শনিবার, ৩০ মে ২০২০, ০১:২৫ পূর্বাহ্ন

লেখালেখিতে সাহিত্য সভার প্রভাব

লেখালেখিতে সাহিত্য সভার প্রভাব

সাহিত্য । সিদ্দিক আবু বকর

লেখালেখিতে সাহিত্য সভার প্রভাব

সাহিত্য বিষয়ে আমার লেখা-পড়ার দৌড় খুব বেশি না। কি পড়ায় কি লেখায় বরাবরই একজন অলস মানুষ আমি। সাহিত্যের টুকিটাকি পাঠ যে টুকুন, তাও ঢাকা এবং নারায়ণগঞ্জের সাপ্তাহিক অথবা মাসিক সাহিত্যসভার শ্রদ্ধাভাজন আলোচলকদের কল্যাণে।

আমার কাছে সাহিত্য সভাগুলোর সব চেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহুর্ত ছিল পঠিত লেখার উপর আলোচনা।

বিজ্ঞ আলোচকদের আলোচনা তন্ময় হয়ে শুনতাম। ভালো লাগতো কোন লেখার উপর যখন আলোচক মুগ্ধ হয়ে যেতেন। কান খাড়া করে শুনতাম, কেনো আলোচকের কাছে এই লেখাটি এতো ভালো লাগলো? লেখাটির শক্তিশালি দিকগুলো কি কি? আলোচককে চমকে দেয়ার মতো এমন একটি লেখা লিখতে হলে আমার কি করা দরকার, কোন কোন ধরণের বই আমার পড়া দরকার।

আর আলোচক যখন কোন লেখার উপর চরম বিরক্ত হতেন এবং লেখককে তুলোধুনো করতেন তখনও কানখাড়া রাখতাম। তবে মুখটা কিঞ্চিত কালো হয়ে যেতো আমার। সম্ভবত হতভাগ্য সাহিত্যাঙ্গনে নবীন লেখকটিরও।

চোখ বড় বড় করে আলোচকের দিকে তাকাতাম। বুকটা ভয়ে টনটন করতো আহারে লেখক বেচারা। আর নিজের লেখাটি নিয়ে ভাবতে থাকতাম। না জানি কি আছে আমার কপালে! করলার জুস না খাটিগুড়ের বাতাসা! লেখাটি কেনো এতো দুর্বল, দুর্বলতা কাটাবার জন্য আলোচক যে প্রেস্ক্রিপশনগুলো সাজেস্ট করতো, তা পালনের জন্য তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নিতাম বা সাজেস্টকৃত অষুধ মানে রেফারেন্স বই কিনার জন্য পাগল হয়ে যেতাম।

তখন চাকরি-বাকরি করিনা। তাই বলে একদম বেকারও না। আধা বেকার বলা যায়। একটা বেসরকারি স্কুলে প্রক্সি দেই আর টিউশনি করে বেড়াই।

বই কিনা তো পরের ব্যাপার পয়সার অভাবে কতলম্বা পথ যে হেঁটে সভায় উপস্থিত হতাম বলে বুঝাতে পারবো না।

যাই হোক রেফারেন্স বইটি কেনার সাধ্য না থাকলে উপস্থিত অন্যদের কাছে আছে কিনা খোঁজ নিতাম। থাকলে দু’দিনের জন্য ধার দেয়া যায় কিনা অনুরোধ করতাম।

আনন্দের ব্যাপার হলো আমরা দূর-দূরান্ত থেকে আসা একে অপরের পরম আত্নীয়ের মতো হয়ে গিয়ে ছিলাম। সংগ্রহে থাকলে ধারও দিতেন বইটি। অথবা বিনয়ের সাথে বলতেন, রেয়ার বই হারালে দ্বিতীয় কপি পাওয়া মুশকিল অতএব, দিতে পারছিনা।

