বুধবার, ২৯ Jul ২০২০, ১১:২৯ অপরাহ্ন

শায়খুল হিন্দ রহ. এর অবিশ্বাস্য বিনয়

শায়খুল হিন্দ রহ. এর অবিশ্বাস্য বিনয়

দারুল উলূম দেওবন্দ, ভারত

শায়খুল হিন্দ রহ. এর অবিশ্বাস্য বিনয়

মুহাম্মদ সলিমুদ্দিন মাহদি কাসেমী : বিটিশ বিরোধী স্বাধীনতা আন্দোলনের মহান স্থপতি, শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদুল হাসান দেওবন্দী রহ. (১৮৫১ -১৯২০) ছিলেন দারুল উলূম দেওবন্দের প্রথম শিষ্য। যাঁর একনিষ্ঠ প্রচেষ্টায় ভারত উপমহাদেশ ইংরেজদের দখল মুক্ত হয়েছিল। ভারতবর্ষ ফিরে পেয়েছিল তাদের হারানো ঐতিহ্য ও লুণ্ঠিত স্বাধীনতা। পৃথিবীর মানচিত্রে আবারো একটি স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করলো ভারতবর্ষ।

ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের ডাক দিয়ে শায়খুল হিন্দ রহ.-কে দেশান্তর হতে হয়েছিল। বন্দী রাখা হয়েছিল মাল্টার দ্বীপে। দীর্ঘ সময় বন্দী থাকার পর তিনি মাল্টার বন্দীশালা থেকে মুক্ত হয়ে দেশে ফিরে এলেন।

শায়খুল হিন্দ রহ. দেশে ফেরার পর মুরাদাবাদ সফরে যান। ভারতের উত্তর প্রদেশের একটি এলাকার নাম মুরাদাবাদ। মুরাদাবাদেই শায়খুল হিন্দ রহ. উপস্থিত হলেন। একজন বড় ব্যক্তিত্বকে পেয়ে স্বভাবত কারণেই যেখানকার লোকেরা খুবই আনন্দিত হলেন। মুরাদাবাদের বাসিন্দারা হযরতের নিকট কিছু ওয়াজ-নসীহত পেশ করার জন্য আবেদন করলেন। শায়খুল হিন্দ রহ. বলেন, আপনারা তো জানেন, আমি ওয়াজ-নসীহত করতে জানিনা। তাই, আমি কোন ওয়াজ-নসীহত করতে পারবো না।

এলাকাবাসী নিজেদের দাবিতে অনড়। তারা শায়খুল হিন্দ রহ.-কে বারবার আবেদন করতে লাগলেন। উপরন্তু সেখানে হযরত শায়খুল হিন্দ রহ. এর সাথে সাক্ষাতের জন্য তাঁরই শিষ্য আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. ও আল্লামা শাব্বীর আহমদ ওসমানী রহ. সহ আরো অনেক ওলামায়ে কেরাম উপস্থিত হলেন। এবার তারাও হযরতকে কিছু ওয়াজ-নসীহত করার জন্য আবেদন করলেন। পরিশেষে বাধ্য হয়ে হযরত শায়খুল হিন্দ রহ. এশার নামাযের পর আলোচনা আরম্ভ করলেন। তিনি একটি হাদীস শরীফ পাঠ করলেন,
فقيه واحد أشد على الشيطان من ألف عابد (سنن ابن ماجه، رقم الحديث:222)
অনুবাদ : একজন ফকীহ শয়তানের রিরুদ্ধে একহাজার ইবাদতকারীর চেয়েও ভারী (কঠোর) হয়ে থাকেন।

তিনি যখন أشد এর অনুবাদ ‘আসকাল’ তথা ‘ভারী’ বলেছেন, তখন উপস্থিত জনৈক আলেম শায়খুল হিন্দ রহ.-কে বারণ করলেন। বললেন, হযরত, এভাবে হাদীসের অনুবাদ করা ঠিক হয়নি। ‘আশদ’ অর্থ কঠোর, ভারী নয়। আপনি ‘আশদ’ এর অর্থ ভারী কিভাবে করলেন? তিনি শায়খুল হিন্দ রহ.-কে লক্ষ্য করে আরো কঠোরভাবে বললেন, যার কাছে হাদীসের অনুবাদ করার যোগ্যতা নেই, তার জন্য বয়ান করারও কোন অধিকার নেই।

অনেক বড় মজলিস ছিল। অনেক লোকের সমাগম হয়েছিল। সকলের সামনে তিনি শায়খুল হিন্দ রহ. এর উপর আপত্তি করলেন এবং তাঁকে ওয়াজের অযোগ্য ঘোষাণা করে ভরা মজলিসে লাঞ্চিত করলেন!

