শনিবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২১, ১১:১৯ অপরাহ্ন

মহানবীর যুবকল্যাণ প্রয়াস । ইউসুফ নূর

মহানবীর যুবকল্যাণ প্রয়াস । ইউসুফ নূর

মহানবীর যুবকল্যাণ প্রয়াস । ইউসুফ নূর

যুবক হচ্ছে জাতির গৌরব ও ভবিষ্যৎ আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক। যুবক হচ্ছে প্রতিটি জাতির উন্নতি ও অগ্রগতির সোপান, জাতির মূল্যবান সম্পদ এবং দেশ গড়ার শ্রেষ্ঠ অবলম্বন। ইসলাম এ সম্পদের যথাযথ সংরক্ষণে বিশেষ গুরুত্বারোপ করেছে। যুবকদের নৈতিকতার উন্নয়ন, স্বাস্থ্য সংরক্ষণ, পরিশীলিত মনন ও বলিষ্ঠ চিন্তাধারায় সমৃদ্ধকরণে ইসলামের সুস্পষ্ট বিধান রয়েছে, যার আলোকে কাজ করে গেছেন মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। আদর্শ যুবক গঠনে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সফল ভূমিকা ও সুনিপুণ কর্মধারা যুবকল্যাণ প্রত্যাশীদের অনুসরণ করতে হবে।

কারণ মানব ইতিহাসে তিনিই সর্বোত্তম ও অতুলণীয় যুবসমাজ উপহার দিতে সক্ষম হয়েছেন। তাঁরই পবিত্র স্পর্শে পৃথিবী পেয়েছে সংগ্রাম ও বীরত্বের প্রতীক আম্মার ইবনে ইয়াসার, হিজরত ও দাওয়াতের আদর্শ মাসআব ইবনে উমাইর, নেতৃত্ব ও পরিচালনার বিস্ময়কর উদাহরণ উসামা ইবনে যায়েদ এবং ইলম ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা)। এসব নিষ্ঠাবান তারুণ্যের তেজে পাল্টে গেছে ইতিহাসের গতিধারা, ধূলোয় মিশে গেছে বাতিলের রাজমুকুট, জুলুম ও অত্যাচারের আঁধার দূরীভূত হয়ে পৃথিবীব্যাপী বয়ে গেছে ইনসাফ ও ন্যায়ের ফল্গুধারা এবং উন্মোচিত হয়েছে জ্ঞান ও বিজ্ঞানের নবদিগন্ত।

রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কর্মসূচি

জাহিলিয়্যাতের ঘোর কুহেলিকায় আচ্ছন্ন এক প্রতিকূল সমাজে হিদায়তের রশ্মি বিকিরণের অসাধ্য কাজ সাধন করে গেছেন রাসূলে আরাবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। নবুয়াতি মিশনে সহযোগিতার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সর্বপ্রথম এক নিবেদিতপ্রাণ জামায়াত গঠনে মনোনিবেশ করেন, যারা ‘আসহাবে রাসূল’ হিসেবে আজ মুমিন হৃদয়ের স্পন্দন ও শ্রদ্ধাভাজন। এ মোবারক জামায়াতের সিংহভাগ ছিলেন তরুণ। এ দুরূহ কর্মটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পাদন করেছেন পরিকল্পিত ‘তারবিয়াতি কর্মসূচির’ আলোকে যা আল্লাহ এভাবে বর্ণনা করেছেন:

‘তিনি নিরক্ষরদের মধ্য থেকে একজন রাসূল প্রেরণ করেছেন, যিনি তাদের কাছে পাঠ করেন আয়াতসমূহ এবং শিক্ষাদেন কিতাব ও হিকমত, ইতিপূর্বে তারা ছিল ঘোর পথভ্রষ্টতায়।’ (সূরা জুমুআহ-২)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সারা জীবন আয়াতে বর্ণিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যয় করেছেন। বস্তুত এ ছিল তার তারবিয়তি কর্মসূচি যা প্রয়োজনমত সাহাবিদের ওপর প্রয়োগ করতেন। মানুষের মেধা অনুযায়ী কথা বলা ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনন্য বৈশিষ্ট্য। আল্লাহর আহকাম যথার্থভাবে পালন করার উৎসাহ প্রদান করা ছিল তাঁর প্রিয় স্বভাব। মানুষের আত্মশুদ্ধি এবং ঐক্য ও সম্প্রীতি স্থাপনে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিরলসভাবে কাজ করে গেছেন।

