শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ০৬:০৩ পূর্বাহ্ন

মহিউদ্দিন আকবর, হৃদয়ের বারান্দায় আলোকিত রোদ্দুর

মহিউদ্দিন আকবর, হৃদয়ের বারান্দায় আলোকিত রোদ্দুর

মহিউদ্দিন আকবর, হৃদয়ের বারান্দায় আলোকিত রোদ্দুর

।। মাসউদুল কাদির।।

তিনি কেবলই ভালোবাসা বিলিয়ে গেছেন, কেবলই ভালোবেসে গেছেন। ভালোবাসছেন। খুব কাছে টেনে নিচ্ছেন। আদরে আহ্লাদে এই ঢাকায় একজন ছোট ভাইয়ের মর্যাদায় অভিসিক্ত করেছেন আমাকে। জানি, এ ঋণ শোধ করার কোনো শক্তি আমার নেই। তিনি প্রিয় কবি মহিউদ্দিন আকবর।

লেখালেখির আগ্রহটা জন্মেছিল সেই ছোট্ট থেকেই। মাদরাসা জীবনের একেবারে আঁতড়ঘর থেকে। সেসময়কার লেখালেখির কথা কেউ বিশ্বাসও করতে চাইবে না। সম্ভবত ৯৮ বা ৯৯ সালে কবি মহিউদ্দিন আকবর ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয় যাত্রা শুরু হয় একটা অনুষ্ঠানে। রাজধানীর মতিঝিলের বেইস মিলনায়তনে কবি নজরুল স্মৃতি সংসদের একটি অনুষ্ঠানে গেলাম। অনুষ্ঠানের গুরু দায়িত্বে ছিলেন মহি ভাই। অনুষ্ঠান উপস্থাপনা সম্পর্কে আমার কোনো ধারণাই ছিলো না। কবি মঈন মুরসালিন ও লেখক অনুবাদ জামিল আহমদ ইউসুফ ভাইয়ের কল্যাণে কবি নজরুল স্মৃতি সংসদের প্রতিযোগিতায় আমি পুরস্কারের জন্য নির্বাচিত হই। সেসূত্রেই মূলত অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ। জীবনের প্রথম কোনো সাহিত্যকেন্দ্রীক বৈঠকীতে অংশ নেয়া। হৃদয়ের বারান্দায় তখনই এক আলোকিত রোদ্দুর মায়াবী জাল বিছিয়েছিল। এটা আমি বুঝতে পেরেছিলাম। আমার ভেতরটা অজানা এক ভালো লাগায় যেনো নেচে উঠেছিল।

আমি অবাক বিস্ময়ে কবি মহিউদ্দিন আকবর ভাইয়ের শব্দচয়ন শুনতে থাকলাম। কতটা দারুণ করে কথা বলতে হয়, কী সুন্দর করে পরিচালনা করতে হয়, অন্যকে কত জাদুর আহ্বানে মোহিত করতে হয়- অপলকনেত্রে তাকিয়ে বিস্মিত হই। এ তো দারুণ এক জগত।

আমি একবার কিছু দিন কুমিল্লায় পড়তে গিয়েছিলাম। ছোট হওয়ায় বন্ধুদের ভাষায় আমাকে ভর করে। পরে আমার বড় ভাই রাগ হলেন। ঢাকায় এনে ভর্তি করলেন। আমাদের উস্তাদদের অনেকে নবীজীর হাদিস আনা আফসাহুল আরব বলে বলে ভাষা শুদ্ধতার বয়ান করতেন। তবে তারাও ভাষা ব্যবহারে অতটা সচেতন তা বলা যাবে না। রাগ হলে তো সবাই যার যারটাই উগরে দেন। ভাষা তখন স্ব স্ব আঞ্চলিক ধাঁধাঁয় রূপ নেয়।

যা হোক, আমি মহিউদ্দিন আকবর ভাইয়ের অনুষ্ঠানের সব কায়দা কানুন ভালো করে দেখছিলাম। ওই অনুষ্ঠানে দেশের বড় বড় কবি সাহিত্যিক উপস্থিত ছিলেন। কিন্তু আমার কোনো জানাশোনাই ছিলো না তাদের বিষয়ে। যেকারণে আলাদা কোনো উচ্ছ্বাস ছিলো না আমার। যারা বক্তৃতা করলেন তারা কবি কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদকে সামনে নিয়ে এলেন। সাম্যশান্তির সমাজ গঠনের আহ্বান জানালেন। তখনো আমি অসাম্প্রদায়িক চেতনা বা স্ব স্ব ধর্মের স্বাধীনতার বিষয়টি বুঝতে শিখিনি। সুতরাং কাজী নজরুল ইসলামকে ধারণ করার শক্তি-সামর্থ্য আমার ছিলো না। তবে মুখে মুখে বাজিছে দামামা, বাঁধরে আমামা-এমন অনেক কবিতা মুখস্থ ছিলো তার। নজরুল বাদে বাংলা কবিতা চিন্তাই করা যায় না।

আমার সৌভাগ্য ছিলো, কবি মহিউদ্দিন আকবর ভাইয়ের হাতে লেখা-অাঁকা একটি সনদপত্র পেলাম। বহুবছর এটিকে আমি আগলে রেখেছি। সনদপত্র দিয়ে মহিউদ্দিন ভাই এমনভাবে আমাকে মায়ার বন্ধনে আবদ্ধ করলেন, আর কোনো দিন তাকে ভুলতে পারিনি। এরপর থেকেই আমি তাকে কেবলই জ্বালিয়েছি। ভীষণ বিরক্ত করে তুলেছি। বার বার তার বাসায় গিয়েছি। নিজের প্রয়োজনটাই বড় করে দেখেছি। কোনো দিন এ চিন্তাই করিনি, তার বাসায় কোনো সমস্যা আছে কিনা। কাজের কোনো চাপ আছে কিনা। জিজ্ঞেস্ও করিনি।

