সোমবার, ২৩ মে ২০২২, ১০:৪১ পূর্বাহ্ন

সালাম ভালোবাসার অনুপম নিদর্শন

সালাম ভালোবাসার অনুপম নিদর্শন

আব্দুল্লাহ আলমামুন আশরাফী :: মানুষ সামাজিক জীব। সমাজবিহীন হয়ে মানুষ বসবাস করতে পারে না। আবহমান কাল থেকেই মানুষ সমাজবদ্ধ হয়ে বসবাস করে আসছে। আর সামাজিক জীবনে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে পারস্পরিক সৌহার্দ্য সম্প্রীতি আর ভালবাসার সৌধ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। আর সৌহার্দ্য সম্প্রীতি আর ভালোবাসার অনন্য নিদর্শন হচ্ছে সালাম।

সালাম মানে অন্যের জন্য শান্তি কামনা করা। আল্লাহ তায়ালার কাছে অপর মুসলমান ভাইয়ের জন্য শান্তি বর্ষনের দোয়া করা। সালাম ইসলামী সংস্কৃতির এক সমুজ্জ্বল অধ্যায়। সালাম পারস্পরিক সুদৃঢ় সম্পর্ক তৈরিতে এক অব্যর্থ উপায়। সালাম আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে এক সেরা উপহার। সালাম মাটির এই পৃথিবীতে জান্নাতী নিদর্শন। সালাম হাজার বছরের ইতিহাসে এক শ্রেষ্ঠ অভিবাদন।

মৃত্যু পরবর্তী জীবনে একজন মুমিনের জন্য সর্বোচ্চ নিয়ামত হবে আল্লাহর দিদার। জান্নাতবাসিরা নিজ চোখে মহান আল্লাহ রব্বুল আলামিনকে প্রাণভরে দেখবে ও নিজ কানে তাঁর পবিত্র কথা শুনবে। সব নবী-রসুল, সর্বস্তরের জান্নাতিকে তাদের প্রেমাস্পদের সঙ্গে সাক্ষাতের দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে সেদিন নুরের পর্দা উঠিয়ে সর্বপ্রথম আল্লাহ স্বীয় রহমত ও বরকতময় ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলে অভিবাদন করবেন।
ইরশাদ হয়েছে-যেদিন তারা (মুমিনরা) আল্লাহর সাথে মিলিত হবে; সেদিন তাদের অভিবাদন হবে সালাম। তিনি তাদের জন্যে সম্মানজনক পুরস্কার প্রস্তুত রেখেছেন। (সূরা আহযাব, আয়াত- ৪৪)
আল্লাহ জান্নাতিদের সম্বোধন করে বলবেন, ‘তোমাদের প্রতি দয়াময় রবের পক্ষ থেকে চিরস্থায়ী সালাম।’ (সুরা ইয়াসিন-আয়াত ৫৮)

কিয়ামতের ময়দানে হিসাব-নিকাশ শেষে জান্নাতিরা জান্নাতে যাওয়ার পথে কোটি কোটি ফেরেশতা সালাম দিয়ে তাদের জান্নাতের দরজায় অভিবাদন করবেন।

ইরশাদ হয়েছে-যারা তাদের পালনকর্তাকে ভয় করত তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। যখন তারা উম্মুক্ত দরজা দিয়ে জান্নাতে পৌছাবে এবং জান্নাতের রক্ষীরা তাদেরকে বলবে, তোমাদের প্রতি সালাম, তোমরা সুখে থাক, অতঃপর সদাসর্বদা বসবাসের জন্যে তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর। (সূরা যুমার- ৭৩)
ছেলেসন্তান লাভের সুসংবাদ ও আল্লাহর নাফরমানিতে লিপ্ত কওমে লুতকে শাস্তি দেওয়ার জন্য আল্লাহর প্রেরিত ফেরেশতারা যখন হজরত ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে আগমন করলেন তারা বললেন ‘সালাম’, তিনি বললেন আপনাদের প্রতিও সালাম, আপনারা অপরিচিত। সূরা যারিয়াত- ২৫)

