শুক্রবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০৭:১৪ পূর্বাহ্ন

লেখক বঙ্গবন্ধু: ‘যেন অগ্নি-উগারী বান’

লেখক বঙ্গবন্ধু: ‘যেন অগ্নি-উগারী বান’

লেখক বঙ্গবন্ধু: ‘যেন অগ্নি-উগারী বান’

পরীক্ষিৎ চৌধুরী ::
‘মানুষকে ব্যবহার, ভালোবাসা ও প্রীতি দিয়েই জয় করা যায়। অত্যাচার, জুলুম ও ঘৃণা দিয়ে জয় করা যায় না’ – (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃষ্ঠা-২০০) ১৯৪৭-এ উপমহাদেশ ভাগের পরই বাংলাদেশ নিয়ে তাঁর সুষ্পষ্ট অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। সেই সময় বেকার হোস্টেলে বসে তিনি তাঁর সঙ্গীদের বলেছিলেন, ‘মাওড়াদের সাথে থাকা যাবে না।’ তিনি শেখ মুজিব! ১৯৬৬ সালে ৬ দফা পেশ করার পর শেখ মুজিব লণ্ডন সফরে গেলে সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হক, তখন বিবিসি’তে কর্মরত, বঙ্গবন্ধুর কাছে জানতে চাইলেন, ‘ছয়’ দফা’ বিষয়টি কী ? শেখ মুজিব তখনো ‘বঙ্গবন্ধু’ উপাধি পাননি। সৈয়দ হকের দিকে তিনটি আঙ্গুল দেখিয়ে স্পষ্ট করে বললেন, ‘কতো নিছো ? কবে দিবা ? কবে যাবা?’ আমাদের জাতীয় ইতিহাসের মোড় ঘুরানো এই ‘ছয় দফা’ আন্দোলনে বাঙালির ওপর নেমে আসা নির্যাতনে ভিন্ন এক মুজিবকে আবার কিছুক্ষণের জন্য দেখা যায়। তিনি বিচলিত হয়ে লিখলেন কারাগারের রোজনামচা’য় ১৯৬৬-এর ৬ জুন, -‘এ ত্যাগ বৃথা যাবে না, যায় নাই কোনোদিন। নিজে ভোগ করতে নাও পারি, দেখে যেতে নাও পারি। তবে ভবিষৎ বংশধররা আজাদি ভোগ করবে ।’ প্রাণাধিক প্রিয় বাঙালিদের জন্য আবেগমথিত হৃদয়ে আবার জেগে উঠলো অগ্রি উজারী বান। ৮ জুন লিখলেন, ‘যে রক্ত আজ আমার দেশের ভাইদের বুক থেকে বেরিয়ে ঢাকার পিচঢালা কাল রাস্তা লাল করেছে, সে রক্ত বৃথা যেতে পারে না।’(কারাগারের রোজনামচা)। এই হচ্ছে শেখ মুজিব। আমাদের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এখানে মহাত্মা গান্ধীর উক্তি মনে পড়ে যায়। The Story of my experiments with truth – এ গান্ধীও এমন ভাবনার কথাই জানিয়েছিলেন। তিনি লিখেছেন, ‘যখন হতাশা কাজ করতো, আমি স্মরণ করতাম যে ইতিহাসে সবসময় সত্য ও ভালোবাসার জয় হয়েছে। অত্যাচারী ও খুনিরা সাময়িকভাবে অপরাজেয় মনে হলেও শেষ পর্যন্ত তাদের পতন অনিবার্য’।

