বুধবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২০, ০৫:৫২ পূর্বাহ্ন

শৈশব ও কৈশোরে কম ওজন মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা

শৈশব ও কৈশোরে কম ওজন মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা

শৈশব ও কৈশোরে কম ওজন মারাত্মক স্বাস্থ্য সমস্যা

ফরিদা রিয়াজ :: রোগা টিংটিংয়ে কবিরকে মনে হয় যেন একটা কংকাল ঘুরে বেড়াচ্ছে। তের পেরিয়ে চৌদ্দয় পা দিয়েছে ছেলেটি। উচ্চতা বাড়ছে কিন্তু গায়ে মাংস নেই এতটুকওু। স্কুল করে কোন রকমে, তারপরের সময়টা কাটায় বাসায় শুয়ে-বসে। পড়ায় মন বসে না, কাজ ভাল লাগে না। একটু পড়তে বসলেই মাথা কেমন ঝিম ঝিম করে। গত বছর নিউমোনিয়ায় ভুগে বেশ কিছু দিন হাসপাতালে থেকে আসল। ইদানীং জ্বর হচ্ছে কিছু দিন পর পর, ঠা-ার সমস্যাতো আছেই।
আসলে কবিরের সমস্যার সূত্রপাত তার খাওয়া থেকে। সব খাবারেই তার অরুচি। কিছু ফাস্ট ফুড ছাড়া কিছুই ভালো লাগে না তার। কবিরের মা-বাবা শত চেষ্টা করেও তাকে প্রয়োজনীয় পরিমাণ সুষম খাবার খাওয়াতে পারে না, যার ফলাফল ঘন ঘন ডাক্তারের কাছে যাওয়া আর এ সাথে অর্থ আর স্বাস্থ্যক্ষয়। শিশু বয়স থেকেই কবিরের স্বাস্থ্যের এ বেহাল অবস্থা।

মানুষের জীবনে অন্যান্য সময়ের চেয়ে শিশু বয়স ও কিশোরকালে সবচেয়ে বেশি ওজন বৃদ্ধি হয়। কিন্তু বংশগত কারণ, সময়ের পূর্বে জন্মগ্রহণ অথবা অপুষ্টিজনিত কারণে শিশুর ওজন বয়সের তুলনায় কম হতে পারে। সমবয়সী সমলিঙ্গের শিশুর তুলনায় কোনো শিশুর ওজন যদি কম বা ধীর গতিতে বাড়ে, তবে তাকে কম ওজন বলে বলা হয়। শিশু বয়স থেকে কিশোর বয়স পর্যন্ত মানুষের ওজন একটি স্বাভাবিক অনুমানযোগ্য গতিতে বৃদ্ধি পায়। ওজন ও উচ্চতার মধ্যকার সম্পর্ক বোঝানো হয় বডিমাস ইনডেক্স (বিএমআই) দ্বারা। বিএমআই যদি ১৮.৫ এর নীচে হয় তাহলে তা কম ওজন হিসেবে চিহ্নিত হয়।

কম ওজন কোনো রোগ নয় বরং রোগের লক্ষণ। যেসব কারণে ওজন কম হয় সেগুলোর মধ্যে রয়েছে অপর্যাপ্ত ক্যালোরি গ্রহণ, আমিষ, চর্বি ও শর্করার সমন্বয় না হওয়া, যথেষ্ট পরিমাণ পুষ্টি গ্রহণে শরীরের অক্ষমতা এবং স্বাভাবিকের চেয়ে অধিক পরিমাণ ক্যালরির চাহিদা। আবার, অপুষ্টি অথবা শারীরিক অসুস্থতার কারণেও শৈশব ও কৈশোরে ওজন কম হতে পারে।

