বৃহস্পতিবার, ২৮ মে ২০২০, ১১:১০ পূর্বাহ্ন

লাইলাতুল কদরের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য

লাইলাতুল কদরের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য

সময় চিন্তা । মুফতি আহমদ যাকারিয়া

লাইলাতুল কদরের মাহাত্ম্য ও তাৎপর্য

আরবিতে ‘লাইলাতুন’ শব্দের অর্থ হলো রাত; আর ‘কদর’ শব্দের অর্থ হলো সম্মান বা মর্যাদা। সুতরাং ‘লাইলাতুল কদর’ এর সমষ্টিগত অর্থ হচ্ছে সম্মানের রাত বা মর্যাদার রাত। ‘কদর’ শব্দের আরো একটি অর্থ হলো সিদ্ধান্ত করা বা নির্ধারণ করা। এ হিসেবে ‘লাইলাতুল কদর’ অর্থ হবে সিদ্ধান্তের রাত বা নির্ধারণের রাত। পবিত্র ‘লাইলাতুল কদর’ সকল রাতগুলোর রাজা। অসংখ্য অগণিত অলৌকিক ঘটনা এ রাতে সংগঠিত হওয়ায় এর মর্যাদা ইসলামে সীমাহীন।

মূলত ইসলামের সমৃদ্ধ সংস্কৃতিতে প্রতিটি জিনিসকেই ঐশী মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হয়। এই মানদণ্ডের ভিত্তিতেই আল কোরআন বলেছে; “লাইলাতুল কাদরি খাইরুম মিন আলফি শাহর” অর্থাৎ কদরের রাত্রি এক হাজার রাতের চেয়েও উত্তম।

পবিত্র রমযানের রাতগুলোর মধ্যকার একটি রাতে ইবাদাত-বন্দেগি করা অন্য সময়কার হাজার মাসের রাতের ইবাদাতের সমান। কারণ ঐ রাতে ইহকালীন ও পরকালীন উপকার যেমন রয়েছে ঠিক তেমনিভাবে এতে রয়েছে ব্যাপক বরকত ও কল্যাণ। ঐ রাতটিকে বলা হয় শবে কদর। বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে যে,পরিপূর্ণ কোরআন একবারে এই রাতেই নবীজীর উপর অবতীর্ণ হয়, যদিও শাব্দিক রূপে বা আয়াত রূপে তা নাযিল হয়েছিল নবী সাঃ এর নবুওয়াতি জীবনের কর্মময় ২৩টি বছরের বিভিন্ন সময়ে। মূলত এই কোরআনের মাহাত্ম্যের কারণেই শবে কদরের এতো মূল্যায়ন, এতো মর্যাদা।

কদরের মহিমান্বিত রাতটি হচ্ছে অন্তরের আয়না ধুয়ে-মুছে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে ঝকঝকে করে তোলার এক স্বর্ণালী সুযোগ। মন্দের স্থানগুলোকে পুণ্য ও কল্যাণময় কাজ দিয়ে পূর্ণ করা, বিচ্ছিন্নতা আর মতানৈক্যের স্থানে ঐক্য ও শান্তি প্রতিষ্ঠা করা, অন্যায়-অত্যাচারের স্থানগুলোকে ন্যায় ও দয়ার সাহায্যে ভরপুর করে তোলা, অবাধ্য সন্তানেরা পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধা-সম্মান প্রদর্শন এবং তাদের ব্যাপারে দায়িত্বশীল ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া, যোগাযোগহীন আত্মীয়-স্বজনদের সাথে সু-সম্পর্ক আর যোগাযোগ গড়ে তোলার সুবর্ণ সময় হলো এই শবে কদর। যারা কদরের রাতে জাগ্রত থেকে ইবাদাত করে, আল্লাহ তাদের নাম পূণ্যবানদের তালিকাভুক্ত করেন এবং জাহান্নামের আগুনকে তাদের জন্যে হারাম করে দেন। এরচেয়ে সৌভাগ্যের কথা আমাদের জন্যে আর কী হতে পারে? পূণ্যবানদের তালিকাভুক্ত হওয়ার অর্থই তো হলো আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা। আর নৈকট্য লাভ করার মধ্যে রয়েছে একজন মানুষের জীবনের পরিপূর্ণ স্বার্থকতা।

