বুধবার, ০২ ডিসেম্বর ২০২০, ০১:৫২ পূর্বাহ্ন

রুহির মায়া কান্নায় হাসি পায়

রুহির মায়া কান্নায় হাসি পায়

রুহির মায়া কান্নায় হাসি পায়

সগীর আহমদ চৌধুরী

:: এক. কাউন্সিলের বিরোধিতা করে চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সম্মেলনে মাওলানা মুঈনুদ্দীন রুহী ভাই “আল্লামা আহমদ শফী (রহ.), মুফতী আমিনী (রহ.) ও চরমোনাইয়ের পীর সাহেবের অনুসরাীদেরকে হেফাজত থেকে বের করে দেওয়ার ষড়যন্ত্র চলছে বলে যে দাবি বা অভিযোগ করেছিলেন তা শুনে আমার যার পর নেই হাসি পেয়েছিল। কারণ ২০১৩ সালে যখন আমীরে হেফাজতের গুণধর সাহেবজাদাকে অবমাননার অভিযোগে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে হেফাজতে নিষিদ্ধ করে যে তোষামুদিমূলক রেজুলেশন পাশ করা হয়ছিল তখন তার প্রস্তাবক-উদ্যোক্তা ছিলেন আমাদের এই রুহী ভাইয়েরা। আমার বুঝে আসেনি যে, এই ‍রুহি ভাইয়েরা কবে থেকে চরমোনাইয়ের প্রতি এতো দরদি হয়ে ওঠলেন! তিনি কবে থেকে ইসলামী আন্দোলনের প্রতি ইনসাফের হাত বাড়ালেন!? তিনি কি জায়গা বজায়গায় চরমোনাইয়ের বিরুদ্ধে বিশোদ্ঘার করেননি, তাঁর দল ও অবুঝ কর্মিরা বদনামি, তুহমত ও অপবাদ দেয়নি? অন্যায় গিবত-শেখায়ত করেনি?

সেই সময় ইসলামী আন্দোলনের দু’জন নেতা তাদের ব্যক্তি-উদ্যোগে মুহতারাম সাহেবজাদার ব্যাপারে একটি ছোট্ট কিতাব লিখে বিতরণ করেছিলেন। এজন্য তাঁরা দলীয়ভাবে শাস্তির মুখোমুখি হয়েছিলেন। কিন্তু তাঁরা সেদিন যা লিখে ও ছেপে বিতরণ করেছিলেন তা যে খাঁটি কথা ছিল সেটি তো এখন আর অস্বীকার করার জো নেই। কথাগুলোই তো এখন সবাই বলছেন, সবাই মানছেন এবং এজন্য বিপ্লব পর্যন্ত ঘটালেন। অত্যন্ত মজার ব্যাপার হচ্ছে, আজকে যারা সাহেবজাদা বিরোধী বিপ্লবের বেনিফিশিয়ারি ভোগ করছেন তাঁরা কিন্তু সেই দিন সেই সাহেবজাদার পক্ষেই তোষামুদমূলক সিদ্ধান্তে সায় দিয়েছিলেন। সেদিন মুসলমানদের ঐক্য ও সংহতির সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করেছিলেন শুধু একজন সাহেবজাদার ইজ্জত রক্ষা করতে গিয়ে। সেদিন যারা ন্যায়বিচারের সপক্ষে অবস্থান নিতে পারেননি এবং ঐক্য ও সংহতি রক্ষায় তোষামুদমূলক সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করতে পারেননি, তাঁরা আজ স্বাধীন-স্বয়ং ক্ষমতাসম্পন্ন হলেও তাঁদের কাছে মূল্যায়ন পাওয়ার আশা করা বোকামি ও নির্বুদ্ধিতা ছাড়া কিছুই নয়।