বঙ্গবন্ধুর আয়ু ছিল মাত্র ৫৫ বছর ৪ মাস ২৯ দিন। কারাগারেই ছিলেন ৪ হাজার ৬৮২ দিন। জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়েছেন কারাগারে। বন্দিজীবনের সময়টা তিনি অপচয় করেননি। লিপিবদ্ধ করেছেন তাঁর মানস নির্মিতির ইতিহাস, অভিজ্ঞতা, ভাবনা, আদর্শ, বাঙালির অধিকার আদায়ে সর্বোচ্চ ত্যাগের জন্য মানসিক প্রস্তুতির কথা। সেসব পান্ডুলিপি নিয়ে প্রকাশিত হয়েছে ৩৪৫ পৃষ্ঠার অসমাপ্ত আত্মজীবনী (২০১২) ও ৩০২ পৃষ্ঠার কারাগারের রোজনামচা (২০১৮) এবং চীন সফরের অভিজ্ঞতা নিয়ে ২০০ পৃষ্ঠার ‘আমার দেখা নয়াচীন’ (২০২০)। তাঁর বিস্তৃত লেখার কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরে মানবিক মুজিব ও তাঁর ভেতরের অগ্নিগিরির জ্বালামুখের সন্ধান করার ক্ষুদ্র চেষ্টা থেকেই এই প্রবন্ধের অবতারণা। জাতির পিতার তিনটি বই থেকে দু’টি বই (অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচা) নিয়ে প্রবন্ধের স্বপ্ন পরিসরে টুকরো টুকরো কিছু আলোচনা করার প্রয়াস নেয়া হয়েছে।বঙ্গবন্ধুর লেখা ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ ও কারাগারের রোজনামচা গ্রন্থে কতো রং-এর, কতো রূপের, কত প্রকরণের এক মানুষকে যে পাওয়া যায়! বইটি যিনিই পড়েছেন তিনিই সম্যক জানতে পেরেছেন মুজিব মানসের নানান ধরনের অভিব্যক্তি, ভাবনা এবং নিজ মাটির প্রতি অন্তর্গত দৃঢ় অঙ্গীকার সম্পর্কে। সেই বয়ানে পাওয়া যায় ব্যক্তিত্বসম্পন্ন, দৃঢ়চেতা এবং মানবিক শেখ মুজিবকেও। যুগে যুগে কিছু মানুষ আসেন যাঁদের নেতৃত্ব দর্শন পাল্টে দেয় পৃথিবীকে, দেশকে, এমনকি দেশের মানুষকেও। তাঁদের আলোতে আলোকিত হয় মানুষ ও দেশ। শ্লাঘার সাথে বাংলার জনগণ বলতে পারে, আমাদের একজন আছেন এমন, যাঁর নাম শেখ মুজিবুর রহমান।

১৯২১ সালে ‘বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়’ নির্মাণের প্রাক্কালে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর স্কটল্যান্ডের নগর পরিকল্পনাবিদ ও নকশাবিদ স্যার প্যাট্রিক গিডেসকে একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেই চিঠিতে একটি জায়গায় তিনি লিখেছিলেন, আমি সেই মানুষ খুঁজছি যাঁর মধ্যে থাকবে যথার্থ চিন্তা, যাঁর অনুভব হবে মহান এবং যার আছে সঠিক সময়ে সঠিক কর্ম করার কৌশলজ্ঞান। রবীন্দ্রনাথ বর্ণিত এই তিন বৈশিষ্ট্যই যোগ্য নেতৃত্বের গুণাবলি। তিনি হয়তো এখানে নেতৃত্ব সম্পর্কে সরাসরি কিছু লিখতে চাননি, কিন্তু তিনি না চাইলেও পরবর্তীকালে তাত্ত্বিকেরা নেতৃত্বের সংজ্ঞা নির্ধারণ করতে গিয়ে এই তিন বৈশিষ্ট্য নিয়ে অনেক আলোচনা করেছেন। এই তিন গুণে সমৃদ্ধ রাষ্ট্র নায়কগণ ইতিহাসের সৃষ্টি করেছেন কালে কালে। তাঁদের রাজনৈতিক দর্শন, রাষ্ট্রচিন্তা, আত্মত্যাগ আর আদর্শের প্রতি বিশ্বস্ততা তাঁদেরকে নিয়ে গেছে চূড়ান্ত বিজয়ের লক্ষ্যে। এই নেতারাই আবার কলম ধরেছেন তাঁদের মননের সাথে আমাদের পরিচয় করে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। স্যার উইনস্টন চার্চিল তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ The Second World War প্রসঙ্গে লিখেছিলেন, It is not history, It is a contribution to the history. বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ সৃষ্টি করে ইতিহাস গড়েছেন, তেমনি তাঁর জীবনী লিখে ইতিহাসকে বাড়তি কিছু দিয়ে গেছেন, একথা অনস্বীকার্য। আমাদের উপমহাদেশের অনেক রাজনীতিবিদ ও রাষ্ট্রনায়কও আত্মজীবনী লিখেছেন। মহাত্মা গান্ধী লিখেছেন, The Story of my experiments with truth; জওহরলাল নেহেরু লিখেছেন, An Autobiography; সম্রাট বাবরও লিখেছিলেন ‘বাবরনামা’। নেলসন মেন্ডেলা লিখেছেন, Long Walk to Freedom । এরকম নজির যে ভূরি ভূরি, তা কিন্তু নয়। এই বিরল দৃষ্টান্তের মধ্যেও বিরল আমাদের জাতির পিতার তিনটি বই।

