রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:২২ অপরাহ্ন

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি

সেলিনা আক্তার : ছয় বছর আগে চাঁদপুরের মতলব উপজেলার আনসার আলী নদীভাঙনে গৃহহীন হয়ে পড়ে। পাঁচ সদস্যের পরিবার নিয়ে কিছুদিন খোলা আকাশের নিচে থাকতে হয়। তারপর এক আত্মীয় তার বাড়ির রান্না ঘরে তাদের থাকতে দেয়। আর্থিক সঙ্গতি না থাকায় জমি কিনে ঘর তোলা সম্ভব হয়নি। কখনও বাড়ি করতে পারবে সেটা ভাবেনি। মতলব উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে আশ্রয়ণ-২ প্রকল্পের আওতায় সরকারি খাসজমিতে ছোটো চরকালিয়া প্রকল্পে আনসার আলীর পরিবারের একটি স্থায়ী থাকার জায়গা হয়েছে।

আনছার আলীর মতো আমাদের দেশে অসংখ্য পরিবার রয়েছে যাদের বাড়িঘর বলতে কিছুই নেই। শহরের ফুটপাত, রাস্তা কিংবা রেললাইনের পাশে বা বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চঘাটে কোনোরকম খুপড়ি ঘরে, কখনো বা খোলা আকাশের নিচে থাকতে হচ্ছে অসংখ্য মানুষকে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় সরকার নানাভাবে এ সকল মানুষের থাকার ব্যবস্থা করতে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

বাছিরনের বয়স সত্তরের কাছাকাছি। বয়সের ভারে ন্যুব্জ, চোখেও তেমন দেখেন না, কানেও ভালোভাবে শোনেন না। স্বামী মারা গেছেন ৭-৮ বছর আগে। বাছিরনের কোনো ছেলে নাই। মেয়ে থাকলেও স্বামীর সংসারেই টানাটানি। বাছিরনের দেখাশোনা করার মতো কেউ নেই বললেই চলে। তার গ্রামের একজন এই অবস্থা দেখে তাকে কুড়াগাছা ইউনিয়নের সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডে নিয়ে যান এবং তাকে বয়স্কভাতা পাবার সুযোগ করে দেন।

বাংলাদেশের সংবিধানের ১৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদনশক্তির ক্রমবৃদ্ধি সাধন এবং জনগণের জীবনযাত্রার বস্তু ও সংস্কৃতিগত মানের দৃঢ় উন্নতি সাধন- যাতে নাগরিকের জন্য অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করা যায়। সরকার সবসময় নাগরিকের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সচেষ্ট।

গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো মানুষ না খেয়ে মারা যাবে, আর্থিক অনটনে জীবনের মৌলিক চাহিদা পূরণ করতে পারবে না বা বাসস্থানের অভাবে বাস্তুহীন বসবাস করবে এটা কাম্য হতে পারে না। তাই কল্যাণ রাষ্ট্রে সামাজিক নিরাপত্তা বলতে সামাজে বসবাসের জন্য আইনগত অধিকারকে ছাপিয়ে মানুষের আর্থিক, বাসস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও খাদ্যের নিরাপত্তা সামনে চলে এসেছে।

বাংলাদেশের সংবিধানের অনুচ্ছেদ ২৮(১) এ আছে; কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষ ভেদে বা জন্মস্থানের কারণে কোনো নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করবে না। সে প্রেক্ষিতে সরকার সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাধ্যমে সকল প্রকার বৈষম্য হ্রাসে উল্লেখযোগ্য কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বয়স্কভাতা, বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা মহিলাদের ভাতা, অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা, প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা উপবৃত্তি, হিজড়া জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি, বেদে ও অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন কার্যক্রম, ক্যান্সার কিডনী ও লিভার সিরোসিস রোগীদের আর্থিক সহায়তা কর্মসূচি, চা শ্রমিকের জীবনমান উন্নয়ন কর্মসূচি, সুদমুক্ত ঋণ ইত্যাদি।

