শুক্রবার, ২৬ ফেব্রুয়ারী ২০২১, ০২:২৭ অপরাহ্ন

বাংলাদেশে জিহাদের শর‌ঈ বিধান : মুফতী আবদুস সালাম চাটগামী

বাংলাদেশে জিহাদের শর‌ঈ বিধান : মুফতী আবদুস সালাম চাটগামী

বাংলাদেশে জিহাদের শর‌ঈ বিধান : মুফতী আবদুস সালাম চাটগামী

জিহাদ হতে হবে সীরাতের নমূনায়

نحمده ونصلي على رسوله الكريم، أما بعد:
وَمَا كَانَ الْمُؤْمِنُونَ لِيَنْفِرُوا كَافَّةً فَلَوْلَا نَفَرَ مِنْ كُلِّ فِرْقَةٍ مِنْهُمْ طَائِفَةٌ لِيَتَفَقَّهُوا فِي الدِّينِ وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ إِذَا رَجَعُوا إِلَيْهِمْ لَعَلَّهُمْ يَحْذَرُونَ سورة التوبة:122)

তাফাক্কুহ ফিদদীন আপনাদের মূল লক্ষ্য!

আলোচ্য আয়াতটি সূরা তাওবার একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত। আল্লাহ তাআলা সূরা তাওবায় জিহাদ বিষয়ে এবং মুশরিক ও মুনাফিকদের ব্যাপারে অনেক বিধিবিধান বর্ণনা করেছেন। জিহাদ বিষয়ে কুরআনুল কারীমে অনেক আয়াত বর্ণিত হয়েছে। কোনো কোনো আয়াত দ্বারা বুঝা যায়, জিহাদে শরীক হওয়া সকল মুমিনের জন্য আবশ্যক। কারো জন্য জিহাদ থেকে বিরত থাকা জায়েয নেই।

আমি যে আয়াত পড়েছি, এর পূর্বের আয়াত দ্বারা এটাই বুঝে আসে। বিশেষকরে তাবুক যুদ্ধে যারা অংশগ্রহণ করেনি, তাদের মধ্যে কিছু তো মুনাফিক ছিল। আর কিছু একনিষ্ঠ মুমিনও ছিল। তাবুকে শরীক না হওয়ায় মুমনিদের সাজা পেতে হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে সাহাবায়ে কেরাম মনে করেছেন যে, জিহাদ থেকে বিরত থাকা কারো জন্যই বৈধ নয়। আল্লাহ তাআলা উক্ত আয়াত দ্বারা এ ধারণা দূর করেছেন যে, তোমরা যেমন ভেবেছো বিষয়টি তেমন নয়। আল্লাহ তাআলা আয়াতের প্রথম অংশে ইরশাদ করেন, “মুসলমানদের জন্য উচিত নয় যে, তারা সবাই জিহাদে বের হয়ে যাবে।” তাহলে তাদের কী করা উচিত? আয়াতের দ্বিতীয় অংশে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: “তাদের প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে কোনো একটি দল ফিকহ ফিদদীন অর্জন করার জন্য বের হয় না ?” আয়াতের প্রথম অংশে জিহাদের ব্যাপারে। সেখানে বলেছেন: সবাই যাতে বের না হয়। কোনো একটি দল বের হবে।

আয়াতের দ্বিতীয় অংশে দীন শেখার ব্যাপারে। সেখানেও বলেছেন: সবাই দীন শেখার জন্য বের হবে না। প্রত্যেক সম্প্রদায় থেকে একটি দল বের হবে।

তো এখানে দীনের ‍ুদুটি বিভাগের কথা উল্লেখ হয়েছে। প্রত্যেক বিভাগ অপরটির সাথে সম্পর্ক রাখে। সকল মানুষ এক কাজে লেগে গেলে দুনিয়ার নেযাম ঠিক থাকবে না। একটি বিল্ডিং তৈরী করার সময় কেউ ইট তৈরী করে। কেউ দেয়াল তৈরী করে। কেউ দরজা, জানালা তৈরী করে। সবাই একই কাজে লেগে যাওয়া মারাত্মক ভুল।

দীনের প্রত্যেক বিভাগে কাজ হওয়া চাই। দীনের প্রত্যেক বিভাগে কিছু কিছু লোক কাজ করবে। যাতে দীনের সকল বিভাগ জারি থাকে। এই তারতীব, এই কর্মবন্টন কুরআন-হাদীসে আল্লাহ তাআলা ও তার রাসূল নির্ধারণ করে দিয়েছেন।

