শনিবার, ০২ Jul ২০২২, ০৮:১৮ পূর্বাহ্ন

আধুনিক ছাপচিত্রের জনক সফিউদ্দীন আহমেদ

আধুনিক ছাপচিত্রের জনক সফিউদ্দীন আহমেদ

গুণীজন

শিল্পগুরু ২০১২ সালের ২০ মে’র সূচনা প্রান্তিকে রাত ১২টা ২০ মিনিটে রাজধানীর বেসরকারি স্কয়ার হাসপাতালে ইন্তিকাল করেন

সাদ বিন ওয়াহেদ
——————-
সফিউদ্দিন আহমেদ। বাংলাদেশের একজন কিংবদন্তী চিত্রশিল্পী। ‘শিল্পগুরু’ হিসেবে সমধিক পরিচিত। তাকে বাংলাদেশের আধুনিক ছাপচিত্রের জনক বলা হয়। তবে ছাপচিত্রের পাশাপাশি তিনি জল রং এবং তেল রংয়ের কাজেও দক্ষতা দেখিয়েছেন। তিনি সুদীর্ঘ সাত দশকের বেশি সময় ধরে শিল্পচর্চায় দেশের চারুকলার জগৎকে সমৃদ্ধ করেছেন।

সফিউদ্দিন ১৯২২ সালের ২৩ জুন ব্রিটিশ ভারতের কলকাতায় জন্ম নেন। ১৯৩৬ সালে কলকাতা আর্ট স্কুলে ভর্তি হন এবং ১৯৪২ সালে এখান থেকে চারুকলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাজ্যের সেন্ট্রাল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটস্ থেকে এচিং ও এনগ্রেভিংয় বিষয়ে ডিপ্লোমা ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৪৭ সালে দেশ ভাগের পর কলকাতা থেকে ঢাকায় ধানমন্ডিতে চলে আসেন।

দেশে-বিদেশে বহু দলবদ্ধ প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করেন ১৯৫৮ সালে থেকে। বিশ শতকের চল্লিশের দশকে কলকাতার আর্ট কলেজে পড়ার সময়ে তিনি দক্ষতা অর্জন করেন ছাপচিত্রে। তার কিছু অসাধারণ কাজের মাধ্যমে তিনি ভারতের কলা-রসিকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এ দেশের শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী, হাশেম খান, আবুল বারক আলভী, ফরিদা জামান, আবুল খায়ের, সুবীর চৌধুরী প্রমুখ সফিউদ্দিন আহমেদের কাজের মাধ্যমে অনুপ্রাণিত হয়েছেন।

দুই বাংলার রঙ তার কাছে ছিল ভিন্ন। তাই পশ্চিম বাংলার প্রকৃতির ধূসরতা এবং বাংলাদেশে নীলাভ সবুজের ছড়াছড়িকে মিশিয়ে নিয়েছেন। প্রাথমিকভাবে তার কাজে পরিস্ফুটিত হয় লোকশিল্পের বৈশিষ্ট্য। কালো রঙের প্রতি দুর্বলতা ছিলো তার। তাই কালো রঙের অনুশীলনের জন্যে ত্রিশ-চল্লিশের দশকেই শিয়ালদা স্টেশনে গেছেন রাতের বেলার কালো রঙ দেখতে। যুক্তরাজ্যে তিনি কালোর বৈচিত্র্যপূর্ণ ব্যবহার করেন এচিং-অ্যাকুয়াটিন্ট মাধ্যমে। নব্বইয়ের দশকে তিন বছরের মতো সময়ে তিনি নিরবচ্ছিন্নভাবে রেখাচিত্র আঁকেন যা ‘ব্ল্যাক সিরিজ’ বা ‘কালো চিত্রমালা’ নামে পরিচিত।

তার শিল্পকর্মে ১৯৫২ বাংলা ভাষা আন্দোলন এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ছবি মূর্ত হয়ে উঠেছে বিভিন্ন মাধ্যমে রচনার মাধ্যমে। তার কলকাতায় আঁকা ছবিতে এসেছে মহানগরের বস্তিজীবন, বিহারের বিভিন্ন অঞ্চলের নিসর্গ, দুমকার প্রকৃতি ও সাঁওতাল-জীবন এবং ঢাকায় আঁকা ছবিতে বিষয়বস্তু হিসেবে এসেছে বন্যা, জাল, মাছ, নৌকা, ঝড় প্রভৃতি প্রাকৃতিক উপাদানের পাশাপাশি নানা শ্রমজীবী মানুষ।

তিনি যশস্বী শিল্পী জয়নুল আবেদীনের সাথে ও অন্যান্য শিল্পীরা মিলে একসঙ্গে ঢাকা আর্ট কলেজ প্রতিষ্ঠায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন, যা বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে থাকা চারুকলা ইনস্টিটিউট নামে পরিচিত।

প্রায় ৮৯ বছরের কর্মোজ্জ্বল জীবনে তিনি ১৯৪৫ সালে কলকাতা একাডেমি অব ফাইন আর্ট প্রদত্ত ‘একাডেমি প্রেসিডেন্ট পদক’ লাভ করেন। এছাড়াও তিনি অর্জন করেন ভারতের পার্টনার শিল্পকলা পরিষদের দেয়া ‘দ্বারভাঙ্গা মহারাজার স্বর্ণপদক (১৯৪৭ সাল)’, পাকিস্তান সরকারের দেয়া ‘প্রেসিডেন্ট পদক (১৯৬৩)’, বাংলাদেশ সরকারের দেয়া ‘একুশে পদক (১৯৭৮)’ এবং ‘স্বাধীনতা পুরস্কার’ (১৯৯৬)। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা ইনস্টিটিউটে ছাপচিত্র বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন ১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৭৯ সাল পর্যন্ত।

২০০৮ সালে ২৩ জুন প্রচারবিমুখ এই গুণী শিল্পীর প্রথম একক প্রদর্শনী ‘রেখার অশেষ আলো’ অনুষ্ঠিত হয় বাংলাদেশে যা উদ্বোধন করেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক প্রধান উপদেষ্টা বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান। শিল্পীর ছাত্র শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরী বলেন, ‘তার চিত্রকর্ম সম্পর্কে আমার বলার কিছু নেই, ধৃষ্টতাও নেই। তার চিত্রকর্মের যে বিশালতা, বলিষ্ঠতা ও ব্যাপকতা এবং ড্রইংয়ে রংয়ের প্রলেপ, যেভাবে লাইন টেনেছেন তা শুধু অনুধাবন করার বিষয়।’

শিল্পগুরু সফিউদ্দীন ২০১২ সালের ২০ মে’র সূচনা প্রান্তিকে রাত ১২টা ২০ মিনিটে রাজধানীর বেসরকারি স্কয়ার হাসপাতালে ইন্তিকাল করেন। বার্ধক্যজনিত কারণে মারা যান শিল্পী সফিউদ্দীন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মসজিদের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন এই মহান শিল্পী।

(তথ্যসূত্র : সৈয়দ আজিজুল হক – ‘অশেষ আলোর আধার’, দৈনিক প্রথম আলো, ১ মার্চ ২০১৪; ‘ছাপচিত্রের স্রষ্টা সফিউদ্দীন আহমেদ’, বিডিনিউজ২৪.কম, ১৯ মে ২০১৪)

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com