শনিবার, ১৫ জানুয়ারী ২০২২, ১০:৫৭ অপরাহ্ন

সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানির চিন্তাধারা

সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানির চিন্তাধারা

সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানির চিন্তাধারা

মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

শায়খুল আরবে ওয়াল আজম মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. ১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দের ৬ মে (১২৯৬ হিজরী ১৯শে শাওয়াল) ভারতের ফায়জাবাদ জেলার ট্যান্ডায় জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর মাতা-পিতা উভয়েই হুসাইন রহ. এর বংশধর ছিলেন। তাঁর ১৯ তম পূর্ব পুরুষেরা দ্বীন ইসলাম প্রচার করার জন্য ভারতবর্ষে এসেছিলেন। সুলতানী যুগ থেকেই তাঁরা ভারতের জায়গীরদার ও জমিদারী লাভ করেছিলেন। আর এক সময় উপমহাদেশ পরাধীন ছিল। এই দেশকে স্বাধীন করার জন্য আলেমগণ ময়দানে অবতীর্ণ হোন। তারা ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য সম্মুখসমরে লড়াই করেছেন। ইমাম শাহ্ ওয়ালিউল্লাহ স্বাধীনতার খসড়া রূপরেখা তৈরি করেন। সিরাজুল হিন্দ শাহ্ আব্দুল আযীয এর নীতিমালা প্রণয়ন করেন। সাইয়্যিদ আহমদ শহীদ বিপ্লবের সূচনা করেন। হাজী ইমদাদুল্লাহ্, রশীদ আহমদ গাঙ্গুহি ও কাসেম নানুতবী শামেলির ময়দানে যুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। শায়খুল হিন্দ এই দেশের স্বাধীনতার জন্য আফগান, মস্কো, জার্মান, তুর্কি ও হেযাযসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সফর করে ও তার ছাত্রদের পাঠিয়ে বিশ্বব্যাপী জনমত গঠন করেন। উবায়দুল্লাহ সিন্ধী ভারতের স্বাধীনতার জন্যে দীর্ঘ ২৩ বছর স্বেচ্ছায় নির্বাসিত জীবনযাপন করেন। ভারতের স্বাধীনতার সূচনা ১৯৫৭ সাল থেকে নয় বরং ১৮০৩ সাল থেকে শুরু হয়। এই স্বাধীনতা ভারতবর্ষের আলেমগণের দীর্ঘ সংগ্রাম, ত্যাগ আর জীবনের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে। শত শত আলেম ফাঁসির দড়িতে ঝুলে শাহাদাতের অমীয় সুধা পান করেছেন। হাজার হাজার আলেম মাল্টা ও আন্দামানে দ্বীপান্তারিত হয়েছেন। মহাত্মা গান্ধীকে সারা দেশে পরিচিত করতে মাওলানা শওকত আলী, মাওলানা জওহর আলী এবং মাওলানা আবুল কালাম আজাদ কলম ও বাগ্মিতার শক্তি প্রদর্শন করেছেন।শায়খুল হিন্দ নিঃস্বার্থ নির্লোভ একদল আলেম যারা জীবনের সকল সুখ শান্তি,জাগতিক আরাম-আয়েশ, ঘরবাড়ি সব কিছু দেশ ও জাতির মুক্তির জন্য উৎসর্গ করেছিলেন তাদের নিয়ে ‘জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ’ প্রতিষ্ঠা করেন। তার উত্তরসূরিদের মধ্যে হুসাইন আহমদ মাদানী, কিফায়েত উল্লাহ দেহলবি, আহমদ সাঈদ,হিফযুর রহমান সিহরাবি,আবুল মাহাসিন সাজ্জাদ প্রমুখ এর হাল ধরেন ও দেশকে স্বাধীনতায় পৌঁছে দেন।

