রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:২২ অপরাহ্ন

রাজনৈতিক সংকটের দেশ ইতালি!

রাজনৈতিক সংকটের দেশ ইতালি!

রাজনৈতিক সংকটের দেশ ইতালি!

পলাশ রহমান : ইতালির প্রধানমন্ত্রী সিনোর জুসেপ্পে কোনতে তার পদ ছেড়েছেন তিন দিন আগে। কিন্তু এসব নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে কোনো ভাবলেশ আছে বলে মনে হচ্ছে না। অবশ্য ইতালির সাধারণ জনগণ অনেক বছর থেকে দেশের রাজনৈতিক সংকট দেখে অভস্ত হয়ে পড়েছে। এখন আর তারা উদ্বিগ্ন হয় না।

গত একাত্তুর বছরে ইতালির সরকার পতন হয়েছে তিয়াত্তুরবার। অদ্ভুত এক সাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক সংকটের গোলকধাঁধায় ঘুরপাক খাচ্ছে ইতালির শাসন ব্যাবস্থা। জনগণের মধ্যে চরম বিরক্তি, তাচ্ছিল্য। যুব সমাজের বড় অংশ ভোট দিতে যায় না। তারা দেশের রাজনীতি নিয়ে কথা বলে না। এ ভাবেই তারা তাদের তাচ্ছিল্য প্রকাশ করে।

গেল বছরের জুন মাসে যখন ইতালির সরকার গঠন হয় তখনই অনেকে মন্তব্য করেছিলেন, এ সরকার টিকবে না। বাস্তবে হলোও তাই। অবশ্য এর বিকল্পও ছিল না। কারন গত নির্বাচনে ইতালির কোনো রাজনৈতিক দল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়নি। তখন কড়া জাতীয়তাবাদী দল লেগা নর্দ এবং তুলনামূলক উদার দল চিংকুয়ে স্তেল্লের মধ্যে কোয়ালিশন হয়। তারা সরকার গঠনের স্বার্থে প্রধানমন্ত্রী হিসাবে বেছে নেন তৃতীয় ব্যক্তি ৫৫ বছর বয়সের আইনবিদ জুসেপ্পে কোনতে কে। লেগা নর্দের মাত্তেয় সালভিনি এবং চিংকুয়ে স্তেল্লের লুইজি দি মাইয়ো যৌথ ভাবে উপপ্রধানমন্ত্রীর পদ গ্রহণ করেন। পাশাপাশি সিনোর সালভিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রনালয় এবং দি মাইয়ো আর্থিক উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান মন্ত্রনালয়ের দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
লেগা নর্দ এবং চিংকুয়ে স্তেল্লে দুই মেরুর দুটি দল। লেগা নর্দ গোটা ইউরোপে কড়া জাতীয়তাবাদী দল বলে পরিচিত। এর নেতা সিনোর সালভিনি মার্কিন প্রেসিডেন্ট মিঃ ট্রাম্পের সুরে সুর মিলিয়ে বলেন, প্রিমা ইতালিয়া। অর্থাৎ ফাষ্ট ইতালি। তিনি চরম রকমের অভিবাসী এবং মুসলিম বিদ্বেষী। তার প্রস্তাবিত জননিরাপত্তা আইন সর্বমহলে নিন্দিত হয়েছে। পদত্যাগের পর প্রধানমন্ত্রী কোনতে বলেছেন, সালভিনির সাথে সরকার পরিচালনা করা সম্ভব না। তিনি ইউরোপীয় মানের রাজনীতি বোঝেন না।

চিংকুয়ে স্তেল্লের প্রধান সমস্যা হলো এই দলে রাজনীতিক নেই। ২০০৯ সালে ইতালির বিখ্যাত কৌতুকাভিনেতা সিনোর বেপ্পে গ্রিল্লোর নেতৃত্বে গঠিত মুভিমেন্তি চিংকুয়ে স্তেল্লে মূলত তরুণ ব্লগারদের দ্বারা গঠিত একটি রাজনৈতিক দল। যারা প্রথমে সোস্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে সংগঠিত হয়েছিল ইতালির শাসন ব্যাবস্থাকে প্রভাবিত করতে। এই দলের তরুণ নেতা ৩৩ বছর বয়সের লুইজি দি মাইয়ো কোয়ালিশন সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দুইপদ দখল করে রাখলেও রাজনৈতিক অভিজ্ঞায় তিনি বেশ আনাড়ি। দেশের আর্থিক উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের জন্য তার কিছু প্রস্তাব প্রশংসীত হলেও রাজনীতিতে তিনি এখনো দক্ষ খেলোয়াড় হয়ে উঠতে পারেননি।

অপরদিকে সিনোর সালভিনি যতোটা না রাজনীতিক তার থেকে অনেক বেশি জাতীয়তাবাদী। তিনি অভিবাসী নিয়ন্ত্রণ ছাড়া উল্লেখ করার মতো কোনো সাফল্য দেখাতে পারেননি। বরং কোনো কোনো মিডিয়ায় তার প্রতি স্বজনপ্রীতি এবং দূর্নীতির আঙ্গুল তুলতে দেখা যায়।

