শনিবার, ৩০ মে ২০২০, ০৩:০৩ পূর্বাহ্ন

সুষম সমাজ গঠনে যাকাতের ভূমিকা | মুফতি আহমদ যাকারিয়া

সুষম সমাজ গঠনে যাকাতের ভূমিকা | মুফতি আহমদ যাকারিয়া

সুষম সমাজ গঠনে যাকাতের ভূমিকা | মুফতি আহমদ যাকারিয়া

যাকাত এর সংজ্ঞা

যাকাত শব্দের অর্থ শুচিতা, পবিত্রতা, শুদ্ধি ও বৃদ্ধি

ইসলামী পরিভাষায় আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে শরিয়ত নির্ধারিত পরিমাণ সম্পদের নির্দিষ্ট অংশ কুরআনে বর্ণিত আট প্রকারের কোন এক প্রকার লোক অথবা প্রত্যেককে দান করে মালিক বানিয়ে দেওয়াকে যাকাত বলে।

যাকাত সম্পর্কে কুরআনে আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন;

وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا اللَّهَ مُخْلِصِينَ لَهُ الدِّينَ حُنَفَاءَ وَيُقِيمُوا الصَّلاةَ وَيُؤْتُوا الزَّكَاةَ وَذَلِكَ دِينُ الْقَيِّمَةِ
‘তাদের এ মর্মে আদেশ করা হয়েছে যে, তারা নিবিষ্ট মনে একান্তভাবে শুধুমাত্র আল্লাহর এবাদত করবে, যথাযথভাবে সালাত আদায় করবে, যাকাত প্রদান করবে, আর এটাই হলো সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন।’
(বাইয়্যিনাহ:৫)

আল্লাহ তা’আলা অন্যত্র ইরশাদ করেন;

وَأَقِيمُوا الصَّلاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَقْرِضُوا اللَّهَ قَرْضاً حَسَناً وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنْفُسِكُمْ مِنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِنْدَ اللَّهِ هُوَ خَيْراً وَأَعْظَمَ أَجْراً
‘তোমরা যথা নিয়মে সালাত আদায় কর, যাকাত প্রদান কর, আল্লাহকে উত্তম ঋণ দাও, আর তোমরা নিজেদের কল্যাণে যা অগ্রে প্রেরণ করবে, তা আল্লাহর কাছ থেকে উত্তম ও শ্রেষ্ঠ প্রতিদান হিসাবে প্রাপ্ত হবে।’ (মুজাম্মিল:২০)

আল্লাহ আরেক জায়গায় বলেন;

وَمَا آتَيْتُمْ مِنْ رِباً لِيَرْبُوَ فِي أَمْوَالِ النَّاسِ فَلا يَرْبُو عِنْدَ اللَّهِ وَمَا آتَيْتُمْ مِنْ زَكَاةٍ تُرِيدُونَ وَجْهَ اللَّهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْمُضْعِفُونَ
‘তোমরা মানুষের সম্পদ বৃদ্ধির নিমিত্তে যে সুদ ভিত্তিক লেনদেন করে থাক, প্রকৃত পক্ষে তা আল্লাহর নিকট কোন লাভজনক নয়। পক্ষান্তরে তোমরা যে যাকাত প্রদান কর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের আশায়, (তা বৃদ্ধি পায়) ফলত যাকাত প্রদানকারীগণ মুনাফাকে দ্বিগুণ করে নেয়।’ (রূম:৩৯)

যাকাতের বিষয়ে হাদীসে আলোচনা

حَدَّثَنَا أَبُو عَاصِمٍ الضَّحَّاكُ بْنُ مَخْلَدٍ، عَنْ زَكَرِيَّاءَ بْنِ إِسْحَاقَ، عَنْ يَحْيَى بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ صَيْفِيٍّ، عَنْ أَبِي مَعْبَدٍ، عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ـ رضى الله عنهما ـ أَنَّ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم بَعَثَ مُعَاذًا ـ رضى الله عنه ـ إِلَى الْيَمَنِ فَقَالَ ‏ “‏ ادْعُهُمْ إِلَى شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ، وَأَنِّي رَسُولُ اللَّهِ، فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوا لِذَلِكَ فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللَّهَ قَدِ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ خَمْسَ صَلَوَاتٍ فِي كُلِّ يَوْمٍ وَلَيْلَةٍ، فَإِنْ هُمْ أَطَاعُوا لِذَلِكَ فَأَعْلِمْهُمْ أَنَّ اللَّهَ افْتَرَضَ عَلَيْهِمْ صَدَقَةً فِي أَمْوَالِهِمْ، تُؤْخَذُ مِنْ أَغْنِيَائِهِمْ وَتُرَدُّ عَلَى فُقَرَائِهِمْ ‏”‏‏.‏

ইব্‌নু ‘আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত; রাসূল সাঃ মু’আয ইবনে জাবাল রাঃ কে ইয়ামান দেশে (শাসক হিসেবে) প্রেরণ করেন। অতঃপর বললেন, সেখানকার অধিবাসীদেরকে এ সাক্ষ্য দানের প্রতি আহবান করবে যে, আল্লাহ ব্যতীত প্রকৃত কোন উপাস্য নেই এবং আমি আল্লাহর রাসূল। যদি তারা তা মেনে নেয়, তবে তাদেরকে অবগত করবে যে, আল্লাহ তা’আলা তাদের উপর প্রতি দিনে ও রাতে পাঁচ ওয়াক্ত নামায ফরয করেছেন। যদি সেটাও তারা মেনে নেয়, তবে তাদেরকে অবগত করবে যে, আল্লাহ তা’আলা তাদের উপর তাদের সম্পদের মধ্য থেকে সাদকা (যাকাত) ফরয করেছেন। যেটা ধনীদের নিকট থেকে গৃহীত হবে আর দরিদ্রদের মাঝে প্রদান করা হবে।