তবে আশ্চার্য, এ ক্ষেত্রে হযরত শায়খুল হিন্দ রহ. এর বিনয় ছিলো খুবই লক্ষ্যনীয়। তাঁর বিদ্যাসাগর শিষ্যরা সেখানে উপস্থিত আছেন। ইলমের জাহাজ আল্লামা শাব্বির আহমদ ওসমানী রহ. ও ইলমের পাহাড় আল্লামা কাশ্মীরী রহ. সেখানে উপস্থিত আছেন। তাঁদের সামনে তাঁদের প্রিয় উস্তাদকে লাঞ্চিত করল! কিন্তু কেউ কোন জবাব দিলেন না! কারণ, তখনকার শিষ্যরা উস্তাদগণের ঈশারা-ঈঙ্গিত ছাড়া কোন কিছুই করতেন না। যেহেতু সেখানে উত্তর দেয়া উস্তাদের উদ্দেশ্য নয়, তাই তাঁরা উস্তাদের সম্মতিকে প্রধান্য দিয়েছেন। তাঁরাও কোন প্রতিবাদ করলেন না।

এখন শায়খুল হিন্দ রহ. এর বিনয়ের প্রতি লক্ষ্য করুন, ঐ আলেমের এমন লাঞ্চনাকর আপত্তি শুনে তিনি বললেন, ‘‘আমি তো প্রথমেই বলে ছিলাম যে, আমি ওয়াজ-নসীহত করতে জানি না, আপনারাই তো পীড়াপীড়ি করেছেন।’’

এ বলে পুনরায় ওয়াজের প্রতি মনোনিবেশ করলেন। ওয়াজ সমাপ্ত করার পর যখন লোকজন নিজ নিজ ঘরে ফিরে গেলো, তখন শায়খুল হিন্দ রহ. বললেন, যিনি আমার ওয়াজে আপত্তি করেছিলেন, তিনি কে? আমাকে তার ঘরে নিয়ে চলো। হযরতের নির্দেশ পালনার্থে উপস্থিত লোকজন তাঁকে ঐ আলেমের ঘরে নিয়ে গেলেন। তিনি সেখানে গিয়ে একজন শাগরিদের ন্যায় তার সামনে বসে পড়লেন। খুবই বিনয়ের সাথে তার সাথে আলোচনা শুরু করলেন। তার কাছে জানতে চাইলেন, হাদীসের অনুবাদে কি ভুল হয়েছিল? তখন ঐ আলেম বলেন, আপনি ‘আশদ’ এর অনুবাদ ‘আসকল’ দিয়ে করেছেন। অথচ ‘আশদ’ শব্দটি কঠোর এর জন্য ব্যবহৃত হয় ‘আসকল’ বা ভারী এর জন্য নয়।

তখন শায়খুল হিন্দ রহ. বলেন, কোথাও এর অনুবাদ যদি ‘আসকল’ প্রমাণিত হয়, তাহলে ক মেনে নিবেন? তখন ঐ আলেম বলেন, কোথা থেকে প্রমাণ করবেন?
শায়খুল হিন্দ রহ. বলেন, কোন ডিকশনারী ইত্যাদি থেকে প্রমাণিত হলে, মেনে নিবেন? তিনি বলেন, ঠিক আছে, মেনে নিব।