এই রাতকে মহান আল্লাহ তা`আলা নিজেই হাজার মাসের চেয়ে উত্তম বলে ঘোষণা করেছেন। এ রাতকে যে কাজে লাগাতে পারেনি নবী সাঃ তাকে বড় হতভাগা বলেছেন।‍ উম্মতগণ চাইলে এ রাতকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে পারেন। এ রাতের প্রত্যেকটি আমল আল্লাহর দরবারে গৃহিত হয়। কেবল কয়েক শ্রেণির মানুষ ছাড়া বাকী সবার দোয়া আল্লাহর কাছে কবুল হয়। মাত্র এক রাতের আমল দিয়ে নিজেকে জান্নাতি বানানোর সুযোগ করে দিয়েছে এই মহিমান্বিত শবে কদর।

লাইলাতুল কদরে শুধুমাত্র চার শ্রেণির মানুষকে ক্ষমা করা হবে না, তাদের কোনো কিছুই আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না, যতক্ষণ না তারা এসব অপকর্ম থেকে সংশোধন হবে। এই চার শ্রেণির মানুষ হলো,

এক- মদপানে অভ্যস্ত ব্যক্তি।

দুই- মাতা-পিতার অবাধ্য সন্তান।

তিন- আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী।

চার- হিংসা, বিদ্বেষ পোষণকারী ও সম্পর্কছিন্নকারী। (শুয়াবুল ঈমান, ৩য় খণ্ড, ৩৩৬ পৃষ্ঠা)

লাইলাতুল কদরের ইবাদত সম্পর্কে নবী করিম সাঃ ইরশাদ করেছেন; তোমাদের উপর এমন এক মাস এসেছে; যাতে একটি রাত এমনও আছে, যা হাজার মাস থেকেও উত্তম। যে এ রাত থেকে বঞ্চিত রয়েছে, সে পূর্ণ কল্যাণ থেকে বঞ্চিত রয়েছে। নবী সাঃ এ রাত সম্পর্কে আরও বলেন, যে ব্যক্তি লাইলাতুল কদরে ঈমানের সঙ্গে সওয়াব লাভের আশায় ইবাদত করে তার পূর্ববর্তী গোনাহগুলো ক্ষমা করে দেয়া হয়। (বুখারি)

লাইলাতুল কদর সম্পর্কে কুরআনের একাধিক জায়গায় বর্ণনা করা হয়েছে। লাইলাতুল কদর এমন এক রাত, যে রাতে আল্লাহ প্রত্যেক বস্তুর সঠিক পরিমাণ নির্ধারণ করেন। তার সময় নির্দিষ্ট করেন এবং হুকুম নাজিল করেন ও প্রত্যেক বস্তুর ভাগ্য নির্ধারণ করেন। এ রাতে ফেরেশতাগণ রবের নির্দেশে সকল কার্য সম্পাদনের জন্যে জমিনে নেমে আসেন। লাইলাতুল কদর এমন এক রাত, আল্লাহর নিকট যার বিরাট মাহাত্ম্য ও ফযিলত রয়েছে।

শবে কদর এমন একটি মহিমান্বিত রাত, যে রাত সম্পর্কে হযরত আনাস রাঃ থেকে বর্ণিত হাদিসে আছে, মহানবী সাঃ বলেছেন, হযরত জিব্রাইল আঃ এর নেতৃত্বে ফেরেশতারা পৃথিবীতে চলে আসেন। প্রত্যেকের মাগফিরাতের জন্য দোয়া করেন, যারা দাঁড়িয়ে কিংবা বসে এবাদত করে থাকেন। (জিয়াউল কোরআন, ৫ম খণ্ড)

শবে কদর কোন রাতে?

এই রাত রমজানের কোন তারিখে? রাসূলুল্লাহ সাঃ একটি রহস্যময় কারণে তারিখটি সুনির্দিষ্ট করেননি। ইমাম বুখারি, ইমাম মুসলিম, ইমাম আহমদ ও ইমাম তিরমিজি কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে বলা হয়েছে যে, হজরত আয়েশা রাঃ বর্ণনা করেছেন, নবী সাঃ বলেছেন; কদরের রাতকে রমজানের শেষ দশ রাতের কোন বেজোড় রাতে খোঁজ করো।’ আবু বকর রাঃ ও আবব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাঃ থেকে বর্ণিত হাদিস থেকেও এই একই ধরনের তথ্য পাওয়া যায়।

