রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:১৬ অপরাহ্ন

বাঙালিসংস্পর্শে মুগ্ধ নরওয়ের ড. রিযওয়ান

বাঙালিসংস্পর্শে মুগ্ধ নরওয়ের ড. রিযওয়ান

কাউসার মাহমুদপৌষের শেষ দুপুর।এখনও শীতের আবহ লেগে আছে। ঝিমিয়ে পড়া মিষ্টি রোদে কেমন আদুরে পরিবেশ চারপাশে। এরমধ্যেই মুসল্লিদের দৌড়ঝাঁপ চলছে ইজতেমার ময়দানে।সঙ্গে চলছে সমবেত কণ্ঠে লা ইলাহা ইল্লাল্লাহুর যিকির।সব মিলিয়ে এক অপার্থিব পরিবেশ।
গত ১১ জানুয়ারি বৃহস্পতিবার থেকে শুরু হয়েছে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের এ বৈশ্বিক দ্বীনী সমাবেশ! দুই ধাপে তিনদিন করে হয় আমলী প্রশিক্ষণ, আল্লাহকে পাওয়ার মশক। মনটা ব্যাকুল হয়ে ছিল প্রথম থেকেই। এমন বরকতময় ময়দানে একবার ঘুরে এলেও আত্মিক প্রশান্তি অসে। বুযুর্গদের এক বেলার বয়ানেও অনেক প্রভাব।

বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে এখানে আগত মুসল্লিদের দ্বীনের প্রতি যে সীমাহীন প্রেম, নিরঙ্কুশ খাঁটি ঈমানি জযবার যে বাস্তবিক শক্তি, না দেখে তা আঁচ করা যায় না একদমই। তাই হাজির হয়েছিলাম সশরীরেই।সরেজমিন ঘুরে পেলাম কিছু রসদ। শীলনবাংলার পাঠকদের শেয়ার করলাম কিছু আলাপন।

গাড়ি থেকে নেমে যখন ইজতেমার ১২ নম্বর গেটের কাছে উপস্থিত হলাম তখন আসরের আাযান হতে আর বেশিক্ষণ বাকি নেই। অনেকক্ষণ ধরেই অপেক্ষা করছিলেন বন্ধুবর মাওলানা নোমান সালেহ। ফোনে আগেই সবকথা সেরে রেখেছিলাম। সালাম বিনিময়ের পর তাকে নিয়ে ইজতেমার মাঠে ঢুকে পড়লাম। চারপাশে কেমন নূরানি পরিবেশ ঝলমল করছে। কোথাও ঐশ্বর্যের ছাপ নেই , সারি সারি চটের সামিয়ানা টাঙানো পুরো মাঠজুড়ে। অথচ কি এক অপার্থিব জান্নাতি পরিবেশ! কোনও হাঙামা নেই। ইল্লাল্লাহুর জিকির ধ্বনিতে মুখরিত সারা ময়দান। লোকজন হাঁটতে চলতেও আল্লাহর নাম জপছে। কোথাও গোল হয়ে বসে আবার ঈমানী তালিম হচ্ছে। একধ্যানে শুনছে সবাই। নিজেকে শুদ্ধ করার এ এক আশ্চর্য প্রয়াস।

ইল্লাল্লাহুর জিকির ধ্বনিতে মুখরিত সারা ময়দান। লোকজন হাঁটতে চলতেও আল্লাহর নাম জপছে। কোথাও গোল হয়ে বসে আবার ঈমানী তালিম হচ্ছে

ইজতেমা বিষয়ে নিজেদের মধ্যে নানান কথা হচ্ছিল আমাদের। মিনিট বিশেক হেঁটে সামনে এগুতেই দেখা মিলল একজন বিদেশী ভাইয়ের। কথা বলার লোভ সামলাতে পারলাম না আর। সালাম মুসাফাহার পর নাম জানতে পারলাম।ডক্টর মুহাম্মদ রিযওয়ান। সেই সুদূর নরওয়ে থেকে এসেছেন। দ্বীনের জন্য এতোবড় কুরবানি! ভদ্রলোক পেশায় একজন ডাক্তার। একজন পুরোদস্তুর আধুনিক শিক্ষিত মানুষ।কিন্তু ঢোলা জুব্বা আর মুখ ভরা কাচা পাকা দাড়ীতে একজন বড় আলেমের মতই দেখতে। চেহারায় উজ্জ্বল নুরানী দীপ্তি। দু’মিনিট কথা বলতে চাইলে খুব আন্তরিক হয়েই সায় দিলেন। বাতচিত সব উর্দুতেই চলছিল।


আমরা আখেরী নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর ঈমান এনেছি। তার উম্মত আমরা। আর আল্লাহ তায়ালা এ উম্মতকে মানুষের হেদায়াতের জন্য নির্ধারণ করেছেন


ছোট্ট করে প্রশ্ন করলাম, কীসের টানে এলেন এতদূর থেকে? ঠোঁটে মৃদু হাসি টেনে স্পষ্ট কণ্ঠে উত্তর, আলহামদুলিল্লাহ! ভাই, আমরা দ্বীনের মেহনতের জন্য এখানে এসেছি। আমরা আখেরী নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর ঈমান এনেছি। তার উম্মত আমরা। আর আল্লাহ তায়ালা এ উম্মতকে মানুষের হেদায়াতের জন্য নির্ধারণ করেছেন। অতএব, যে কালেমা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ” পড়ে নিয়েছে চাই সে পুরুষ হোক বা মহিলা, আল্লাহ তার যিম্মায় কাজ দিয়ে দিয়েছেন।নিজে দ্বীনের উপর চলো, অন্যকে এ সত্য পথে দাওয়াত দাও। নবীওয়ালা কজের জিম্মাদারি । আর আমরা এ ফিকিরেই বাংলাদেশে এসেছি। যে করেই হোক পুরো দুনিয়ায় এ দাওয়াত প্রচার হয়ে যাক। কেননা হিন্দু, ঈসায়ী, ইহুদী তারা সকলেই আমাদের ভাই, তারা আল্লাহকে মাননে ওয়ালা হয়ে যেন জান্নাত পায়। এ জন্যই আসা।

