শনিবার, ০২ Jul ২০২২, ০৮:০৩ পূর্বাহ্ন

উদারমনা মুসলিম চিন্তাবিদ কাজী আবদুল ওদুদ

উদারমনা মুসলিম চিন্তাবিদ কাজী আবদুল ওদুদ

গুণীজন

এই ধীমান ব্যক্তিত্ব ১৯৭০ সালের ১৯ মে কলকাতায় ইন্তিকাল করেন

সাদ বিন ওয়াহেদ
———————-
কাজী আবদুল ওদুদ। একজন উদারমনা মুসলিম চিন্তাবিদ। তিনি একাধারে প্রাবন্ধিক, সমালোচক, নাট্যকার, জীবনীকার ও অভিধানকার ছিলেন। ১৮৯৪ সালের ২৬ এপ্রিল (শুক্রবার) তৎকালীন নদীয়া বর্তমান কুষ্টিয়া জেলার জগন্নাথপুর গ্রামে মাতুলালয়ে জন্মগ্রহণ করেন। মতান্তরে তৎকালীন ফরিদপুর জেলার (বর্তমান রাজবাড়ী জেলার) পাংশা উপজেলার বাগমারা গ্রামে নিজ পৈত্রিক বাড়িতে জন্ম তার। নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান হয়েও স্বীয় সাধনা বলে কালোত্তীর্ণ এক ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন তিনি।

তার সম্পর্কে অন্নদাশঙ্কর রায়ের অসামান্য মূল্যায়ন, ‘কাজী আবদুল ওদুদ ছিলেন জাতিতে ভারতীয়, ভাষায় বাঙালি, ধর্মে মুসলমান, জীবন দর্শনে মানবিকবাদী, মতবাদে রামমোহনপন্থী, রাজনীতিতে গান্ধী ও নেহরুপন্থী, অর্থনৈতিক শ্রেণি বিচারে মধ্যবিত্ত ভদ্রলোক, সামাজিক ধ্যানধারণায় ভিক্টোরিয়ান লিবারেল। কোনও চরমপন্থায় তার বিশ্বাস ছিল না।’

ওদুদের বাবা কাজী সৈয়দ হোসেন প্রাথমিক বিদ্যালয় পর্যন্ত পড়ে কলকাতা রেলওয়েতে সাধারণ চাকরির মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করে হাওড়া স্টেশন মাস্টার হিসেবে শেষ করেন। মা খোদেজা খাতুন ছিলেন গৃহিনী। আবদুল ওদুদের নানা পাচু মোল্লা ছিলেন প্রভাবশালী ব্যক্তি, জোতদার। মাতৃ পরিবারের কাছ থেকে অনুপ্রাণিত আবদুল ওদুদ ছোটবেলা থেকে শিক্ষা সাহিত্যের প্রতি প্রবলভাবে আগ্রহী ছিলেন।

কাজী ওদুদ ঢাকা কলেজিয়েট স্কুল থেকে ১৯১৩ সালে মাসিক দশ টাকা বৃত্তি ও রৌপ্যপদকসহ ম্যাট্রিকুলেশন পাশ করেন। তারপর তিনি ১৯১৫ ও ১৯১৭ সালে যথাক্রমে আইএ এবং বিএ পাশ করেন কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে। ১৯১৯ সালে রাজনৈতিক অর্থনীতিতে এমএ পাশ করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে।

১৯২৬ সালে তিনি ঢাকা মুসলিম সাহিত্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতা এবং তিনি অজ্ঞতা থেকে বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন কিছু তরুণ লেখকের সঙ্গে। কাজী ওদুদের সংবাদপত্র ‘শিখা’ আন্দোলনের বেগ বৃদ্ধি করতে সাহায্য করেছিল। ‘শিখা’ হয়ে ওঠে সাহিত্য-সমাজের মুখপত্র।

১৯২০ সালে তিনি ঢাকা ইন্টারমিডিয়েট কলেজে (বর্তমানে ঢাকা কলেজ) প্রভাষকের পদে যোগদান করেন এবং ১৯৪০ সালের এপ্রিল মাস পর্যন্ত এ কলেজে অধ্যাপনা করেন। ১৯৪০ সালে বাংলা সরকার প্রাদেশিক টেক্সটবুক কমিটির সেক্রেটারি ও রীডারের পদ সৃষ্টি করলে তিনি উক্ত পদে নিয়োগ লাভ করে কলকাতায় শিক্ষাদপ্তরে যোগদান করেন। ১৯৪৭ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকার উক্ত পদের সঙ্গে রেজিস্টার অব পাবলিকেশন্স পদটি যুক্ত করে। কাজী আবদুল ওদুদ এ গুরুত্বপূর্ণ পদে এগারো বছর কর্মরত থাকার পর ১৯৫১ সালের জুলাই মাসে অবসর গ্রহণ করেন।

