মঙ্গলবার, ২২ অক্টোবর ২০১৯, ১১:২৭ পূর্বাহ্ন

মিসকীনদের আরবরা আর কতো গুরুত্ব দেবে?

মিসকীনদের আরবরা আর কতো গুরুত্ব দেবে?

আরবদের ভারততোষণ

মিসকীনদের আরবরা আর কতো গুরুত্ব দেবে?

সগীর আহমদ চৌধুরী : বাংলা-পাক ও আরকান বা মুসলিম জাহান থেকে যারা আরববিশ্বে প্রবাসী আরবদের কাছে তাদের সাধারণ পরিচিতিটা হচ্ছে, “মিসকীনের জাতি” বলে। আরবদের ভারততোষণ, হিন্দুস্তানকে গুরুত্বদান এবং শক্তিধর দেশসমূহের প্রতি নতজানু নীতির কার্যকারণ ও রহস্য আমাদের এই আত্মপরিচিতির মধ্যেই নিহিত আছে। আরবরা ধনি, মুসলিমও বটে। মুসলিম ভ্রাতৃত্বের দোহাই দিয়ে আমরা তাদের কাছে কাজ চেয়েছি; গরিব দেশের মানুষ, যেকোনো কাজ, দিন একটা। দক্ষতা নেই, যোগ্যতা নেই, কোয়ালিটি নেই; তা সত্ত্বেও বছরের পর বছর লাখ লাখ মানুষকে আরবরা কাজ দিয়েছে। আর এমনটি করেছে একান্তই ধর্মীয় ভাবাবেগ ও মুসলিম ভ্রাতৃত্ববোধ থেকে। কিন্তু আরবরা এখন ভাবাবেগী থেকে একটু বাস্তবতাবাদী হয়ে ওঠেছে। একমাত্র এ কারণেই দুর্বল, দীনহীন ও মিসকীন মুসলিমবিশ্বকে উপেক্ষা করে স্থিতিশীল অর্থনীতির দেশ, শক্তিধর রাষ্ট্র ও দক্ষজনশক্তিসম্পন্ন জাতিসমূহকে আরবরা কদর করছে, তাদের দ্বারস্থ হচ্ছে এবং তাদেরকে পেছনে পেছনে ঘুরছে।

আমীরশাহি কর্তৃক নরেন্দ্র মোদীকে রাজকীয় সর্বোচ্চ অ্যাওয়ার্ডে সম্মানিতকরণে আমাদের জাতীয় রাজনীতি আওয়ামী লীগ-বিএনপির কোনো প্রতিক্রিয়া নেই, কোনো ভাবলেশ নেই, কোনো শঙ্কা-হতাশা কিছুই নেই। একমাত্র ইসলামপন্থি হিসেবে পরিচিতরাই দুনিয়ার গোসসা দেখাচ্ছে, ক্ষুব্ধ প্রতিক্রয়া জ্ঞাপন করছে এবং লা’নত বর্ষণ করছে। আচ্ছা! গালাগাল, ইহুদি-খ্রিস্টানদের অ্যাজেন্ট আখ্যা এবং তাগুত-মুনাফিক ঘোষণা ছাড়া কি ইসলামপন্থিদের আর কোনো দায়-দায়িত্ব নেই? সমস্যা থেকে উত্তোরণের কোনো উপায়-উপকরণ নেই? ‍মুসলিম উম্মাহর পুনর্জাগরণের জন্য করণীয়-কর্তব্য নেই? গালাগাল-গোসসা যেহেতু ইসলামপন্থিদের, সেহেতু প্রশ্নগুলো তাদের কাছেই।

