বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৪:৩৫ অপরাহ্ন

বায়ুদূষণ শিশু স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি

বায়ুদূষণ শিশু স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি

পরিবেশ । অখিল পোদ্দার

বায়ুদূষণ শিশু স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি

পরিবেশ দূষণ ঘটে বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ এবং পানি দূষণের কারণে। উন্নয়নশীল জনবহুল দেশ হিসেবে আমাদের দেশে বায়ুদূষণ একটি অন্যতম জনস্বাস্থ্য সমস্যা। স্বাভাবিকভাবে বায়ুমন্ডলে যদি এমন কোনো উপাদানের অনুপ্রবেশ ঘটে যার ফলে মানুষ, উদ্ভিদ বা প্রাণিকুলের ক্ষতি হয় বা ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দেয় সেটাই বায়ুদূষণ। বায়ুদূষণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে মানুষের সৃষ্টি। মানুষের অসচেতনতা বায়ুদূষণের প্রধান কারণ।

বিগত কয়েক দশকে বায়ুদূষণ পরিবেশ দূষণের একটি অন্যতম কারণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বের জনগণ আজ বায়ুদূষণ এবং এর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী ক্ষতির বিষয়ে উদ্বিগ্ন। বায়ুদূষণ জনস্বাস্থ্যের জন্য হুমকিস্বরূপ।

বাংলাদেশের আধুনিকায়ন ও জনসংখ্যার ক্রমোর্ধ্বগতির সাথে এ দূষণ প্রক্রিয়া সম্পৃক্ত। বায়ুদূষণের বড় কারণসমূহ হচ্ছে ইট ভাটা থেকে নির্গত দূষিত ধোয়া, বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন থেকে নির্গত ধোঁয়া (বিশেষ করে ফিটনেসবিহীন যানবাহন), পরিবেশ সম্মত রান্নার চুলা ব্যবহার না করা বা রান্নাঘরে ব্যবহৃত বিভিন্ন জ্বালানির ব্যবহার, নির্মাণে ব্যবহৃত জ্বালানি পুড়ে নির্গত ধোঁয়া, রাস্তাঘাটের ধূলাবালি, বিদ্যুতের বিকল্প হিসেবে জেনারেটরের ব্যাপক ব্যবহার থেকে নির্গত ধোঁয়া, হাসপাতাল ও অন্যান্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সঠিক ব্যবহার না থাকা, সঠিকভাবে ডাস্টবিন ব্যবহার না করা ইত্যাদি। এছাড়া নির্মাণাধীন ভবনসমূহ সংলগ্ন এলাকায় ধুলাবালি শহরের বায়ুদূষণের অন্যতম কারণ। পরিবহন ব্যবস্থাপনায় নির্ধারিত পরিমাণের চেয়ে অধিক মাল বহন করলে বা ক্রুটিযুক্ত যানবাহন থেকে যে কালো ধোঁয়া বের হয়, তা মানবদেহের জন্য ক্ষতিকর। আইন থাকা সত্ত্বেও মানুষের অসচেতনতায় এখনো রাস্তাঘাটে ধূমপানের ব্যবহার বন্ধ হয়নি। তামাকজাতীয় দ্রব্যের ধোঁয়া প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর একইসাথে মারাত্মকভাবে বায়ুদূষণের জন্যও দায়ী। শীতকালে বৃষ্টিপাত কম হয় বলে এ বায়ুদূষণ ব্যাপক আকার ধারণ করে। মিল, কলকারখানা এবং ঘন বসতিপূর্ণ এলাকায় দূষণের পরিমাণ বেশি। তবে দূষণের সাথে আইন ও নীতিসমূহ লংঘনের বিষয়টি অনেকাংশে দায়ী।

