শনিবার, ০২ Jul ২০২২, ০৮:০৬ পূর্বাহ্ন

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক ইবনে সিনা

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক ইবনে সিনা

গুণীজন

আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক ইবনে সিনা প্রাতঃস্মরণীয় এই মুসলিম মনীষা ১০৩৭ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুন মাত্র ৫৮ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন

সাদ বিন ওয়াহেদ

মুসলিম স্বর্ণযুগের এক উজ্জ্বল নক্ষত্র এবং ইতিহাসের নায়ক তিনি। তার পারদর্শিতা ছিল সর্ববিদ্যায়। জ্ঞান-বিজ্ঞানের এমন কোনো ক্ষেত্র নেই, যেখানে তিনি বিচরণ করেননি। মধ্যযুগের জ্ঞান বিজ্ঞানের ভিত্তি স্থাপনে তার অবদান অপরিসীম। তবে চিকিৎসা শাস্ত্রে তার অবদান সবচেয়ে বেশি। তাই তাকে ‘আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের জনক’ গণ্য করা হয়। কেবল একজন চিকিৎসক-ই ছিলেন না, তিনি একজন গণিতজ্ঞ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং দার্শনিকও বটে!

অসাধারন প্রতিভাধর এই ব্যক্তিটি আর কেউ নন, তিনি ইবনে সিনা। পৃথিবীর সেরা জ্ঞানী ব্যক্তিদের অন্যতম এ মানুষটির নাম শোনেনি এমন কাউকে খুঁজে পাওয়া ভার। আরবরা তাকে অ্যাখ্যায়িত করেছে ‘আল-শায়খ আল-রাঈস’ তথা ‘জ্ঞানীকুল শিরোমণি’ হিসেবে। আর পাশ্চাত্যে তিনি ‘আভিসেনা’ নামেই অধিক পরিচিত এ পারসিক বহুবিদ্যাবিশারদ।

তার পুরো নাম আবু আলী হোসাইন ইবনে আব্দুল্লাহ আল হাসান ইবনে আলী ইবনে সিনা। সাধারণত তিনি ‘ইবনে সিনা’ নামেই পরিচিত। ইবনে সিনা নামের অর্থ সিনার পুত্র হলেও, তার পিতা ছিলেন আবদুল্লাহ এবং মা ছিলেন সিতারা বিবি। ইবনে সিনার পিতা বুখারার সামানীয় সম্রাটের অধীনে একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন।

ইবনে সিনার জন্ম ৯৮০ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে (মতান্তরে আগস্ট) সামানি সা¤্রাজ্যের বুখারার অন্তর্গত খার্মাতায়েন জেলার আফসানা গ্রামে, যা বর্তমানে উজবেকিস্তানে অবস্থিত। তার মাতৃভাষা ছিল ফার্সি। ফার্সি ভাষায় তিনি বেশ কিছু কবিতা ও গ্রন্থ রচনা করেন। তবে সমকালীন অন্যান্যদের মতো তিনিও আরবি ভাষাকে জ্ঞান প্রকাশের মূল বাহন হিসেবে গ্রহণ করেন।

শিক্ষা ক্ষেত্রে ইবনে সিনা প্রথম থেকেই ছিলেন তুখোড় মেধাবী। মাত্র দশ বছর বয়সেই তিনি কুরআনের হাফেজ হন। এছাড়াও তার চিন্তাভাবনা ছিল সূক্ষ ও জটিল বিষয় নিয়ে। ইবনে সিনার প্রতিভা দেখে তার পিতা তাকে পড়ানোর জন্য তিন জন গৃহশিক্ষকের ব্যবস্থা করেন। তাদের মধ্যে ইসমাইল সূফী তাকে শিক্ষা দেন ধর্মতত্ত্ব, ফিকাহ শাস্ত্র আর তাফসীর বিষয়ে। সেই সময়ে ভারতীয় গণিত শাস্ত্রে বিশেষ পারদর্শী ছিলেন মাহমুদ মসসাহ। তার কাছে ইবনে সিনা গণিত শাস্ত্রের উপর শিক্ষা অর্জন করেন। এরপর তিনি অধ্যয়ন করেন ইসমাইলী শাস্ত্রের আইন অধ্যায়। এতেও তিনি সমান দক্ষ হয়ে ওঠেন।

তৎকালে আরেকজন জ্ঞানী ব্যক্তি ছিলেন আল নাতেলী। ইবনে সিনা তার কাছে ফিকহ শাস্ত্র, ন্যায়শাস্ত্র, জ্যামিতি এবং জ্যোতিষ শাস্ত্র বিষয়ে শিক্ষা নেন। কিন্তু তার প্রতিভা ও জানার আগ্রহের কাছে আল নাতেলীর মত জ্ঞানী ব্যক্তিও হার মানেন। একসময় আল নাতেলীর কাছে এমন কোনো জ্ঞান আর অবশিষ্ট ছিল না, যা তিনি ইবনে সিনাকে শিক্ষা দিতে পারেন। তাই তিনি ইবনে সিনাকে নিজে স্বাধীন মত গবেষণা করার কথা বলেন।