শরীয়াভিত্তিক শাসন কায়েম ইসলামপন্থিদের অ্যাজেন্ডা, শ্লোগাননির্ভির ও থিউরিক্যাল এই অ্যাজেন্ডা ছাড়া ইসলামপন্থিদের বাস্তবিক কোনো কাজ নেই, বাস্তবসম্মত কোনো কর্মসূচি নেই, রোডম্যাপভিত্তিক কোনো প্লান নেই। প্রশ্নটা হচ্ছে, আরবরা যখন দীন-দুর্বল ও নিঃস্বদের পোষা ত্যাগ করে শক্তিধরদের কাছে ধর্না দিচ্ছে তার মোকাবেলায় বা আরবদের চাহিদাপূরণে এবং তাদের পক্ষে শক্তি হয়ে দাঁড়াতে কথিত ইসলামপন্থিরা কী করেছে? তাদের ভূমিকা কী? তাদের কোন পদক্ষেপটা উম্মাহর কাজে আসছে? কুরআন-সুন্নাহর শাসন, শরীয়তের বিধান কায়েম ও ইসলামি হুকুমতের ওয়ায অনেক হয়েছে, দশকের পর দশ ধরে ইসলামের নামে রাজনীতিও বহুত হলো, কিন্তু উম্মাহকে শক্তিশালীকরণে কিছুই তো করা হয়নি। কিছুই যখন করা হয়নি তাহলে অমুসলিম বিশ্বের অসামান্য বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তির মোকাবেলায় আরবরা যখন কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দিগ্বিদিক ছুটছে তখন একমাত্র তাদেরকেই গালাগাল ও দায়ী করা কতটুকু সাজে? কতটুকু মানায়? কেন? মুদিকে আমীরশাহির সম্মানিতকরণে নিজের কপাল নিজে চাপড়ানো উচিত ছিল না? নিজের মাথার চুল নিজে ছেঁড়া দরকার ছিল না? নিজের কানটা নিজে টেনে ছেঁড়া প্রয়োজন ছিল না?

শরীয়া শাসন কায়েম করতে চাই, এজন্য শাসকদের কাফির-তাগুত আখ্যা দেই, মুহাক্কিক আলেম তৈরিতেই গুরুত্ব দেই, গভীর জ্ঞানী আলেম ফয়দা করতে শুধু মাদরাসাই প্রতিষ্ঠা করি, সেখান থেকে অনেক ফাযেলান বের হয়, তারা কিতাবের গভীর থেকে গভীর বিষয় চর্চার মাধ্যমে গৌরববোধ করে, ফেরকা-মাযহাব নিয়ে মুবাহাসা-মুনাযারা করে, পক্ষে-বিপক্ষে মুসলমানদের জড়ো করে, শুদ্ধ আকিদার নামে সহীহ হাদীসের নামে হক্কানিয়াতের নামে বিভিন্ন দল-উপদলে বিভক্ত হয়। ইসলামপন্থিদের চিরাচরিত প্র্যাক্টিস তো এটুকুই। স্কুল-কজেলে পড়াশোনাকে মকরুহ জ্ঞান করা হয়, কোনো মাদরাসা ফারেগ উচ্চশিক্ষার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলে তার আমল বরবাদ হয়েছে মনে করা হয়, যারা বিশ্ববিদ্যায়ে ভর্তি হয় তাদের শিক্ষাসাবজেক্টও নিজস্ব সীমানা থেকে বেশি উত্তীর্ণ হতে পারে না, ইসলামিক স্টাডিজ বা আরবি সাহিত্যেই সীমাবদ্ধ থাকে, এতে শুধু ডিগ্রি লাভ হয়, সর্বোচ্চ ডক্টরের লকবপ্রাপ্তি হয়, উচ্চমাইনে একটা চাকরি হয়; আলিয়া মুহাদ্দিস বা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কিংবা বড় মসজিদের ইমাম-খতীব হিসেবে।