বায়ুদূষণের ফলে জনস্বাস্থ্যের উপর তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদী নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। আমাদের দেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক মানুষ শ্বাসতন্ত্র, ফুসফুস এবং স্নায়ুতন্ত্রের রোগে আক্রান্ত হচ্ছে বিশেষ করে স্কুলগামী শিশু এবং গর্ভবতী নারীরা। দূষিত বায়ুর কারণে হৃদযন্ত্র এবং শ্বাসনালীর সমস্যা বেশি হয়। অতিরিক্ত দূষিত বায়ু সেবনে গর্ভবতী নারী ও শিশু স্বাস্থ্যের প্রতি বিরূপ প্রভাব ফেলে, তবে শিশুরাই বায়ুদূষণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কারণ তাদের শরীর গঠন প্রক্রিয়ার ভিতর দিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে থাকে। ফলে তাদের অঙ্গপ্রতঙ্গসমূহ খুবই স্পর্শকাতর ও সংবেদনশীল অবস্থায় থাকে। তাদের হাড় নরম, টিস্যু ও কোষসমূহ দ্রুত পরিবর্তনশীল, তাদের ফুসফুসের গঠন ও বৃদ্ধি চলমান অবস্থায় থাকে। অতিরিক্ত শ্বাস-প্রশ্বাস গ্রহণ ও নির্গমণ এবং বাইরে খেলাধুলায় অধিক সময় অবস্থান তাদেরকে বায়ুদূষণজনিত রোগে আক্রান্তের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ করে তোলে। বায়ুদূষণজনিত কারণে শিশুদের শ্বাসপ্রশ্বাস নিতে কষ্ট, দীর্ঘশ্বাস গ্রহণে বুকে ব্যথা, কাশি, স্বল্পকালীন ফুসফুসের কার্যকারিতা হ্রাস, ফুসফুসের প্রদাহ, হাঁপানী এবং ক্রনিক ব্রংকিওলাইটিস দেখা দিতে পারে। এছাড়া বায়ুদূষণ গর্ভবতী মায়েদের নির্ধারিত সময়ের পূর্বে প্রসব, শিশুর কম ওজন এবং মাতৃ ও শিশুমৃত্যুর হার বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে। পরিপাক ও বিপাক প্রক্রিয়া ব্যাহত হওয়া, শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া এবং এলার্জিজনিত সমস্যাও বায়ুদূষণের কারণে পরিলক্ষিত হয়।

আমাদের দেশের মতো একটি জনবহুল উন্নয়নশীল দেশে বায়ুদূষণজনিত রোগবালাই থেকে মুক্ত থাকা বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ বিরাট এ জনগোষ্ঠীর অসুস্থতাজনিত কারণে চিকিৎসার মতো ব্যয় ব্যক্তি ও সমাজের জন্য অত্যন্ত ব্যয়বহুল এবং সার্বিক অর্থে উন্নয়নের পথে বাধা। বায়ুদূষণ পরিবেশ দূষণের অংশ হিসেবে একটি বৈশ্বিক সমস্যা। কিন্তু উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এ সমস্যা ক্রমেই তীব্র আকার ধারণ করছে। দেশের প্রায় সমগ্র জনগোষ্ঠীই বায়ুদূষণের শিকার। তবে বায়ুদূষণের ফলে দরিদ্র ও সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়।বায়ুদূষণের কারণে স্মৃতিভ্রম বা ডিমেনশিয়া রোগে আক্রান্ত হওয়ার হার শিশুদের মধ্যে বাড়ছে। ডিমেনশিয়া হলো ভুলে যাওয়া বা দূর অতীতের পাশাপাশি অনেক সময় সাম্প্রতিক অতীতের কথাও মনে রাখতে না পারা। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এটি আলঝেইমার রোগ নামেও পরিচিত। বায়ুদূষণের প্রত্যক্ষ প্রভাবে মস্তিষ্কের স্নায়ুকোষ ক্ষতি হচ্ছে। স্নায়ুর নিউরোনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে মস্তিষ্কে তথ্য পৌঁছে দেওয়ার কাজ বিলম্ব ঘটে। তাই স্মৃতিভ্রম রোগের জন্য বায়ুদূষণ অনেকাংশে দায়ী বলে চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা মনে করেন।

শিশুরা আমাদের উত্তরাধিকার। আমাদের যা কিছু অর্জন তা টিকিয়ে রাখতে হলে সুস্থ ও স্বাস্থ্যবান ভবিষ্যৎ জনগোষ্ঠীর বিরাট ভূমিকা রয়েছে। অসুস্থ প্রজন্ম উন্নয়নের পথে বাধা। বায়ুদূষণের দীর্ঘমেয়াদী প্রভাবে শিশু রোগব্যাধি নিয়ে বড় হবে। এসব অসুস্থ প্রজন্ম সমাজের জন্য হতে পারে বোঝা। এটা কখনোই কাম্য হতে পারে না।