মুহাম্মদ বিন আবদুল্লাহর পাঠশালায় নবুয়াতি কারিকুলামে সৃষ্টি হয়েছে হেদায়াতের অনির্বাণ মশাল, উন্নত সংস্কৃতির পথিকৃৎ ও ও আদর্শ জাতি সংগঠক। তাঁর পূর্ণাঙ্গ তারবিয়াতি কর্মসূচির আওতাভুক্ত ছিল সামগ্রিক মানব জীবন।

শুধু জাতিসংঘ নীতিমালা, জাতীয় সংসদে গৃহীত সংবিধান, কারো প্রণীত শিক্ষা ব্যবস্থা, যুবমন্ত্রণালয়গুলোর সমন্বিত পদক্ষেপ কিংবা খেলাধুলা ও চিত্তবিনোদনের মাধ্যমে যুবকল্যাণ ও তারুণ্যের পুণ্যময় বিকাশ হবে না, বরং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তারবিয়াতি কর্মসূচির সযত্ন বিস্তারেই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। কারণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য উত্তম আদর্শ ও একমাত্র মডেল। ইরশাদ হচ্ছে: ‘যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের স্মরণ করে তাদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের মধ্যে রয়েছে উত্তম নমুনা।’ (সূরা আল আহযাব-২১)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তারবিয়াতি কর্মসূচিতে দুটি বিষয়ের স্পষ্ট প্রধান্য ছিল। এক, ইলম বা শিক্ষা যা ইতিহাসে ধ্বনিত হয়েছে। দুই, আখলাক বা চরিত্র গঠন। নববী তারবিয়াতে আখলাখের গুরুত্ব ছিল সমাধিক। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হচ্ছেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ চরিত্রের অধিকারী মহাপুরুষ। মহান আল্লাহ স্বয়ং ঘোষণা দিচ্ছেন: হে নবী আপনি অবশ্যই মহান চরিত্রের অধিকারী।’ (সূরা কলম-৪)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: মহৎ চরিত্রের পূর্ণতা বিধানের লক্ষ্যেই আমি প্রেরিত হয়েছি। (বুখারী, মুসলিম)

ইসলামি শরিয়াতের চাহিদাসম্মত আখলাকের পরিপূর্ণ সমাবেশ ঘটেছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে। উম্মত জননী হযরত আয়েশা (রা) এর মতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছিলেন কুরআনের দর্পণ। রাসূলের সীরাত অনুসরণেই মানুষ আল্লাহর নৈকট্য এবং ইহ-পরকালের সম্মান অর্জন করতে পারবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইলম ও বিদ্যার সাথে আখলাক ও নৈতিকতার সংযোগ জুড়ে দিয়ে প্রমাণ করে দিলেন যে, নীতিহীন শিক্ষা দ্বারা কল্যাণ আশা করা যায় না। যে শিক্ষা নীতিতে যুবকদের চরিত্র গঠনের উপাদান থাকবে না তার দ্বারা জাতির উপকার হওয়ার পরিবর্তে সমূহ বিনাশই ডেকে আনা হবে। আধুনিক শিক্ষা ও সভ্যতার ধ্বাজাধারী পাশ্চাত্য সমাজ এর প্রকৃষ্ট প্রমাণ। চরিত্রের অনুশীলন না থাকায় দেশের অনেক সেরা বিদ্যাপীঠ আজ বেহায়পনার নিরাপদস্থানে পরিণত হয়েছে। জ্ঞানকেন্দ্র হয়েছে এখন আতংকের জনপদ।

অতএব ধর্মীয় মূল্যবোধ বর্জিত কোন শিক্ষা ব্যবস্থা জাতি মেনে নিতে পারে না। তেমনিভাবে কুরআন- হাদীস শিক্ষায় নিবেদিত মাদ্রাসা ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপপ্রচারও প্রতিহত করবে নবীপ্রেমে উদ্বেল তাওহীদী জনতা।