حَدَّثَنِي مُحَمَّدُ بْنُ عَبْدِ الرَّحِيمِ، حَدَّثَنَا عَفَّانُ بْنُ مُسْلِمٍ، حَدَّثَنَا وُهَيْبٌ، عَنْ يَحْيَى بْنِ سَعِيدِ بْنِ حَيَّانَ، عَنْ أَبِي زُرْعَةَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ـ رضى الله عنه ـ أَنَّ أَعْرَابِيًّا، أَتَى النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَقَالَ دُلَّنِي عَلَى عَمَلٍ إِذَا عَمِلْتُهُ دَخَلْتُ الْجَنَّةَ‏.‏ قَالَ ‏”‏ تَعْبُدُ اللَّهَ لاَ تُشْرِكُ بِهِ شَيْئًا، وَتُقِيمُ الصَّلاَةَ الْمَكْتُوبَةَ، وَتُؤَدِّي الزَّكَاةَ الْمَفْرُوضَةَ، وَتَصُومُ رَمَضَانَ ‏”‏‏.‏ قَالَ وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ لاَ أَزِيدُ عَلَى هَذَا‏.‏ فَلَمَّا وَلَّى قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم ‏”‏ مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى رَجُلٍ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ فَلْيَنْظُرْ إِلَى هَذَا ‏”‏‏.‏

আবূ হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত; এক বেদুইন নবী সাঃ এর নিকট এসে বললো, আমাকে এমন একটি আমলের কথা বলুন; যদি আমি তা সম্পাদন করি, তবে জান্নাতে প্রবেশ করবো। রাসূল সাঃ বললেন; আল্লাহর ইবাদত করবে আর তার সাথে অপর কোন কিছু শরীক করবে না। ফরয নামায আদায় করবে, ফরয যাকাত প্রদান করবে, রমযান মাসে রোযা আদায় করবে। সে বললো, যাঁর হাতে আমার প্রাণ রয়েছে, তার শপথ করে বলছি! আমি এর চেয়ে বেশী করবো না। যখন সে ফিরে গেল, নবী সাঃ বললেন; যে ব্যক্তি কোন জান্নাতী ব্যক্তিকে দেখতে পছন্দ করে, সে যেন এই ব্যক্তিকে দেখে নেয়।

যাকাতের ফজিলত

যাকাতের ইহকালীন ও পরকালীন অনেক ফযিলত রয়েছে, তন্মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপ।

১- যাকাত আল্লাহর রহমত লাভের কারণ।

আল্লাহ তাআ’লা বলেন;

وَرَحۡمَتِي وَسِعَتۡ كُلَّ شَيۡءٖۚ فَسَأَكۡتُبُهَا لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ وَيُؤۡتُونَ ٱلزَّكَوٰةَ
আর আমার রহমত সব বস্তুকে পরিব্যাপ্ত করেছে। সুতরাং আমি তা লিখে দেব তাদের জন্য, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে এবং যাকাত প্রদান করে। (আরাফ:১৫৬)

২- যাকাত প্রদান আল্লাহর সাহায্য লাভের শর্ত।

আল্লাহ তাআ’লা বলেন;

وَلَيَنصُرَنَّ ٱللَّهُ مَن يَنصُرُهُۥٓۚ إِنَّ ٱللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ ٤٠ ٱلَّذِينَ إِن مَّكَّنَّٰهُمۡ فِي ٱلۡأَرۡضِ أَقَامُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتَوُاْ
আর আল্লাহ অবশ্যই তাঁকে সাহায্য করেন, যে তাঁকে সাহায্য করে। নিশ্চয় আল্লাহ শক্তিমান, পরাক্রমশালী। তারা এমন, যাদেরকে আমি জমিনে ক্ষমতা দান করলে তারা নামায কায়েম করবে এবং যাকাত দেবে।
(হাজ্জ: ৪০-৪১)

৩- যাকাত প্রদান গুনাহ মাফ হওয়ার কারণ।
নবী সাঃ বলেন; ‘সাদকা গুনাহকে নিভিয়ে দেয়, যেভাবে পানি আগুনকে নেভায়।’ (বুখারী)

ইসলামে যাকাতের অবস্থান

যাকাত ইসলামের ফরজ কাজ সমূহের মধ্যে একটি এবং ইসলামের পাঁচটি রুকনের মধ্যে তৃতীয় রুকন হলো এটি।

আল্লাহ তাআ’লা বলেন

وَأَقِيمُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتُواْ
তোমরা নামাজ প্রতিষ্ঠা করো ও যাকাত প্রদান করো। (নূর:৫৬)

নবী সাঃ বলেছেন; ‘ইসলাম পাঁচটি বিষয়ের উপর নির্মিত:

এক- এ সাক্ষ্য দেয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত কোনো ইলাহ নেই এবং মোহাম্মদ সাঃ আল্লাহর বান্দা ও রাসূল।

দুই- নামাজ প্রতিষ্ঠা করা।
তিন- যাকাত প্রদান করা।
চার- বায়তুল্লাহর হজ্ব করা।
পাঁচ- রমজানের রোজা রাখা। (মুসলিম)

যাকাত ওয়াজিব হওয়ার শর্ত

১-মুসলিম হওয়া।

২-নেসাবের মালিক হওয়া।

৩- নেসাব প্রকৃত প্রয়োজনের অতিরিক্ত হওয়া।

৪- ঋণগ্রস্ত না হওয়া।

৫- নেসাব পরিমাণ সম্পদ ১ বছর স্থায়ী হওয়া। তবে হ্যাঁ; নির্দিষ্ট কোন মাস নেই, ব্যক্তির সম্পদ এক বছর পূর্ণ হলেই যাকাত ফরয হবে।

যাদের উপর যাকাত ওয়াজিব নয়

এক- কাফেরের উপর যাকাত ফরয নয়। যাকাতের নামে সে প্রদান করলেও আল্লাহ্‌ তা কবুল করবেন না।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ্‌ বলেন,

وَمَا مَنَعَهُمْ أَنْ تُقْبَلَ مِنْهُمْ نَفَقَاتُهُمْ إِلَّا أَنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَبِرَسُولِهِ وَلَا يَأْتُونَ الصَّلَاةَ إِلَّا وَهُمْ كُسَالَى وَلَا يُنفِقُونَ إِلَّا وَهُمْ كَارِهُونَ

“তাদের সম্পদ ব্যয় শুধুমাত্র এই কারণে গ্রহণ করা হবে না যে, তারা আল্লাহ্‌ ও তার রাসূলের সাথে কুফরী করেছে। অলস ভঙ্গিতে ছাড়া তারা নামাযে আসে না এবং মনের অসন্তষ্টি নিয়ে খরচ করে।” (তাওবাঃ ৫৪)