নানাবিধ পরিবেশ দূষণের মধ্যে বায়ুদুষণ সর্বাধিক ক্ষতিকর। নির্মল ও পরিচ্ছন্ন বায়ু আমাদের শ্বাসপ্রশ্বাসের জন্য অপরিহার্য্য। তাই বায়ুর গুণমান বজায় রাখা ছাড়া আমাদের উপায় নেই। বিশ্বব্যাপী প্রতি বছর আনুমানিক ৭ মিলিয়ন মানুষ মারা যায় বায়ুদূষণের কারণে। এদের মধ্যে ৪ মিলিয়ন মানুষের বসবাস হলো এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে। বায়ুদূষণের ফলে মৃত্যুবরণকারী নব্বই ভাগেরও বেশি মানুষ গরীব দেশগুলোর বাসিন্দা। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি হিসেবে দেখা গেছে, বিশ্বে বায়ুদূষণের কারণে ২৪ শতাংশ পূর্ণবয়স্ক মানুষের হার্টের অসুখ, ২৫ শতাংশ স্টোক এবং ২৯ শতাংশ ফুসফুস ক্যান্সার হয়ে থাকে। বায়ুদূষণের অর্থনৈতিক প্রভাবও কম নয়। প্রতি বছর বিশ্ব অর্থনীতির ৫ ট্রিলিয়ন ডলার ক্ষতি হয় বায়ুদূষণের কারণে।

বায়ুদূষণ রোধে সরকার অনেক সক্রিয় রয়েছে। পরিবেশ দুষণ রোধে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়, পরিবেশ অধিদপ্তর’সহ সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠান সচেতনতামূলক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় থেকে সারাদেশে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে বায়ুদুষণ রোধে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সরকার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংস্থার সাথেও একতাবদ্ধভাবে কাজ করে চলেছে। রাজধানীতে সিটি কর্পোরেশনের মাধ্যমে নির্মাণাধীন এলাকাসমূহের রাস্তায় পানি ছিটিয়ে বায়ুদূষণ রোধে উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। নদী দূষণ এবং নদী দখলদারদের বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। দায়ীদের গ্রেফতার করা হচ্ছে। পলিথিনের ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। দূষণ প্রতিরোধে ট্যানারি শিল্প হাজারিবাগ থেকে সাভারে স্থানান্তর করা হয়েছে। পরিবেশ অধিদপ্তর নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছে এবং দূষণ সৃষ্টিকারী স্থাপনাসমূকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। সর্বোপরি পরিবেশসম্মত অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং তার বাস্তবায়ন, ব্যক্তি ও পারিবারিক পর্যায়ে পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং পরিবেশ শিক্ষায় অধিকতর মনোযোগী হওয়া অত্যন্ত জরুরি।

স্বাস্থ্যের জন্য হুমকি বায়ুদূষণ এবং এ থেকে সৃষ্ট স্বাস্থ্যসমস্যা থেকে রক্ষা পেতে আমাদের পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং বাস্তবায়ন করতে হবে। জাতীয় এবং স্থানীয় পর্যায়ে সমন্বিত কর্ম পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। জনগণের কাছে বার্তা পৌঁছে দিতে হবে বায়ুদূষণের ক্ষতিকর দিক সম্পর্কে। বায়ুদূষণ ও তা প্রতিরোধ সংক্রান্ত শিক্ষামূলক প্রচারণা চালাতে হবে। বায়ুদূষণ রোধে জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে সবাইকে সচেতন হতে হবে। এক্ষেত্রে গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা অনস্বীকার্য। বায়ুদূষণের নেতিবাচক দিক তুলে ধরে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে এ সমস্যা মোকাবিলায় এগিয়ে আসতে হবে। একটি স্বাস্থ্যবান ও কর্মক্ষম জাতি গঠনে শিশুদের সার্বিক বিষয়ে নজর দিতে হবে। এ শিশুদের জন্য সুন্দর দুষণমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা সরকারের পাশাপাশি আমাদের সবার নৈতিক ও জাতীয় দায়িত্ব।

লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com