শনিবার, ৩০ মে ২০২০, ০২:১৬ পূর্বাহ্ন

হযরত পালনপুরী হুজুর; যে স্মৃতি হাতড়ে বেড়াই

হযরত পালনপুরী হুজুর; যে স্মৃতি হাতড়ে বেড়াই

হযরত পালনপুরী হুজুর; যে স্মৃতি হাতড়ে বেড়াই

আবুল ফাতাহ কাসেমী : কাসেম গেইট পেরিয়ে বাম দিকের সরু পথ দিয়ে কিছুটা এগুলে দেওবন্দের ঐতিহাসিক লাইব্রেরি। এ ভবনের নিচতলায় কারিগরি বিভাগ আর উপরে দু-তিন তলা মিলে দারুলউলুমের বিখ্যাত লাইব্রেরি (মাকতাবা)। সাথে আছে দুতলা বিশিষ্ট এককক্ষীয় প্রাচীন মিউজিয়াম।

সুনসান নিরবতা। লাইব্রেরি খুলল মাত্র। সকালের পুবালি আলোর রেশ এখনো কাটেনি। আলতো রোদ জানালা টপকিয়ে এখন কামরার মধ্যে। লাইব্রেরি তত্ত্বাবধায়ক, বিশিষ্ট উর্দু লেখক ও ইসলামের বিভিন্ন দিক নিয়ে লেখা ‘মাসায়েল সিরিজ’ এর সুলেখক মাওলানা রাফআত কাসেমির সাথে আলাপ করছি। লাগাতার কয়েক দিনের আসা যাওয়ায় অনেকটা সখ্যতা গড়ে উঠেছে তাঁর সাথে। ঐ দূর কোণে দু’একজন দর্শণার্থীর আনাগোনা। কেউ কেউ নিবিড় পাঠে। দূর থেকে দেখলে মনে হবে তারা দীর্ঘ সাধনার কিছু হয়তো খুঁজে পেয়েছেন। রাজ্যের সুখ তাদের চোখে মুখে। বুঁদ হয়ে আছেন কিতাবের পিঠে। এ যেন কালো হরফের রাখাল।

আমি অস্ফুটস্বরে কথা বলছি রাফআত কাসেমির সাথে। ঠুকঠুক লাঠির আওয়াজ। কেউ একজন হয়তো সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠছেন। নিরবতা ছাপিয়ে সবাই কেমন যেন নড়োচড়ো। চোখ ফেরাতেই —–সুবহানাল্লাহ কী হেরিলাম! শ্বেত শুভ্র বসন। পাঁচ কুল্লি মোটা কাপড়ের টুপি। দেখতে উঁচু ও সুঠামদেহি। কালচে গাঢ় জুব্বা। শরীরে বয়সের ছাপ। চেহারা দ্যুতিময়। চোখ বিস্ফারিত হলো। পুরো লাইব্রেরি যেন শুচিতায় বিভাময়। মাওলানা রাফআত কাসেমী সাহেবকে জিজ্ঞেস করলাম—- ইয়েহ হযরত কোন হ্যঁয় ( উনি কে?) তিনি চোখ বড়সড় করে ঠোঁট নাড়লেন —- ‘ইয়েহ মুফতি সাব হ্যঁয়’….

ঐ তো চলে এলেন। তিনি কাছে আসছেন আর সকলেই দাড়িয়ে যাচ্ছে। সবাইকে ইশারা করছেন না উঠতে। অশীতিপর মাওলানা রাফআত কাসেমী সাহেব লাঠি ভর করে কেমন যেন দ্রুত সম্মানে দাড়িয়ে গেলেন। আমিও অবুঝ বালকের ন্যায় ভয়ে কম্পমান। অগত্যা দাঁড়িয়ে গেলাম। অনেক সাহস করে কাছে গিয়ে বললাম—- ‘আসসালামু আলাইকুম’। পালনপুরী হুজুর জবাব দিলেন —আলাইকুমুসসালাম।