শবে কদর সম্পর্কে আল্লাহ পাক বলেন; “আমি যদি শবে কদরকে নির্দিষ্ট করে দিতাম আর তোমরা এ রাত সম্পর্কে জানা সত্ত্বেও গুনাহে লিপ্ত হতে, তাহলে এটা না জেনে গুনাহ করার চেয়ে বেশি জঘন্য হয়ে যেত। সুতরাং এ কারণে আমি সেটাকে গোপন রেখেছি। তিনি আরও বলেছেন যে, যদি তুমি শবে কদর সম্পর্কে জানতে এবং তাতে ইবাদত করতে তবে হাজার মাস অপেক্ষা বেশি সওয়াব অর্জন করতে। আর যদি তাতে গোনাহ করে বসতে তবে হাজার মাসের চেয়েও অনেক বেশি শাস্তি পেতে। শাস্তি দূর করা সওয়াব অর্জনের চেয়েও উত্তম।

শবে কদরের সঠিক দিনক্ষণ নিয়ে ইসলামী পণ্ডিতদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এ ব্যাপারে চল্লিশটিরও অধিক মতভেদ পাওয়া যায়। শাহ্ ওয়ালী উল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী রাহঃ বলেছেন, লাইলাতুল কদর দু’টি। তার একটি হচ্ছে শা’বান মাসের ১৫ তারিখ। এ রাতে বান্দার আগত বছরের ভাগ্য নির্ধারণ করা হয়। এটাকে লাইলাতুল বারাতও বলা হয়। আর দ্বিতীয়টি হচ্ছে রমজান মাসের শেষ ১০ দিনের কোনো এক রাত। এ রাতের মর্যাদা অনেক গুণ বেশি। এ রাতে বান্দার প্রতি আল্লাহর নূর বর্ষিত হয়। ফেরেশতাগণ এবং হযরত জিবরাঈল আঃ এ রাতে যমীনে অবতরণ করেন।

তবে বেশিরভাগ ইসলামী বিশেষজ্ঞদের মতামত যে, শবে কদর পবিত্র রমজানের শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতেই হয়ে থাকে। এ কারণে শুধু রমজানের ২৭ তম রাতের গুরুত্ব না দিয়ে রমজানের ২১, ২৩, ২৫, ২৭ ও ২৯ তারিখের রাতে ‘শবে কদর’ খোঁজ করে এসব রাতে বেশি বেশি করে ইবাদত করার কথা বলা হয়েছে।

মহিমান্বিত এ রাতকে আল্লাহ পাক রমজানের শেষ দশকের বেজোড় রাতে লুকিয়ে রেখেছেন। বান্দাহ বিনিদ্র রজনী কাটাবে, সবর করবে, ধৈর্য ধারণের মাধ্যমে খুঁজে পাবে সম্মানিত রাত। পাবে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত; ফেরেশতার অদৃশ্য মোলাকাতে সিক্ত হবে তার হৃদয়, আপন রবের ভালোবাসায় হবে সে উদ্বেলিত। এ যেন দীর্ঘ বিরহের পর আপনজনকে ফিরে পাওয়ার আনন্দ। এ দীর্ঘ প্রতিক্ষার কষ্ট-বিরহের মাধ্যমে রব তার বান্দাহকে আরো আপন করে নেন। কাজেই শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে ইবাদতে মশগুল থাকা চাই। শেষ দশকের বিজোড় প্রতিটি রাতকেই আমাদের ‘লাইলাতুল কদর’ মনে করতে হবে। তাহলে লাইলাতুল কদর আল্লাহর মেহেরবানিতে আমাদের থেকে হাতছাড়া হবে না ইনশাআল্লাহ।

হযরত আয়েশা রাঃ থেকে বর্ণিত; রাসূল্লাহ সাঃ ইরশাদ করেছেন; তোমরা শবে কদর রমজানুল মোবারকের শেষ দশকের বিজোড় রাতগুলোতে তালাশ করো।