তাফাক্কুহ ফিদদীন অনেক বড় বিষয়। কুরআন-হাদীস , ফিকহ ইত্যাদি সবকিছু দীনকে বোঝার জন্য, দীনের ইলম অর্জন করার জন্য। এটা আপনাদের বৈশিষষ্ট্য যে, আপনারা তাফাক্কুহ ফিদদীন অর্জণ করার জন্য বের হয়েছেন। এখানে সমবেত হয়েছেন। মাদরাসায় থাকা অবস্থায় তাফাক্কু ফিদদীনই আপনাদের মূল লক্ষ্য থাকবে। আয়াতের দাবি অনুযায়ী আপনারা দীনের ইলম ও আহকাম শিক্ষা করবেন। দীন শিক্ষাকে মূল লক্ষ্য বানাবেন।

জিহাদের বিধান পালনে ইতিদাল (মধ্যমপন্থা) জরুরি

আয়াতে জিহাদের বিধানের প্রতিও ইঙ্গিত করা হয়েছে। জিহাদ ফরযে কিফায়া। হাদীসে উল্লেখ হয়েছে:
الجهاد ماض إلى يوم القيامة
এক্ষেত্রে স্মরণ রাখতে হবে যে, জিহাদের জন্য বের হওয়া যেমন ফরযে কিফায়া; ইলমের জন্য বের হওয়াও ফরযে কিফায়া। কিফায়া পর্যায়ের জিহাদ ফরয হওয়ার পর যদি কেউ বের না হয়, তাহলে সবাই গুনাহগার হবে। আবার যদি সবাই বের হয়ে যায়, তাহলেও গুনাহগার হবে। কেননা, এতে দীনের অন্যান্য বিভাগ শূন্য হয়ে যাবে। বেকার হয়ে যাবে। কেউ বের না হওয়া যেমন অপরাধ, তেমনিভাবে কোনো বিভাগে কাজ হলো না, এটাও অপরাধ। ইতিদাল রক্ষা করা জরুরি।

দীনের সকল শাখায় কাজ হওয়া জরুরী। তাবলীগওয়ালারা যদি বলে, সবাইকেই বরে হতে হবে, তাহলে তা ইতিদাল পরিপন্থী হবে। এটা দীনের শিক্ষা নয়। বিষয়টা আপনাদের ভালো করে বুঝে নিতে হবে। কোনো বিধানের গুরুত্ব ও পর্যায় কতটুকু তা জানতে হবে। দীনের সকল শাখায় কাজ হওয়া চাই। এটা অতীব জরুরী। এটাই দীনের তাকাযা। দীনের দাবি।

ইতোমধ্যে আপনারা জানতে পেরেছেন, সফরে জিহাদ ফরযে কিফায়া। ইলমের জন্য বের হওয়াও ফরযে কিফায়া। উভয়ের আলাদা আলাদা শর্ত আছে। সফরে ইলমের আলাদা কিছু শর্ত রয়েছে। সফরে জিহাদেরও আলাদা কিছু শর্ত রয়েছে। আজ জিহাদের শর্তসমূহের ব্যাপারে কিছু সংক্ষিপ্ত আলোচনা করার ইচ্ছা করি।

শর্ত না বুঝে জযবা প্রদর্শন ঠিক নয়

আপনারা নাকি জিহাদওয়ালা। জযবাওয়ালা। আজকাল অধিকাংশ তালিবুল ইলমকে শেকায়েত করতে শোনা যায় যে, আমাদের আসাতিযায়ে কেরাম জিহাদের ফযীলতের ব্যাপারে, জিহাদে বের হওয়ার ব্যাপারে আলোচনা করেন না। কিন্তু এই শেকায়েত সহীহ নয়। বাস্তবসম্মত নয়। কেননা, জিহাদের আলোচনা কুরআনে আছে; হাদীসে আছে। কুরআন ও হাদীসের দরস চলছে; লেখনির মাধ্যমেও আলোচনা করছেন অনেকে। তবে কার্যত জিহাদ কখন আরম্ভ হবে তা শর্তনির্ভর। জিহাদ ফরয হওয়ার জন্য এবং জিহাদে বের হওয়ার জন্য কিছু শর্ত রয়েছে।