তখন শায়খুল হিন্দ রহ. কোন ডিকশনারী খুলেননি, বরং বোখারী শরীফের ওহী সংক্রান্ত প্রথম হাদীসটি পাঠ করে তাকে শুনালেন, যেখানে ওহীর প্রকার বর্ণনা করা হয়েছে,
وأحيانا يأتيني مثل صلصلة الحرس (صحيح البخاري، رقم الحديث:2)
অর্থ : কখনো আমার নিকট ঘন্টার আওয়াজের ন্যায় ওহী আসে। অতঃপর বলেন وهوأشد علي. এ ধরণের ওহী অনেক ভারী মনে হয়। এখানে ‘আশদ’ এর অনুবাদ ‘আসকাল’ অর্থাৎ ভারী দ্বারা করা হয়েছে।

শায়খুল হিন্দ রহ. এই হাদীসটি পাঠ করে দেখিয়ে দিলেন, ‘আশাদ’ এর অনুবাদ ‘আসকাল’ হয়। কারণ, এই প্রকার ওহী নাযীল হলে রাসূলুল্লাহ সা. এর উপর তা অনেক ভারী মনে হতো। যদি উটে আরোহিত অবস্থায় নাযীল হতো তখন উট বসে যেতো। একদা রাসূল সা. হযরত যাইদ বিন আরকম রা. এর রানে শুয়ে ছিলেন, তখন ওহী নাযীল হলো। তিনি বলেন, আমার নিকট এমন ভারী মনে হলো যেন, আমার রান চুর্ণবিচুর্ণ হয়ে গেলো।

তৎক্ষণাৎ ঐ আলেম নিজের ভুল স্বীকার করে হযরত শায়খুল হিন্দ রহ. এর পা ধরে কান্নাকাটি করতে থাকেন এবং বলেন, আপনি হাদীসের সঠিক অনুবাদ করেছেন, আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি আপনাকে বারণ করেছি, আমি আপনাকে জনসম্মুখে ভরা মজলিসে লাঞ্চিত করেছি, আল্লাহর দোহাই আমাকে ক্ষমা করে দিন। শায়খুল হিন্দ রহ. তাকে ক্ষমা করে দিলেন।

শায়খুল হিন্দ রহ. মাহফিলেও উত্তর দিতে পারতেন। তবে তিনি সেখানে কোন উত্তর দেননি। কারণ, সেখানে উত্তর দিলে ঐ আলেম লাঞ্চিত হতো। শায়খুল হিন্দ রহ.-এর কারণে কোন আলেমের মানহানি হোক, এটা তিনি কখনো বরদাশত করতেন না। শায়খুল হিন্দ রহ. নিজের সম্মানহানিকে সহ্য করে নিলেন, তারপরেও অন্য আলেমকে লাঞ্চিত করেননি।

তিনি বলেছেন, যদি আমি ঐ আলেমকে জনসম্মুখে উত্তর দিতাম, তাহলে তার উপর থেকে মানুষের আস্থা উঠে যেতো। অথচ তিনি ঐ এলাকায় দ্বীনি বিষয়ে মুসলমানদেরকে পথ প্রদর্শন করে থাকেন। তার উপর থেকে মানুষের আস্থা উঠে গেলে, তারা দ্বীনি বিষয়ে তার কাছ থেকে আর উপকৃত হবে না। তাই, আমি নিজের অপমানকে প্রধান্য দিয়ে তার ইজ্জতকে রক্ষা করেছি।

বস্তুত শায়খুল হিন্দ রহ. এর উপরোক্ত ঘটনা একদিকে যেমন আমাদেরকে নিজেদের জীবন পরিক্রমায় বিনয় ও ভদ্রতা অবলম্বন করার প্রতি উদ্বুদ্ধ করে, তেমনি আমাদেরকে স্মরণ করে দেয় যে, দ্বীনের রাহবর ও ‘মুক্তাদায়ে কওম’ এবং উম্মতের পথপদর্শক ওলামায়ে কেরাম সম্পর্কে মন্তব্য করতে আরো অনেক সংযত হওয়ার কথাও।

নিঃসন্দেহে উম্মতের নেতৃত্বস্থানীয় ওলামায়ে কেরামের মান-মর্যাদাকে রক্ষা করা সকলের নৈতিক ও দ্বীনি দায়িত্ব। আল্লাহ আমাদেরকে নিঃস্বার্থভাবে বিষয়টি অনুধাবন করার তাওফীক দান করুন, আমীন।

অনুবাদ ও সম্পাদনা

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com