সিনোর সালভিনি এবং দি মাইয়োর কোয়ালিশন সরকার না টেকার প্রধান কারন দুটি। প্রথমত তারা দুই মেরুতে চিন্তা করা দুই রাজনৈতিক দলের নেতা। তারা দুজন কখনোই এক মেরুতে চিন্তা করতে পারেননি। তাদের রাজনৈতিক আদর্শে মিল নেই। উচ্চগতির ট্রেন লাইন স্থাপনসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ অধিকাংশ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তারা ছিলেন বিপরীত মুখী। কোনো বিষয়ে ঐক্যমত হতে পারছিলেন না। মাঝখানে প্রধানমন্ত্রী সিনোর কোনতে ছিলেন মহাফ্যাসাদে। তাকে পদাধিকারের পূর্ণ স্বাধীনতা দেয়া হবে বলে আনা হলেও মূলত তিনি ছিলেন পুতুল প্রধানমন্ত্রী। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে তিনি দি মাইয়োর সাথে একমত হতে পারলেও সালভিনির সাথে পারছিলেন না।প্রধানমন্ত্রী জুসেপ্পে কোনতে পদত্যাগের মাধ্যমে মূলত ইতালির কোয়ালিশন সরকার ভেঙ্গে দিয়েছেন। দুই উপপ্রধানমন্ত্রী দি মাইয়ো এবং সালভিনির মতানৈক্য এমন পর্যায়ে পৌছেচে যে তারা কোনো ভাবেই কোয়ালিশন ধরে রাখার কথা ভাবতে পারছেন না। সিনোর কোনতেও সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, সালভিনির সাথে চলা সম্ভব না। এই অবস্থায় দুটি পথ খোলা আছে- এক. নতুন নির্বাচন ঘোষনা করা। নির্বাচনের আগে পর্যন্ত গভেরনো তেকনিকো বা কেয়ারটেকার সরকারের মাধ্যমে দেশ পরিচালনা করা। দুই. নির্বাচন এড়িয়ে সংসদে প্রতিনিধিত্ব করা অন্য দলগুলোর মধ্যে কোয়ালিশন করে নতুন সরকার গঠন করা।

ডানপন্থী দল ফরছা ইতালিয়া এবং লেগা নর্দের মধ্যে কোয়ালিশন হওয়া সম্ভব ছিল। অতীতে কোয়ালিশন সরকার পরিচালনার অভিজ্ঞতা তাদের আছে। কিন্তু এবারের সংসদে তারা দুই দল এক হয়েও সংখ্যাগরিষ্ঠ হতে পারছে না। সুতরাং ফরছার নেতা সাবেক প্রধানমন্ত্রী সিনোর সিলভিয়ো বেরলুসকোনি এবং লেগার নেতা সালভিনি নতুন নির্বাচনের দাবী তুলেছেন।

অপরদিকে বামদল পিডি এবং চিংকুয়ে স্তেল্লের মধ্যে কোয়ালিশন করে নতুন সরকার গঠনের গুনজন শোনা যাচ্ছে। পিডি চিংকুয়ে স্তেল্লের সাথে কোয়ালিশনের জন্য প্রকাশ্যে দুটি শর্ত দিয়েছে। সালভিনির জননিরাপত্তা আইন সংস্কার করা এবং সাংসদদের সুযোগ সুবিধা কর্তন আইন বাতিল করা। এসব বিষয়ে তারা ঐকমত্য হতে পারলে হয়তো ইতালির জনগণ আরেকটি নতুন কোয়ালিশন সরকারের থৈরিনাচ উপভোগ করবে। তবে সোস্যাল মিডিয়ায় চোখ বুলিয়ে দেখা যায় পিডির সাথে কোয়ালিশন করতে চিংকুয়ের ভোটারদের ঘোর আপত্তি। তাদের অনেকে লিখেছেন, চিংকুয়ে স্তেল্লে পিডির সাথে সরকারে গেলে আগামীতে তারা আর কোনো দিন চিংকুয়ে কে ভোট দিবেন না।

উল্লেখ্য, ঘন ঘন সরকার পতনের সাংবিধানিক এবং রাজনৈতিক সংকট থেকে বেরিয়ে আসার জন্য বাম দল পিডির (পার্তিতো ডেমোক্রাতিকো) নেতা মাত্তেয় রেনসি প্রধানমন্ত্রী থাকা কালে (২০১৬ সালে) সংবিধান পরিবর্তনের প্রস্তাব করেছিলেন। তার প্রস্তাবের পক্ষে বিপক্ষে ভোটাভুটিও হয়েছিল। তখন বিরোধী দল বলেছিল, সিনোর রেনসি নিজের ক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য সংস্কার প্রস্তাব করেছেন। সে সময় নিজ দলের ভেতরেও রেনসি বিরোধীতার মুখে পড়েছিলেন। পক্ষ বিপক্ষ ভোটে হেরে তিনি প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকেও পদত্যাগ করেছিলেন।

লেখক : আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com