বাঙালিদের সংস্পর্শে কেমন লাগছে? এবার জানতে চাইলাম। তিনি বললেন, আমরা সকলেই তো ভাই ভাই। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, মুমিন মুমিনের ভাই।আলহামদুলিল্লাহ বাঙালি ভাইদের সংস্পর্শে খুবই ভালো লাগছে।

এরপর মেহমানের শুকরিয়া আদায় করে জিজ্ঞেস করলাম।

আন্তর্জাতিক বিশ্বে এ ইজতেমা কি ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে? সোজাসুজি উত্তর।সারা দুনিয়া এটাই জানবে যে, দ্বীনের জন্য এ ইজতেমা। দ্বীন ভিন্ন আমাদের আর কোনও উদ্দেশ্য নেই এবং মুসলমানদের এ ধর্মীয় ঐক্য আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে অবশ্যই প্রভাব ফেলবে। ইসলামের প্রচার প্রসারে এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে ইনশাআল্লাহ।

শেষে জানতে চাইলাম, এখানে কোনও কষ্ট হচ্ছে নাতো! এবং এ ইজতেমা বিষয়ে আপনার কোনও মতামত আছে কি না?
মৃদু হেসে বললেন, কোনও কষ্ট হচ্ছেনা, আলহামদুলিল্লাহ। আমাদের খুব খেদমত করা হচ্ছে। অনেক সুন্দর গোছানো ইন্তেজাম।আমরা ইমপ্রেসড। লাখ লাখ মানুষেরর এ ব্যবস্থা আল্লাহর রহমতেই হচ্ছে। আল্লাহ এ দেশের মঙল করবেন ইনশাল্লাহ।

হাঁটতে হাঁটতে গল্প করছিলাম। উনি প্রায় ছ’বছর ধরে নিয়মিত আসেন ইজতেমায়। পূর্ণ সুন্নতি লেবাসে তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে তিনি কলেজের স্টুডেন্ট

জাযাকাল্লাহ বলে সালাম মোসাফাহা করে বিদায় নিলাম। আসরের আযান হচ্ছে মাঠে। মুসল্লিরা সকলে ব্যস্ত যার যার কাজে। একটু সামনে এগুতেই সাক্ষাৎ হলো কল্যাণপুর থেকে আসা ইন্টারমিডিয়েটের ছাত্র আল-আমিনের সাথে। হাঁটতে হাঁটতে গল্প করছিলাম। উনি প্রায় ছ’বছর ধরে নিয়মিত আসেন ইজতেমায়। পূর্ণ সুন্নতি লেবাসে তাকে দেখে বোঝার উপায় নেই যে তিনি কলেজের স্টুডেন্ট। বললেন তাবলীগের ছোঁয়ায়ই তার এ পরিবর্তন। নিজ মহল্লা ও শিক্ষাঙ্গনেও তাবলীগের দাওয়াত দেন তিনি। কথায় কথায় জিজ্ঞেস করলাম,তার ইজতেমায় অংশগ্রহণের অনুভূতি কী?

– আলহামদুলিল্লাহ খুব ভালো। নিজের ভেতরকে শুদ্ধ পবিত্র করার জন্যই দ্বীনের এ মেহনতে আসা এবং এর সঙ্গে লেগে থাকার চেষ্টা করি সবসময়। বিশ্ব ইজতেমায় অংশগ্রহণও এ লক্ষ্যেই। তবে বিগত বছরগুলোর তুলনায় এবার জনসমাগম কিছুটা কম মনে হচ্ছে।

কেন? প্রশ্ন করতেই তিনি মুখ ভার করে উত্তর দিলেন, হতে পারে আমাদের ভেতরের যে অন্তর্ন্দ্বন্দ্ব সাধারণ মানুষ এবং বিভিন্ন মহলে এটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া ছড়িয়েছে। আল্লাহ আমাদের মাফ করুণ।

একজন জেনারেল শিক্ষিত হয়ে আপনি দ্বীনের পথে এসেছেন, তাবলীগের ভেতরকার এ সমস্যাকে আপনি কোন দৃষ্টিতে দেখেন?

-আল্লাহ হেফাযত করুন। এ ব্যাপারে আমি আর কিইবা বলবো। তবে দোয়া করি খুব শিগগিরই যেন সবকিছু সমাধান হয়ে যায়। আমাদের ভেতরের সমস্যা আমাদেরই মিটিয়ে ফেলা উচিৎ। কারণ আমরা বাইরের মহলে থাকি এবং দেখি সাধারণ শিক্ষিত সমাজে তাবলীগের মত মহান দ্বীনি খেদমতের ব্যাপারে নানান ধরনের কথা হচ্ছে। আল্লাহ সকলকে হেদায়েত নসিব করুণ।

শেষবধি জাযাকাল্লাহ বলে আমরা বিদায় নিলাম।

ময়দানের ভেতর আসরের নামায আদায় করে যখন গাড়ীতে উঠছি। তখনও কানে ভেসে আসছে,
“আয় আল্লাহ তু হাম পর রাযী হো যা। হাম তেরী হি কি লিয়ে আয়া হো। তু হামারে ইস মেহনত কো কবুল ফরমা।

লেখক : শিক্ষার্থী, ইসলামি উচ্চতর গবেষণা বিভাগ, জামিআ ইকরা বাংলাদেশ
kawsarhusain1996@gmail.com

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com