যাকাত-ফিতরার কোটি কোটি টাকা ব্যয় হয় এ ধরনের মোল্লা-মুনশি তৈরির পেছনেই; ইঞ্জিনিয়ার-চিকিৎসাগবেষক, প্রযুক্তিবিদ ও বৈজ্ঞানিক তৈরিতে যাকাতের একটা পয়সাও খরচ করা হয় না, এটাকে বরং বদ্দীনী জ্ঞান করা হয়। তাহলে ‍উম্মাহ শক্তিশালী হবে কি করে? এই বিষয়টি বোঝার জন্য দু’জন মুসলিম নেতার উদাহরণ এখানে প্রাসঙ্গিক মনে করি। একজন ভারতের লোকসভা সদস্য ব্যরিস্টার আসাদউদ্দীন ওয়ায়সী ও অন্যজন বাংলাদেশের চরমোনাইয়ের পীর সাহেব। ওয়াইসীর মতে, দারিদ্রতা, জ্ঞান-বিজ্ঞানে অদক্ষতা এবং সরকারি চাকরি ও অভিজাত পেশা থেকে পিছিয়ে আছে মুসলমানরা। তা থেকে উত্তোরণে তিনি ভারতীয় মুসলানদের জন্য ‘ইঞ্জিনিয়ারিং’, ‘মেডিসিন’, ‘ম্যানেজম্যান্ট’, ‘ফিজিওথেরাফি’, ‘ফার্মেসি’, ‘নার্সিং’ ও ‘আর্কিটেকচার’-এর ওপর স্বয়ংসম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ১০টি বিশেষায়িত কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছেন। এসব কলেজ থেকে ফারেগ ছাত্ররা ইউরোপ-আমেরিকা ও বিশেষত মধ্যপ্রাচ্যে উচ্চবেতনে কর্মে নিয়োজিত রয়েছে। আর তাঁদের আর্থিক সহযোগিতায় ওয়াইসীর দল মজলিসে ইত্তেহাদুল মুসলিমীন আর্থিকভাবে পরিপুষ্ট হয় এবং নিয়মিতই তিনি মুসলমানদের আর্ত-সামাজিক উন্নয়নে ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করে চলেছেন।

২০১৫ সালে ঘটনাক্রমে সউদি আরবের সঙ্গে চরমোনাইয়ের উষ্ণ সম্পর্ক তৈরি হয়। সম্পর্কের সূত্রে সউদি আরবের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধি দল চরমোনাইয়ের বার্ষিক মাহফিলেও শরীক হয়েছিল। সউদি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে পীর সাহেব চরমোনাইয়ের একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের সুদৃশ্য ছবি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়েছিল। আমাদের কারো ধারণা নেই সেই বৈঠকে প্রতিনিধি দলের সাথে পীর সাহেব ‍হুযুরের কি আলাপ হয়েছে। মনে করুন, প্রতিনিধি দল পীর সাহেব হুযুরকে সহযোগিতা করার প্রস্তাব দিয়েছিল, এর পরিপ্রেক্ষিতে পীর সাহেব হুযুর তাদের কাছে কী সহযোগিতা চেয়েছেন? নগদ অর্থ চেয়েছেন? না সউদি আরবে জনশক্তি রফতানির জন্য আগ্রহ প্রকাশ করেছেন? আচ্ছা! চরমোনাইকে অর্থ দিয়ে সউদি আরবের লাভ কি? ধর্মীয় কাজে কি সউদি আরব কম সহযোগিতা করে? লাখ লাখ কপি কুরআন বিতরণ করে সারা বিশ্বে বিনামূল্যে, বিশ্বের নানা জায়গায় মসজিদ নির্মাণে অর্থ ব্যয় করে, ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে হাজার হাজার দেশি-বিদেশি ছাত্রদেরকে উচ্চতর ইসলামি শিক্ষা দেয়, ইসলাম প্রচারে হাজার হাজার মুবাল্লিগ নিয়োজিত করে তাদের পেছনে কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে। চরমোনাইকে কিছু অর্থ দেওয়া তাদের জন্য কোনো ব্যাপার ছিল না, কিন্তু এটা সউদি আরবের জন্য আকাঙ্ক্ষিত কোনো ব্যাপার নয়, তাদের জন্য তো ফায়দার নয়ই, বরং চরমোনাইয়ের জন্যও দীর্ঘস্থায়ী কোনো উপাদেয় নয়।