যুবকল্যাণে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নির্দেশনা

প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবকদের সাথে করমর্দন করে স্নেহ ও ভালোবাসার পরিচয় দিতেন। তাদেরকে সৎকাজের অনুপ্রেরণা দিতেন। কারণ তাদের হৃদয় উদার এবং তারা বিনীত। দেশ জাতি ও উম্মাহর কল্যাণে তারা হন অগ্রগামী।

যুবকদের শিক্ষাদীক্ষার উন্নয়নের জন্য আদর্শ পরিবার গঠনে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বারবার গুরুত্ব আরোপ করেছেন। এজন্য তাকওয়াসম্পন্ন রমনীকে বিয়ে করতে হাদিসে তাগিদ এসেছে। কারণ পরিবার হচ্ছে শিশুর প্রথম পাঠশালা এবং মা হলেন তার প্রথম শিক্ষয়িত্রী।

সদ্যপ্রসূত শিশুর ডান কানে আজান এবং বাম কানে ইকামত দেওয়া বিধেয়। যাতে শিশুর কানে সর্বপ্রথম আল্লাহু আকবর বাক্যটি শ্রুত হয়। পরবর্তী সময়ে এর প্রভাব তার জীবনে দৃশ্যমান হবে।

সন্তানের ব্যাপারে পিতার করণীয় সম্পর্কে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন: পিতার ওপর সন্তানের তিনটি অধিকার রয়েছে: সুন্দর নামকরণ, ইলম শিক্ষাদান, প্রাপ্তবয়স্ক হলে বিবাহ প্রদান। (ইবনুল মুবারক)

প্রিয় পাঠক! চিন্তা করুন, আজ মুসলিম সমাজে সন্তানের এ অধিকার কতটুকু আদায় করা হচ্ছে? পিতৃকুল এ ব্যাপারে কতটুকু সচেতন? বরং বিরাজমান পরিস্থিতির আলোকে বলা যায় যে, এর বিপরীতই বিদ্যমান। সুন্দর ইসলামি নাম আজ বর্জিত, সঠিক জ্ঞান ও ইলম কয়টি পরিবারে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে? অপর দিকে বিয়ে আজ সামাজিক বিড়ম্বনায় পরিণত হয়েছে।

উপযুক্ত বয়সে কয়জন তরুণ-তরুণীর বিয়ে পর্ব সম্পন্ন হয়? অথচ বিয়ে ধর্মীয় কর্তব্য ও নৈতিকতার রক্ষাকবচ। বিয়ের মাধ্যমে চারিত্রিক দৃঢ়তা, আধ্যাত্মিক সমুন্নতি, সামাজিক সংহতি, মানবিক সমৃদ্ধি, শান্তি-শৃঙ্খলা ও আনন্দময় জীবন অর্জিত হয়। সভ্য সমাজের জন্য যৌন নিয়ন্ত্রণ অপরিহার্য। দুঃখের বিষয়, ইন্টারনেট ও স্যাটেলাইট চ্যানেলের মাধ্যমে যৌন সুড়সুড়ি প্রদান জোরেশোরে চলছে কিন্তু বিয়ে ব্যবস্থা প্রতিনিয়ত জটিল ও ব্যয়বহুল আকার ধারণ করছে। যৌতুকের রকমারী প্রচলনে কন্যাদায়গ্রস্ত অভিভাবকগণ চোখে সর্ষেফুল দেখছেন। অথচ নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ব্যয়বহুল ও আড়ম্বরতা বর্জিত বিয়েতেই রয়েছে বরকত ও কল্যাণ। (বায়হাক্বী, বর্ণনায়: হযরত আয়েশা রাযি. রিয়াদুস সালিহীন)

যেসব অভিভাবক সামর্থ থাকা সত্ত্বেও প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের বিয়ের ব্যবস্থা করছে না তাদের সতর্ক করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: প্রাপ্তবয়স্ক সন্তানের বিয়ে দেয়া না হলে সে যদি কোনো পাপ করে তার গোনাহ পিতাকে বহন করতে হবে। (বায়হাক্বী, বর্ণনায়, হযরত আবু সাঈদ রাযি)