রেয়ার বইয়ের অধিকাংশই খুঁজে পেতাম কমরেড মনিসিং ভবনের সামনের রাস্তায়। যে আংকেলের পুরনো বইয়ের স্তুপে এগুলো পেতাম, উনি ছিলেন বেজায় ঘাগুমাল! শ্রদ্ধেয় আংকেল ঠিকই ধরতে পারতেন কোন বইটির রিয়েল পাঠক কে! চন্ডিদাশের শুকনায় বড়শিপাতার মতন আরকি। ঠোক্কর পড়ছে তো হাকা দাম! তবুও আংকেলের উপর রাগ হতোনা। কৃতজ্ঞচিত্তে কিনে নিতাম মহামূল্যবান অই রেফারেন্স বইটি।

লোকালবাসে ভাগ্যক্রমে সিট মিলে গেলে তো কথাই নাই। পড়তে শুরু করে দিতাম। যদিও আগা-মাথা কিছুই তখন মাথায় ঢুকতো না। বাসের ঝাকি, গাড়ির শব্দ আর হেল্পারের চিল্লাচিল্লিতে মাথায় ভজঘট লেগে যেতো। তবু্ও অই রত্ন পড়া চাই! অবশ্য রাতে হতো আসল অধ্যয়ন। পড়তাম আর আশ্চর্য হতাম। বইয়ের লেখকের নামটা জানা সত্যেও মলাটে গিয়ে আবার পড়তাম পরম শ্রদ্ধায়। আর কৃতজ্ঞতায় নুয়ে পড়তাম আলোচক আপা বা ভাইয়াটির প্রতি।

হ্যাঁ যে কথা বলছিলাম, প্রত্যেক সাহিত্য সভায় একজন সভাপতি এবং প্রধান অথিতি থাকতেন। বিশেষ করে সভাপতির বক্তব্যটি আমার বেশ লাগতো। পুরো সভাটির একটা দারুণ সামারি তার বক্তব্যে ফুটে উঠতো। যারা তুলোধুনো হলেন তাদেরও সাহস যোগাতেন, প্রশংসা করতেন। ভুলগুলো শুধরে নেবার মার্জিত পরামর্শ দিতেন।

আর প্রধান অতিথি কখনো কখনো তার নিজের লেখক হয়ে ওঠার গল্প করতেন অথবা বিশেষ একটি বিষয়ে বিষদ আলোচনা করতেন। যা থেকে পেতাম লেখালেখি করার বিশেষ কলাকৌশল।

এভাবেই কেটে যেতো সময়। কখন যে দুই বা তিন ঘন্টা চলে যেতো টেরই পেতাম না।

খারাপ লাগতো পঠিত লেখার উপর আলোচনায় বেশ তাড়াহুড়োটা। পঠিত লেখার আলোচকরা হতেন সম্ভাবনাময় প্রতিভাবান তরুণ। তাই গুণিজনদের সময় রাখতে গিয়ে তারা একটু সংক্ষেপ করতেন।

সাহিত্যসভা গুলো থেকেই পেতাম লেখালেখির মণিমুক্তা। আমার কাছে ঢাকার চাইতে শেখার ক্ষেত্রে তুলনামূলক নারায়ণগঞ্জের সাহিত্য সভাগুলো বেশি ফলপ্রসূ মনে হয়েছে। ঢাকায় সভাগুলোতে শেখার সুযোগ কিছুটা কম। তবে নিজেকে জাহির করার, পত্রিকার পাতা ধরার বা লাইমলাইটে আসার ক্ষেত্রে মোক্ষম অপর্চুনিটি। নারায়ণগঞ্জের সাহিত্যসভা আমাকে শিখিয়েছে। আর ঢাকা রাজধানী শিখিয়েছে কিভাবে প্রচার যন্ত্রের ছত্রছায়ায় থাকা যায়। মফস্বল শহর যদি হয় লেখালেখির বেইজ, শহর হলো বেইজে দাঁড়িয়ে নিজের ক্রিয়েটিভিটির জানান দেয়া।

নারায়ণগঞ্জ বা ঢাকা, দুটি ক্ষেত্রই আমার কাছে পয়োমন্ত। একটি আমাকে তৈরি হতে সহায়তা করেছে আরেকটি করেছে পরিচত। আমি দুই শহরের প্রতিই কৃতজ্ঞ।

লেখক : কবি ও কথাশিল্পী

চলবে…

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com