আসবাবে জিহাদ, জিহাদের উপযোগী স্থান, তরবিয়তপ্রাপ্ত জনশক্তি, আমীর নিযুক্তি, প্রতিরক্ষা শক্তি ও অস্ত্রসস্ত্র ইত্যাদি বিষয়গুলো জিহাদের অন্যতম শর্ত। এখানে বসে বসে বাবুল জিহাদের কিছু হাদীস পড়ে লাফালাফি করলে তো হবে না। এটা দীন নয়।

দেখুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তাআলা নবী বানিয়ে মানবতার মুক্তির দূত হিসেবে, শরীআতের বাস্তবায়নকারী হিসেবে পাঠিয়েছেন। দীর্ঘ তেরো বছর মক্কায় কাটিয়েছেন, যা ছিল দারুল হারব। এই দারুল হারবে তেরোটি বছর শত জুলুম-নির্যাতনের মাঝেও তালীম-তাবলীগের কাজ চালিয়ে গেছেন। প্রতিবাদ করেননি। গরম নয়, নরম কথা বলেছেন। পাথরের আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়েছেন। কিন্তু পাল্টা পাথর ছুঁড়েননি। সাহাবায়ে কেরাম কষ্ট সহ্য করেছেন। এতকিছুরও পরও আল্লাহ তাআলা ও তাঁর রাসূল জিহাদের হুকুম দেননি। মক্কায় কিছুসংখ্যক লোক মুসলমান হয়েছিলো। কিন্তু এ সংখ্যা কাফেরদের তুলনায় কিছুই ছিলো না। এমতাবস্থায় যদি লড়াই হতো, তবে খুব সহজেই কাফেররা মুসলমানদের নিঃশ্বেষ করে দিতো। আল্লাহ তাআলার ইচ্ছা তো দীনকে যিন্দা করা। কিয়ামত পর্যন্ত দীনকে প্রতিষ্ঠিত রাখা।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং সাহাবায়ে কেরাম যখন মেহনত করলেন এবং যতটুকু কাজ হওয়ার ততটুকু হলো, তখন আল্লাহ তাআলা হুকুম দিলেন, আপনি আর এখানে অবস্থান করবেন না। এখানে থাকলে কেবল কষ্টই পেতে হবে। এরা দীন কবুল করবে না। মদিনায় হিজরত করুন; যেখানে আপনি আযাদির সাথে দীন প্রচার করতে পারবেন। তখন একদা বারোজন মদীনাবাসী রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে ইসলাম গ্রহণ করেন। দ্বিতীয় দফায় আশিজন ইসলাম গ্রহণ করেন। মদিনায় ইসলাম গ্রহণ করেন। মদিনায় ইসলাম গ্রহণে আগ্রহী আরও অনেকে ছিলেন। তাদের বাসনা ছিলো: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যেন মদীনায় চলে আসেন। তারা তাঁকে সর্বদিক দিয়ে সযোগিতা করবেন।

হিজরতের বিধান জারি হওয়ার পর কত কষ্ট করে সাহাবায়ে কেরাম হিজরত করেছেন। কত ভয়াবহ পরিস্থিতির সম্মুখীন তারা হয়েছেন। মক্কার মুশরিকরা সাহাবায়ে কেরামকে আপন জন্মভূমি থেকে বিতাড়িত করে রিক্তহস্ত করেছে।

মদিনার আনসারী সাহাবায়ে কেরাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে কেমন বিরল সহযোগিতা করেছিলেন ইতিহাস তার সাক্ষী! রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ভ্রাতৃত্বের বন্ধন সৃষ্টি করলেন। প্রত্যেক মুহাজিরকে একেকজন আনসারী সাহাবীর সাথে জুড়িয়ে দিলেন। ঠিক যেমন সম্পর্ক দুই সহোদরের মাঝে হয়ে থাকে।

আনসারী সাহাবায়ে কেরাম ঈমানকে হৃদয়ে স্থান দিয়েছেন। মুহাজির মুমিনদের থাকার জায়গা দিয়েছেন। জমিন দিয়েছেন। ব্যবসার জন্য অর্থকড়ি দিছেন। মদিনার আনসার সাহাবায়ে কেরাম মুহাজির ভাইদের বলেছেন, আমাদের ঘরে আপনাদের অংশ রয়েছে।