# দুই. যদি নীতি-নৈকিতার কথা বলি, ইসলামি রাজনীতির কর্মিদের প্রশিক্ষণ কর্মশালাসমূহে আমরা মোহ, লোভ, পদলিপ্সা ও যশ-খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা এসব পরিহারের শিক্ষা পেয়ে থাকি। দলের অভ্যন্তরীণ কাঠামোর বাইরে রাষ্ট্রীয় পদ-পদবি ও রাজনীতিক ক্ষমতা বিষয়ে এর ব্যতিক্রম দোষণীয় নয়। আমার বোধগম্য নয় যে, কাজের জন্য এতো বিশাল বহরের ফোরামের প্রয়োজন আছে কিনা! আমার মনে হয়েছে, এখানে সব পক্ষকে সন্তুষ্ট রাখতে চেষ্টা করা হয়েছে, সবাইকে সাথে রাখতে চেষ্টা করা হয়েছে, সবার মাঝে সমন্বয় করতে চেষ্টা করা হয়েছে। আবার সব পক্ষকেই দেখেছি পদ-পদবির জন্য মুখিয়ে ছিলেন, লবিং করছিলেন, পদ ভাগাতে জোর তৎরতা ও প্রচেষ্টা চালাচ্ছিলেন। ছোট হোক বা ছিন্নভিন্ন কিংবা সাংগঠনিকভাবে দুর্বল প্রত্যেকে নিজ নিজ দলের পক্ষে অধিকতর পদ কব্জা করতে চেষ্টার কোনো কসুর করেনি। এসব দলের এই এক বদ-অভ্যাস: মাঠে-ময়দানে কাজ না থাকলেও মঞ্চ-কমিটির পদ দখলে থাকে সবার আগে। ইসলামি ঐক্যের ইতিহাস আপনি খুঁজলে দেখবেন, এসব ছোট ছোট দলের এ ধরনের অপতৎপরতার কারণেই অধিকাংশ ইসলামি ঐক্য ভেঙেছে, বেশি দিন টিকতে পারেনি এদের পদলোভের কারণে, কাজের চেয়ে এদের পদ-পদবি দখলের অপপ্রয়াসের কারণেই ইসলামি সংহতি চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছে।

সবপক্ষকে সাথে রাখার চেষ্টা হিসেবে এটিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছি। তবে নেতৃবৃন্দ আরেকটু উদারতার পরিচয় দিলে সংঠনটি বাংলাদেশের মুসলমানদের প্রতিনিধিত্বশীল সব পক্ষেরই উপযুক্ত ফ্লাটফরম হতে পারতো। আকিদা-বিশ্বাসের দিক থেকে কাছাকাছি আছে এমন সবাইকে আলংকরিকভাবে হলেও ফোরামে রাখা যেতো। বায়তুশ শরফ, শর্ষিনা, ফুরফুরা এসব দরবার আকিদা-বিশ্বাস ও তাসাওউফের তরীকা ওলামায়ে দেওবন্দের সাথে অনেক কাছাকাছি। তাঁদের সকলকে উপদেষ্টা হিসেবে রাখা হলে সংগঠনটি উম্মাহর ঐক্য ও সংহতির প্রতীকে পরিণত হতে পারতো। এমন উদারতা তো অকল্পনীয়, যেখানে নিজেদেরই ঘরানার ও সুলুক-মসলকে একই আদর্শের চরমোনাইঅলারা নূন্যতম সদস্য, উপদেষ্টাসহ কোনো ধরনের আলংকরিক পদেও স্থান পায়নি সেখানে এমন আশা-আকাঙ্ক্ষা কিভাবে পোষণ করা যেতে পারে?

হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের বিগত কমিটির প্রিন্টেড যে তালিকাটি আমার কাছে আছে তাতে “সম্মানিত সদস্য” হিসেবে দ্বিতীয় নাম্বারে চরমোনাইয়ের মুফতী সৈয়দ মুহাম্মদ ফয়জুল করীম সাহেবের নাম রয়েছে (পৃ. ৪ দৃষ্টব্য)। সে হিসেবে তিনি কাউন্সিলে দাওয়াত পাওয়ার কথা, এটি তাঁর হক বা অধিকার, কিন্তু তিনি দাওয়াত পাননি। কাউন্সিল ভর্তি ছিল বিপ্লবে নেতৃত্বদানকারী পোলাপাইনে, কাউন্সিলের নিয়ন্ত্রণ ছিল এদের হাতে, পছন্দের পদ লাভকারীর জন্য এরা মুহূর্মুহূ স্লোগানে কাউন্সিল মুখরিত করেছিল। সবাই পদ পেয়েছে, এমনকি জামায়াতের একনিষ্ঠ সমর্থক ও রাজনীতির সাথে জড়িত এমন দু’জন সুনির্দিষ্ট ব্যক্তিও পদ পেয়েছেন আল-হামদু লিল্লাহ। দেওবন্দিদের ইতিহাসে এটি বড়ই ইতিবাচক বিষয়।

#তিন. একটা দল চৌত্রিশের অধিক পদ পেয়েছে, এতে উচ্ছ্বসিত সেই দলের নেতা-কর্মিরা, এটাকে তারা নিজেদের বিশাল সাফল্য মনে করে। কিন্তু এতে হেফাজতের কি? তার কি ফায়েদা? এটা ওই দল ও হেফাজত উভয়ের জন্য হানিকারক, ক্ষতির কারণ ও নেতিবাচক। কারণ এই ৩৪জন লোক যদি এতোই কর্মঠ, উদ্যমী ও পরিশ্রমী হয় তবে তাদের দলের এ অবস্থা কেন? ৬৪ জেলার কয়টিতে কমিটি আছে? থানা-ইউপি-ওয়ার্ডের কি খবর? তাহলে তাঁদের দ্বারা হেফাজত কতটুকু লাভবান হবে? যদি তাঁরা হেফাজতে পরিপূর্ণ সময় ব্যয় করেন তাহলে তাদের দলের তো বারোটা বেজে যাওয়ার কথা! এই লাভ-ক্ষতির হিসেব অবুঝ কর্মিরা বুঝবে দূরের কথা, তাঁরা বরং পদের সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে নিজেদের দলকে বৃহত্তর দল ভেবে খুশিতে বগল বাজাতে শুরু করেছে। হেফাজতের জন্য এমন দলীয় আধিপত্য ক্ষতিকারক প্রমাণিত হবে। আর ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ তার মূল সংগঠন, ছাত্র-যুব-শ্রমিকসহ প্রায় শতাধিক অঙ্গসংগঠনে বিস্তৃত।

সাপ্তাহিক হালাকায়ে জিকির, মাসিক ইজতিমা, দলের মিটিং, জরুরি সভা, প্রশিক্ষণ কর্মশালা, কেন্দ্রীয় নেতাদের সফর, মাহফিলসহ নিত্য কর্মকাণ্ডে নেতা-কর্মিরা হিমশিম খায়। সেই হিসেবে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশকে হেফাজতে ইসলামে শরীক না করায় আমি রবং সংগঠনটির প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই। দলীয় নেতা-কর্মিরা হেফাজতে শরীক হলে সেখানে মাসিক চাঁদা, মিটিং, কমিটি গঠনসহ অন্যান্য কাজে যে ব্যস্ততা অতিরিক্ত বেড়ে যেতো তা এখন ইসলামী আন্দোলনের নেতা-কর্মিরা নিজেদের দলের জন্য ব্যয় করতে পারবে। কাজেই এটি ইসলামী আন্দোলনের অগ্রগতি, দলের বিস্তৃতি ও মজবুতি অর্জনের জন্য ইতিবাচক হয়েছে। কাজেই এতে আমি অত্যন্ত খুশি ও সন্তুষ্ট।

লেখক : রাজনীতিক

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com