তবে শবে কদরের রাত নিয়ে ইসলামী পণ্ডিতদের মধ্যে ভিন্নমত থাকলেও বেশিরভাগ ইসলামী বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, শবে কদর রমজানের ২৭ তম রাতেই হয়ে থাকে। এ কারণে সারা বিশ্বের মুসলমান রমজানের ২৭ তম রাতকেই ‘শবে কদর’ হিসেবে পালন করে থাকে। রমজানের ২৭ তম রাতের প্রতি বেশি গুরুত্ব দেয়ার কথা তাঁরা উল্লেখ করেছেন বিভিন্ন বক্তব্য ও লেখনীতে। এসব ইসলামী মনীষী তাদের নিজস্ব ইজতিহাদ, গবেষণা, গাণিতিক বিশ্লেষণ ইত্যাদির মাধ্যমে রমজানের ২৭ তারিখের রাতে অর্থাৎ ২৬ রোজার দিবাগত রাতে ‘শবে কদর’ হওয়ার উজ্জ্বল সম্ভাবনার কথা জোর দিয়ে বলেছেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ সাঃ এটাকে সুনির্দিষ্ট করেননি; বরং কষ্ট করে খুঁজে নিতে বলেছেন উম্মতকে।

আর ইসলামী পণ্ডিতদের অভিমত; শবে কদর সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য ধারণা হলো যে, ২৭ তারিখের রাত সম্পর্কেই। তাই এ রাতে অলসতার মধ্যে না কাটিয়ে ইবাদত বন্দেগির মাধ্যমে কাটানো উচিত।

রমজানের শেষ দশকের বিজোড় রাতে লাইলাতুল কদর হওয়ার ব্যাপারে রাসুল সাঃ এর অনেক হাদিসও রয়েছে।

রমজান মাসের শেষ দশকের বিজোড় রাতের মধ্যে কোনো একদিন লাইলাতুল কদর। তবে হাদীসে রয়েছে যে, আবহাওয়া বা ঝলমলে একটি প্রাশান্তির রাত হবে সেদিন। এই রাতটি হবে খুবই শান্ত ও প্রশান্তিময়। এই রাত শেষে সকালটি হবে প্রশান্তির। এ রাতে প্রত্যেক বস্তুকে সেজদারত অবস্থায় দেখা যাবে। প্রতিটি স্থান হবে স্বর্গীয় আলোয় আলোকিত। সবচেয়ে সুস্পষ্ট নিদর্শন হচ্ছে, এই রাতের এবাদত অন্তরে তৃপ্তি জোগাবে। এটি দোয়া কবুলের রাত। আমাদের ভাগ্য রজনী বা মহিমান্বিত রজনী। এই রাতেই আল্লাহ পাক আমাদের ভাগ্য নির্ধারণ করে থাকেন। রমজানের শেষ দশকে ই’তিকাফ করার উদ্দেশ্যই হলো, শবে কদর প্রাপ্তিতে দৃঢ়তা আনয়ন।

শবে কদরের ফযিলত

শবে কদর হচ্ছে একটি মহিমান্বিত, বরকতময় এবং বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত রজনী। এ রজনীতে মহাগ্রন্থ আল কোরআন অবর্তীণ হয়েছে। হাজার মাসের চেয়ে উত্তম রাত কদরের রাত।

আল্লাহ পাক সুরা কদরের ১-৫ নং আয়াতে বলেন, নিশ্চয় আমি কোরআন অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে। আর কদরের রাত সম্বন্ধে তুমি কি জান? কদরের রাত হাজার মাস অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ। সে রাতে ফেরেশতারা ও রুহ অবতীর্ণ হয় প্রত্যেক কাজে তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। শান্তিই শান্তি, বিরাজ করে উষার আবির্ভাব পর্যন্ত।

আরেক জায়গায় আল্লাহ্ বলেন; হা-মীম! শপথ সুস্পষ্ট কিতাবের। নিশ্চয়ই আমি কোরআন এক মুবারকময় রজনীতে অবর্তীণ করেছি। নিশ্চয় আমি সতর্ককারী। এ রাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়। (আদ দুখান: ১-৪)

আরেক জায়গায় আল্লাহ্ বলেন; রমজান এমন মাস যাতে কুরআন নাজিল হয়েছে’ (বাকারা:১৮৫)

কুরআনে এসেছে যে, “এ রাতেই পবিত্র কুরআন নাজিল করা হয়েছে”।

কুরআনের এক জায়গায় এসেছে যে, “এ রাতে ফেরেশতা পৃথিবীতে অবতরণ করেন এবং ইবাদতকারী বান্দাহদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন। ফজর পর্যন্ত এ রাতে পুরোপুরি শান্তি ও নিরাপত্তার”।