মানুষের শরীরের ওজন কমার বিভিন্ন কারণের মধ্যে ক্ষুধামন্দা একটি। ক্যান্সার, লিভার অথবা কিডনীর রোগ, উদ্বেগ, বিষন্নতা, সংক্রমণ অথবা কোনো ঔষধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ক্ষুধামান্দ্য হতে পারে। তাছাড়া, এ্যানারোক্সিয়া এবং বুলিমিয়া জাতীয় খাদ্য গ্রহনজনিত রোগে মানুষের ওজন কমে যায়। এ্যানারোক্সিয়া আক্রান্ত কোনো ব্যক্তি তার ওজন কম হওয়া সত্বেও নিজেকে স্থ’ূলকায় ভাবে এবং খাদ্য গ্রহণের মাত্রা মারাত্মকভাবে কমিয়ে দেয়। অন্যদিকে বুলিমিয়া আক্রান্ত ব্যক্তিগণ অত্যধিক পরিমাণে খাদ্য গ্রহণ করে কিন্তু পরক্ষণেই বমি বা অন্য কোনো উপায়ে তা শরীর থেকে বের করে দেয়। এ ধরনের ব্যক্তি বা নিজের ওজন কমানো ও খাদ্য নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে সাংঘাতিক রকমের উদ্বেগে ভোগে। অনেক সময় খাদ্য হজমজনিত সমস্যা, খাদ্যনালী, পাকস্থলী, পিত্তথলি, ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদান্ত্রসহ শরীরের অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে আক্রান্ত করে। ফলে কোনো ব্যক্তি যথেষ্ট পরিমাণে খাদ্য গ্রহণ করলেও তা থেকে প্রয়োজনীয় পুষ্টি শোষণ করতে পারে না। বিভিন্ন জটিলতা যেমন গ্যাস, পেট ফাঁপা, বমি, কোষ্ঠ্যকাঠিন্য অথবা ডায়রিয়ার কারণে শরীর দুর্বল ও ক্ষীণকায় হয়ে পড়ে। জীবনযাত্রা ও খাদ্যভ্যাসের পরিবর্তন এবং ঔষধ গ্রহণের মাধ্যমে এসব সমস্যা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যায়।

বংশগত জটিল কোনো রোগ বা পুষ্টিহীনতার কারণে ওজন কম হয়। কোনো কোনো কিশোর-কিশোরীর বংশগত কারণে খাদ্য বিপাক প্রক্রিয়া হয় দ্রুত এবং শরীরে চর্বি জমার প্রক্রিয়া থাকে কম। এদের শরীরে চর্বিবিহীন টিস্যুসমূহ হয় ছোট আকারের যা তাদের ওজন কম রাখতে ভূমিকা রাখে। আবার কিছু জটিল ব্যাধিও খাদ্য শোষণ, বিপাক প্রক্রিয়াকে ব্যহত করে এবং শরীরের পুষ্টি ক্ষয় করে ফেলে। এসব রোগের কারণে কিশোর-কিশোরীদের ওজন হ্রাস পায়। শুধু শারীরিক নয় বরং মানসিক রোগেও ওজন কমে। অনেক কিশোর-কিশোরীর ধারনা মানব শরীরের সব ধরনের চর্বিই খারাপ এবং শারীরিক সৌন্দর্যের নামে তারা ওজন বাড়াতে নারাজ। এরা দিনের পর দিন প্রয়োজনের তুলনায় কম খাবার খেয়ে থাকে। শক্তির অভাবে না পারে তারা ঠিকমতো পড়াশুনা করতে, না পারে কোনো কায়িক পরিশ্রম করতে। তারা জানে না, শরীরে বিদ্যমান সব ধরনের চর্বিই ক্ষতিকর নয় বরং কিছু কিছু জমাকৃত চর্বি পরিশ্রমের কাজের সময়ে শরীরে শক্তি যোগায়। এসব চর্বি মস্তিকের গঠন, প্রদাহ ও রক্তজমাট বাধা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে এবং সুস্থ চুল ও ত্বকের জন্য জরুরি।

কম ওজনের কারণে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ায় শিশুর বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়ার আশংকা বেড়ে যায়। শিশুতের ওজন কম হওয়ার কারণে তাদের উচ্চতাসহ শারীরিক ও মানসিক বৃদ্ধি এবং শিক্ষণ প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। প্রয়োজনের চেয়ে ওজন কম হলে তাদের ঘন ঘন ঠা-া লাগে বা জ্বর হয়। তাই শিশুদের ওজন কম থাকলে জরুরিভিত্তিতে চিকিৎসকদের পরামর্শ গ্রহণ করা উচিত।

আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে স্বাভাবিক ওজনের চেয়ে কম ওজনের শিশু বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হওয়া অথবা মৃত্যু হার বেশি। কম ওজনের কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে হাঁপানী, অস্থিক্ষয়, পেটের পীড়া এবং আবেগজনিত সমস্যা বেশি দেখা যায়। স্বল্প ওজনের কারণে ছেলে-মেয়েদের বয়ঃসন্ধিকালে পৌঁছা ও প্রজনন ক্ষমতা অর্জনে বিলম্ব হয়। এছাড়া ক্লান্তি, উদ্দীপনার অভাব, ঘন ঘন সংক্রামক রোগে ভোগে তারা। প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে কম ওজনের মানুষেরা, বিশেষ করে মেয়েরা অনিয়মিত হরমোন নিসৃত হওয়ার কারনে নানা রকমের স্বাস্থ্যগত জটিলতার সম্মুখীন হয়। অপর্যাপ্ত ওজনের ফলে লৌহ ঘাটতিজনিত রক্তশূন্যতা দেখা দিতে পারে। খাবারে পুষ্টির ঘাটতির কারণে দুর্বলতা ও নিস্ক্রিয়তা, ত্বকের শুষ্কতা, চুল পড়ে যাওয়া, চিন্তার অক্ষমতা এবং নিদ্রাহীনতা দেখা দিতে পারে।