মানব সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকেই সালামের প্রচলন। আল্লাহ যখন হজরত আদম (আ.)-কে সৃষ্টি করলেন তখনই তাঁকে সালামের শিক্ষা ও নির্দেশ দেন। নবী করিম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন, ‘আল্লাহ হজরত আদম (আ.)-কে যখন সৃষ্টি করলেন তখন বললেন যাও সামনে অবস্থানরত ফেরেশতাদের বিশাল একটি জামাতকে সালাম কর আর তারা তোমার সালামের কী উত্তর দেয় তা শ্রবণ কর এবং তাই হবে তোমার ও তোমার সন্তানদের সালামের পদ্ধতি। তখন হজরত আদম (আ.) সামনে এগিয়ে বললেন আসসালামু আলাইকুম, জবাবে ফেরেশতারা বললেন, আসসালামু আলাইকা ওয়া রহমাতুল্লাহ। [রসুলুল্লাহ (সা.) বলেন,] তারা ওয়া রহমাতুল্লাহ অংশটি বৃদ্ধি করে বলেছেন।’ বুখারি- (৩৩২৬)

সালাম ভালবাসার নিদর্শন। সালাম সমাজে ভালোবাসার বার্তা ছড়িয়ে দেয়। আর পারস্পরিক সৌহার্দ্য সম্প্রীতি বজায় রাখা ইসলামের অনন্য শিক্ষা। তাই মানবজাতির মহান শিক্ষক রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভালবাসাময় সমাজ গঠন করতে ব্যাপকভাবে সালামের প্রচার করার নির্দেশনা দিয়েছেন।

আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত,রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলেন, ‘তোমরা ততক্ষণ পর্যন্ত জান্নাতে প্রবেশ করবে না যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে পারবে না। আর ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরা পরিপূর্ণ ঈমানদার হবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত তোমরা একে অপরকে ভালবাসবে না, আমি কী তোমাদেরকে এমন একটি জিনিস বাতলেয়ে দেব যা করলে, তোমরা পরস্পর পরস্পরকে ভালো বাসবে? তারপর তিনি বললেন, তোমারা বেশি বেশি করে সালামকে প্রসার কর” । [সহীহ্ মুসলিম-৫৫]। আগে আগে সালাম দেয়া অহংকারমুক্ত স্বচ্ছ হৃদয়ের পরিচায়ক।

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে আগে সালাম দেয় সে অহংকারমুক্ত।’(শুয়াবুল ইমান- ৮৭৮৬)

কুরআনুল কারিমে আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদের ঘর ছাড়া অন্য কারও ঘরে প্রবেশ করো না যতক্ষণ না তোমরা অনুমতি নেবে এবং ঘরবাসীকে সালাম দেবে, এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। (সূরা নুর আয়াত ২৭)

আল্লাহ অন্যত্র বলেন, ‘তোমরা যখন কোনো ঘরে প্রবেশ করবে তখন তোমরা নিজেদের ওপর সালাম করবে, আল্লাহর পক্ষ থেকে বরকতপূর্ণ ও পবিত্র অভিবাদন-স্বরূপ।’ (সূরা নুর আয়াত ৬১)
আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন তোমাদের সালাম দেওয়া হবে তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম সালাম দেবে, অথবা জবাবে তা-ই দেবে।’ (সূরা নিসা আয়াত ৮৬)

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. থেকে বর্ণিত,প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করা হলো উত্তম আমল কী? তিনি বললেন, ‘মানুষকে খাবার খাওয়ানো এবং তুমি যাকে চেন আর যাকে চেন না সবাইকে সালাম দেওয়া।’ (সহীহ বুখারি- ১২)

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে সালাম রা. বলেন- রাসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) মদিনায় পদার্পণ করলে লোকেরা তাঁকে দেখার জন্যে ভিড় জমায় এবং বলাবলি হয় যে, রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এসেছেন। আমিও লোকেদের সাথে তাঁকে দেখতে গেলাম। আমি রসূলুল্লাহ (সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর চেহারার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলাম যে, এ চেহারা কোন মিথ্যাবাদীর চেহারা নয়। তখন তিনি সর্বপ্রথম যে কথা বললেন তা হলো : হে লোকসকল! তোমারা পরস্পর সালাম বিনিময় করো, অভুক্তকে আহার করাও এবং রাতের বেলা মানুষ যখন ঘুমিয়ে থাকে তখন সালাত পড়ো। তাহলে তোমারা নিরাপদে জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে। (জামে তিরমিযী-২৪৮৫, সুনানে দারিমী ১৪৬০, সুনানে ইবনু মাজাহ ৩২৫১)

তাই আসুন ব্যাপকভাবে সালামের প্রচার প্রসার করে সমাজে সৌহার্দ্য সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দেই। আর নিরাপদে জান্নাত লাভের পথ সুগম করি।

লেখক : মুহাদ্দিস, জামিয়া গাফুরিয়া মাখযানুল উলুম ঢাকা

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com