বঙ্গবন্ধুর বইগুলো মূলত সেই সময়ের শেখ মুজিবের রাজনৈতিক দর্শন ও নেতৃত্বের ধরন সম্পর্কে ধারণা দেয়। তাঁর দর্শন ও কৌশল সম্পর্কে বলতে গিয়ে স্পষ্ট করেই স্বীকার করেছেন, ‘যদি কোনো ভুল হয় বা অন্যায় করে ফেলি, তা স্বীকার করতে আমার কোনোদিন কষ্ট হয় নাই। ভুল হলে সংশোধন করে নেব, ভুল তো মানুষেরই হয়ে থাকে। আমি অনেকের মধ্যে দেখেছি, কোনো কাজ করতে গেলে শুধু চিন্তাই করে। চিন্তা করতে করতে সময় পার হয়ে যায়, কাজ আর হয়ে ওঠে না। — আমি চিন্তা ভাবনা করে যে কাজটা করব ঠিক করি, তা করেই ফেলি। যদি ভুল হয় সংশোধন করে নেই।’ আবারো গান্ধীর শরণাপন্ন হয়ে উল্লেখ করতে চাই, এখানেও তাঁর ‘আত্মকথা অথবা সত্যের প্রয়োগ’ গ্রন্থে এমনটিই যেন লিখেছেন, ‘যদি আমার লেখার মধ্যে পাঠকের কাছে আমার অহংকারের সপ্তম সুরের আভাস পায়, তবে তারা অবশ্য জানবেন যে আমার সাধনার মধ্যে ত্রুটি রয়েছে।’ সত্যনিষ্ঠ ব্যক্তিরা তো এমনই। বঙ্গবন্ধু তৃণমূল পর্যায় থেকে রাজনীতির শীর্ষে ওঠে আসেন। এটি কিছুতেই সহজসাধ্য ছিল না। এজন্য তাঁকে অনেক পথ পাড়ি দিতে হয়। এ সম্পর্কে বলতে গিয়ে ১৯৭২ সালে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত ছাত্রলীগের সম্মেলনে বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন, ‘চোঙ্গা মুখে দিয়ে রাজনীতি করেছি, রাস্তায় হেঁটেছি, ফুটপাতে ঘুমিয়েছি। বাংলাদেশে এমন কোন মহকুমা নেই, এমন কোন থানা নেই, যেখানে আমি যাইনি।’ বাঙালির মুক্তি আন্দোলনের অবিসংবাদিত এই নেতার মূল দর্শন ছিল গণতন্ত্র, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মনিরপেক্ষতা। ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৩ পর্যন্ত তাঁর রাজনীতির গুরু গণতন্ত্রের মানসপুত্র হোসেন শহীদ সোহ্রাওয়ার্দীর আধুনিক পাশ্চাত্য রাজনীতির পরিশীলিত নিয়মতান্ত্রিক ধারা; আবুল হাশিম, শরৎ বসু, কিরণশঙ্কর রায়ের অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদভিত্তিক রাজনীতি; নেতাজি সুভাষ বসু ও দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাসের রাজনীতির প্রতি তীব্র আকর্ষণ; নজরুল ও হুমায়ুন কবিরের সান্নিধ্যের প্রভাবে রাজনীতি ও সংস্কৃতির চমৎকার সমন্বয় ঘটিয়ে বঙ্গবন্ধু তাঁর স্বাধীন রাজনীতির গতিপথ বিনির্মাণে এগিয়ে গিয়েছিলেন। আত্মজীবনীতে বঙ্গবন্ধু সেই সময়ের ভারতবর্ষ ও পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি তুলে ধরার পাশাপাশি পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের চাপিয়ে দেওয়া বৈষম্য, নির্যাতন এবং অধিকার ও সম্পদ লুট করার জ্বলজ্বলে চিত্র তুলে ধরেছেন।

কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক মুসলিম লীগ সরকারের অপশাসন, ভাষা আন্দোলন, ছাত্রলীগ ও আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠা, যুক্তফ্রন্ট গঠন ও নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন, আদমজির দাঙ্গা, পাকিস্তান কেন্দ্রীয় সরকারের বৈষম্যমূলক শাসন ও ষড়যন্ত্রের বিস্তৃত বিবরণ এবং এসব বিষয়ে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার বর্ণনায় সমৃদ্ধ হয়েছে ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’। সঙ্গে রয়েছে তাঁর বংশপরিচয়, শৈশব কাল এবং শিক্ষাজীবনের নির্মোহ বর্ণনা। ‘মানুষ স্বার্থের জন্য অন্ধ হয়ে যায়’- এ উপলদ্ধিই বুঝিয়ে দেয় বঙ্গবন্ধুর আত্মত্যাগের মূল দর্শন এর মতো কোথায় বাঁধা। বাংলা ও বাঙালির ইতিহাস সম্পর্কে বঙ্গবন্ধুর সচেতনতা এবং এই অঞ্চলের মানুষের প্রতি তাঁর সহমর্মিতা ছিল খুবই তীক্ষ্ণ ও সুগভীর। বিভিন্ন সময়ে তাঁর ভাষণেও এর প্রকাশ দেখা যায়। ১৯৪৩ সালে বাংলার দুর্ভিক্ষ ও অগণিত মানুষের মৃত্যু বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি লিখেন, ‘যুদ্ধ করে ইংরেজ, আর না খেয়ে মরে বাঙালি; যে বাঙালির কোনো কিছুরই অভাব ছিল না। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি যখন বাংলাদেশ দখল করে মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায়, তখন বাংলার এত সম্পদ ছিল যে, একজন মুর্শিদাবাদের ব্যবসায়ী গোটা বিলাত শহর কিনতে পারত।’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ: ১৮) বাঙালিদের প্রতি বৈষম্য, বঞ্চনার বিরুদ্ধে তাঁর ভেতরে কিভাবে এক আগ্নেয়গিরির জন্ম নিচ্ছে ধীরে ধীরে, তা এসব লেখনীর মধ্য দিয়ে মূর্ছিয়ে ওঠে।