কাফেরের উপর যাকাত ফরয নয় এবং আদায় করলেও গ্রহণ করা হবে না; এ কথার অর্থ এটা নয় যে, পরকালেও তাকে ক্ষমা করে দেয়া হবে; বরং তাকে এজন্য শাস্তি দেয়া হবে।

কুরআনে এসেছে,

كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ، إِلَّا أَصْحَابَ الْيَمِينِ، فِي جَنَّاتٍ يَتَسَاءَلُونَ، عَنْ الْمُجْرِمِينَ، مَا سَلَكَكُمْ فِي سَقَرَ، قَالُوا لَمْ نَكُ مِنَ الْمُصَلِّينَ، وَلَمْ نَكُ نُطْعِمُ الْمِسْكِينَ، وَكُنَّا نَخُوضُ مَعَ الْخَائِضِينَ، وَكُنَّا نُكَذِّبُ بِيَوْمِ الدِّينِ، حَتَّى أَتَانَا الْيَقِينُ

“প্রত্যেক ব্যক্তি তার কৃতকর্মের জন্য দায়ী; কিন্তু ডান দিকের লোকেরা ছাড়া। তারা থাকবে জান্নাতে এবং পরস্পরে জিজ্ঞাসাবাদ করবে অপরাধীদের সম্পর্কে। বলবে, তোমাদেরকে কিসে জাহান্নামে প্রবেশ করিয়েছে? তারা বলবে, আমরা নামায পড়তাম না, অভাবগ্রস্তকে আহার্য দিতাম না। আমরা সমালোচকদের সাথে সমালোচনা করতাম। এবং আমরা প্রতিফল দিবসকে অস্বীকার করতাম। এমনকি আমাদের মৃত্যু এসে গেছে।” (মুদ্দাস্‌সির:৩৮-৪৭)

এ থেকে বুঝা যায় যে, ইসলামের বিধি-বিধান না মেনে চলার কারণে কাফেরদেরকে শাস্তি দেয়া হবে।

দুই- ক্রীতদাসের কোন সম্পদ নেই। কোন সম্পদ থাকলেও তা তার মালিকের সম্পদ হিসেবে গণ্য হবে। তাই তার উপর যাকাত ওয়াজিব নয়।

কেননা নবী সাঃ বলেন;

مَنِ ابْتَاعَ عَبْدًا فَمَالُهُ لِلَّذِي بَاعَهُ إِلَّا أَنْ يَشْتَرِطَ الْمُبْتَاع
“সম্পদের অধিকারী কোন ক্রীতদাস যদি কেউ বিক্রয় করে, তবে উক্ত সম্পদের মালিকানা বিক্রেতার থাকবে। কিন্তু যদি ক্রেতা উক্ত সম্পদের শর্তারোপ করে থাকে, তবে এটা ভিন্ন কথা।”

তিন- নেসাব পরিমাণ সম্পদ না থাকলে বা নেসাবের কম সম্পদ থাকলে তাতে যাকাত দিতে হবে না। কেননা তার সম্পদ কম। আর অল্প সম্পদ দ্বারা অন্যের কল্যাণ করা সম্ভব নয়।

মাঝখানে একটি কথা বলে নেওয়া ভালো যে, চতুষ্পদ জন্তুর নেসাবে শুরু এবং শেষ সংখ্যার খেয়াল রাখতে হবে। কিন্তু অন্যান্য সম্পদে শুধু প্রথমে কত ছিল তার হিসাব ধর্তব্য। পরে যা অতিরিক্ত হবে তার হিসাব করে যাকাত দিতে হবে।

চার- বছর অতিক্রান্ত হওয়া। কেননা বছর পূর্ণ না হওয়া স্বত্বেও যাকাতের আবশ্যকতা সম্পদশালীর প্রতি কঠোরতা করা হয়। বছর পূর্তি হওয়ার পরও যাকাত বের না করলে যাকাতের হকদারদের প্রতি অবিচার করা হয়; তাদের ক্ষতি করা হয়। এ কারণে শরীয়ত এর জন্য একটি সীমারেখা নির্ধারণ করেছে এবং এর মধ্যে যাকাতের আবশ্যকতা নির্ধারণ করেছে। আর তা হচ্ছে বছর পূর্তি। অতএব এর মধ্যে সম্পদশালী ও যাকাতের হকদারদের মধ্যে একটি সামঞ্জস্যতা বিধান করা হয়েছে। এ কারণে বছর পূর্ণ হওয়ার পূর্বে কোন মানুষ যদি মৃত্যুবরণ করে বা তার সম্পদ বিনষ্ট হয়ে যায়, তবে যাকাত রহিত হয়ে যাবে। অবশ্য তিনটি জিনিস এ বিধানের ব্যতিক্রম:

১- ব্যবসার লভ্যাংশ।

২- চতুষ্পদ জন্তুর বাচ্চা।

৩- উশর।

ব্যবসার লভ্যাংশে ব্যবসার মূল সম্পদের সাথে যোগ করে যাকাত দিতে হবে। আর চতুষ্পদ জন্তুর ভূমিষ্ঠ বাচ্চার যাকাত তার মায়ের সাথে মিলিত করে দিতে হবে। আর উশর অর্থাৎ জমিনে উৎপাদিত ফসল ঘরে উঠালেই যাকাত দিতে হবে।

যাকাত ফরজ হওয়ার হিকমত

যাকাত ফরজ হওয়ার পেছনে অসংখ্য হিকমত রয়েছে। যেমন, সম্পদ উপার্জনের যোগ্যতা, দক্ষতা ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে মানুষের মধ্যে অনেক তারতম্য রয়েছে। আর এ তারতম্য কমিয়ে ধনী-গরিবের মাঝে ভারসাম্য আনার জন্য আল্লাহ পক যাকাত আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। কারণ দেখা যায় যে, কিছু মানুষ সম্পদের পাহাড় গড়ছে, অর্থ-কড়ি ও ভোগ-বিলাসে মত্ত আছে এবং প্রাচুর্যের চূড়ান্ত শিখরে অবস্থান করছে, আর কিছু লোক দারিদ্র সীমার একেবারে নিচে অবস্থান করছে। মানবেতর জীবন যাপন করছে। আল্লাহ এ ব্যবধান দূর করার জন্যই তাদের সম্পত্তিতে যাকাত ফরজ করেছেন। যাতে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে ব্যবধান কমে যায় এবং ধনী দরিদ্রের বৈষম্য দূর হয়। অন্যথায় দেশে বা সমাজে হিংসা- বিদ্বেষ, ফিতনা-ফাসাদ ও হত্যা-লুণ্ঠন ছড়িয়ে পড়বে। বিঘ্নিত হবে সামাজিক শৃঙ্খলা ও স্থিতি। এছাড়া যাকাতের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা হলো, যাকাত মানুষকে কৃপণতা থেকে বিরত রাখে। মানুষকে পরোপকারী, অন্যের ব্যথায় সমব্যথী, দরিদ্র জনগোষ্ঠীর প্রতি সহানুভূতিশীল ও সহমর্মী হতে সাহায্য করে।

