রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:১৬ অপরাহ্ন

ভারত কেন ভাগ হল?

ভারত কেন ভাগ হল?

ভারত কেন ভাগ হল?

চৌধুরী আতিকুর রহমান : মুসলিম লিগ ও কৃষক প্রজা পার্টির ভিত্তিমূলেই কিছু পার্থক্য ছিল। মু লি ছিল ধনী ব্যবসায়ী ও জমিদারদের দল। নেতৃত্বে মৌলানা আক্রাম খাঁ ছাড়া কোন বাংলাভাষী ছিলেন না। তাই কোলকাতার বাইরে সাধারণ মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ ছিল না। অপরদিকে কৃষক- প্রজা পার্টি ছিল সাধারণ মানুষ ও মধ্যবিত্তের দল। সাধারণ কৃষক, দোকানদার ও চাকুরে জনাব ফজলুল হককে ভরসা করতেন। প্রথম তিন বছরেই লিগ- কৃ প্র কোয়ালিশন তাঁদের দাবির অনেকটাই পূরণ করে।

জনাব ফজলুল হক তাঁর ভাবনা আর চরিত্রবিরোধী আরও একটা কাজ করতে বাধ্য হন। কোয়ালিশন মন্ত্রীসভাকে দৃঢ়তা প্রদানের উদ্দেশ্যে তিনি মুসলিম লিগে যোগ দিলেন।

লিগের সর্বভারতীয় নেতৃত্ব তিনটি প্রদেশে কংগ্রেসের সঙ্গে কোয়ালিশন করে। কিন্তু কংগ্রেস নানা অজুহাতে তাদের অস্তিত্ব অস্বীকার করতে থাকে। ১৯৩৯-এ ২য় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হলে লর্ড লিনলিথগো ভারতের সমর্থন আশা করেন। প্রতিবাদে কংগ্রেস তাদের সাতটি প্রদেশে মন্ত্রীসভা ত্যাগ করে। মুসলিম লিগ চেয়েছিল সরকার চালাতে কারা ব্রিটিশদের সঙ্গে থাকবে বা থাকবে না সে বিষয়ে তারাই ঠিক করুক। এই উপেক্ষা ও সঙ্ঘাতের ফলেই দল হিসাবে মু লি প্রথম দ্বিজাতিতত্ত্বের অবতারণা করে

১৯৪০-এর ২৩-শে মার্চ মুসলিম লিগের লাহোর সম্মেলনে প্রথম পৃথক রাষ্ট্র চেয়ে ‘লাহোর প্রস্তাব’ আনা হয়। এই প্রস্তাবের উত্থাপক ছিলেন জনাব এ কে ফজলুলু হক। এরপরই হক সাহেবের সঙ্গে জিন্নার সঙ্ঘাত শুরু হলে এবং জাতীয় প্রতিরক্ষা পরিষদে সদস্য নিয়ে হক সাহেব মুসলিম লিগ ত্যাগ করেন। ১৯৪১-এ লিগ নেতৃত্ব ফজলুল হক সাহেবের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব আনে। লিগের কয়েকটি প্রস্তাব না মানায় লিগও যুদ্ধকালীন সহায়তা পুরোপুরি নাকচ করে দেয়।

অতঃপর ফজলুল হক সাহেব শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির হিন্দু মহাসভা, ফরোয়ার্ড ব্লক ও দলিত পার্টির সঙ্গে কোয়ালিশন করেন। গঠিত হয় প্রোগ্রেসিভ কোয়ালিশন পার্টি, যার পোশাকি নাম ছিল শ্যমা-হক মন্ত্রীসভা। মন্ত্রীসভায় ৬ জন মুসলিম ও ৫ জন হিন্দু ছিলেন। শ্যামাবাবু পান অর্থমন্ত্রক, হক সাহেব মুখ্যমন্ত্রী (তখন প্রধানমন্ত্রী)।

ইতিমধ্যে দুটি ঘটনা ঘটে। স্যার স্টাফোর্ড ক্রিপস ১৯৪২-এ ভারতে আসেন। ভারতের স্বাধীনতা প্রদানের রূপরেখা নির্ণয়ই ছিল তাঁর আগমণের হেতু। অপরটি হল কংগ্রেসের ভারত ছাড়ো আন্দোলনের ডাক। জমিয়তে উল উলেমায়ে হিন্দের শাইখুল হিন্দ মৌলানা সৈয়দ আহমদ মাদানি একটি প্রস্তাব দেন, যার নাম হল মাদানি ফর্মুলা।
‘স্বাধীন রাষ্ট্রে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক ভারতবাসীর ভোটাধিকার থাকবে, রাষ্ট্রব্যবস্থা ফেডারেল হবে। কয়কটি সাধারণ বিষয় ছাড়া যা কেন্দ্রের হাতে থাকবে প্রতিটি প্রদেশ স্বাধীন হবে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ভাষা, সংস্কৃতি, ধর্ম ইত্যাদি সুরক্ষিত থাকবে, ব্যক্তিগত আইন হেফাজত করা হবে, কেন্দ্রীয় আইন সভায় মুসলিম/হিন্দু অনুপাত হবে ৪৫% করে অন্য সম্প্রদায় ১০%।’