অসাম্প্রদায়িক চরিত্র ও নেতৃত্বের কারণে দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাস ও নেতাজি সুভাষ বসুর ভক্ত হয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু। মুসলমানদের বিচ্ছিন্নতাবোধ সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি ব্রিটিশবিরোধী ত্যাগী ও কারানির্যাতন ভোগকারী সংগ্রামীদের প্রসঙ্গ টেনে লিখেন : জীবনভর কারাজীবন ভোগ করেছে ইংরেজকে তাড়াবার জন্য। এই সময় যদি এই সকল নিঃস্বার্থ স্বাধীনতা সংগ্রামী ও ত্যাগী পুরুষরা ইংরেজদের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সাথে সাথে হিন্দু ও মুসলমানদের মিলনের চেষ্টা করতেন এবং মুসলমানদের উপর যে অত্যাচার ও জুলুম হিন্দু জমিদার ও বেনিয়ারা করেছিল, তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতেন, তাহলে তিক্ততা এত বাড়ত না।’ (বঙ্গবন্ধুর আত্মজীবনী, পৃ: ১৮) আওয়ামী মুসলিম লীগের নামকরণের ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি এভাবে ব্যক্ত করেন, ‘আমি মনে করেছিলাম, পাকিস্তান হয়ে গেছে, সাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের দরকার নাই। একটা অসাম্প্রদায়িক রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হবে, যার একটা সুষ্ঠু মেনিফেস্টো থাকবে’। (অসমাপ্ত আত্মজীবনী, পৃ১২১) । স
ব ধর্মের সহাবস্থান ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই ছিল তাঁর মূলমন্ত্র। দুঃখী মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ছিল তাঁর লক্ষ্য। তিনি যেমন তাঁর জীবনী ও রোজনামচা লিখতে গিয়ে বারবার দুঃস্থ ও গরিবের প্রসঙ্গ এনেছেন, তেমনি তাঁর বিভিন্ন ভাষণেও দ্ব্যর্থহীনভাবে তাঁর অবস্থান জানিয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৭২ সালের ২৪ জানুয়ারি টাঙ্গাইলে, তিনি তখন আমাদের জাতির পিতা, এক জনসভায় বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশে সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতি প্রতিষ্ঠা করা হবে। শোষকদের আর বাংলাদেশে থাকতে দেওয়া হবে না। গরিব হবে এই রাষ্ট্র এবং এই সম্পদের মালিক, শোষকরা হবে না। এই রাষ্ট্রে হিন্দু-মুসলমান ভেদাভেদ থাকবে না। এই রাষ্ট্রের মানুষ হবে বাঙালি। তাদের মূলমন্ত্র – ‘সবার উপরে মানুষ সত্য তাহার উপরে নাই’। বাংলাদেশে ধর্মনিরপেক্ষতা ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা হবে। কিন্তু এর অর্থ বিশৃঙ্খলা নয়।’বঙ্গবন্ধুর মানস নির্মিতি ও রাজনৈতিক চিন্তার বিকাশ সম্পর্কে প্রত্যক্ষ ধারণা পাওয়া যায় তাঁর অসমাপ্ত আত্মজীবনী ও কারাগারের রোজনামচায় । ছাত্রাবস্থায় মাদারীপুরে স্বদেশ আন্দোলনকারী ও তাঁদের নেতা অধ্যক্ষ পূর্ণেন্দু দাসের মুক্তিতে কবি কাজী নজরুল ইসলামের ‘পূর্ণ অভিনন্দন’ কবিতা ও তাতে ‘জয় বাংলা’র উল্লেখ এবং নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর পার্টির সাথে যোগাযোগের কারণে তাঁর মনোজগতে প্রগতিশীলতা ও অসাম্প্রদায়িকতার বীজমন্ত্র রোপিত হতে থাকে। পাশাপাশি নিয়মিত দৈনিক ও মাসিক পত্রিকা, কবি নজরুল ও কবি হুমায়ুন কবিরের সাথে সখ্যতা তাঁর শুদ্ধ সংস্কৃতি মনস্কতা সৃষ্টিতে জোরালো ভূমিকা রাখে। তিনি হতে থাকেন পুরোপুরি এক বিশুদ্ধ বাঙালি।