কিছুটা দূরে ঠাঁই দাড়িয়ে অপলক নয়নে তাকিয়ে রইলাম। —-আচ্ছা ইনিই তাহলে মুফতি সাইদ আহমদ পালনপুরী দা. বা.। স্বপ্নে আবিষ্কার করা কর্মবীর সেই মানুষটি। বাংলাদেশে উস্তাদগণের মুখে তাঁর ক-ত গল্প শুনেছি।

ব্যক্তি যখন ব্যক্তিত্বের ব্যপ্ততা, চিন্তার গভীরতা, জ্ঞান ও বৈশ্বাসিক দৃঢ়তায় জয়ী হন তখন তিনি ‘আমাদের’ না হয়ে হয়ে উঠেন সবার। এমন সবার একজন আল্লামা পালনপুরী। বর্তমান বিশ্বে ইশারা করে দেখানো হয় এমন ইলমী ব্যক্তিত্বের মধ্যে প্রথম সারির একজন আল্লামা সাইদ আহমদ পালনপুরী।

দাওরা পাশ করার পর বাবা মওলবি সাইদকে তিব্বিয়া কলেজে ভর্তির জন্য চাপ প্রয়োগ করলেন। ছেলেও নাছোড়বান্দা। বাবাকে কোন মতে বুঝিয়ে চলে এলেন মাদরাসায়। জীবন উৎসর্গ করলেন ইলমের পেছনে। তাকাননি পেছনে ফিরে। সেই মওলবি সাইদ এখন সবার পালনপুরী হুজুর।

আমার উস্তাদ, পৃখিবীখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ ঐতিহাসিক দারুল উলুম দেওবন্দের শাইখুল হাদীস, বিশিষ্ট ইসলামি স্কলার, ফকীহ আলিম মুফতী সাইদ আহমদ পালনপুরী হুজুর —-অধ্যাপনা, ইলমী গবেষণা ও আধ্যাত্মিকতা চর্চায় ব্যস্ত থকেন সব সময়। রমজানসহ ছুটির সময়ে বুরতানিয়া, কানাডা, ইউরোপ আমেরিকা, লন্ডনসহ পৃখিবীর বিভিন্ন দেশে ছুঁটে যান দীন দাওয়াতের মেহনত নিয়ে। তাঁর ঐতিহাসিক কীর্তির মধ্যে শাহ ওয়ালী উল্লাহ রহ. এর বিখ্যাত কিতাব ‘হুজ্জাতুল্লাহিল বালিগাহ’ এর ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘রহমাতুল্লাহিল ওয়াসিআহ’ অমর কীর্তি।

তাছাড়া তিনি হেদায়েতুল কুরআন, আপ ফতোয়া কেইছে দেঁ, তাহসিল আদিল্লায়ে কামেলা, ইফাদাতে নানুতবি, ইফাদাতে রশিদিয়া, তুহফাতুল কারী (বুখারী শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ), তুহফাতুল আলমায়ী (তিরমিযি শরীফের ব্যাখ্যাগ্রন্থ) সহ ছোট বড় প্রায় পঞ্চাশের কাছাকাছি ইলমী অভিসন্দর্ভ, কিতাব রচনা করেন।

দুহাজার তেরোর যেদিন প্রথম সাক্ষাতপ্রার্থী হয়েছিলাম এ মহান মানুষটির সাথে সেদিন থেকে কত যে স্মৃতি খেলা করে আমার হৃদয়ের খেলা ঘরে। কয়েক দিন যাবত আমাদের এ মহান মানুষটির শরীর ভাল যাচ্ছে না। ভয় শংকায় আঁতকে উঠি। আকাবির বিয়োগের এ সময়টায় আমাদের এ মানুষটি যেন আরো বহুকাল বেঁচে থাকেন আমাদের মাঝে। কায়মনোবাক্যে লাখ হৃদয়ের এ আকুতি আমাদের। আমার। সকলের।

লেখক : ফাযেলে দারুল উলূম দেওবন্দ, ভারত

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com