অশুদ্ধ বানান, জগাখিঁচুড়ি লেখা, ভুল অন্ত্যমিল, মাত্রা, ছন্দ- ঠিক করে দিতে দিতে তিনি ক্লান্ত। কিন্তু কোনো দিন চোখের ভাষায় একটু শাসন করতে দেখিনি মহিউদ্দিন আকবর ভাইকে। আমার জনমে অতখানি নিবেদিত প্রাণ আর কোনো মানুষকে আমি পাইনি।

দুইটা কাকের ঠ্যাংয়ের মতো ছড়া খাতার কাগজ ছিঁড়ে লিখেই মহিউদ্দিন ভাইয়ের বাসায় দৌড় দিয়েছি। তখন তো আর ফোনের যুগ ছিলো না। বাসায় গিয়ে কতদিন আছে পাইনি। না পেতে পেতে আমাদের বিরক্তি ধরে গেছে। কিন্তু বার বার সময় দিয়ে মহিউদ্দিন আকবর প্রমাণ দিতেন- দেখো, আমি তোমাদের অনেক ভালোবাসি।

শীলন বাংলাদেশের সাহিত্য আড্ডায় তিনি মধ্যমণি থাকতেন (এখনো থাকেন)। শীলনের সভায় আসতে আসতেই মূলত মহিউদ্দিন আকবর ভাই গোটা কওমী অঙ্গনেরই একজন ভালোবাসার মানুষে পরিণত হন। কওমী মাদরাসা অঙ্গনের বেশিরভাগ সাহিত্য আড্ডায় মহিউদ্দিন আকবর ভাই উপস্থিত হয়েছেন। অকাতরে ভালোবাসা বিলিয়েছেন। লিখেছেন সে ধারার পত্রিকাগুলোতেও।

সাহিত্যপুরোধা হওয়ার বাইরে মহিউদ্দিন আকবর ভাইয়ের সবচেয়ে বড় পরিচয় হলো তিনি একজন উঁচুমানের আর্টিস্ট। চোখে যা দেখা যায় তাই তিনি আর্ট করতে পারেন। নিজস্বতা, নিজস্ব স্বকীয়তাবোধও আছে তাঁর। আমার দৃষ্টি থামে সবুজ গ্রামে নামক ছড়ার বইটি আর্ট করে দিয়ে বলেছিলেন, জীবনে যত বই লিখবে সবই আমি ফ্রিতে ইলাস্টেশন করে দেবো।

আমি জানি, এ ঢাকায় অত বড় কথা, অত দামি কথা, অত ওজনধার আশ্বাস দেওয়ার মতো আর কেউ নেই আমার। আর এটা কেউ পারেও না। সেই শক্তি সবার নেই। মহিউদ্দিন আকবর এই রকমের মনের জোর রাখেন।

আমাকে অবাক করে দিয়ে একদিন নিজের ঝোলা থেকে একটা আর্ট কাগজ দেখালেন। শীলন কর্নার। নিজের হাতে অার্ট করে এনেছেন। আমি কিছু বুঝে উঠতে পারলাম না। কেবল সুন্দরটাই দেখলাম। বললেন, আমাদের দৈনিক জনতার সংবাদ পত্রিকার সাহিত্যপাতায় একটা শীলন কর্নার থাকবে। এখানে শুধু শীলনের সাহিত্যসভায় পাঠ করা লেখাগুলো যাবে।

আমি যেনো সম্বিৎ হারালাম। কওমী দরদি এই মানুষটির ভালোবাসার পাথরটা কত্ত বড়। কিছু কিছু আনন্দ খোলস বদলানো সাপের মতো শরীরকে নেতিয়ে দেয়। আনন্দভালোবাসায় হৃদয়টা যেনো ভিন্নরকম হয়ে গেল।

দেখলাম, শীলনের সভায় পাঠ হওয়া লেখা তিনি প্রকাশ করে চলেছেন। ওই সময়টায় ভয়ে আমি কম্পিউটারের মাউস ধরি না। না জানি আবার বড় কোনো ক্ষতি হয়ে যায়। তখন শীলনের সব বন্ধুদের লেখাগুলো তিনি কম্পোজও করাতেন এরপর ছাপার ব্যবস্থা করতেন।

আমি লেখক হয়ে উঠেছি এমন দাবি করার সাহস আমার নেই। আল মাহমুদ ভাইকে একটি সাহিত্যসভায় বলতে শুনেছি আমি তো কবি নই। কিন্তু লোক আমাকে কবি কবি বলে। আমার লেখালেখির বড় অবদানটাই কবি মহিউদ্দিন আকবর ভাইয়ের। আমার সব লেখার মাঝখান থেকে যদি কোনো পুণ্য পাই তা যেনো আমার ভাই মহিউদ্দিন আকবরের নামেও তা লেখা হয়-সেই প্রার্থনাই জানিয়ে রাখলাম আল্লাহর কাছে। প্রিয় মহি ভাই আপনি আরও অনেক দিন বাঁচুন। সুস্থ সুন্দর থেকে লিখে যান। ফি আমানিল্লাহ।

লেখক : সাংবাদিক

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com