মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ১১:২৮ পূর্বাহ্ন

বঙ্গবন্ধুর খুনি নূর চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

বঙ্গবন্ধুর খুনি নূর চৌধুরীর সাক্ষাৎকার

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০১১, সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে সিবিসি রেডিওর দ্য কারেন্ট বিভাগের প্রধানকে এক সাক্ষাৎকারে দেন নূর চৌধুরী। ।
তার এক সপ্তাহ আগে সিবিসির টরন্টো স্টুডিওতে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করা হলেও নানা কারণে সেটা প্রচার হতে দেরি হয়। আর পলাতক জীবনে নূর চৌধুরী এই প্রথম মিডিয়ার মুখোমুখি হলো। পরে স্থানীয় দৈনিক টরন্টো স্টারের রিপোর্টার অমিয় দেমসে ও অমনি টিভির মিটু ঘোসলা নূর চৌধুরীর টরন্টোর অ্যাপার্টমেন্টে হাজির হয়েছিলেন। কিন্তু মুখ খোলেনি নূর। সিবিসি রেডিওতে প্রচারিত সাক্ষাৎকারের নির্বাচিত অংশ শীলনবাংলার পাঠকদের জন্য তুলে দেওয়া হলো-

সিবিসি : আপনি বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা এবং তার পুরো পরিবারকে তছনছ করে দেওয়ার কারণে একজন দাগি আসামি। আপনি কানাডায় খুব অনায়াসে বসবাস করছেন এবং কানাডা সরকারের সাহায্য চেয়েছেন। আপনি কেন কানাডিয়ান সরকারের সাহায্য আশা করছেন?
নূর : হ্যাঁ, আমি কানাডিয়ান সরকারের কাছে সাহায্য চেয়েছি। কারণ আমি নির্দোষ। আমি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করিনি। আর সেজন্য আমি আজ এখানে। আমাকে আসামি করা হয়েছে। কিন্তু আমি নির্দোষ। তাই আমি কানাডা সরকারের সাহায্য চেয়েছি।

সিবিসি : আপনি আরো ১১ জনের সঙ্গে এ হত্যা মামলায় আদালত কর্তৃক দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। যারা সাক্ষী দিয়েছেন তারা বলেছেন, হত্যার সময় আপনি শুধু সেখানে ছিলেনই না বরং আপনিই গুলিটি করেছেন, যে গুলিতে প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিব নিহত হয়েছেন।

নূর : না, এটা সত্যি নয়। আমি সেখানে ছিলাম না। আমি অন্য কোথাও ছিলাম। অনেকেই এটি জানে। কিন্তু তারা সামনে আসতে ভয় পাচ্ছে। তারা মুখ খুলছে না।

সিবিসি : তাহলে কেন আপনার দিকে আঙুল তোলা হচ্ছে?
নূর : কারণ আমি এ হত্যা মানে ক্যুকে সমর্থন করেছিলাম। পরে আমি জেনারেল ওসমানী ও প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান কর্তৃক সম্মানিত হয়েছিলাম। আর আমার ইউনিট সে সময় বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাতে ছিল।

সিবিসি : ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের দিন সকালে যখন প্রেসিডেন্টকে হত্যা করা হলো তখন আপনি কোথায় ছিলেন?
নূর : আমি তো বলেছি, আমি সেখানে ছিলাম না। আমার কিছু আত্মীয়ের সঙ্গে অন্য কোথাও ছিলাম, অন্য কিছু করছিলাম।

সিবিসি : আপনি কী করছিলেন?
নূর : তাদের নিরাপত্তার কথা ভেবে আমি আপনাকে অনুরোধ করছি এ বিষয়টি নিয়ে আমার সঙ্গে আলোচনা না করার জন্য। আমি আত্নীয়দের সঙ্গে সময় কাটাচ্ছিলাম, আমি তাদের সঙ্গে একটা কাজ করছিলাম।

সিবিসি : আপনার ডিপোর্টেশন রিমুভাল ফাইলে আমি দেখলাম, আপনি বলেছেন ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট আপনি টি-শার্ট বানাচ্ছিলেন। আসলেই?
নূর : এটি সত্যি।

সিবিসি : বিষয়টি লুকানোর কী কারণ?
নূর : আসলে, এ ব্যাপারটিতে বিস্তারিত অনেক কিছু বের হয়ে আসে। আমি চাইনি এটা প্রকাশ হোক। যখন আমি রিফ্যুজি বোর্ডের কাছে রাজনৈতিক আশ্রয় চেয়েছি তখন আমি চেয়েছি আমার এবং আমার সাক্ষীদের জীবনের নিরাপত্তার কারণে এটি একেবারেই গোপন থাকবে।

সিবিসি : আপনি আরো বলেছেন শেখ মুজিবের মৃত্যুর পর একটা শোভাযাত্রা বের হয়েছিল, সেটার জন্যই আপনি টি-শার্ট বানিয়েছিলেন। তাই কি?
নূর : এটি সত্যি।