বিয়ে ব্যবস্থা সহজতর করার জন্য সুন্নতি বিবাহের ব্যাপক প্রচলন ও ঘৃণ্য যৌতুক প্রথার বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন সৃষ্টি করা সময়ের দাবি।

নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিশোর বয়স থেকেই সন্তানদের ইবাদত অনুশীলনে যত্নবান হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। ইরশাদ হচ্ছে: তোমরা সাত বছরের সন্তানকে নামাজ শিক্ষা দাও। দশ বছর বয়সে নামাজ অনাদায়ে প্রহার কর এবং পৃথক শয্যার ব্যবস্থা কর। (আবু দাউদ)

বলা নিষ্প্রয়োজন, কিশোরকাল হতে ইবাদতে যথাযথ অভ্যস্থ ব্যক্তি যুবক বয়সে ইবাদতবিমুখ হতে পারে না।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবকদের সামাজিক আচরণ শিক্ষার ব্যাপারে সচেতন ছিলেন। হযরত আনাস রাযি. কে একদিন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘরে প্রবেশের আদাব শিক্ষা দিতে গিয়ে বলেন: প্রিয় বৎস, গৃহে প্রবেশকালে সালাম করবে, এতে গৃহবাসী ও তুমি উভয়ে বরকত লাভ করবে। (তিরমিজী)

আল্লাহ ইরশাদ করেছেন: হে মুমিনগণ! তোমরা নিজের গৃহ ব্যতীত অন্যের গৃহে প্রবেশ করবে না, যে পর্যন্ত আলাপ পরিচয় না কর এবং গৃহবাসীদেরকে সালাম না কর। (সূরা নূর-২৭)

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রয়াসে যুবকগণ সামাজিক শিষ্টাচার অর্জনে সক্ষম হয়েছিলেন। রাসূলের ‘প্রিয় বৎস’ সম্বোধনে স্নেহ ও ভালোবাসা ফুটে উঠেছে এবং বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, যুবকদেরকে উপদেশ প্রদান কালে কোমলতা ও দয়ার্দ্রতার পরিচয় দিতে হবে, নতুবা অনুপ্রাণিত হওয়ার পরিবর্তে বিদ্রোহী হয়ে উঠতে পারে।

যুবকদের মাঝে হিমালয়সম অটল ঈমান, তাওয়াক্কুল ও খোদাভীতি সৃষ্টির প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। যাতে কঠিন পরিস্থিতিতেও তাদের মনে হতাশা ও অস্থিরতা দেখা না দেয়।

ইবনে আব্বাস রাযি. বর্ণনা করেছেন: একদিন আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পেছনে ছিলাম। তিনি আমাকে বলেন: হে যুবক! আমি তোমাকে কিছু শিক্ষা দান করব, আল্লাহকে স্মরণ করবে তো তিনি তোমাকে রক্ষা করবেন, যখন কিছু চাইবে তো আল্লাহর কাছেই চাইবে। জেনে রাখ! সমগ্র জাতি যদি তোমার কোনো উপকার করতে চায় তবে আল্লাহ তোমার জন্য যা নির্ধারিত করে দিয়েছেন তা ব্যতীত কোন উপকারই করতে পারবে না। আর যদি সমস্ত মানুষ তোমার অনিষ্ট করতে চায় তবে আল্লাহ তোমার জন্য যা নির্ধারিত করে দিয়েছেন তা ব্যতীত কোনো অনিষ্টই করতে পারবে না। (তিরমিজি)

পথচলা অবস্থায় ইবনে আব্বাস রাযি. এর উদ্দেশ্যে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কটি নসিহত করেছেন তা গোটা উম্মতের জন্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমস্ত তরুণদের আকিদা বিশ্বাস পরিশুদ্ধ করে ক্ষান্ত ছিলেন তা নয় বরং তাদেরকে সাস্থ্য সচেতনও করে তুলেছিলেন। অটুট স্বাস্থ্য ও শক্তি অর্জনের নিমিত্তে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শরীর চর্চার উৎসাহ দিয়ে গেছেন। কারণ সুস্থ শরীরের মাঝে সঠিক জ্ঞান অবস্থান করে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছেন: আল্লাহ দুর্বল মুমিনের চেয়ে সবল মুমিনকে অধিক ভালোবাসেন। (মুসলিম)