অধিকাংশ দেশেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় যাকাত দারিদ্র বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সহায়তা করে দারিদ্র দূর করতে।

যাকাত আদায়ের মাধ্যমে মুসলমানদের মনোবল বৃদ্ধি পায়। ভাবমর্যাদা অক্ষুন্ন থাকে এবং আত্মমার্যাদা ও সম্মানবোধ বৃদ্ধি পায়। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে দূরত্ব কমে আসে। তাদের মাঝে ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যরে সেতুবন্ধন রচিত হয়। দূর হয় পারস্পরিক হিংসা-বিদ্বেষ। কারণ গরিবরা যখন ধনীদের সম্পদ দ্বারা উপকৃত হয় এবং তাদের সহানুভূতি লাভ করে, তখন তাদের সহযোগিতা করে এবং তাদের স্বার্থ ও সম্মান রক্ষায় সচেষ্ট হয়। যাকাত আদায় করলে আল্লাহ ধন-সম্পদের মধ্যে বরকত বাড়িয়ে দেন।

যেমন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, রাসূল ইরশাদ করেন, ‘সদকা করার কারণে কখনো সম্পদ কমে না।’

দান-খয়রাত করলে সম্পদের পরিমাণ কমলেও সম্পদের বরকত কমে না। যাকাত একটি সমাজ বা দেশের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও গতিশীলতাকে স্বাভাবিক রাখার নিশ্চয়তা বিধান করে। যাকাত ভিত্তিক অর্থব্যবস্থাই বর্তমান অর্থব্যবস্থার সব প্রকার ত্রুটি

বিচ্যুতি ও নানাবিধ সমস্যার যুৎসই সমাধান

যাকাত নামক এ অর্থনৈতিক ইবাদত আল্লাহর সন্তুষ্টি এবং তাঁর অনুগ্রহ ও রহমতকে ত্বরান্বিত করে।

কুরআনে এসেছে, যাকাত আদায় করা আল্লাহর সাহায্য লাভের পূর্বশর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
(আ‘রাফ: ১৫৬)

যাকাত ফরজ করার কিছু বাহ্যিক উপকার

১- কৃপণতা, পাপ ও অন্যায় থেকে মানব-অন্তর পবিত্র করা।

আল্লাহ তাআলা বলেন;
خُذۡ مِنۡ أَمۡوَٰلِهِمۡ صَدَقَةٗ تُطَهِّرُهُمۡ وَتُزَكِّيهِم بِهَا
তাদের সম্পদ থেকে সদকা নাও। এর মাধ্যমে তাদেরকে তুমি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবে। (তাওবা:১০৩)
২- সম্পদ পবিত্র ও বৃদ্ধি করা এবং তাতে বরকত আকৃষ্ট করা। রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন, ‘সাদকা কোনো সম্পদকে কমিয়ে দেয় না।’ (মুসলিম)
৩- আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে মানুষ আনুগত্য প্রকাশ করে কি না, আল্লাহর ভালোবাসাকে সম্পদের ভালোবাসার উপর প্রাধান্য দেয় কি না, এ ব্যাপারে পরীক্ষা করে দেখা।
৪- দরিদ্রদের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন ও অভাবীদের প্রয়োজন পূরণ করা। এর মাধ্যমে মুসলমানদের পরস্পরের মাঝে মহব্বত বৃদ্ধি পায় এবং মুসলিম সমাজের সদস্যদের মাঝে সর্বোচ্চ পর্যায়ের সামাজিক সহযোগিতা সৃষ্টি হয়।
৫- আল্লাহর পথে দান-খয়রাত ও সম্পদ ব্যয়ের অভ্যাস গড়ে তোলা।

যাকাত অনাদায়কারীর হুকুম

যাকাত অনাদায়কারী হয়তো অস্বীকৃতিবশত অথবা কৃপণতা হেতু যাকাত প্রদান করে না।

অস্বীকৃতিবশত যাকাত অনাদায়কারী তথা যে ব্যক্তি জেনে বুঝে যাকাত অস্বীকার করলো; সে সর্বসম্মতিক্রমে কুফরি করলো; কেননা সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশ অমান্য করলো।
যাকাত আদায়ে অস্বীকৃতি জ্ঞাপনকারীদের উদ্দেশ্যে আবু বকর রাযিঃ বলেছিলেন, ‘আল্লাহর কসম! যারা নামাজ ও যাকাতের মধ্যে পার্থক্য করলো; তাদের বিরুদ্ধে আমি অবশ্যই লড়াই করবো। কারণ, যাকাত হলো সম্পদের উপর আরোপিত অধিকার। আল্লাহর কসম! তারা যদি আমাকে একটি রশি অর্পণ করতেও অস্বীকার করে, যা তারা রাসূলুল্লাহ সাঃ কে অর্পণ করতো, তবে আমি এর জন্যেও তাদের বিরুদ্ধে অবশ্যই লড়াই করব।’ (বুখারী)

আর যে ব্যক্তি কৃপণতাবশত যাকাত প্রদান করল না, তার কাছ থেকে শক্তি প্রয়োগ করে হলেও যাকাত আদায় করা হবে। তবে এ আচরণের কারণে তাকে কাফের বলা হবে না। যদিও সে স্বেচ্ছায় যাকাত আদায় না করে একটি বড় অন্যায় ও পাপকর্ম করেছে। এর প্রমাণ হলো, যাকাত অনাদায়কারীর ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সাঃ এর বাণী; ‘সোনা-রুপার মালিক যদি এ সবের হক আদায় না করে, তবে তা দিয়ে কিয়ামতের দিন আগুনের পাত তৈরি করা হবে, অতঃপর তা আগুনে গরম করা হবে এবং তা দিয়ে তার পার্শ্বদেশে, কপালে ও পিঠে ছেঁকা দেয়া হবে। পাত ঠান্ডা হয়ে গেলে আবারও তা গরম করে আনা হবে। আর এটা হবে এমন এক দিনে, যা হবে পঞ্চাশ হাজার বছরের পরিমাণ দীর্ঘ। বান্দাদের মাঝে শেষ ফয়সালা হওয়া পর্যন্ত এ প্রক্রিয়া চলমান থাকবে। ফয়সালা শেষ হলে তাদের এক দলকে জন্নাতের এবং অপর দলকে জাহান্নামের পথ দেখিয়ে দেয়া হবে।’ (মুসলিম)