১৯৫৩ সালে প্রকাশিত হয় কাজী আবদুল ওদুদ সম্পাদিত ও সংকলিত ‘ব্যবহারিক শব্দকোষ’। আধুনিক বাংলা ভাষার একটি জনপ্রিয় অভিধান সংকলনে তার ভাষা সচেতন মনের পরিচয় মেলে এখানে। অভিধানটির বিশেষত্ব হলো, এতে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে আরবি, ফার্সি ও তুর্কি শব্দের প্রতিবর্ণীকরণের প্রয়াস আছে এবং বাঙালি মুসলমান সমাজে প্রচলিত শব্দসমূহ অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা হয়েছে।

১৯১৮ সালে ছাত্রাবস্থায় তার প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। ‘মীর পরিবার’ নামের গল্পগ্রন্থ প্রকাশের পর তৎকালীন সাহিত্য সমাজের দৃষ্টি কাড়েন আবদুল ওদুদ। এর পরের বছরই প্রকাশ করেন উপন্যাস ‘নদীবক্ষে’। ‘মোহাম্মদ ও ইসলাম (১৯৬৬)’ তার পরিণত বয়সের রচনা। তিনি এ গ্রন্থে বিশ্ব মানবতার মুক্তির দূত, ইসলামের সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হযরত মোহাম্মদ (সা.)-কে ঐতিহাসিক এক সঙ্কটকালের মহৎ পুরুষ হিসেবে উপস্থাপন করেন।

কাজী আবদুল ওদুদের অন্যান্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে, প্রবন্ধ ও সাহিত্যসমালোচনা: নবপর্যায় (১ম খন্ড ১৩৩৩, ২য় খন্ড ১৩৩৬), সমাজ ও সাহিত্য (১৩৪১), হিন্দু-মুসলমানের বিরোধ (১৩৪২), Fundamentals of Islam (১৩৫৭), State and Literature (১৩৬৪), TagoreÕs Role in the Reconstruction of Indian Thought (১৩৬৮), আজকার কথা (১৩৪৮), স্বাধীনতা দিনের উপহার (১৩৫৮), রবীন্দ্রকাব্য পাঠ (১৩৩৪), নজরুল-প্রতিভা (১৩৫৬), শরৎচন্দ্র ও তারপর (১৩৬৮); জীবনীগ্রন্থ: অনুবাদ গ্রন্থ: Creative Bengal(১৩৫৭), পবিত্র কোরআন (১ম ভাগ ১৩৭৩, ২য় ভাগ ১৩৭৪)। এ ছাড়া রয়েছে কাজী আবদুল ওদুদ রচনাবলী (১ম খন্ড ১৯৮৮, ২য় খন্ড ১৯৯০, ৩য় খন্ড ১৯৯২, ৪র্থ খন্ড ১৯৯৩, ৫ম খন্ড ১৯৯৪ ও ৬ষ্ঠ খন্ড ১৯৯৫) এবং কাজী আবদুল ওদুদের পত্রাবলী (১৯৯৯)।

কাজী আবদুল ওদুদের সম্পাদনায় কলকাতা থেকে সংকল্প (১৩৬১) ও তরুণপত্র (১৩৭২) নামে দুটি সাময়িক পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি ছিলেন প্রথমটির সম্পাদক এবং দ্বিতীয়টির সম্পাদকমন্ডলীর সভাপতি। কলকাতায় সেই সময় তার সঙ্গে কাজী নজরুল ইসলাম, আবুল হুসেন, মোজাফফর আহমেদ, পবিত্র গঙ্গোপাধ্যায়, শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়, মোহিতলাল মজুমদার, প্রেমাঙ্কুর আতর্থী, হেমেন্দ্রকুমার রায়, গোলাম মোস্তফা, ড. মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ, কাজী মোতাহার হোসেন প্রমুখের ঘনিষ্ঠ সাহচর্য গড়ে ওঠে। সাহিত্য রচনায় প্রশংসা কুড়িয়েছেন খোদ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎ চন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ও শশাঙ্ক মোহন সেনের।

ব্যক্তিজীবনে ১৯১৬ সালে কাজী আবদুল ওদুদ তার চাচার বড় মেয়ে জামিলা খাতুনকে বিয়ে করেন। ১৯৫৪ সালে স্ত্রী জমিলা খাতুনের মৃত্যু হয়। এরপর একা জীবনে তিনি শুধু লেখালেখি আর বক্তৃতা দিয়ে কাটিয়েছেন। ১৯৫৬ সালে বিশ্বভারতীতে ‘বাংলার জাগরণ’ সম্পর্কে এবং ১৯৫৭ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘শরৎ স্মৃতি বক্তৃতামালা’ দান করেন। জীবনের শেষ মুহূর্তে ‘শিশির কুমার পুরস্কার’ অর্জন করেন। এর অল্প কিছুদিন পর ১৯৭০ সালের ১৯ মে এই ধীমান ব্যক্তিত্ব কলকাতায় ইন্তিকাল করেন।

(তথ্যসূত্র : বাংলাপিডিয়া; কাজী আবদুল ওদুদ, ‘আমার জীবন কথা (আত্মজীবনী)’; ড. শাহিন আফজাল, ‘কাজী আবদুল ওদুদ : সমাজ চেতনা’, প্রথম প্রকাশ – একুশে বইমেলা ২০০৫।)

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com