সিবিসি : মিস্টার নূর! বিষয়টি ফানি নয় কি! ভোর ৫টায় আপনি টি-শার্ট বানাচ্ছিলেন, ঠিক যখন হত্যাকাণ্ডটি ঘটেছিল?
নূর : না না কাজটা শুরু হয়েছিল সন্ধ্যায় এবং ভোররাত পর্যন্ত চলেছিল।

সিবিসি : তাহলে, আপনি বলছেন যে, আপনি সে সময় টি-শার্ট বানাচ্ছিলেন?
নূর : জি, এটি সত্যি।

সিবিসি : আদালত কর্তৃক আপনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন। যেটি ছিল সঠিক এবং আনবায়সড- অ্যামেনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল এমনই বলেছে।
নূর : তারা হয়তো সেটা মনে করে, কিন্তু আমি আসলে জানি না তারা মামলাটির কত গভীরে গিয়েছিল। আমি যতটুকু জেনেছি, সাক্ষী এবং যারা দোষী সাব্যস্ত হয়েছে তাদের কথার ভিত্তিতে এটি হয়েছে, এবং তাদের ওপর অনেক অত্যাচার চালানো হয়েছিল। আমি জানি যে, এই বিচারে প্রচুর রাজনৈতিক প্রভাব এবং উৎসাহ ছিল, যেটা লজ্জাজনক।

সিবিসি : আপনি যদি মনে করেছিলেন সেটি সঠিক হয়নি, তাহলে আপনি কেন সেটার মুখোমুখি হননি।
নূর : আমি বাংলাদেশের বিচার-পদ্ধতিকে বিশ্বাস করি না। বাংলাদেশে রায় কেনাবেচা হয়।

সিবিসি : ১৯৭৫ সালে আপনার বয়স ছিল ২৪, এটি সত্যি? এবং মিলিটারি ছেড়ে দেন?
নূর : হ্যাঁ। সত্যি। আমি সিভিলিয়ান ছিলাম এবং ব্যবসা করতাম।

সিবিসি : কিসের ব্যবসা করতেন?
নূর : আমি আমদানি-রপ্তানির ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ছিলাম।

সিবিসি : ১৯৭৫ সালে ক্যু হবার পরপরই তখনকার নতুন প্রেসিডেন্ট আপনাকে এবং অন্য আরো যারা এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিল, সবাইকে ডিপ্লোম্যাট পোস্টিং দেন।
নূর : না, ঠিক হত্যার পরপরই নয়, এটি সম্পূর্ণ ভুল কথা। হত্যাকাণ্ডের অনেক পরে।

সিবিসি : কখন? কোন বছর?
নূর : এটি ১৯৭৫ অথবা ১৯৭৬ সালের শেষের দিকে।

সিবিসি : ক্যু হয়েছে ১৯৭৫ সালে, তার মানে এটি পরের বছর?
নূর : হ্যাঁ। পরের বছর।

সিবিসি : কোথায় ছিল ডিপ্লোম্যাট পোস্টিং এবং কী পদে ছিল?
নূর : আমি ইরানের এম্বাসিতে সেকেন্ড সেক্রেটারি হিসেবে যাই।

সিবিসি : আপনার বয়স ছিল ২৫, আপনি মিলিটারিতে ছিলেন, পরে ব্যবসা করতেন এবং আপনাকে সেকেন্ড সেক্রেটারি হিসেবে পাঠানো হয়? কীভাবে?
নূর : এটি খুবই স্বাভাবিক। বাংলাদেশ এম্বাসির বেশিরভাগ সেক্রেটারি ছিল ওই বয়সেরই।

সিবিসি : বলা হয়েছে যে, হত্যাকাণ্ডের পর নতুন যে নেতা ক্ষমতায় গিয়েছিল, তিনি আপনাকে বিচার থেকে রক্ষা করার পুরস্কার হিসেবে দেশের বাইরে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন, এ বাপারে আপনি কী বলবেন?
নূর : আমি নিশ্চিত জানি যে এটি আমার জন্য কোনো পুরস্কার ছিল না। কারণ অনেক লোক যাদের বয়স আমার চেয়ে কম, তাদের আমার চেয়েও উঁচু পদে পাঠানো হয়েছে। আমি অবসর নেওয়ার আগে মিলিটারিতে যে পদে ছিলাম এবং সেখান থেকেই সিভিলিয়ান হই।

সিবিসি : পদটি কী ছিল?
নূর : মেজর।

সিবিসি : হত্যাকাণ্ডের পরেই নতুন নেতা খন্দকার মুশতাক আহমদ একটি আইন পাস করেছিলেন যার মাধ্যমে আপনাকে এবং অন্যদের ইনডেমনিটি দিয়েছিলেন। সেখানে এটিও বলা হয়েছিল যে, আপনি হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত এবং আপনার নিরাপত্তা দরকার। আপনাকে ইনডেমনিটি দেওয়া হয়েছিল কেন?
নূর : দেখুন! প্রেসিডেন্টই এর উত্তর দিতে পারবে। আসলে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরবর্তী সব কর্মকাণ্ডকেই ইনডেমনিটির আওতায় নিয়ে আসা হয়।