ইবনে সিনা ছিলেন একজন জ্ঞানসাধক। জ্ঞান সাধনার মধ্যেই ছিল তার মনোনিবেশ। তাই তো ইউক্লিড ও টলেমির মত বিজ্ঞানীর লেখাও পড়ে ফেলেন তিনি। এরপর পড়তে শুরু করেন এরিস্টটলের মেটাফিজিক্স। একই সাথে এরিস্টটলের দর্শন শাস্ত্রও সম্পূর্ণ ধাতস্থ করে ফেলেন। কোনো বিষয় বুঝতে না পারলে কিংবা জটিল কোনো বিষয়ে সমস্যার সম্মুখীন হলে তিনি মসজিদে গিয়ে নফল নামাজ আদায় করতেন। যতক্ষণ না সমস্যার সমাধান পেতেন।

১৬ বছর বয়স থেকে ডাক্তার হওয়ার নেশা জাগে তার। ১৮ বছর বয়সেই তিনি পুরোদমে ডাক্তার হয়ে যান। তার খ্যাতি দুর-দুরান্তে ছড়িয়ে পড়তে থাকে। মাত্র ১৯ বছর বয়সে ইবনে সিনা বিজ্ঞান, দর্শন, ইতিহাস, অর্থনীতি, রাজনীতি, গণিতশাস্ত্র, জ্যামিতি, ন্যায়শাস্ত্র, চিকিৎসা শাস্ত্র, কাব্য, সাহিত্য প্রভৃতি বিষয়ে অসীম জ্ঞানের অধিকারী হন। জীবনে অনেক দেশ ভ্রমণ করেন ইবনে সিনা, সেই সাথে অর্জন করেন প্রচুর অভিজ্ঞতা।

মাত্র ২১ বছর বয়সে ইবনে সিনা ‘আল মুজমেয়া’ নামক একটি বিশ্বকোষ রচনা করেন, যার মধ্যে গণিত শাস্ত্র ব্যতীত প্রায় সকল বিষয়াদি তিনি লিপিবদ্ধ করেন। চিকিৎসা বিষয়ে তার অমর গ্রন্থ ‘আল কানুন ফিত-তিব’। আল কানুন ৫ খন্ডে বিভক্ত। যা উনিশ শতক পর্যন্ত প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় ও মেডিকেল প্রতিষ্ঠানসমূহে পড়ানো হত। এখনো ইউনানী চিকিৎসায় এই বইয়ের অবদান অপরিসীম। ইবনে সিনা হলিস্টিক মেডিসিনের প্রণেতা। তিনিই মানুষের চোখের সঠিক এনাটমির বর্ণনা দেন। মেনিনজাইটিস রোগও প্রথম তিনি শনাক্ত করেন।

ইবনে সিনার আরেকটি বিখ্যাত রচনা ‘কিতাব আল-শিফা’, যা একটি দার্শনিক গ্রন্থ। এটি ২০ খন্ডে বিভক্ত। ইবনে সিনার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ গ্রন্থ হল ‘কিতাব আল ইশারাত’। তার অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ‘আরযুযা ফিত-তিব’, ‘লিসানুল আরব’, ‘আলমজনু’, ‘আল মুবাদাঊন মায়াদা’, ‘মা দুনিয়াত (খনিজ পদার্থসমূহ)’, ‘ট্রিটিজ অব মিনারেলস’ ইত্যাদি। ধারণা করা হয় তিনি ৪৫০টি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন, যার মধ্যে ১৫০টি দর্শনশাস্ত্র বিষয়ক এবং ৪০টি চিকিৎসা বিজ্ঞান বিষয়ক রচনাসহ মোট ২৪০টি গ্রন্থ বর্তমানে টিকে রয়েছে।

ইবনে সিনা ছিলেন স্বাধীনচেতা ও আত্মমর্যাদা সচেতন ব্যক্তি।তিনি ছিলেন একজন জ্ঞানপিপাসু এবং ধী-সম্পন্ন ব্যক্তি। জীবনের নানা উত্থান পতনের মধ্যেও তিনি কখনো জ্ঞানচর্চা করা ছাড়েননি।

রাজরোষের শিকার হয়ে অধুনা ইরানের হামাদানে এক যুদ্ধ শিবিরে অবস্থান কালে তিনি তলপেটের ব্যাথায় কাবু হয়ে পড়েন। এই রোগেই ইবনে সিনা ১০৩৭ খ্রিস্টাব্দের ২২ জুন (৪২৮ হিজরি), মাত্র ৫৮ বছর বয়সে ইন্তিকাল করেন। প্রাতঃস্মরণীয় এই মুসলিম মনীষা হামাদানেই চিরনিদ্রায় শায়িত রয়েছেন ।

(তথ্যসূত্র : এনসাইক্লোপিডিয়া অব ইসলাম, ভলিউম-১, পৃষ্ঠা ৫৬২, ১৯৬৪, লাহোর, পাকিস্তান; সাইয়্যেদ হুসেন নসর, ‘অ্যান ইন্ট্রডাকশন টু ইসলামিক কসমোলজিক্যাল ডকট্রিনস’, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব নিউ ইয়র্ক প্রেস, পৃষ্ঠা ১৮৩; ইবন সিনা: সংক্ষিপ্ত জীবনী – সৈয়দ আবদুস সুলতান; ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের পক্ষে ইসলামী সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, রাজশাহী থেকে প্রকাশিত। প্রকাশক – মাসুদ আলী; প্রকাশকাল: জুন, ১৯৮১; পৃষ্ঠা ৬-৭; রাষ্ট্র দর্শনে মুসলিম মনীষা – আবু জাফর, প্রকাশক: অধ্যাপক শাহেদ আলী, ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ, দ্বিতীয় প্রকাশ: জানুয়ারি ১৯৭৯, পৃষ্ঠা ৪৭।)

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com