আমাদের জমিনে আপনাদের অংশ রয়েছে। বাগানেও আপনাদের অংশ রয়েছে। কিন্তু মুহাজির সাহাবায়ে কেরাম বলেছেন, থাকার জন্য জায়গা দেয়া এতটুকুই আমাদের জন্য যথেষ্ট। আমরা ততদিন আপনাদের ঘরে থাকবো, যতদিন নিজেরা থাকার ঘরের ব্যবস্থা করতে পারবো না।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় তাশরীফ আনলেন। মদীনাবাসীরা জায়গা দিলেন। সেখানে মুশরিক, আহলে কিতাব, ইহুদী, নাসারা ছিলো। মক্কা থেকে গিয়ে মুসলমানদের একটি জামাত সেখানে আশ্রয় নিলো। জায়গা পাওয়ার পর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সেখানে মসজিদ নির্মাণ করলেন। মাদরাসা কায়েম করলেন। দীন শিক্ষা দেয়ার কাজ শুরু করলেন। রাসূল মসজিদে নববী ছাড়া আরও ষোলটি মসজিদ নির্মাণ করেছেন। আযাদি অর্জন হলো। মসজিদ নির্মাণের আযাদি। দীনের শিক্ষা প্রচার-প্রসারের আযাদি। যে আযাদি মক্কায় ছিলো না, সেটা মদিনায় এসে অর্জন হলো। সাহাবায়ে কেরাম মসজিদে নববীতে এসে স্বাধীনভাবে দীনি শিক্ষা নিতে পারতেন এবং দিতে পারতেন। তালীম-তাবলীগের সূচনা হয়ে গেলো। মাদরাসার সূচনা হয়ে গেলো।

মদিনায় আসামাত্রই জিহাদের হুকুম আসেনি। যখন সেখানে অবস্থান সুদৃঢ় হলো, তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাজির, আনসার, নতুন, পুরাতন সব সাহাবায়ে কেরামের আদমশুমারী করলেন।

লক্ষ করুন, কথাগুলো দেমাগে সংরক্ষণ করতে হবে। আমি জিহাদের শর্ত বর্ণনা করছি। ‘হাওয়াই’ কথা বলছি না। এ সব কথা কিতাবে আছে। জিহাদ বুঝতে হলে শর্তকে বুঝতে হবে। অন্যথায় জিহাদ বোঝা হবে না; বরং নিজের খাহেশাতকেই বোঝা হবে। শর্ত না বুঝে জযবা প্রদর্শন ঠিক নয়।

তো হালত যখন প্রতিকূল হয়, ভূখণ্ড যখন দারুল হারব হয়, অথবা দারুল হারবের মতো হয়, তখন আমাদেরকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সীরাতকেই অনুসরণ করতে হবে। গোড়া থেকে চিন্তা করতে হবে।

বাংলাদেশ সম্পর্কে বিভিন্নজন বিভিন্ন কথা বলেন। আমি বাংলাদেশকে দারুল হরব মনে করিনা। দলিলের বিচারে এ মতটিই রাজেহ।

সামগ্রিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তা অনুমিত। কারণ, সরকার এ কথা স্বীকার করে যে, আমাদের দেশ মুসলমানদের দেশ। এখানে ৯০% মানুষ মুসলমান। তারা ইসলামের দাবিদার। মুসলমান হওয়ার দাবী করে। তাদেরকে আমরা হরবি বলি না। কাফের তো বলি না। কাফের না হলে হরবি কিভাবে বলা যাবে?
বাংলাদেশের হুকুমত ইসলামী হুকুমত নয়। কিন্তু দারুল হরব নয়। কেননা এখানে মুসলমানরা ফারায়েজ ও বুনিয়াদি রোকনসমূহ স্বাধীনভাবে আদায় করতে পারে। নামায পড়তে পারে। যাকাত দিতে পারে। রোযা রাখতে পারে। হজ করতে পারে। মুআমালাত ও মুআশারা সংক্রান্ত যাবতীয় বিধিবিধান এখানে পালন করতে পারে।

আজ মুসলমানদের গাফলতের যিন্দেগি চলছে। নামায পড়তে পারে এমন কত শতাংশ মানুষ নামায পড়ে? যাকাত দিতে পারে এমন কতজন মানুষ যাকাত দেয়? ১০ হাজার মানুষের সংকুলান হয় এমন মসজিদে কতজন মুসলমান হয়? না এসব ফরয আদায় করার পর যদি জি হা দের মাসআলা চলে আসে।