আর যদি যাকাত না দেয়ার উদ্দেশ্যে মানুষ লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, তবে তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করে যেতে হবে, যতক্ষণ না তারা আল্লাহর নির্দেশ মানতে সম্মত হয়।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেন;

فَإِن تَابُواْ وَأَقَامُواْ ٱلصَّلَوٰةَ وَءَاتَوُاْ ٱلزَّكَوٰةَ فَخَلُّواْ سَبِيلَهُمۡۚ إِنَّ ٱللَّهَ غَفُورٞ رَّحِيمٞ

তবে যদি তারা তাওবা করে এবং সালাত কায়েম করে, আর যাকাত দেয়, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও। নিশ্চয় আল্লাহ বড়ই ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু। (তাওবা:৫)

যাকাতের অর্থ ব্যয়ের খাতসমূহ

আল্লাহ তা’আলা কুরআন পাকে যাকাতের অর্থ ব্যয়ের খাতসমূহ উল্লেখ করে দিয়েছেন। কুরআনে যাকাতের অর্থ ব্যয়ের জন্য ৮টি খাত উল্লিখিত হয়েছে।

আল্লাহ তা’আলা ইরশাদ করেন,

১। ফকির: যারা নিজেদের সাধারণ জীবন যাপন করতে পারে না। অনেক দুঃখে-কষ্টে কালাতিপাত করে।তাদেরকে যাকাত দেয়া হবে। হাদীসে বলা হয়েছে যে, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ধনী তাদের থেকে যাকাত নেয়া হবে, আর গরিবের মাঝে বিতরণ করা হবে।’
২। মিসকিন: সহায়-সম্বলহীন হৃতসর্বস্ব ব্যক্তি, যার নিকট নগদ অর্থ বলতে কিছুই নেই; এমন লোকদেরকে যাকাত দেয়া হবে।
৩। কর্মকর্তা-কর্মচারী: যাকাতের পয়সা বা সম্পদ উসুল করার কাজে নিয়োজিত কর্মচারী, কর্মকর্তাদের বেতন ভাতার কাজে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা হবে। চাই এরা ধনী হোক অথবা গরিব। সর্বাবস্থায় এ যাকাতের সম্পদ থেকে তারা তাদের বেতন ভাতা গ্রহণ করতে পারবে।

৪। কৃতদাস বা কৃতদাসীকে মুক্ত করার জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে।

৫। অমুসলিম বা কাফের সম্প্রদায়ের জন্য যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে। যাতে তারা ইসলামের প্রতি আকৃষ্ট হয়। তাদের অন্তরে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রতি আকর্ষণ বোধ করে। একমাত্র এ ধরনের কোন উদ্দেশ্য ছাড়া অমুসলিমদের মধ্যে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে না।

৬। ঋণগ্রস্ত কোন ব্যক্তির উপর তার ঋণের বোঝা কমানো বা ঋণ মুক্ত করার উদ্দেশ্যে যাকাতের অর্থ ব্যয় করা যাবে।
৭। যারা আল্লাহর পথে বিভিন্নভাবে জিহাদরত, তাদের সার্বিক সাহায্যার্থে যাকাতের অর্থ প্রদান করা যাবে।

৮। মুসাফির ব্যক্তি পথিমধ্যে অর্থাভাবে বিপদগ্রস্থ বা অসহায় হয়ে পড়েছে। বাড়ী পর্যন্ত পৌঁছার মতো কোন সম্বল তার সঙ্গে নেই। এমতাবস্থায় যাকাতের অর্থ দিয়ে সহযোগিতা করা বা লোকটির জন্য যাকাতের অর্থ গ্রহণ করা সম্পূর্ণ বৈধ।

তবে একটি কথা বলে নেওয়া ভালো যে, উত্তম হলো যে দেশের সম্পদ সে দেশবাসীর মধ্যেই যাকাত বণ্টন করে দেওয়া। তবে প্রয়োজন দেখা দিলে কাছের অথবা দূরের যেকোনো দেশে যাকাতের টাকা পাঠিয়ে দেওয়া যাবে। উদাহরণস্বরূপ; দূরবর্তী দেশ অধিক দরিদ্র অথবা দূরবর্তী দেশে যাকাত প্রদানকারীর আত্মীয়-স্বজন রয়েছে, যারা যাকাত প্রদানকারীর দেশের দরিদ্রদের মতোই দরিদ্র, এমতাবস্থায় আত্মীয়-স্বজনকে প্রদান করাটা অধিক উপকারী বলে বিবেচিত হবে। কেননা এক্ষেত্রে একদিকে আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা হবে, অন্যদিকে যাকাতও আদায় হয়ে যাবে। পাশাপাশি যাকাত পাওয়ার বেশি হকদার ও অধিক প্রয়োজনগ্রস্ত কে, তা অনুসন্ধান করে বের করতে যাকাত প্রদানকারীকে শ্রম দিতে হবে। যাকাত পাওয়ার হকদারির গুণ যার মধ্যে বেশি পাওয়া যাবে, তাকে যাকাত প্রদান করা অধিক উত্তম হবে, যেমন নিকটবর্তী গরীব অথবা তালেবে ইলম ইত্যাদি।

যেসব সম্পদের ওপর যাকাত ফরয

প্রথম প্রকার: ভূমি থেকে উৎপাদিত শস্য ও ফল-ফলাদি।

কুরআনে এসেছে;

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَنْفِقُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا كَسَبْتُمْ وَمِمَّا أَخْرَجْنَا لَكُمْ مِنَ الْأَرْضِ

‘হে মুমিনগণ! তোমরা তোমাদের বৈধ উপার্জন এবং আমি তোমাদের জন্য ভূমি থেকে যে শস্য উৎপন্ন করি তা থেকে আল্লাহর নির্দেশিত পথে ব্যয় কর।’
(বাকারা: ২৬৭)

কুরআনের আরেক জায়গায় এসেছে

وآتو حقه يوم حصاده.