সিবিসি : আপনাকে কেন ইনডেমনিটি দেওয়া হয়েছিল?
নূর : আমি ইনডেমনিটি পাইনি। আইনটিতে বলা হয়েছে যে, নতুন সরকার পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত ওই দিনের সকল কর্মকাণ্ডই ইনডেমনিটির আওতায় পড়বে।

সিবিসি : কোন কর্মকাণ্ডগুলো অন্তর্ভুক্ত ছিল?
নূর : ওই যে…যারা ওইদিনের ক্যুতে অংশ নিয়েছিলেন। আমি তো হত্যাকাণ্ডের সাথে সরাসরি জড়িতই ছিলাম না।

সিবিসি : আপনি একজন ডিপ্লোম্যাট ছিলেন। আপনি কানাডায় কেন এসেছেন?
নূর : আসলে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসেন এবং তিনি আমাকে দেশে ফিরতে আদেশ দেন। আমি মনে করেছি, আমার অন্য কোথাও যাওয়া উচিত। পরিস্থিতি কী হয় সেটা দেখে তারপর সিদ্ধান্ত নেবার কথা ভেবেছিলাম।

সিবিসি : এর অর্থ কী? যাকে হত্যা করা হয়েছে তাঁর মেয়ে ক্ষমতায়, তিনি তো তার পিতৃহত্যার বিচার করবেনই। আর আপনি জানতেন যে আপনি একজন হত্যাকারী হিসেবে দোষী সাব্যস্ত হবেন?
নূর : না, এটা ঠিক নয়।

সিবিসি : এবং আপনি দেশে না গিয়ে কানাডায় চলে আসেন।
নূর : জি, আমি কানাডায় ভিজিটর হিসেবে চলে আসি পরিস্থিতি দেখার জন্য।

সিবিসি : আপনি কবে রেফিউজি স্ট্যাটাস চেয়েছিলেন?
নূর : এক বছর পর। কারণ আমি অপেক্ষা করেছিলাম। এবং এর মধ্যে আমি দেখেছি যে, কোনো কারণ ছাড়াই তারা বাংলাদেশের লোকদেরকে গ্রেফতার করা শুরু করেছে, যাদের তারা দোষী মনে করেছে। পাশাপাশি তারা আইন পরিবর্তন করেছে এবং তাদের ওপর দোষ আরোপ করা হয়েছে, যেভাবে তারা করতে চেয়েছে।

সিবিসি : ব্যাপারটা শুনে মনে হচ্ছে, আপনি তখন জানতেন যে আপনি দোষী কোনো কিছুর জন্য এবং একটি জায়গা খুঁজেছেন যাবার জন্য, এবং আপনি এখানে চলে আসেন। আপনি কি সন্দেহ করেছিলেন যে, তারা আইন পরিবর্তন করেছে এবং আপানাকে দোষী করা হবে?
নূর : আমি সন্দেহ করিনি। কিন্তু আমি সব সময়ই চিন্তা করেছি যে শেখ হাসিনা জানতেন এবং তিনি আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ তৈরি করবেন।

সিবিসি : তিনি তো চাইবেনই পিতার হত্যাকারীদের আইন ও বিচারের আওতায় নিয়ে আসতে। এটাই তো স্বাভাবিক। তাই নয় কি?
নূর : আমি এই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িত ছিলাম না। কিন্তু আমাকে দোষী সাব্যস্ত করছে।

সিবিসি : শেখ হাসিনা আগামী মাসে কানাডায় আসছেন। তিনি তো নিশ্চয়ই আপনাকে ফেরত নেবার চেষ্টা করবেন। আপনি কী বলবেন?
নূর : আমি বলব যে, আমি নির্দোষ। আমি কোনো হত্যাকারী নই। আমি আইনগতভাবে কানাডায় বসবাসের অধিকার রাখি। তাঁরা আমার বিরুদ্ধে যে দোষ আরোপ করেছেন সে ব্যাপারে আমার কিছু করার নেই। এটা সম্পুর্ণভাবে একটি ভ্রান্ত ধারণা। আমি কানাডার কাছ থেকে বিচার এবং নিরাপত্তা চেয়েছি। আমি ন্যায়বিচার-প্রত্যাশী। শেখ মুজিব যেভাবে স্বৈরাচারী কায়দায় দেশ পরিচালনা করেছেন, তার মেয়ে শেখ হাসিনা একইভাবে দেশ পরিচালনা করছেন। তাই বাংলাদেশে এখন আর ন্যায়বিচার আশা করা যায় না।

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com