দুশমন, যদি আমাদের দিকে অস্ত্র উঠায়। আমরাও তাদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরবো। এটাকে বলে দিফায়ী জি হা দ। আর যদি দুশমন আমাদেরকে কোণঠাসা করে রাখে। কোন বিধান পালন করতে বাধা দেয়। তখন ইকদামী জি হা দ করতে হয়।

জি হা দ হতে হবে সীরাতের নমুনায়

দিফায়ী জি হা দ ও ইকদামী জি হা দ। ইসলামে উভয় জি হা দের বিধান রয়েছে। সাহাবায়ে কেরাম উভয় প্রকার জি হা দে শরিক হয়েছেন। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উভয় জি হা দ করেছেন। আমাদের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সীরাতে সব কিছুর নমুনা রয়েছে। কোরআন তো বলে দিয়েছে:

لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ
“তোমাদের জন্য রয়েছে রাসূলের মধ্যে উত্তম আদর্শ” (সূরা আহযাব-২১)

আমরা রাসুলের নমুনা অনুসরণ করবো, নাকি নিজেদের পক্ষ থেকে নমুনা আবিষ্কার করব? নমুনা আছে না নাই? যদি থাকে তাহলে ওই নমুনাকেই আমাদের অনুসরণ করতে হবে। কেউ ঘর বানাতে চাইলে এর জন্য নমুনা প্রয়োজন হয়। নমুনা কোত্থেকে মিলবে? রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য নমুনা। সেখান থেকেই আমাদেরকে নমুনা গ্রহণ করতে হবে।

ফরজ বিধানসমূহ আদায়ের নমুনা রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের গাযওয়াসমূহ আমাদের জন্য নমুনা। সকল কাজে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে শর্ত আরোপ করেছেন সেগুলো আমাদের জন্য নমুনা। নমুনা অনুসরণ করা ছাড়া আমরা যদি ময়দানে জি হা দের জন্য নেমে পড়ি, তাহলে এর ফলাফল কী দাঁড়াবে? ফলাফল ধ্বংস আর বরবাদিই হবে। যেদিকে তীর ছোড়ার নির্দেশ দিয়েছেন সেদিকেই ছুড়তে হবে। অন্যদিকে নয়।

মদিনাকে চিন্তা করুন, সেখানে প্রথমে মুসলমানদের উপযুক্ত জায়গা মিলল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নেতৃত্বে একটি ইসলামী ভূখণ্ড তৈরী হলো। এরপর তাদের সংখ্যা যখন হাজারে পৌঁছল। এতে খাঁটি মুসলমানদের পাশাপাশি কিছু মুনাফিক‌ও ছিল। বাহ্যিক গণনায় যখন হাজারে পৌঁছল এবং শক্তি সামর্থ্য অর্জন হল। তখন আল্লাহ তাআলা দ্বিতীয় হিজরীতে জি হা দের হুকুম দিলেন। আল্লাহ তা’আলা তো জানতেন, কখন জি হা দের হুকুম দেয়া হবে। কতজন মুসলমান দীনের জন্য মুজাহাদা করবে, কামিয়াবী কাদের হবে- এ সব আল্লাহ তাআলা আগে থেকেই জানতেন। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সব কাজ নেযাম অনুসারে করে থাকেন।

তো প্রথম বিষয় হল, একজন আমির থাকতে হবে। জি হা দ যেহেতু এককভাবে বা একা একা করার মত কোন আমল নয়; বরং ইজতেমায়ী আমল। সম্মিলিতভাবে করতে হয়। তাই আমির ছাড়া জি হা দের বিধান প্রযোজ্য নয়। একজন আমিরের ব্যাপারে সবাই একমত হতে হবে। আমীর দুই তিনজন হলে ঝগড়া বিবাদ সৃষ্টি হবে। ইকদামীর জন্য আমীর লাগবেই। নিয়মতান্ত্রিক দিফায়ী জি হা দের জন্যও আমীর আবশ্যক। অন্যথায় জি হা দ ফাসাদে পরিণত হয়ে যাবে।

আমিরের পাশাপাশি শুরার নেযাম থাকাও জরুরি। আমির মাশওয়ারা করে কাজ করবেন। আমির তো কেবল নিজের রায় দিয়ে কাজ করতে পারবে না। দুনিয়াবী কাজের তার তারতীব ও সুন্দর নেযামের জন্য মাশওয়ারা করা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। খুসূসী এবং উমূমী শুরা থাকতে হবে। শূরা জি হা দের জন্য গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। প্রথমে খুসূসী শূরায় ফায়সালা হবে। এরপর উমূমী শূরায় আলোচনা হবে।