‘ফসল কাটার সময় তার হক (যাকাত) আদায় কর।’ (আনআম: ৪১)

ফসলের যাকাত প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন;

فيما سقت السماء أو كان عثريا العشر وفيما سقى بالنضح نصف العشر.

‘বৃষ্টির পানিতে উৎপন্ন ফসল ও উশরী জমিতে উৎপন্ন ফসলের যাকাত বিশ ভাগের একভাগ। (বুখারি)

ফসলের উপর যাকাত ওয়াজিব হওয়ার নির্ধারিত পরিমাণ হচ্ছে ‘নিসাব’। আর পাঁচ ওসকে নিসাব হয়।

রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন;

لَيْسَ فِي حَبٍّ وَلَا تَمْرٍ صَدَقَةٌ حَتَّى تَبْلُغَ خَمْسَةَ أَوْسُقٍ.

‘শস্য বা ফলমূল এর উপর যাকাত ওয়াজিব হবে না, যতক্ষণ তা পাঁচ ওসক পরিমাণ না হয়।’

‘ওসক’ এর পরিমাণ

রাসূলুল্লাহ সাঃ এর ব্যবহৃত ৬০ ‘সা’ এর সমপরিমাণ এক ওসক। সে হিসেবে যাকাতের নিসাব হওয়ার জন্য ৩০০ ‘সা’ এর প্রয়োজন। আর এক ‘সা’ সমপরিমাণ ২০৪০ গ্রাম। সুতরাং নিসাব এর পরিমাণ দাঁড়াল ৬১২ কেজি। তাই এর কম ফসলের মধ্যে যাকাত ওয়াজিব হবে না। উক্ত নিসাবে বিনাশ্রমে প্রাপ্ত ফসলে যাকাতের পরিমাণ হলো এক দশমাংশ আর শ্রম ব্যয়ে প্রাপ্ত ফসলে যাকাতের পরিমাণ হলো এক বিশমাংশ।

তবে ফলমূল, শাক-সব্জি, এসব বস্তুর উপর যাকাত ওয়াজিব নয়। এ প্রসঙ্গে ওমর রা.বলেন;

ليس في الخضروات صدقة
‘শাক-সব্জিতে যাকাত নেই।’

আলী রা. বলেন,

ليس في التفاح وما اشبه صدقة
‘আপেল ও এ জাতীয় ফলের উপর যাকাত ওয়াজিব নয়।’

যেহেতু এগুলো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাবার জাতীয় শস্য বা ফল নয়, তাই এর উপর যাকাত আসবে না। তবে যদি এগুলো টাকার বিনিময়ে বিক্রি করা হয়, যার অংক নিসাব পরিমাণ হয়ে যায়, তাহলে এর মূল্যের উপর এক বছর অতিবাহিত হওয়ার পরে যাকাত ওয়াজিব হবে।

দ্বিতীয় প্রকার: যে সকল প্রাণীর উপর যাকাত ওয়াজিব হয় তা হলো, উট, গরু, ছাগল, ভেড়া ও মহিষ।

যদি এ সকল প্রাণী ‘সায়িমা’ হয় ও মাঠ চড়ে ঘাষ খায় এবং এগুলো বংশ বৃদ্ধির জন্য পালন করা হয় এবং তা নিসাব পরিমাণ হয়, তাহলে এদের যাকাত দিতে হবে। উটের নিসাব ন্যুনতম ৫টি, গরুর ৩০টি, আর ছাগলের ৪০টি।

‘সায়িমা’ ঐ সকল প্রাণীকে বলা হয়, যেগুলো সারা বছর বা বছরের অধিকাংশ সময় চারণভূমিতে ঘাস খেয়ে বেড়ায়। যদি এ সকল প্রাণী ‘সায়িমা’ না হয়, তবে এর উপর যাকাত ওয়াজিব হবে না। কিন্তু ব্যবসার উদ্দেশ্যে পালন করা হলে, সর্বাবস্থায় এগুলোর যাকাত দিতে হবে, যদি তা নিসাব পরিমাণ হয়। আর নিসাবের কম হলে এগুলোর মূল্য অন্য সম্পদের সাথে যুক্ত করে নিসাব পরিমাণ হলে যাকাত দিতে হবে।

তৃতীয় প্রকার: স্বর্ণ-রৌপ্যের উপর (নিসাব পরিমাণ হলে) সর্বাবস্থায় যাকাত ফরয।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ পাক বলেন;

وَالَّذِينَ يَكْنِزُونَ الذَّهَبَ وَالْفِضَّةَ وَلا يُنْفِقُونَهَا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَبَشِّرْهُمْ بِعَذَابٍ أَلِيمٍ. يَوْمَ يُحْمَى عَلَيْهَا فِي نَارِ جَهَنَّمَ فَتُكْوَى بِهَا جِبَاهُهُمْ وَجُنُوبُهُمْ وَظُهُورُهُمْ هَذَا مَا كَنَزْتُمْ لانْفُسِكُمْ فَذُوقُوا مَا كُنْتُمْ تَكْنِزُونَ.
‘যারা সোনা-রূপা জমা করে রাখে অথচ তা আল্লাহর নির্দেশিত পথে ব্যয় করে না। আপনি তাদের যন্ত্রণাদায়ক শাস্তির সংবাদ প্রদান করুন। কিয়ামত দিবসে ঐ সোনা-রূপাকে জাহান্নামের আগুনে উত্তপ্ত করে তা দ্বারা তাদের ললাট, পার্শ্ব ও পৃষ্ঠে ছেকা দেয়া হবে এবং বলা হবে যে, এ হলো তোমাদের সে সকল ধন-সম্পদ, যা তোমরা নিজেদের জন্যে সঞ্চয় করে রাখতে। সুতরাং আজ জমা করে রাখা সম্পদের স্বাদ গ্রহণ করো।’ (তাওবা:৩৪-৩৫)

সোনা-রূপার নিসাব পূর্ণ হলে তার উপর যাকাত ফরয হয়। স্বর্ণের নিসাব হলো ২০ দিনার।

এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন;

ليس عليك شيئ حتى يكون لك عشرون دينارا
‘সোনা বিশ দিনার পরিমাণ হলে তাতে যাকাত ফরয হবে।’ (আবু দাউদ)