কুরআনের আরেক জায়গায় এসেছে; “এ রাতে প্রত্যেকটি ব্যাপারে অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও সুদৃঢ় ফায়সালা জারি করা হয়”।

নবী সাঃ বলেন; “এ রাতে ইবাদতে মাশগুল বান্দাহদের জন্য অবতরণকৃত ফেরেশতারা দোয়া করেন”।

সুরা কদরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, হাজার মাস ইবাদতে যে পূণ্য হয়, কদরের এক রাতের ইবাদত তার চেয়ে উত্তম। লাইলাতুল কদরে মুসলিমরা আল্লাহর কাছে মাগফিরাত, নাজাত ও ক্ষমা পাওয়ার পরম সুযোগ লাভ করে।

লাইলাতুল কদর সম্পর্কে নবী সাঃ বলেন, যে ব্যক্তি এ রাত ইবাদতের মাধ্যমে অতিবাহিত করবে, আল্লাহ তাঁর পূর্বের কৃত সব গোনাহ মাফ করে দেবেন। (বুখারী)

আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাঃ, ইবনে আব্বাস রাঃ, ইকরামা প্রমুখ হতে বর্ণিত হয়েছে যে, কদরের রাত সারা বছরের মধ্যেই অনুষ্ঠিত হওয়া সম্ভব। হানাফী মাযহাবের বিশিষ্ট ফিকাহবিদ ফতওয়ায়ে কাযীখান এর গ্রন্থকার আল্লামা ফখরুদ্দিন আবুল মুখাখির আল কারিগিনী ও আবু বকর রহঃ বলেছেন যে, এটাই হানাফী মাযহাবের প্রসিদ্ধ অভিমত।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাঃ বলেছেন, কদরের রাত রমজান মাসের সাথে সম্পৃক্ত। তবে রমজানের সারা মাসেই তা পাওয়া সম্ভব রয়েছে। রাসুল সঃ বলেছেন, তোমরা রমজানের শেষ দশকে ৯, ৭ ও ৫দিন অবশিষ্ট থাকতে তালাশ করো। (বুখারী: ১৯৮৫)

শবে কদরের আমল

এই রাতে নিজেকে নিজের বিবেক দ্বারা বিচার করা প্রয়োজন। আত্মসমালোচনা করা, আত্মবিচার করা। অর্থাৎ, আপনি নিজেই নিজের পর্যালোচনা করুন। জীবনের ফেলে আসা দিনগুলোতে আল্লাহর কতগুলো হুকুম অমান্য করেছেন, আল্লাহর কতগুলো আমল আপনি পালন করেছেন এবং তা কতটা নিষ্ঠার সাথে করেছেন, ইচ্ছা ও অনিচ্ছায় কী কী বড় গুনাহ আপনি করেছেন, আল্লাহর গোলাম হিসেবে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠায় আপনি কতটুকু ভূমিকা রেখেছেন? এগুলো ভাবুন, যা কিছু ভালো করেছেন; তার জন্য আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করুন, আর যা হয়নি, তার জন্য আল্লাহর ভয় মনের মধ্যে সৃষ্টি করুন। সত্যিকার ভাবে তাওবা করুন। এই রাতে নীরবে-নিভৃতে কিছুটা সময় নিছের আত্মসমালোচনা করুন। দেখবেন আপনি সঠিক পথ খুঁজে পাবেন। আত্মসমালোচনা বিবেককে জাগিয়ে তুলবে। আত্মসমালোচনা আত্মশুদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপায়। আল্লাহ পাক কুরআনে বলেন; ‘হে ঈমানদার লোকেরা! আল্লাহ তায়ালাকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত আগামী কালের জন্য (পরকাল) সে কী প্রেরণ করেছে, তা চিন্তা করা’। (হাশর :১৮)

এই রাতে রাত্রি জাগরণ করা উচিত। আল্লাহর জন্য আরামের ঘুম স্বেচ্ছায় হারাম করে রাত জেগে ইবাদত করা আল্লাহর প্রিয় বান্দাহদের একটি গুণ। আল্লাহ পাক তার প্রিয় বান্দাহদের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে; ‘তারা রাত্রি যাপন করে রবের উদ্দেশ্যে সিজদাবনত হয়ে ও দাঁড়িয়ে থেকে’ (ফুরকান:৬৪)