শরীর চর্চার উদ্দেশ্যে নিবেদিত খেলাধুলা ইসলামের দৃষ্টিতে প্রশংসনীয়। তবে খেলাধুলা কোন মুমিনের ইস্পিত লক্ষ্য হতে পারে না। পাশ্চাত্য স্টাইলে মুসলিম দেশগুলো যেভাবে খেলাপ্রিয় হয়ে উঠেছে তা এক অশুভ ইঙ্গিত বহন করে। মুসলিম তরুণদের ঈমানি কর্তব্যচ্যুত করার ঘৃণ্য পরিকল্পনার আলোকে এসব পরিচালিত হচ্ছে। বর্তমানে খেলাধুলার নাম যে উন্মাদনা শুরু হয়েছে তা সর্বোতভাবে বর্জন করা উচিত।

যুবকদের মনোবল বৃদ্ধি ও অটুট রাখার অভিপ্রায়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তীরন্দাযী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতেন। তিরান্দাযী অনুষ্ঠানে দর্শক হিসেবে উপস্থিত থেকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর গুরুত্ব বুঝিয়েছেন।

তিরান্দাযী প্রশিক্ষণরত একদল যুবকের পাশ দিয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম পথ অতিক্রম করছিলেন, তখন তাদের লক্ষ্য করে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে উঠলেন: হে ইসমাইল (আ) এর বংশধর! তীরান্দাযী চালিয়ে যাও; তোমাদের পূর্ব পুরুষ ছিলেন তীরান্দায। তীরান্দাযী তোমাদের তোমাদের গোত্রীয় ঐতিহ্য। তোমরা তীর নিক্ষেপ করো আমি অমুক অমুক গ্রুপকে সমর্থন করছি। একদল যুবককে তীরান্দাযী হতে বিরত দেখে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: তোমরা কেন তিরন্দাযী করছ না? তারা বলল, আপনি তো অমুক গ্রুপকে সমর্থন করছেন তাহলে আমরা কেন অংশ নেব? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সোহাগভরে বললেন: তোমরাও তীরন্দাযী কর আমি সকলের পক্ষে আছি। (বুখারী)

এ ছিল নববী তারবিয়াতের এক উজ্জল দৃষ্টান্ত। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যুবকদের শারীরিক ও মানসিকভাবে গঠন করেছিলেন। দুঃসময়ে জাতির পাশে দাঁড়ানোর জন্য প্রতিরক্ষা ও সমর বিদ্যায় তাদের পারদর্শী করে তুলেছিলেন। মুহাদ্দিস, মুফাস্সির , ধর্মীয় বিশেষজ্ঞ ও হাফেজে কুরআন তৈরিতেই রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ব্যস্ত ছিলেন তা নয়, বরং অসংখ্য সমরবিদ ও উপহার দিয়ে গেছেন। তাঁর আদর্শ অনুসরণে সকল নাগরিককে প্রয়োজনীয় প্রতিরক্ষা ট্রেনিং দেয়ার ব্যবস্থা করা রাষ্ট্রের কর্তব্য।

উপসংহার: যুবকল্যাণে আজীবন নিবেদিত রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মতের যুব সমাজের অবস্থা আজ বড়ই করুণ। হতাশা ও অস্থিরচিত্ততা তাদের নিস্তেজ করে দিয়েছে। কিন্তু এ অস্থির চিত্ততার উৎস কোথায়?