বাংলার নদী, বাংলার জল, খাবার, বাংলার গান, বাংলার উর্বর জমি আর নৈসর্গিক সৌন্দর্য তাঁকে সবসময় বিমোহিত করতো। একবার এক অনুষ্ঠান শেষে নদীপথে নৌকা দিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে আসছিলেন। বাংলার শ্রেষ্ঠ লোকসংগীত শিল্পী আব্বাসউদ্দিন ছিলেন সহযাত্রী। পথে আব্বাসউদ্দিনের কণ্ঠে ভাটিয়ালি গান শুনে তিনি খুবই মুগ্ধ হয়েছিলেন। তিনি লিখেন, ‘নদীতে বসে আব্বাসউদ্দিন সাহেবের ভাটিয়ালি গান তাঁর নিজের গলায় না শুনলে জীবনের একটা দিক অপূর্ণ থেকে যেত। তিনি যখন আস্তে আস্তে গাইতেছিলেন তখন মনে হচ্ছিল, নদীর ঢেউগুলিও যেন তাঁর গান শুনছে।’ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কারাগারের রোজনামচায় ভূমিকা লিখতে গিয়ে লিখেছেন, ‘বাংলার মানুষ যে স্বাধীন হবে, এ আত্মবিশ্বাস বারবার তাঁর (বঙ্গবন্ধু) লেখায় ফুটে উঠেছে। এত আত্মপ্রত্যয় নিয়ে পৃথিবীর আর কোন নেতা ভবিষ্যদ্ববাণী করতে পেরেছেন কি না জানি না।’
কারাগারের রোজনামচায় ৭ জুন, ১৯৬৬ বঙ্গবন্ধু লিখলেন, ‘— জনগণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে হরতাল পালন করেছে। তারা ছয়দফা সমর্থন করে আর মুক্তি চায়, বাঁচতে চায়, ব্যক্তি স্বাধীনতা চায়। —- এখবর শুনলেও আমার মনকে বুঝাতে পারছি না। একবার বাইরে একবার ভিতরে, খুবই উদ্বিগ্ন হয়ে আছি। বন্দি আমি, জনগণের মঙ্গল কামনা ছাড়া আর কি করতে পারি। তাঁর হাত দিয়ে বাঙালি যেমন নিজের রাষ্ট্র পেয়েছে, তেমনি পেয়েছে মানুষের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার আদর্শ। এই তিনিই তো ১৯৭১ এর ৭ মার্চ রেসকোর্স ময়দানে জানিয়ে দিয়েছিলেন, ‘আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই’। সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা, অসীম আত্মবিশ্বাস, গভীর দেশপ্রেম ও ত্যাগের মানসিকতার পাশাপাশি মানুষের ভালোবাসা বঙ্গবন্ধুকে স্বীয় স্থানে পৌঁছে দেয়। এ কারণেই বঙ্গবন্ধু আজ ‘জীবিতের চেয়েও অধিক জীবিত’।

ভারতের প্রয়াত রাষ্ট্রপতি এ পি জে আবদুল কালাম তাঁর আত্মজীবনীমূলক গ্রন্থ The Wings of Five -এ লিখেছেন, ‘আমরা সবাই আমাদের ভেতরে এক স্বর্গীয় আগুন নিয়ে জন্মগ্রহণ করেছি। আমাদের উচিত এই আগুনে ডানা জুড়ে দিয়ে সেই আলোর মহিমায় পৃথিবীকে মহিমান্বিত করে দেয়া।’ ১৯২০ সালের ১৭ই মার্চ গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় এক ছোটো আগুনের ফুলকি নিয়ে জন্ম নেয়া শেখ মুজিবুর রহমান খোকা। তাঁর অন্তর্গত ফুলকিকে প্রজ্বলিত মশালে রূপ দিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয় পুরো বিশ্বকে আলোকিত করেছিলেন। এই ধ্রুব সত্য তাঁর শত্রুরাও অকপটে স্বীকার করতে বাধ্য। কবি জসীমউদ্দীন তো তাঁকে নিয়েই লিখেছেন, ‘শেখ মুজিবুর রহমান / যেন বিসুভিয়াসের অগ্নি-উগারী বান’।
০১.০৯.২০২১

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com