বাংলাদেশের সামাজিক নিরাপত্তার ইতিহাস অনেক পুরোনো। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে যুক্তফ্রন্ট সরকারের সর্বকনিষ্ঠ মন্ত্রী হিসেবে ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। তাঁর প্রধান কাজ ছিল সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম সচল রাখা। এরপর স্বাধীন বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর বিশেষ গুরুত্বারোপ করা হয়।

সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বিভিন্ন সময়ে সরকার বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গীতে বিবেচনা ও উপস্থাপন করেছে। তবে এর মূল লক্ষ্য ছিল সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বাসস্থান ইত্যাদির নিশ্চয়তা বিধান করা।

মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে তাঁর প্রধান দশটি অগ্রাধিকার কর্মসূচির অন্যতম হিসেবে গ্রহণ করেছেন। বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার মূল অংশীজন হলো জলবায়ুর বিরূপ প্রভাব ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠী এবং বিভিন্ন কারণে সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী। এদের জীবনমানের উন্নয়ন ব্যতীত উন্নয়নশীল বাংলাদেশ বা উন্নত বাংলাদেশ বিনির্মাণ সম্ভব নয়। সে আলোকে সরকারের জাতীয় সামাজিক নিরাপত্তা কৌশল ঠিক করা হয়েছে। এ কৌশল অনেকটা মানবিক ও সামাজিক মূল্যবোধতাড়িত।

বর্তমানে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে ১৪৫টি কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। ১৪৫টি কর্মসূচি বাস্তবায়ন মানে হলো ১৪৫ শ্রেণির মানুষ এ খাত থেকে উপকৃত হচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের হিসেব মতে ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ১৪৫টি কর্মসূচির মাধ্যমে ৮ কোটি ১০ লক্ষ লোক কোনো না কোনোভাবে উপকৃত হয়েছে। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রধান ৯টি খাত হলো- কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন, খোলাবাজারে খাদ্য শস্য বিক্রয় (ওএমএস), কাজের বিনিময়ে খাদ্য/টাকা, টেস্ট রিলিফ, ভিজিএফ, অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসৃজন কর্মসূচি, শিক্ষাবৃত্তি, উপবৃত্তি, বয়স্কভাতা ও ভিজিডি। এ ৯টি খাতে সরকারের ব্যয় হয় বরাদ্দের প্রায় ৭০ শতাংশ। আর সুবিধাভোগীর ৭০ শতাংশ হলো খোলা বাজারে খাদ্যশস্য বিক্রয়, ভিজিএফ, জিআর, উপবৃত্তি ও অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসূচি-এ ৫টি খাতে।

অর্থমন্ত্রণালয়ের এক হিসেবে দেখা যায় ১৯৯৮ সালে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে জিডিপি’র ১.৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০১১ সালে ২.৩ শতাংশ হয়েছে। এরপর থেকে বার্ষিক বাজেট ক্রমাগত বৃদ্ধি পেলেও এ খাতে বরাদ্দ জিডিপি’র ২ শতাংশের অধিকই রাখা হয়। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে এ খাতে ৩০,৬৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৬৪,৬৫৬ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০১৮-১৯ অর্থবছরের বরাদ্দ জিডিপির ২.৫৫ শতাংশ এবং বাজেটের ১৩.৯২ শতাংশ। ২০০৫-০৬ অর্থবছরে এ খাতে বরাদ্দ ছিল ৩৭৩.২ কোটি টাকা।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রভাবে উত্তরাঞ্চলের ‘মঙ্গা’ দুরীভূত হয়েছে। ২০০০ সালে দারিদ্র্যের হার ৪৮.৯ শতাংশ, ২০০৫ সালে ৪১.৫ শতাংশ, ২০১০ সালে ৩১.৫ শতাংশ, ২০১৫ সালে ২৪.৮ শতাংশ ও সর্বশেষ ২০১৮ সালে ২১.৮ শতাংশে নেমে এসেছে। যে দেশে এক সময়ে মানুষ কাজ না পেয়ে অনাহারে দিন কাটিয়েছে সেখানে এখন গ্রামগঞ্জে কাজের লোক পাওয়া কষ্টকর হয়ে পড়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় ২০০৯ সাল থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত সময়ে অতিদরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান কর্মসূচি (ইজিপিপি) এর আওতায় ৭৮ লক্ষ গ্রামীণ বেকার মজুরের জন্য ৪০ দিনের কর্মসংস্থান করেছে। গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থানের আরেকটি উৎস কাবিখা/কাবিটা কর্মসূচি। এ কর্মসূচির মাধ্যমে ২০ লক্ষ ৩১ হাজার মেট্রিকটন খাদ্যশস্য ও ৪১৬৬ কোটি টাকার বিনিময়ে বিগত ১০ বছরে ১ কোটি ৬২ লক্ষ লোকের কর্মসংস্থান হয়েছে। এসময়ে বিভিন্ন দুর্যোগ-দুর্বিপাকে বিশেষত বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, নদীভাঙ্গন অগ্নিকাণ্ড ইত্যাদি দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত ৬ কোটি ৩৩ লক্ষ মানুষ খাদ্য সহায়তা পেয়েছেন এবং ১ কোটি ৯ লক্ষ ৭৬ হাজার মানুষ ১৯৩ কোটি টাকার অর্থ সহায়তা পেয়েছেন। সরকারের একটি প্রতিশ্রুতি ছিল যে কোনো মানুষ যাতে দুর্যোগ-দুর্বিপাকে খাদ্যকষ্ট না পায়। শুধু খাদ্য ও আর্থিক সহায়তাই নয়, নদীভাঙ্গন, পাহাড়ি ঢল, পাহাড় ধস ইত্যাদির কারণে ঘর হারিয়েছেন এমন ২ লক্ষ ৫০ হাজার মানুষকে ঢেউটিন ও নগদ ১০২ কোটি টাকার গৃহনির্মাণ মঞ্জুরি দেওয়া হয়।