শরী ও মনের সঠিক বিকাশ এবং সুস্থ থাকতে সবার আগে প্রয়োজন পর্যাপ্ত পরিমাণে পুষ্টিকর ও সুষম খাবার গ্রহণ। বিশেষজ্ঞদের মতে স্বাভাবিক খাদ্য গ্রহণের বাইরে প্রতিদিন অতিরিক্ত ৫০০ ক্যালরি গ্রহণের মাধ্যমে সপ্তাহে প্রায় ১ পাউন্ড ওজন বাড়ানো যায়। ওজন বৃদ্ধির জন্য মেয়েদের প্রতিদিন ৩০০০ ক্যালরির সমপরিমান এবং ছেলেদের ৩৫০০ ক্যালরির সমপরিমান খাদ্য গ্রহণ করতে হবে। তবে সুস্বাস্থ্যের জন্য চর্বি ও তৈলজাতীয় খাবারের পরিমাণ মোট ক্যালরির ৩০ শতাংশের বেশি হওয়া উচিত নয়। অধিক চিনিযুক্ত খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ নিরুৎসাহিত করতে হবে। খাবারের মধ্যে বাদাম ও তিল, সূর্যমুখী, মিষ্টি কুমড়া ইত্যাদি বীজ জাতীয় খাদ্যে ক্যালরি বাড়িয়ে দেয়। উচ্চ মানসম্পন্ন আমিষ যেমন মাংস, বাদামী চাল, লাল আটা, শাক-সবজি, ফলমূল এবং দুধ ওজনের ভারসাম্য রক্ষায় কাজ করে। কারো যদি খাদ্যে অরুচি থাকে, তবে সারাদিনের খাবারকে কয়েক ভাগে ভাগ করে কিছুক্ষণ পর পর অল্প পরিমাণে খেতে হবে।

জাতীয় সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা ও রূপকল্প ২০২১-এর আলোকে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ মন্ত্রণালয় প্রণীত পাঁচ বছর মেয়াদি ‘চতুর্থ স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি কর্মসূচি ২০১৭-২০২২’-এর বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। এ কর্মসূচিটি সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়ন হলে দেশের সার্বিক স্বাস্থ্য, জনসংখ্যা ও পুষ্টি পরিস্থিতির ব্যাপক উন্নয়ন ঘটবে। ২০৩০ সালের মধ্যে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা’র স্বাস্থ্যবিষয়ক সূচকগুলো অর্জনে এ উন্নয়ন কর্মসূচি বিরাট ভূমিকা রাখবে। এছাড়া শিশুদের স্কুলে পুষ্টিকর খাবার বিতরণ কর্মসূচি, সরকারিভাবে দরিদ্র মাদের জন্য মাতৃত্বকালীন ভাতা প্রদান কর্মসূচির, হাওর ও দরিদ্র প্রবণ এলাকা চিহ্নিত করে বিশেষ পুষ্টি কার্যক্রম কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। এর ফলে পুষ্টি ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি হয়েছে।

দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলে টেলিমেডিসিন সেবার মাধ্যমে রোগীদের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সেবা পাওয়ার সুবিধা প্রদান করা হয়েছে। এ ছাড়া ‘স্বাস্থ্য বাতায়ন’ ১৬২৬৩ সার্বক্ষণিক কল সেন্টারের মাধ্যমে সারা দেশ থেকে যে কোনো মানুষ যে কোনো সময়ে পুষ্টি ও স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত যে কোনো তথ্য জানতে পারছে।

বেশি ওজন যেমন মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর তেমনি উচ্চতার তুলনায় কম ওজনও ঝুঁকিপূর্ণ। বয়সের সাথে শিশু কিশোরদের দৈহিক ও মানসিক বিকাশ ও সুস্থতার সম্পর্ক বিষয়ে আমাদের সচেতনতা প্রয়োজন। সুষম খাদ্য, শারীরিক পরিশ্রম, সুশৃঙ্খল জীবনযাপন ও চিকিৎসকের পরামর্শমতো শরীরের সঠিক ওজন বজায় রাখা সুস্থ জীবনের জন্য আবশ্যক। কারণ বেঁচে থাকার প্রথম ও প্রধান শর্ত সুস্থতা।

লেখক : কলামিস্ট ও পুষ্টিবিদ

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com