দিনার বলতে ইসলামী দিনার উদ্দেশ্য। যার ওজন এক ‘মিছকাল’। ‘মিছকাল’ সমান সোয়া চার গ্রাম। সে হিসাবে সোনার নিসাব হলো ৮৫ গ্রাম। যা দেশীয় মাপে ৭.৫ ভরি হয়।

রূপার নিসাব হলো পাঁচ আওকিয়া।

এ প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেন;

ليس فيما دون خمس اواق صدقة
‘পাঁচ আওকিয়ার কম রূপার উপর যাকাত নেই।’ (বুখারী)

এক আওকিয়া সমান ৪০ দিরহাম। এই হিসেবে রূপার নিসাব হলো ২০০ দিরহাম। আর এক দিরহাম হলো এক মিছকালের সাত দশমাংশ, এর মোট ওজন ১৪০ মিছকাল, যার বর্তমান প্রচলিত ওজন হলো, ৫৯৫ গ্রাম। যা এ দেশীয় মাপে ৫২.৫ ভরি, তা থেকে ৪০ ভাগের ১ ভাগ যাকাত দেয়া ফরয। সোনা-রূপার উপর সর্বাবস্তায় যাকাত ওয়াজিব। চাই এগুলো হাতে বিদ্যমান থাকুক বা অন্য কারো কাছে ঋণ থাকুক।

সোনা-রূপা ছাড়া অন্য সকল খনিজ পদার্থের উপর যাকাত ওয়াজিব নয়। তবে যদি সেগুলো ব্যবসার জন্যে হয়ে থাকে, তবে নিসাব পরিমাণ হলে অবশ্যই যাকাত দিতে হবে।

চতুর্থ প্রকার: ব্যবসায়ী পণ্য। স্থাবর-অস্থাবর সকল প্রকার ব্যবসায়ী পণ্যের উপর যাকাত ওয়াজিব।

বছরান্তে সেগুলোর মূল্য নির্ধারণ করে তার ৪০ ভাগের এক ভাগ যাকাত দিতে হবে। মেশিনারিজ বা খুচরা যন্ত্রাংশ ও এ জাতীয় ক্ষুদ্র পণ্যের ব্যবসায়ীদের কর্তব্য হলো, ছোট-বড় সকল অংশের মূল্য নিধারণ করে নিবে, যাতে কোন কিছু বাদ না পড়ে। পরিমাণ নির্ণয়ে যদি জটিলতা দেখা দেয়, তাহলে সতর্কতামূলক বেশী দাম ধরে যাকাত আদায় করবে, যাতে সে সম্পূর্ণ দায়িত্ত্ব থেকে মুক্ত হতে পারে।

মানুষের নিত্য প্রয়োজনীয় বস্তু যথা খাবার, পানীয়, আসবাবপত্র, বাহন, পোষাক, (সোনা-রূপা ছাড়া) অলংকারসহ ব্যবহার্য পণ্যের ওপর যাকাত আবশ্যক নয়। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাঃ বলেছেন, ‘মুসলিমদের গোলাম, বাদী, ঘোড়া এগুলোর উপর যাকাত নেই।’

যাকাত আদায় করার সময়

যাকাত প্রদানে সক্ষম ব্যক্তির যাকাত ফরজ হওয়ার সাথে সাথে তা আদায় করে দেওয়া ফরজ। বিশেষ কোনো সমস্যা ব্যতীত যাকাত ফরজ হওয়ার মুহূর্ত থেকে আদায় প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা বৈধ নয়, যেমন সম্পদ বিদেশে থাকা অথবা আটককৃত অবস্থায় থাকা।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলা বলেন;

وَءَاتُواْ حَقَّهُۥ يَوۡمَ حَصَادِهِۦۖ
এবং ফল কাটার দিনেই তার হক দিয়ে দাও।
(আনআম: ১৪১)

(وَءَاتُواْ ٱلزَّكَوٰةَ )
আর তোমরা যাকাত আদায় করো। (নূর:৫৬)

এখানে আল্লাহ তাআ’লা অনুজ্ঞাসূচক ক্রিয়াপদ ব্যবহার করেছেন, যার দাবি হলো, অনতিবিলম্বে বাস্তবায়ন করা।

যাকাত আদায় করার দায়িত্ব

যাকাত আদায় করার দায়িত্ব সরকার বা রাষ্ট্রের। কিন্তু সমকালীন দুনিয়ায় ইসলামী অনুশাসন না থাকায় কোথাও যাকাত ভিত্তিক অর্থনীতি চালু নেই। যার কারণে রাষ্ট্রীয়ভাবে তো বটেই ব্যক্তি পর্যায়েও যাকাত আদায়ের ব্যাপারে উদাসীনতা দেখা যায়। কিয়ামতের কঠিন বিপদের দিনে আল্লাহর পাকড়াও থেকে বাঁচতে হলে যাকাত আদায় করতে হবে অবশ্যই। এ ক্ষেত্রে কোনো অজুহাত আল্লাহর কাছে গৃহীত হবে না। প্রতাপশালী বিচারকের সামনে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে অবশ্যই যাকাত আদায় করতে হবে। যেভাবে হোক না কেন যাকাত দিতেই হবে। রাষ্ট্র বা সরকার যাকাত আদায় করতে আসুক বা না আসুক। মসজিদ আছে, ইমাম নেই এই কথা বলে যেমন নামাজ থেকে মাফ পাওয়া যায় না, যাকাত উসুলকারী রাষ্ট্র বা লোক নেই বলে যাকাত আদায়ের কঠিন ফরজ থেকেও পলায়নের সুযোগ নেই। ব্যক্তিগত উদ্যোগে হলেও যাকাত দিতে হবে। অন্যথায় যাকাত অনাদায়ের যে শাস্তি নির্ধারিত আছে তার অবধারিত কবল থেকে মুক্তি পাওয়ার কোন উপায় নেই।

যাকাতের হিসাব ও আদায়ের পদ্ধতি

সম্পদের ৪০ ভাগের একভাগ যাকাত আদায় করা ফরজ। অর্থাৎ শতকরা আড়াই টাকা। কাজেই কারো ৮০,০০০ আশি হাজার টাকা যাকাতযোগ্য সম্পদ থাকলে সে ২,০০০ দুই হাজার টাকা যাকাত দিবে।