কাজের সংস্থান হওয়ায় মানুষের খাদ্যের নিরাপত্তা ও বৈচিত্র বেড়েছে। খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত হওয়ায় নিরক্ষর জনগোষ্ঠী অক্ষর জ্ঞান অর্জনে অনুপ্রাণিত হয়েছে। ২০০৯ সালে সাক্ষরতার হার ৫৬.৭ থেকে বৃদ্ধি পেয়ে ২০১৮ সালে ৭২.৩ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। মাথাপিছু আয় ২০০৫-০৬ সালের ৫৪৩ মার্কিন ডলার থেকে বেড়ে ২০১৮-১৯ সালে ১৭৫১ মার্কিন ডলারে উন্নীত হয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তার একটি বড়ো অংশ দেখাশোনা করেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। দুস্থ, দরিদ্র, অবহেলিত, অনগ্রসর, সুবিধাবঞ্চিত ও সমস্যাগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সামাজিক নিরাপত্তা সেবা দিয়ে থাকেন এ মন্ত্রণালয়। তাদের মূল কর্মসূচিগুলোর মধ্যে হলো- বয়স্কভাতা (৪০ লক্ষ জন), বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতা ভাতা (১৪ লক্ষ জন), অসচ্ছল প্রতিবন্ধী ভাতা (১০ লক্ষ জন), প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তি (৯০ হাজার জন) ও এতিম শিশুদের ক্যাপিটেশন গ্রান্ট (৮৬,৪০০ জন)। এ কয়েকটি খাতে এ মন্ত্রণালয় ২০১৮-১৯ অর্থবছরে ৪২৬৪ কোটি টকা বরাদ্দ করেছে। বিভিন্ন দুরারোগ্য রোগে আক্রান্ত এমন ১৫ লক্ষ লোকের সহায়তার জন্য ৭৫ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি বিশ্বের প্রায় সকল দেশে বিভিন্ন আকারে ও ধরনে বিদ্যমান আছে, বিদ্যমান থাকবে। বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত গরিব ও অসহায় মানুষদের নিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি আবেষ্টিত। আবার সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশনসহ অন্যান্য সুবিধাও দেওয়া হয় সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় এর প্রয়োজনীয়তা আছে বলেই উন্নত দেশেও এর প্রচলন রয়েছে। বাংলাদেশে বিশেষ করে জলবায়ু পরিবর্তন ও দুর্যোগ ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য এর পরিধি বিস্তৃত হোক-এ প্রত্যাশা আমাদের সকলের।

লেখক : কলামিস্ট

২৭.০৮.২০১৯

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com