দ্বিতীয়তঃ জি হা দের জন্য ভূখণ্ড হতে হবে। উপযুক্ত মাকাম থাকতে হবে। একটা নির্দিষ্ট ঠিকানা তো থাকতে হবে। যেখান থেকে জি হা দ পরিচালিত হবে। প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যাবে। আফরাদ থাকতে হবে। লক্ষ্য করতে হবে যে, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিরবিচ্ছিন্ন দাওয়াতের ফলে যখন কিছু মুখলিস মুসলমান তৈরি হলো, তখন আল্লাহ তাআলা জি হা দের হুকুম দিলেন: এবার তোমরা বের হও।

তৃতীয়তঃ হাতিয়ার ও সরঞ্জাম থাকতে হবে। শত্রুপক্ষের কাছে যে ধরনের অস্ত্র থাকে কম হলেও সেই ধরনের অস্ত্র মুসলমানদের সংগ্রহে থাকা চাই। জি হা দ ও ফাসাদের পার্থক্যটা বোঝা উচিত। হাতিয়ার নেই, জি হা দে নেমে গেলেন। এতে লাভ হবে না। বরং ফাসাদ তৈরি হবে। সাহায্য ও সফলতা তো আসবে আল্লাহর পক্ষ থেকে। আসবাব ও উপকরণ থেকে নয়। কিন্তু দুনিয়াবী উপকরণ গ্রহণ করা এটাও আল্লাহ তাআলার নির্দেশ। মুসলমানদের এলাকায় যে সমস্ত ইহুদি খ্রিস্টান ও অন্যান্য বিধর্মীরা বসবাস করে তাদের সাথেও মুআহাদা ও শান্তি চুক্তি করতে হবে। মদীনার ইহুদী-খ্রিস্টানদের সাথে যেমনটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম করেছিলেন। সম্ভব হলে পর্শী ও অন্যান্য রাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করবে। যাতে যুদ্ধ ও বৈরী পরিবেশ তৈরী হলে সহযোগিতায় এগিয়ে আসে।

শর্ত থাকলে জি হা দ অন্যথায় ফাসাদ

জি হা দের মৌলিক শর্তগুলো আমরা সংক্ষেপে দেখলাম। শর্তগুলো আমাদের বোঝা উচিৎ। শর্ত মেনে কাজ করলে তা জি হা দ হিসেবে গণ্য হবে। অন্যথায় ফাসাদ বলে বিবেচিত হবে।

কুরআনুল কারিমে জি হা দ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে। আর ফাসাদ থেকে বিরত থাকার হুকুম দেয়া হয়েছে। শর্তগুলোর সাথে আমাদের অবস্থা এবং আমাদের পরিস্থিতি মিলিয়ে দেখুন। বর্তমানে জি হা দ নিয়ে অতি উৎসাহী ও জযবাতীরা জি হা দের দিকে দাওয়াত দিচ্ছে, নাকি ফাসাদের দিকে তা সহজেই বুঝে আসবে।

আমাদের এখানে জায়গা (state) প্রস্তুত নেই। কোনো এলাকাকে জি হা দের জন্য নির্ধারণ করলে দ্বিতীয় দিন সেটা হাতছাড়া হয়ে যাবে। তরবিয়তপ্রাপ্ত সদস্য নেই। আমরা নিজেরা প্রস্তুত করিনি।
আমাদের আকাবিরের যামানায় আলেম-ওলামার সংখ্যা ছিল কম। কিন্তু তাদের মুরিদ অনুসারী থাকত বেশুমার। আর আমাদের যামানায় পুরোপুরি এর বিপরীত। পীর-মাশায়েখ অনেক। কিন্তু নিবেদিতপ্রাণ তাবেদার কম। সাহাবায়ে কেরাম রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ছোট থেকে ছোট কোনো কথারও বিরোধিতা করতেন না। এরকম সদস্য আমাদের কাছে নেই। আমরা তৈরি করতে পারিনি।

জায়গা নেই। তরবিয়তপ্রাপ্ত সদস্য নেই। আমিরও নেই। যেটা জি হা দের প্রথম শর্ত। আমির তো খলিফার স্থলাভিষিক্ত হয়। খলিফা নবীর স্থলাভিষিক্ত হয়। আর নবী আল্লাহ তাআলার স্থলাভিষিক্ত হয়। আল্লাহ তাআলার সাহায্য তো এভাবে আসে। আমির নেই। তাহলে আল্লাহ তাআলার সাহায্য আসবে কিভাবে?

