মঙ্গলবার, ১৮ জানুয়ারী ২০২২, ১০:০২ পূর্বাহ্ন

হারানো মানিক | আমিনুল ইসলাম কাসেমী

হারানো মানিক | আমিনুল ইসলাম কাসেমী

হারানো মানিক | আমিনুল ইসলাম কাসেমী

মানিক হারায়ে গেলে তার কদর বোঝা যায়। যখন সেটা হাতের নাগালে থাকে তখন মুল্যায়ন হয়না। তবে হারায়ে গেলে শুধু আফসোস হয়। বারবার স্মরণ হয়। দিকবিদিক ছুটে বেড়ায় সেটা খোঁজার জন্য।

এমনি এক মানিক। তিনি হারায়ে গেছেন। একবছর পার হয়ে গেল। নিমেষেই যেন সেটা পার করে ফেললাম। কিন্তু তাঁর স্মৃতিগুলো যেন চোখের পাতায় ভেসে বেড়াচ্ছে। প্রতিটিক্ষণ যেন তাঁর কথা মনে হচ্ছে। বারবার তাঁর কথা, তাঁর কাজ, তাঁর প্রজ্ঞা – বিচক্ষণতা আঁখির পাতায় ফুটে ওঠছে।

আল্লামা নুর হোসাইন কাসেমী ( রহ,)। একজন বর্ষীয়ান আলেমেদ্বীন এবং প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ ছিলেন। ইলমী ময়দানের উজ্জল এক নক্ষত্র। যিনি সারাটা জীবন আলো ছড়িয়েছিলেন। ছাত্র গড়ার বেমেছাল এক কারিগর। যার সাথে কোন তুলনা হয় না। গোটা বাংলাদেশের আলেম সমাজের মধ্যমণি ছিলেন। তাঁর ইলমী মাকাম এত উর্ধে ছিল, বড় বড় আলেমগণ তাঁর ভুয়সী প্রশংসা করতেন। এখনো পর্যন্ত এদেশের বিজ্ঞ আলেম সমাজ তাঁকে মুল্যায়ন করে থাকেন। ইলমী মজলিস বসলে মনে পড়ে যায় আল্লামা কাসেমীকে।

আল্লামা নুর হোসাইন কাসেমীর সবচেয়ে বড় গুণ ছিল আলেম তৈরী করা। ছাত্রদের মেধার বিকাশ ঘটানো। রতনে রতন চেনে। আল্লামা কাসেমী ছাত্র দেখলেই বু্ঝতেন কার মাঝে প্রতিভা আছে। মেধাবী ছাত্রকে কীভাবে গড়ে তোলা যায় সে প্রচেষ্টা থাকত তাঁর। শিক্ষক জীবনের শুরু থেকেই এই মিশনে তিনি নেমেছিলেন। ফরিদাবাদ জামেয়া, মালিবাগ জামেয়া, বারিধারা জামেয়া এবং জামেয়া সোবহানিয়াসহ যত প্রতিষ্ঠানে তিনি অধ্যাপনা করেছেন, সকল জায়গাতে তিনি ছাত্র গড়েছেন। প্রতিভাবান আলেম তৈরী করেছেন।

নিজের চিন্তা করেন নি। পরিবারের চিন্তা মাথায় ছিলনা। অর্থ- বিত্তের মালিক হওয়ার ভাবনা তাঁর মধ্যে ছিলনা। তাঁর ভাবনা ছিল একটাই, সেটা হল যোগ্য আলেম তৈরী করা। আর এই কাজে তিনি সফল। তিনি যেসব আলেম তৈরী করেগেছেন, তারা সকলেই যেন অতুলনীয়। বর্তমান দেশে খ্যাতনামা আলেম এবং লেখক- গবেষক যা দেখা যায়, খোঁজ নিলে জানা যাবে এর অধিকাংশ আল্লামা কাসেমীর সংস্পর্শে গড়ে ওঠেছে।

একজন বিনয়ী ব্যক্তিত্ব ছিলেন তিনি। যে গাছে ফলে ভরপুর থাকে সে গাছ কিন্তু মাটির সাথে নুয়ে যায়। আল্লামা কাসেমীর এমন বিনয়-নম্রতা ছিল, কোনদিন তাঁকে বোঝা যায়নি তিনি বড় মাপের আলেম। বরং সাদামাটা চলাফেরা এবং নম্র মেজাজে জীবন পার করেছেন।

আরো অবাক হব তাঁর বিনয় নম্রতা দেখে, কোথাও কোন মিটিং হলে, কোন কমিটি গঠন হলে, নিজে কোন দায়িত্ব নিতে চেতেন না। বরং অন্যকে দায়িত্ব দিয়ে নিজে সাধারণ কর্মি হিসাবে কাজ করার মানসিকতা রাখতেন। এরকম বহু ঘটনা ছিল তাঁর জীবনে।

একজন প্রাজ্ঞ রাজনীতিবিদ। তাঁর রাজনৈতিক জ্ঞান ছিল প্রশংসনীয়। এদেশের খ্যাতিমান রাজনীতিবিদগণ তাঁকে সমীহ করেছেন। মুফতী ফজলুল হক আমিনী (রহ,) কে দেখেছি, আল্লামা কাসেমীকে সমীহ করতেন। শ্রদ্ধা করতেন। যে কোন পরামর্শ কাসেমী সাহেবের কাছ থেকে নিতেন।

“বাকিয়্যাতুচ্ছ ছলফ” অর্থাৎ পূর্বসূরী খ্যাতিমান আলেমদের যেন অবশিষ্ট ব্যক্তি তিনি। আকাবির – আছলাফের পরিপূর্ণ পদাঙ্ক অনুসারী ছিলেন আল্লামা নুর হোসাইন কাসেমী। আকাবিরে দেওবন্দের আদর্শের অনুগামী এক ব্যক্তিত্ব। দেওবন্দীয়্যাতের উপরে অটল- অবিচল থাকার চেষ্টা করে গেছেন।
জাতির এই ক্রান্তিকালে বড্ড স্মরণ হয় সেই সোনার মানিকের কথা। সবসময় মনেপড়ে। তবে আমরা তাঁকে হারিয়ে ফেলেছি। আর তাঁকে পাওয়া যাবেনা।
মহান আল্লাহর কাছে কায়মনোবাক্যে দুআ করি, জান্নাতে সুউচ্চ মাকামে তিনি অধিষ্টিত হোন। আল্লাহ কবুল করুন। আমিন।
লেখক : শিক্ষক ও কলামিস্ট

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com