এ প্রশ্নের জবাবে ইসলামি দুনিয়ার প্রাজ্ঞ মনীষী মরহুম আল্লামা আবুল হাসান আলী নদভী বলেছেন: জীবনের সর্বত্র বিদ্যমান অসঙ্গতি ও বৈপরীত্য হচ্ছে এর প্রধান কারণ। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের সর্বত্র তারা এ বৈপরীত্যের মুখোমুখি হচ্ছে। পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য সম্পর্কে তারা যা জেনেছে, শুনেছে, পারিবারিক জীবনের কোথাও তারা তার ছাপ দেখতে পায় না। মা-বাবা কিংবা অভিভাবকদের কাছে তারা শুনতে পায় এক ধরণের জীবন দর্শন ও মূল্যবোধের কথা, কিন্তু শিক্ষাঙ্গনে তাদের পড়ানো হয় ভিন্ন কিছ আর সাহিত্য ও শিল্পকলার নামে তাদের পরিবেশন করা হয় অন্য কিছু। সম্ভব হলে আজ এ মুহূর্তে আমাদের সমাজ জীবন ও শিক্ষাব্যবস্থা থেকে এ দ্বিমুখী অবস্থার অবসান ঘটানো কর্তব্য।

আল্লামা নদভীর এ বাস্তব সম্মত অভিমতের সাথে দ্বিমত পোষণের কোনো অবকাশ নেই। প্রচলিত ঔপনিবেশিক শিক্ষাব্যবস্থাই তরুণদের বিপথগামী করে তুলেছে, ফলে যে শক্তি ব্যয় হওয়ার কথা দেশ গঠনে, সমাজ সংস্কারে, জাতীয় সমৃদ্ধি অর্জনে ও দ্বীন রক্ষার মহান কাজে, তা আজ ব্যয় হচ্ছে নেতিবাচক কর্মকাণ্ডে এবং ধ্বংস তৎপরতায়।

অতএব এ শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কারে আমাদের সচেষ্ট হতে হবে। সোচ্চার হতে হবে জাতির আক্বীদা বিশ্বাস , জীবন দর্শন ও মূল্যবোধের উপযোগী নতুন শিক্ষাব্যবস্থা প্রণয়নের দাবিতে। এ পবিত্র সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালনার্থে ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া উলামাদের গ্রহণ করতে হবে ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস। সকল জড়তা ও অবসাদ এবং যাবতীয় মতভেদ পদদলিত করে সমবেত হতে হবে একই প্লাটফর্মে। শিক্ষা কর্তৃপক্ষ ও শাসকবর্গকে উলামা-মাশায়েখের মতামত আন্তরিকতার সঙ্গে গ্রহণ করতে হবে। কয়েক যুগ পূর্বে আল্লামা ইকবাল ধর্মীয় নেতৃত্বে সমীপে যে আবেদন রেখেছিলেন তা উদ্ধৃত করে শেষ করছি এ লেখা।

হরমের হে পীর! খানকাহর প্রাণহীন আনুষ্ঠনিকতা বর্জন কর;

আমার শেষ রাতের আহাজারির মর্ম অনুধাবন কর।

তোমাদের তরুণদের আল্লাহ নিরাপদ রাখুন;

তাদের শিখা ও আত্মগঠন ও আত্মপীড়নের পাঠ।

পাশ্চাত্য তা

দের শিখিয়েছে কাঁচ তৈরির শিল্প;

তুমি তাদের শিখিয়ে দাও জীবন জয়ের পন্থা।

দুশ বছরের বন্দীদশা ভেঙে গুড়িয়ে দিয়েছে তাদের মন,

তোমাকে আজ খুঁজে পেতে হবে তাদের হৃদয়ের এ রক্তক্ষরণের কোন উপশম।

তথ্য সূত্র: ১. মাসিক মানারুল ইসলাম আবুধাবী। ২. প্রাচ্যের উপহার, ইফা বাংলাদেশ। ৩. ইসলামের রুপরেখা, দি ওয়ার্ল্ড অ্যাসেম্বলী অফ মুসলিম ইয়ুথ, রিয়াদ। ৪. চল্লিশ হাদিস, ইমাম নববী রহ.। ৫. তাফসিরে মাআরিফুল কুরআন, মাওলানা মহিউদ্দীন খান রহ. অনূদিত।

লেখক : ইমাম-খতিব ও প্রশিক্ষক, কাতার ধর্ম মন্ত্রণালয়; , আলনূর কালচারাল সেন্টার, কাতার

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com