‘তাদের শরীর বিছানা থেকে পৃথক থাকে (অর্থাৎ তারা শয্যা গ্রহণ করে না ; বরং এবাদতে মাশগুল থাকে)। তারা গজবের ভয়ে এবং রহমতের আশায় তাদের রবকে ডাকতে থাকে এবং আমি যা দিয়েছি তা থেকে দান করে থাকে। কেউ জানে না; তাদের আমালের পুরস্কারস্বরূপ (আখিরাতে) তাদের জন্য কী জিনিস গোপনে রাখা হয়েছে’। (সিজদা:১৬-১৭)

আল্লাহর প্রিয় বান্দারা গোটা জীবনই এভাবে কাটান। আমাদের সে জীবনে প্রবেশ করতে হলে দরকার অধ্যবসা। পবিত্র রমজান, বিশেষ করে লাইলাতুল কদরের অনুসন্ধানের প্রচেষ্টা আমাদের ঈপ্সিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে।

’নবী সাঃ বলেছেন; ‘কদরের রাত রমজান মাসের শেষ দশ রাতে রয়েছে। যে ব্যক্তি এর শুভফল লাভের উদ্দেশ্যে ইবাদতের জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে, আল্লাহ তার আগের ও পেছনের গুনাহ মাফ করে দেবেন।’ রাসূল সাঃ রমজানের শেষ দশ দিন মসজিদে ইতেকাফে থাকতেন এবং ইবাদতে গভীর মনোনিবেশ করতেন। কাজেই আমরা কোনো একটা বিশেষ রাতকে নির্দিষ্ট না করে হাদিস অনুযায়ী অন্তত রমজানের শেষ দশ দিনের বেজোড় রাতগুলোতে লাইলাতুল কদরের সৌভাগ্য লাভের আশায় ইবাদতে মশগুল হই। আমরা এতে অবহেলা করলে হাদিসের ভাষায় হতভাগ্য হিসেবে চিহ্নিত হবো। রাসূল সাঃ বলেন; ‘যে ব্যক্তি এ রাত থেকে বঞ্চিত হবে, সে সমগ্র কল্যাণ ও বরকত থেকে বঞ্চিত হবে। এর কল্যাণ থেকে একমাত্র হতভাগ্য লোক ছাড়া আর কেউ বঞ্চিত হয় না’। (মিশকাত)

এই রাতে লম্বা সময় ধরে মোনাজাত করা উচিত। মোনাজাতের মাধ্যমে বান্দাহর বন্দেগি ও আল্লাহর রবুবিয়্যাতের প্রকাশ ঘটে। বান্দাহ তার প্রভুর কাছে চায়। আল্লাহ্ এতে ভীষণ খুশি হন। আল্লাহ তার বান্দার প্রতি এতটাই অনুগ্রহশীল যে, তিনি তার কাছে না চাইলে অসস্তুষ্ট হন। হাদীসে এসেছে, নবী সাঃ বলেন; ‘যে আল্লাহর কাছে কিছু চায় না, আল্লাহ তার উপর রাগ করেন’। (তিরমিজি)

আরেক হাদীসে আছে; ‘দোয়া ইবাদতের মূল’। নবী সাঃ বলেন; ‘যার জন্য দোয়ার দরজা খোলা, তার জন্য রহমতের দরজাও খোলা রয়েছে’ (তিরমিজি)

কাজেই আমরা কায়মনোবাক্যে আল্লাহর দরবারে মুনাজাত করব, ক্ষমা চাইব, রহমত চাইব, জাহান্নাম থেকে মুক্তি চাইব। মনের আবেগ নিয়ে চাইব। চোখের পানি ফেলে চাইব। আল্লাহ আমাদেরকে খালি হাতে ফেরাবেন না ইনশাআল্লাহ।

রাসূল সাঃ এর বাণী আশার আলো জ্বেলে দেয় হৃদয়ে। রাসূল সাঃ বলেছেন- ‘তোমাদের পরওয়ারদিগার লজ্জাশীল ও দাতা; তিনি লজ্জাবোধ করেন, যখন তাঁর বান্দাহ তার কাছে দুই হাত উঠায়, তখন তা খালি ফিরিয়ে দিতে’। (তিরমিজি, আবু দাউদ)