তবে পীর সাহেব চরমোনাই যদি জনশক্তি রফতানির ব্যাপারে আগ্রহ দেখাতেন! ইমাম-মুয়াযযিন ও অদক্ষ শ্রমিক প্রেরণের কথা বলছি না, বিশেষজ্ঞ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রযুক্তিবিদ ও বৈজ্ঞানিক প্রেরণের কথা যদি তিনি বলতেন। যদি এই ব্যবস্থা হযরত পীর সাহেব হুযুরের হাতে থাকতো, তাঁর আন্দোলনের অধীনে যদি ইসলামি মূল্যবোধসহকারে আধুনিক শিক্ষা, বিজ্ঞান-প্রযুক্তির ওপর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউনিস্টিটিউট প্রতিষ্ঠিত হতো। যদি তিনি সউদী আরবের সাথে সম্পর্কের সুযোগে এসব প্রতিষ্ঠান থেকে ফারিগীন দক্ষ জনশক্তিকে সউদি আরবে প্রেরণ করতে পারতেন তা সউদির জন্যও ভালো হতো, চরমোনাইয়েল মিশনের জন্যও ব্যাপকভিত্তিক স্থায়ী উপকার বয়ে আনতে পারতো। সউদিসহ আরববিশ্বকে তাহলে আজকে অমুসলিম বিশ্বের মুখাপেক্ষী হতে হতো না, মুসলমানদের প্রতিটি সদস্য আজকে দক্ষ হলে আরবরা আমাদের বলের ওপর নির্ভর করতে পারতো। আব্বাসী খলীফাদের শেষ সময়টা কেমন ছিল, শৌর্য-বীর্য নিজেদের তেমন ছিল না। গজনবী, সেলজুক, তুর্কি ও ফারসিরা একের পর এক এসে শক্তি যুগিয়েছে খলীফাকে। মুসলমানদের মধ্যে এখন এমন কে আছে, কার ওপর ভরসা করবে আরবরা!

এখন কথা হচ্ছে, পীর সাহেব চরমোনাই বা ইসলামপন্থিরা তো হচ্ছে ধর্মীয় নেতা, তাঁরা কেন এসব করবেন? এসব কি তাঁদের সাবজেক্ট? যদি তা-ই হয় তবে রাজনীতিও তাঁদের সাবজেক্ট নয়। ইহজাগতিকতা ছাড়া রাজনীতি অচল, সিয়াসত ধর্মীয় ভাবাবেগের বিষয় নয়, এখানে ওয়ায-নসীহতের চেয়ে বাস্তবতার গুরুত্বই বেশি। এসব বিষয় ধর্মীয় নেতৃত্বের সাবজেক্টের অন্তর্ভুক্ত না হলে আজকের আমীরশাহি ও আরবদের গালাগাল ও লা’নত দেওয়ারও কোনো মানে হয় না। এই অযোগ্যতা শুধু আরবদের নয়, এর দায় শরীয়াপন্থি গোটা ইসলামি জগতেরও। প্রশ্ন এও হতে পারে যে, বিজ্ঞান-প্রযুক্তি অর্জনে আরবরা নিজেরা কেন কাজ করছে না? স্মরণে রাখা উচিত, ইসলামের বিজয়ের জন্য আরবরা সীমাহীন সাহসিকতা দেখিয়েছে, বীরত্বের সঙ্গে সারা বিশ্বের সাথে লড়েছে, দিনের বেলায় লড়াই করেছে রাতের আঁধারে দরবেশের জীবন যাপন করেছে। দীনী ইলম তাঁদের কাছে সহজবোধ্য ছিল, কিন্তু ইসলামের বিজ্ঞান-ফলসাফার উন্নয়নে আরবদের চেয়ে অগ্রগণ্য ভূমিকা রেখেছে অনারবর, বিশেষত বৃহত্তর ফারসিরা। প্রযুক্তি, বিজ্ঞান, গণিত, দর্শন এসব তখনো এবং এখনো আরবদের জন্য কঠিনবোধ্য। তাতে বরং অনারবদেরই এগিয়ে আসতে হবে।

লেখক : রাজনীতিক ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com