আল্লাহ তাআলার নুসরত প্রত্যেক মুসলমানের সাথে রয়েছে। এটি ব্যক্তিগত পর্যায়ের। কিন্তু এভাবে সাহায্য আসে আমিরের মাধ্যমে। হিন্দুস্তানে বিচ্ছিন্নভাবে জি হা দ হচ্ছে; কিন্তু সেখানে তারা বিভিন্ন দলে বিভক্ত। প্রত্যেক দলের পৃথক পৃথক আমির রয়েছে। প্রত্যেক আমিরের নির্দেশে প্রত্যেক দল যার যার চিন্তা অনুযায়ী কাজ করছে। এটা সহীহ নেযাম নয়। তাই সেখানে কামিয়াবি আসছে না। একই কারণে কাশ্মীরের জি হা দেও কামিয়াবি আসছেনা।

আফগানিস্তানের মুজাহিদরা সফল হয়েছে। কারণ তারা এক আমিরের নেতৃত্বে জি হা দ করেছে। তাদের কাছে তরবিয়তপ্রাপ্ত জনশক্তি রয়েছে। সম্পদ রয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় হলো: দেশটি দীর্ঘদিন যাবৎ যুদ্ধকবলিত হওয়া সত্ত্বেও কোন দেশের কাছে ঋণী নয়। বরং ব্রিটেন-আমেরিকা তার কাছে ঋণী।

আল্লাহ তাআলা এ জাতিকে এমন কিছু দান করেছেন যার কারণে এত যুদ্ধবিগ্রহের পর বিক্ষুব্ধ সকল দুর্যোগ মোকাবেলা করে এখনো নিজেদের স্বকীয়তা বজায় রেখে মাথা উঁচু করে বিশ্ববাসীর মাঝে টিকে আছে। তারা অল্পে তুষ্টির জাতি। কম খেতে অভ্যস্ত। দুটি রুটি, ডাল বা অন্য কিছু মিলে গেল তা খেয়েই তারা জীবন চালিয়ে নিতে পারে।

আমাদের অবস্থার কথা কী বলব! খাবারের দস্তরখানে ১০ রকমের তরকারি লাগবে। গোশত লাগবে, মাছ লাগবে, আরও কত কী? এ রকম আয়েশী জাতি কিভাবে জি হা দ করবে; যাদের না আছে মুনাসিব জায়গা, না আছে আমীর, না আছে শুরা, না আছে যোগ্য সৈনিক, না আছে অস্ত্র, না আছে সম্পদ! কিছুই নেই। শুধু লাফালাফি করার দ্বারা কী হবে ভাই!

আপনাদের দায়িত্ব ও করণীয়

জযবাতি আন্দাযে লাফালাফি করার দ্বারা ক্ষতি হয়। এ ধরনের কাজ ও চিন্তার পেছনে আপনারা দৌড়াবেন না। আপনা আপনা জিম্মাদারী পালন করুন। আল্লাহ তাআলা দুটি কথা বলেছেন:
ليتفقهوا في الدين
অর্জন করুক। এটা এখন আপনাদের মূল কাজ।

তাফাক্কুহ ফিদ্দীন অর্জন করার পর আপনাদের কাজ কি হবে তাও উপর্যুক্ত আয়াতে বর্ণিত হয়েছে। আয়াতে চাকরি করার জন্য বলা হয়নি। পদ-পদবী অর্জন করার কথা বলা হয়নি। বিদেশ যাওয়ার জন্য বলা হয়নি। তাফাক্কুহ ফিদদীন অর্জন করার পর দীনের আহকাম শেখার পর প্রথম কাজ হলো নিজে সে মোতাবেক আমল করবে।

দ্বিতীয় কাজ হলো: وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ
অর্থাৎ নিজে সে মোতাবেক আমল করার পর দীনের যা কিছু শিখেছে লোকদেরকে তা শেখাবে। তাদের কাছে দীন পৌছিয়ে দিবে। একই হুকুম মুজাহিদদের ক্ষেত্রেও অর্থাৎ জি হা দ করার জন্য কিছু লোক বের হবে; সবাই নয়। সফরে জি হা দ থেকে ফেরার পর এই সফরে যা কিছু দেখেছে, যা কিছু শিখেছে তা লোকদেরকে বলবে। শিখাবে। তো মুজাহিদেরও দুটি কাজ:

