মঙ্গলবার, ১১ অগাস্ট ২০২০, ০৮:৩৫ অপরাহ্ন

সম্ভাবনাময় পায়রা সমুদ্র বন্দর

সম্ভাবনাময় পায়রা সমুদ্র বন্দর

বিশেষ নিবন্ধ । মো: জাহাঙ্গীর আলম খান

সম্ভাবনাময় পায়রা সমুদ্র বন্দর

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন আধুনিক বন্দর ব্যবস্থায় সমৃদ্ধ ও সমুদ্র বাণিজ্য নির্ভর। বন্দর সুবিধাদির ব্যবহার গড়ে ১২% হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। বর্তমান জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ৭% ধরে ২০২১ সালের মধ্যে একটি মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার লক্ষ্যে ৫০ বিলিয়ন মেট্রিক টন পোশাক রপ্তানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের জন্য দেশে কয়েকটি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিভক্ত করা হয়েছে। উক্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলের মাধ্যমে আমদানি ও রপ্তানি বৃদ্ধির কারণে বন্দর সুবিধাদির সক্ষমতা এবং সংখ্যা বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি হয় পড়ে।

জলগভীরতা সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে অধিক গভীরতা এবং বৃহৎ আকারের জাহাজ দেশে বিদ্যমান দুটি বন্দরে নোঙ্গর করতে পারে না। এ অবস্থায় আধুনিক বন্দর সুবিধাদি অনুযায়ী জাহাজ নোঙ্গরের ব্যবস্থাকরণ অর্থাৎ অধিক গভীরতা সম্পন্ন মাদার ভেসেলকে বন্দর সুবিধাদি ব্যবহারের উপযুক্ত করে গড়ে তোলা অপরিহার্য। এ বাস্তবতা উপলব্ধি করেই বিদ্যমান বন্দরের পাশাপাশি নতুন গভীর সমুদ্র বন্দর গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়।

আন্তর্জাতিকমানের সমুদ্র বন্দরের সুবিধা সৃষ্টি করে দক্ষ বন্দর ব্যবস্থাপনা, নিরাপদ জাহাজ চলাচল এবং বন্দর ব্যবহারকারীদের সেবা প্রদানের মাধ্যমে বৈদেশিক বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অনগ্রসর দক্ষিণাঞ্চলসহ দেশে ব্যাপক শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির মাধ্যমে দেশের সার্বিক আর্থসামাজিক উন্নয়নের কথা বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৩ সালের ১৯ নভেম্বর দেশের দক্ষিণাঞ্চলে পটুয়াখালী জেলার রাবনাবাদ চ্যানেলে পায়রা সমুদ্র বন্দর নামে দেশের ৩য় সমুদ্র বন্দরের শুভ উদ্বোধন করেন।

পায়রা বন্দর প্রকল্পটি সরকারের ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বন্দরটি নির্মাণের কাজ দ্রুততার সাথে এগিয়ে চলেছে। ২০১৬ সালে যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এইচ আর ওয়েলিংফোর্ড মাধ্যমে পায়রা সমুদ্র বন্দর উন্নয়নের জন্য একটি কনসেপচুয়াল মাস্টারপ্ল্যান প্রস্তুত করা হয়। উক্ত পরিকল্পনায় পায়রা বন্দরের সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রমকে ১৯টি কম্পোনেন্টে বিভাজন করা হয়। এরমধ্যে ১২টি কম্পোনেন্ট পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক সরকারি, অন্যান্য দেশের (জিটুজি) অর্থায়ন এবং সরকারি-বেসরকারি অংশিদারিত্ব (পিপিপি) এর ভিত্তিতে বাস্তবায়িত হবে এবং অপর সাতটি কম্পোনেন্ট নিজ নিজ কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় কর্তৃক বাস্তবায়িত হবে। পায়রা বন্দরকে পরিকল্পিত এবং একবিংশ শতাব্দী উপযোগী একটি আন্তর্জাতিকমানের সমুদ্র বন্দর হিসেবে প্রতিষ্ঠার জন্য এর সার্বিক উন্নয়ন কার্যক্রমকে সরকার তিনটি ধাপে যথা- স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে।

পায়রা গভীর সমুদ্র বন্দরের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো/সুবিধাদির উন্নয়নের লক্ষ্যে ৩,৩৫০.৫১ কোটি টাকা ব্যয়ে ৬,৫৬২.২৭ একর ভূমি অধিগ্রহণ, ৫.২২ কিলোমিটার সংযোগ সড়ক নির্মাণ, সাতটি জলযান নির্মাণ/ক্রয় এবং অভ্যন্তরীণ নৌ-রুটে ড্রেজিং কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। ভূমি অধিগ্রহণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত ৩,৫০০টি পরিবারের পুনর্বাসন ও প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। পায়রা বন্দরের ডিটেইল মাস্টারপ্ল্যান ও অন্যান্য ডকুমেন্টস প্রস্তুতির লক্ষ্যে বিআরটিসি, বুয়েট ও নেদারল্যান্ডভিত্তিক Royal Haskoning DHV এর সাথে ২০১৯ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী কার্যক্রম চলমান রয়েছে।