বিশেষ করে এই রাতে পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে। মানবজাতির এই বিরাট নিয়ামতের কারণেই এ রাতের এত মর্যাদা ও ফজিলত। এই কুরআনকে ধারণ করলেই মানুষ সম্মানিত হবে, একটি দেশ ও জাতি মর্যাদাবান হবে; গোটা জাতির ভাগ্য বদলে যাবে। কাজেই এ রাতে অধিক পরিমাণে কুরআন পড়া চাই। এই রাতে কুরআনের শিক্ষাকে ব্যক্তি ও সমাজ জীবনে প্রতিষ্ঠার শপথ গ্রহণ করতে হবে। বাছাইকৃত কিছু আয়াত এ রাতে মুখস্থও করা যেতে পারে। কুরআনের এ গভীর অধ্যয়ন আমাদের সৌভগ্যের দ্বার খুলে দেবে। হাদিস থেকে জানা যায়, রাতে এক ঘণ্টা গবেষণামূলক ইসলামী গ্রন্থ অধ্যয়ন, সারা রাত জেগে ইবাদত করার চেয়েও উত্তম। এই সম্মান হলো সাধারণ রাতের জন্য আর এই পবিত্র রজনীতে কুরআন অধ্যয়নের ফজিলত কী হবে? তা তো কল্পনা করাই কঠিন।

সুতরাং এই রাতে নফল নামাজ, তাহিয়্যাতুল অজু, দুখুলিল মাসজিদ, আউওয়াবিন, তাহাজ্জুদ, সালাতুত তাসবিহ, তাওবার নামাজ, সালাতুল হাজাত, সালাতুশ শোকর, উমরি কাযা ও অন্যান্য নফল এবাদতের পাশাপাশি কুরআন তেলাওয়াত বেশি বেশি করে করা উচিত।

পাশাপাশি এই রাতে অধিক পরিমাণে জিকিরে সময় ব্যয় করব। হাদিসে যেসব দোয়া ও জিকিরের ফজিলতের কথা বলা হয়েছে, সেগুলো পড়া যেতে পারে।

ইস্তেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা) ও দুরুদ আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয়। কমপক্ষে ১০০ বার ইস্তেগফার ও ১০০ বার দুরুদ পড়া যেতে পারে।

আয়েশা রাঃ বলেন; আমি রাসূলুল্লাহ সাঃ কে বললাম, ইয়া রাসূলুল্লাহ! যদি কোনভাবে আমি জানতে পারি যে, রাতটি লাইলাতুল কদর; তাহলে কী দোয়া করব? জবাবে নবী সাঃ বলেন, এই দোয়া পড়বে- আল্লাহুম্মা ইন্নাকা আফুউয়্যুন, কারিমুন, তুহিব্বুল আ’ফওয়া ফা’ফু আন্নী।’ অর্থাৎ ‘হে আল্লাহ! তুমি বড়ই ক্ষমাশীল এবং বড়ই অনুগ্রহশীল। মাফ করে দেয়াই তুমি পছন্দ করো। অতএব তুমি আমাদের গোনাহগুলো ক্ষমা করে দাও।’ হজরত আয়েশা রাঃ কে শেখানো দোয়া আমরা আবেগের সাথে বারবার পড়তে পারি।

উপরোক্ত আমলের মাধ্যমে আমরা এ পবিত্র রাতকে কাটাতে পারি। লাইলাতুল কদর পাওয়ার আশা নিয়ে নিষ্ঠার সাথে অনুসন্ধান করলে আল্লাহ আমাদের বঞ্চিত করবেন না ইনশাআল্লাহ। অবশ্য নফল ইবাদত নীরবে-নিভৃতে ঘরে আদায় করাই সুন্নাত। এতে আমাদের ইবাদত রিয়া (প্রদর্শন ইচ্ছা) দোষে দুষ্ট হওয়ার হাত থেকে রক্ষা পাবে।

সর্বোপরি সকল মুসলমানের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করা এবং দেশ ও জাতির কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করে দোয়া করা দরকার। সকল পাপ প্রেরণা ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা বিসর্জন দিয়ে মানসিক উৎকর্ষ ও প্রশান্তি লাভের জন্য এই রাতের সদ্ব্যবহার করা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব এবং এতেই বিশ্ব শান্তি ও মানব কল্যাণ নিহিত রয়েছে।

লেখক : সাংগঠনিক সম্পাদক, রেনেসা সাংস্কৃতিক ফোরাম সিলেট

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com