মা সেতু যানবাহন চলাচলের জন্য উন্মুক্ত হলে। তখন কালিগঞ্জ, কোটচাঁদপুর, মহেশপুর, ঝিনাইদহ সদর, হরিণাকুণ্ডুসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন এলাকার টাটকা শাকসবজি এবং অন্যান্য পণ্য দ্রুততম সময়ে রাজধানীর বাজারে পৌঁছে যাবে। কুষ্টিয়া,মেহেরপুর,চুয়াডাঙ্গাসহ অত্র এলাকার হাজার হাজার মানুষের ঢাকায় যাতায়াতও যে সহজ, দ্রুততর, ননস্টপ এবং ফেরি পারাপারের ভোগান্তিমুক্ত হবে, তা তো আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

অবশ্য কিছু তৎপরতা এখনই শুরু হয়ে গেছে, যা দেখে মতিন সাহেবের বড়ো ভালো লাগে। সুপশস্ত এই রাস্তায় এখন বিশাল বিশাল পণ্যবোঝাই ট্রাক রাস্তা কাঁপিয়ে চলাচল করছে, যেমনটি আগে কখনও দেখা যায়নি। বাঘারপাড়ার দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় এলাকার বিভিন্ন মোকাম, আড়ত এবং শিল্পকারখানার পণ্যাদি পরিবহনকারী ট্রাকগুলো এই রাস্তা দিয়ে উত্তরাঞ্চলীয় জেলাগুলোয় সহজে যেতে পারছে, যশোর শহর ঘুরে যেতে হচ্ছে না এখন। কখনো কখনো দৌলতদিয়া, পাটুরিয়া হয়ে ঢাকাগামী এই অঞ্চলের পণ্যবাহী ট্রাকগুলোও এ রাস্তা দিয়ে সোজা খাজুরা এবং সেখান থেকে মাগুরা ও ফরিদপুর হয়ে ফেরিঘাটে পৌঁছাতে পারছে আরো কম সময়ে।

বাঘারপাড়া,রায়পুর,খাজুরা ও কালিগঞ্জ রাস্তাটি তাই নিছক একটি আঞ্চলিক রাস্তা বা তথাকথিত ভৌত অবকাঠামো নয় মতিন সাহেবের কাছে; এ যেন শত সম্ভাবনার এক বহুমুখী উৎস অনেক স্বপ্নের প্রিয় ঠিকানা; একটি সড়ক যেন অনেক অধরা-অছোঁয়া স্বপ্নের হাতছানি! প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চলমান উন্নয়নের ধারায় এক গর্বিত মাইলফলক। পদ্মা সেতু চালু হলে এই রাস্তায় যে ব্যস্ততার মহাআয়োজন শুরু হবে; এতদঞ্চলের আর্থসামাজিক ক্ষেত্রে যে অভাবনীয় অনুকূল পরিবর্তন সূচিত হবে, তা যেন মনের চোখে এখনই দেখতে পাচ্ছেন মতিন সাহেব! অজান্তেই আনন্দাশ্রু গড়িয়ে পড়ে তার দুই গাল বেয়ে। পিআইডি নিবন্ধ
১৬.১১.২০২১

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com