উল্লেখ্য যে, ২০১৬ সালের আগস্টে সীমিত পরিসরে পায়রা বন্দরের অপারেশনাল কার্যক্রম শুরুর পর এ পর্যন্ত ৪৪টি জাহাজ বন্দরে প্রবেশ করেছে যা থেকে সরকার প্রায় ১০০ কোটি টাকার রাজস্ব আয় করেছে এবং পায়রা বন্দর কর্তৃপক্ষ প্রায় ৫ কোটি টাকা আয় করেছে। ২০১৬ সালের আগস্ট থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বন্দরে ৯,৬৭,০৭২ মেট্রিক টন পণ্য হ্যান্ডলিং করা হয়েছে। ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে প্রথম ধাপের কয়লাকেন্দ্রিক বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের কাজ শেষ হওয়ায় প্রতিদিন প্রায় দু’টি জাহাজ বন্দরে আসা শুরু করেছে।

মধ্যমেয়াদি কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ইতোমধ্যে ০৪টি প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। প্রকল্পগুলো হলো পায়রা বন্দর হতে খালাসকৃত মালামাল দেশের অন্যত্র পরিবহণের লক্ষ্যে রাবনাবাদ চ্যানেল সংলগ্ন এলাকায় নূন্যতম অবকাঠামো যেমন-সংযোগসড়ক, আন্দারমানিক নদীর উপর সেতু ও ৬৫০ মিটার দৈর্ঘে্যর জেটিসহ একটি টার্মিনাল নির্মাণের লক্ষ্যে পায়রা বন্দরের প্রথম টার্মিনাল প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ০৪ নভেম্বর একনেক সভায় অনুমোদিত হয়। প্রকল্পটির স্থাপনাসমূহের ডিটেইল ড্রইং, ডিজাইন, ডকুমেন্টেশন এবং প্রকল্প চলাকালীন টপসুপারভিশনের জন্য পরামর্শক সেবা গ্রহণের লক্ষ্যে ২০১৯ সালের ২৩ এপ্রিল কোরিয়ান পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সাথে একটি চুক্তিপত্র স্বাক্ষরিত হয়েছে। প্রকল্পটির কাজ দ্রুততার সাথে এগিয়ে চলেছে।

পায়রা বন্দরের মূল চ্যানেলে “ক্যাপিটাল এন্ড মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং’’ প্রকল্পটি জাতীয় অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। ২০১৯ সালের ১৪ জানুয়ারি বেলজিয়ামভিত্তিক ড্রেজিং কোম্পানি ‘জান ডি নুল’ (Jan De Nul) এর সাথে চুক্তিপত্র সম্পন্ন হয়েছে। ক্যাপিটাল এন্ড মেইনটেন্যান্স ড্রেজিং এর কাজ ২০২২ সাল নাগাদ শেষ করা সম্ভব হবে বলে আশা করা যায়।

ভারত সরকারের লাইন অব ক্রেডিট এর আওতায় অভ্যন্তরীণ সংযোগ সড়ক ও ১,২০০ মিটার দৈর্ঘে্যর জেটিসহ একটি টার্মিনাল নির্মাণের লক্ষ্যে ‘পায়রা বন্দরের মাল্টিপারপাস টার্মিনাল নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পটির প্রাথমিক কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
এছাড়া পিপিপি অর্থায়নে ৭০০ মিটার দৈর্ঘ্যরে জেটি ও অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের লক্ষ্যে ‘‘ড্রাইবাল্ক/কোলটার্মিনাল নির্মাণ (প্রথমপর্যায়)’’ শীর্ষক একটি প্রকল্প প্রস্তাবের কাজ চলমান রয়েছে। উক্ত প্রকল্পগুলো ২০২২ সাল নাগাদ সম্পন্ন করে বন্দরের পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হবে।

পায়রা বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা মোতাবেক একটি পূর্ণাঙ্গ গভীর সমুদ্র বন্দর প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে প্রণিতব্য ডিটেইলড মাস্টারপ্ল্যান অনুসরণে আরও তিনটি টার্মিনাল বন্দর কর্তৃপক্ষ কর্তৃক পিপিপি-জিটুজি অর্থায়নে আগামী ২০২৫ সাল নাগাদ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। পায়রা বন্দরকে কেন্দ্র করে বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, বিমানবন্দর, ঢাকা হতে পায়রা বন্দর পর্যন্ত রেলসংযোগ স্থাপন, ডকইয়ার্ড ও শিপইয়ার্ড, ইকো-ট্যুরিজম, এলএনজি টার্মিনাল, লিক্যুইড বাল্ক টার্মিনাল এবং সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সুবিধা ও অবকাঠামো গড়ে উঠবে। এসকল পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে ২০৩০ সালের মধ্যে পায়রা বন্দর এ অঞ্চলের একটি অন্যতম আধুনিক ও আন্তর্জাতিকমানের গভীর সমুদ্র বন্দর হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

লেখক : কলামিস্ট

১৫.০১.২০২০

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com