যাকাতের অর্থবছর চান্দ্র মাস হিসেবে নির্ধারণ হবে। ধরা যাক কেউ রজব মাসের ৫ তারিখে নেসাবের মালিক হলো। তাহলে আগামী বছর রজবের ৪ তারিখে তার বছর পূর্ণ হবে। ঐ দিন তার নিকট যে সম্পদ থাকবে তার যাকাত আদায় করবে।

আর যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য শর্ত হলো; বছরের শুরু ও শেষে নেসাব পরিমান সম্পদ থাকতে হবে। উপরে উল্লেখিত তারিখ অনুযায়ী রজবের ৫ তারিখে তো তার নিকট নেসাব পরিমান সম্পদ থাকবেই। যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য পরের বছর রজবের চার তারিখে তার নিকট কমপক্ষে নেসাব পরিমান সম্পদ থাকতে হবে। যদি না থাকে তবে তার উপরে যাকাত ফরজ হবে না। নতুনভাবে যেদিন নেসাবের মালিক হবে, সেদিন থেকে নতুন করে বছর শুরু হবে।

পাশাপাশি যাকাত ফরজ হওয়ার জন্য বছরের শুরু ও শেষে নেসাব পরিমান মাল থাকা যথেষ্ট। মাঝখানে যদি মাল কমে যায় এমন কি নেসাব থেকে কমে গেলেও যাকাত ফরজ থাকবে। তবে যদি মাঝখানে পুরো সম্পদ নষ্ট হয়ে যায়, তার কাছে কোন সম্পদ না থাকে, তাহলে পূর্বের হিসাব বাতিল হবে। আবার যখন নেসাবের মালিক হবে, তখন নতুন করে হিসাব ধরা হবে।

তবে মনে রাখতে হবে যে, প্রতিটি মালের উপর বছর পুর্ণ হওয়া জরুরী নয়। বরং যেদিন সে নেসাবের মালিক হবে ঐ দিন থেকে এক বছর পূর্ণ হওয়ার পরই তার নিকট থাকা সকল সম্পদের যাকাত দিতে হবে। যদি বছর পূর্ণ হওয়ার মাত্র দুদিন আগে তার নিকট দশ লক্ষ টাকা আসে, তবে ঐ দশ লক্ষ টাকার যাকাত দিতে হবে। অথচ ঐ টাকা তার নিকট এক বছর থাকেনি। বরং মাত্র দুই দিন ছিল। অনুরুপভাবে নেসাবের বছর পূর্ণ হওয়ার দুই দিন আগে যদি তার থেকে দশ লক্ষ টাকা খোয়া যায়, তবে ঐ দশ লক্ষ টাকার যাকাত দিতে হবে না। মোটকথা; বছরের মাঝে যা আসে ও যা চলে যায় তা ধর্তব্য হবে না। বরং বছরের শেষের সম্পদ হিসাব করা হবে।

যাকাত আদায়ের সময় যাকাত হিসাব করে আদায় করা জরুরী। যেদিন বছর পূর্ণ হবে সেদিন তার যাকাতযোগ্য সকল সম্পদ হিসাব করবে। ব্যবসা থাকলে তার সকল স্টক মিলাবে। অতঃপর শতকরা আড়াই পার্সেন্ট হারে যাকাত আদায় করবে। ধারনা বা আন্দাজ করে যাকাত দিবে না।

সোনা-রুপার যাকাত হিসাব করার ক্ষেত্রে বিক্রয়মূল্য ধর্তব্য হবে। চাই ক্রয়মূল্য কম বা বেশী হোক। যেমন সোনার ভরি ৬০,০০০ টাকা হলে বিক্রি করতে গেলে স্বর্ণকার সাধারণত ৪৫ থেকে ৪৮ হাজার টাকা দেয়। কাজেই এই ৪৫ বা ৪৮ হাজার টাকার যাকাত আদায় করতে হবে। ক্রয়মূল্যের নয়।

আর ব্যবসার পন্যের যাকাত বাজার দর হিসেবে আদায় করতে হবে। চাই তার ক্রয়মূল্য বেশি বা কম হোক। ব্যবসার পন্যের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে তিনটি সুরত হতে পারে।
এক. খুচরা মুল্য।

দুই. পাইকারি মূল্য বা হোল সেল প্রাইস।

তিন. সমস্ত স্টক একত্রে একবারে বিক্রি করলে যত টাকা হয়।

ব্যবসায়ীরা এই তৃতীয় সুরতটি এখতিয়ার করতে পারে। তবে দ্বিতীয় সুরত তথা হোল সেল প্রাইস গ্রহন করার মধ্যেই বেশি সতর্কতা।

সাথে সাথে এটা মনে রাখতে হবে যে, সোনা-রুপা ও ব্যবসার পন্যের যাকাত হিসাবের ক্ষেত্রে যেদিন বছর পূর্ণ হবে এবং যাকাত হিসাব করা হবে, সেদিনের বাজার দর হিসাব করতে হবে। ঐদিন উক্ত জিনিসগুলো বিক্রি করতে গেলে যত টাকা পাওয়া যাবে, তার উপর যাকাত আসবে। আর যে জিনিসের যাকাত আদায় করা হবে তা যে স্থানে রয়েছে সেখানকার বাজারদর হিসেবে যাকাত আদায় করতে হবে। যাকাতদাতার স্থান ধর্তব্য হবে না।

শেষ কথা হলো যে, ইসলাম ব্যক্তিগত মালিকানায় সম্পদ উপার্জনের অনুমতি দিয়েছে। আবার কিছু সংখ্যক লোকের কাছে অঢেল ধন-সম্পদ যাতে একচেটিয়া হয়ে না যায়, তার প্রতিও সতর্ক দৃষ্টি রেখেছে। ইসলাম ব্যক্তি মালিকানা সমর্থন করেছে বটে, কিন্তু ব্যক্তিস্বার্থের প্রধান্যকে সমর্থন করেনি। ইসলাম জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের কল্যাণ সাধন করেছে।

তাই আসুন, আল্লাহর হুকুম, যাকাত আদায় করে, সম্পদের সুষম ব্যবহার নিশ্চিত করি, গরীবদের হক আদায় করে, তাদেরকে সমাজে প্রতিষ্ঠিত করে তুলে অঢেল সওয়াব আর পূণ্যের ভাগিদার হই। আল্লাহ্ আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। আমীন।

লেখক : শিক্ষক ও তরুণ আলেম

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com