সামান্য পরিবর্তন সাপেক্ষে এই ফর্মুলা গৃহীত হয় যা প্রথমে কংগ্রেস ও পরে মুসলিম লিগের হটকারিতার জন্যে কার্যকর হয়নি। অপরদিকে সম্ভবত মন্ত্রীসভাকে টিকিয়ে রাখার জন্যে শ্যমা বাবু ভারত ছাড়ো আন্দোলনের বিরোধিতা করে গভর্ণর স্যার জন হার্বার্টকে চিঠি লেখেন। তিনিই আবার মেদিনিপুরে ব্রিটিশ পুলিশের কংগ্রেসি আন্দোলনকারীদের উপর লঠিচার্জের প্রতিবাদ করে পদত্যাগ করলেন। এদিকে নেতাজি অন্তরীন অবস্থা থেকে দেশ ছাড়লে মন্ত্রীসভার অংশীদার ফরোয়ার্ড ব্লকের জন্যে ব্রিটিশ গভর্ণর চাপ দিতে থাকে, এবং মন্ত্রীসভাকে উপেক্ষা করে সীদ্ধান্ত নিতে থাকে। তারই ফল হল লাঠিচার্জ। শ্যামাবাবুর পদত্যাগের অব্যবহিত পরেই মন্ত্রীসভার পতন হয় (১৯৪৩)। কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভার অবিমৃষ্যকারিতার ফল হল মুসলিম লিগ ছাড়া বাংলায় মুসলিমদের আর কোন দল থাকল না।

ফজলুল হক সাহেব নতুন করে তাঁর পুরনো দল কৃষক-প্রজা পার্টিকে পুনরুজ্জীবিত করেন। কিন্তু ১৯৪৩-এ খাজা নাজিমুদ্দিনের মুসলিম লিগ ক্ষমতায় এসেই হক সাহেবের জনপ্রিয়তার জায়গাগুলিতে হাত দেয়। সোহরাওয়ার্দি ও আবুল হাশিম দেশ ভাগ নিয়ে ছাত্র-যুবাদের মধ্যে উন্মাদনা তৈরী করেন। হক সাহেবকে কংগ্রেস ও হিন্দু মহাসভা সংস্রবের জন্যে বিশ্বাসঘাতক রূপে রূপায়িত করেন। ফল হল ১৯৪৫-এর নির্বাচনে ১১৯ টির মধ্যে হক সাহেবের দল পেল মাত্র ৬ টি আসন। স্পষ্ট (বাংলা) দেশভাগের লক্ষণ। যদিও ভোটাধিকার ছিল ধনী, শিক্ষিত ও জমিদারদের। মন্টেগু চেমসফোর্ড সংস্কার অনুযায়ী এটাই নিয়ম ছিল। দেশের ৯০% দলিত-মুসলিমের ভোটাধিকার ছিল না।

এর পরেও দেশভাগ রোধের একটি চেষ্টা হয়। মাদানি সূত্রানুযায়ী কেন্দ্রের হাতে বিদেশ, প্রতিরক্ষা, যোগাযোগ ইত্যাদি রেখে তিনটি বিভাগ করা হল১) হিন্দু প্রধান এলাকা ২) মুসলিম প্রধান এলাকা ৩) বাংলা, আসাম। জিন্না এই প্রস্তাব মেনে নিয়ে দেশভাগ রদ করলেন। কংগ্রেস প্রস্তাব মেনে নিল। কিন্তু কয়েকদিন পরই জওহারলাল বললেন, ‘আমরা কিছুই গ্রহণ করিনি,….. দুর্বল কেন্দ্র মানি না’।
জিন্না বললেন, ‘ইংরেজ থাকাকালীন কথা পাল্টানো হচ্ছে। পাকিস্তান লাভের জন্যে প্রত্যক্ষ সংগ্রামে যেতে হবে’।

অতঃপর হক সাহেবও শেষ, মাদানি সূত্রও শেষ।

লেখক : কলামিস্ট

তথ্যসূত্রঃ ১) ভারত কি করে ভাগ হল?-বিমলানন্দ শাসমল
২) বাংলাদেশ ইতিহাস পরিক্রমা- কে এম রইসুদ্দিন খান
৩) সমস্যার স্বরূপ-জাস্টিস চৌধুরী আব্দুর রহিম

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com