বিশেষ করে শায়খুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী ভারতের স্বাধীনতার প্রশ্নে কখনো ব্রিটিশদের সঙ্গে আপোস করেননি।মাওলানা হুসাইন আহমদ মাদানী ১৮৭৯ সালে ভারতের উত্তর প্রদেশের উন্নাও জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। পিতা সাইয়্যিদ হাবিবুল্লাহ ছিলেন ফজলে রহমান গঞ্জেমুরাদাবাদীর খলিফা। প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনের পর তিনি দারুল উলূম দেওবন্দে উচ্চশিক্ষার জন্য আসেন এবং শায়খুল হিন্দের কাছে হাদীস, তাফসীর ও ফিকহে ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। ইংরেজদের নির্যাতন নিপীড়নে অতিষ্ঠ হয়ে তার পরিবার মদীনায় হিজরত করেন। তখন তার মুর্শিদ রশীদ আহমদ গাঙ্গুহি তাকেও হিজরত করে মদীনায় গিয়ে হাজী ইমদাদুল্লাহর সঙ্গে সাক্ষাতের আদেশ করেন। মাওলানা হুসাইন আহমদ মদীনায় রওজা শরীফের পাশে দীর্ঘ ১৮ বছর হাদীস,তাফসীর ও চার মাযহাবের ফিকহের দরস প্রদান করেন। তিনি সেখানে শাহ্ ওয়ালিউল্লাহর গবেষণার আলোকে লেকচার প্রদান করতেন। পাশাপাশি তিনি কাসেম নানুতবী ও শায়খুল হিন্দের তাহকীকাত পেশ করতেন এবং মাঝেমধ্যে আবেগে আপ্লুত হয়ে বলতেন, ‘আমাদের হিন্দুস্থানের শায়খ এভাবে ব্যাখা করেছেন’। ফলে হেযাযভূমির আন্তর্জাতিক ছাত্র ও শায়খদের নিকট শায়খুল হিন্দ খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠেন এবং ছাত্ররা তার সাক্ষাত লাভ করে হাদীসের সনদ অর্জনের প্রতিক্ষায় থাকতেন। তার জ্ঞান ও পাণ্ডিত্যে মুগ্ধ হয়ে আরবের শায়খগণ তাকে ‘শায়খুল ইসলাম’ উপাধিতে ভূষিত প্রদান করেন।শায়খুল হিন্দ ১৯১৫ সালে মদিনায় গমন করে খলিল আহমদ সাহারানপুরি ও হুসাইন আহমদ মাদানীকে রেশমী রুমাল আন্দোলনের পরিকল্পনার কথা জানালে তারা সানন্দে তার সহযোগী হোন। পরবর্তীতে মক্কায় ব্রিটিশদের অনুগত শরীফ হুসাইন বয়োবৃদ্ধ শায়খুল হিন্দকে গ্রেফতার করলে মাদানী উস্তাদের সেবার জন্য স্বেচ্ছায় কারাবরণ করেন। দীর্ঘ তিন বছর ৭ মাস মাল্টায় নির্বাসনে থেকে ১৯২০ সালে মুক্তিলাভ করেন। এসময় তিনি সম্পূর্ণ কোরআনের হিফজ সম্পন্ন করেন। শায়খুল ইসলাম আজীবন শায়খুল হিন্দের নীতি ও আদর্শের ভিত্তিতে রাজনীতি করেছেন।মাল্টার বন্দিজীবন থেকে ভারতবর্ষে প্রত্যাবর্তনের পর শায়খুল হিন্দ অনেক অসুস্থ হয়ে পড়েন, তখন তিনি তাকে তার পূর্বসূরি হিসেবে তার হাতে ভারতের স্বাধীনতা, বিপ্লব আর আযাদী আন্দোলনের অসমাপ্ত দায়িত্ব অর্পন করেন।