জি হা দে বের হওয়া এবং ফিরে এসে স্বজাতিকে যা শিক্ষা অর্জন করেছে তা শিখাবে। وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ এর সম্পর্ক তালিবুল ইলম ও মুজাহিদ উভয়ের সাথে। অল্প কথায় তাআলা অনেক কিছু শিক্ষা দিয়েছেন। لعلهم يحذرون অর্থাৎ তালিবুল ইলম যখন ইলম শিখে জাতির কাছে গিয়ে দ্বীনের তাবলিগ করবে। দীনের আহকাম শিখাবে, তখন তাদের মধ্যে খোদাভীতি সৃষ্টি হবে। ইলম শিখার জযবা, দ্বীনের ওপর চলার জযবা তৈরি হবে। আর মুজাহিদ যখন ফিরে আসবে এবং যা দেখেছে, শিখেছে এবং করেছে তা বর্ণনা করবে। তখন মানুষের মাঝে জি হা দের জযবা তৈরি হবে। প্রয়োজনের সময় জি হা দের দিকে অগ্রসর হবে। আল্লাহ তাআলার নাফরমানি থেকে বাঁচবে। গোমরাহী থেকে বাঁচবে। এটা আয়াতের সারসংক্ষেপ। এতক্ষণ আমি আপনাদের সামনে বললাম।

তাই আপনা জায়গায় গিয়ে وَلِيُنْذِرُوا قَوْمَهُمْ এর উপর আমল করুন। আপনারা নিজ এলাকায় গিয়ে মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করুন। ১০-২০ জন লোক তৈরি করুন। দুই হাজার তালিবুল ইলম ফারেগ হয়ে প্রত্যেকে ১০ জন করে লোক তৈরি করলে কত হাজার হবে? এভাবে কাজ করুন এবং লোক তৈরি করুন। আপনি তো কিছুই করছেন না। এখন তো আপনার পেছনে পাঁচজন লোকও পাবেন না।
আমাদের আখলাক ঠিক নেই। আমাদের আমল ঠিক নেই। সব গলত। ফারেগ হওয়ার পর নিজ নিজ কর্মস্থলে নিজেকে এমনভাবে উপস্থাপন করুন যাতে মানুষ বলতে বাধ্য হয় যে, অমুক হুজুর যা কিছু বলে সহীহ বলে। তার আকীদা সহীহ। তার আমল সহীহ। তার চলাফেরা ও যাবতীয় কর্মকাণ্ড নির্ভেজাল। তাকে অনুসরণ করা যায়। কেনই বা তাকে আমরা মানবো না।

এলাকাবাসী তার কাছে আসবে। দীন শিখবে। একে অন্যকে তার কাছে এসে দ্বীন শেখার জন্য দাওয়াত দিবে। এসব কখন হবে? যখন ধীরে ধীরে মেহনত করতে থাকবে। তখন লোকজন তৈরি হবে। এখন তো এমন কোন জায়গা নেই যেখানে দুইজন লোক আপনার সঙ্গ দেবে। দু-চারজন লোক হয়তো সঙ্গ দিবে। যতক্ষণ পর্যন্ত সরকার অ্যাকশন নিবে না। কিন্তু যখন ধরপাকড় শুরু করবে, তখন সব পালাবে। তো আখের এতে ফায়দা কী?

আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার উপর জিম্মাদারী রয়েছে তা পালন করুন। মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করুন। মাদরাসা থাকলে সেখানে দিনের তালিম দিতে থাকুন। না থাকলে মক্তবের ব্যবস্থা করুন। লোকদেরকে মসজিদমুখি করুন। সুন্নতের অনুসারী বানান। সুযোগমতো দিনের সকল বিধান প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করুন।

খুবই সংক্ষেপে আলোচনা করলাম। এরপরও যদি প্রশ্ন থাকে, আমার কাছে গিয়ে বলবেন। আর যদি প্রশ্ন হল হয়ে যায়। তাহলে নিজের কাজে মনোযোগ নিবদ্ধ করুন। অযথা জেহেনকে বিক্ষিপ্ত করবেন না। নিজের আকিদা ও আমল বরবাদ করবেন না। মেহনত করুন। এর উপর আমল করুন।

× লেখাটা হাটহাজারী মাদ্রাসার মুখপত্র মাসিক মুঈনুল ইসলামের ফেব্রুয়ারি সংখ্যায় প্রকাশিত

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com