ফলে তিনি ভারতবর্ষে থেকে যান এবং বিভিন্ন মাদরাসায় হাদীসের দরস প্রদানের পরে ১৯২৭ সালে দারুল উলুম দেওবন্দের ‘সদরুল মুদাররিসীন’ পদ অলংকৃত করেন। আমৃত্যু তিনি দেওবন্দে সহীহ বুখারী ও জামে তিরমিজীর দরস প্রদান করেছেন। তার কাছে নিয়মিত দরসের মাধ্যমে ৪৪৭৩ জন আলেম হাদীসের সনদ অর্জন করেন। (কারী মুহাম্মদ তায়্যিব,তারীখে দারুল উলুম দেওবন্দ, খণ্ড-২,পৃ-২০৯) শায়খুল হিন্দের মৃত্যুর পরের সময় ছিল স্বাধীনতা আন্দোলনের সবচেয়ে জটিল ও স্পর্শকাতর মুহূর্ত। হুসাইন আহমদ মাদানী পরম অবিচলতা ও বহু ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে আকাবির উলামার পবিত্র আমানত ১৯৪৭ সালে সাফল্যের চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছে দেন। তিনি ১৯১৬ সাল হতে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত মোট ৩১ বছর স্বাধীনতা সংগ্রাম করেন। এর মধ্যে ৮ বছর অতিবাহিত হয় ইংরেজদের জেলখানায়।করাচীর জেলে তার প্রদত্ত ভাষণ সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। (ড. মুশতাক আহমদ,শায়খুল ইসলাম সাইয়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানী,পৃ-৩০১)আরবে এবং মাল্টার কারাগারে থাকা অবস্থায় মাদানীর আন্তর্জাতিক নেতৃবৃন্দ ও রাজবন্দীদের সঙ্গে আলোচনার সুযোগ হয়। ফলে তিনি বিশ্ব পরিস্থিতি ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির সুস্পষ্ট ধারনা নিতে সক্ষম হোন এবং বিগত অষ্টাদশ, ঊনবিংশ ও বিংশ শতকে মুসলিম ভূখণ্ডে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের জুলুম ও চক্রান্ত তার অজানা ছিল না। এজন্য তার দর্শন ছিল ভারতের সকল জাতি, ধর্ম,বর্ণ মিলে আগে ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীনতা অর্জন করতে হবে তারপর শরীয়াহ আইন কায়েমের সংগ্রাম পরিচালনা করা হবে। আর ভারতের স্বাধীনতা আন্দোলনে হুসাইন আহমদ মাদানীর ঐতিহাসিক অবদানকে স্মরণ করে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি ড. রাজেন্দ্র প্রসাদ শাস্ত্রী তাকে ‘পদ্মভূষণ’ খেতান প্রদান করেন।

কিন্তু খোদাভীরু, দেশপ্রেমিক আকাবিরগণের প্রতিনিধি মাদানী বিনয়ের সাথে এই খেতাব ফিরিয়ে দেন এবং একটি ঐতিহাসিক চিঠি লেখেন যা ইতিহাসের অনন্য দলিল হয়ে রয়েছে। (আল জমিয়ত পত্রিকা, শায়খুল ইসলাম সংখ্যা, পৃ-৩২)ব্যক্তি জীবনে শায়খুল ইসলাম ছিলেন পরিপূর্ণ সুন্নতের পাবন্দি নির্মোহ এবং খোদাভীরু। যাকারিয়া কান্ধলবি বলেন, ‘আমার পিতা ইয়াহইয়া কান্ধলবি আর মাদানীর মতো তাহাজ্জুদে আল্লাহর ভয়ে এতো বেশি হাউমাউ করে কাউকে কাঁদতে দেখিনি। মনে হতো কোন শিশুকে পেটানো হচ্ছে আর সে মা মা বলে কাঁদছে।’ (মুহাম্মদ যাইনুল আবিদীন, প্রিয় লেখক প্রিয় বই,পৃ-১৫)১৯৫৫ সালে শেষবার হজে গমন করলে হেযাযের বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকে তাকে ‘শায়খুল আরব ওয়াল আজম’ খেতাব দিয়ে প্রবন্ধ-নিবন্ধ ছাপা হয়। মদিনা থেকে বিদায় বেলা তিনি ৩ ঘণ্টা রওজা শরীফে দাঁড়িয়ে অশ্রু বিসর্জন করেন। ১৯৫৭ সালে স্বাধীনতা আন্দোলনের এই কীর্তিমান পুরুষ, মহান নেতা মৃত্যুবরণ করেন।

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক, দৈনিক স্বাস্থ্য তথ্য

drmazed96@gmail.com

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com