রবিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৯, ০৯:১৫ অপরাহ্ন

ফেরকাবাজি শিরকের চেয়েও জঘন্য

ফেরকাবাজি শিরকের চেয়েও জঘন্য

ফেরকাবাজি শিরকের চেয়েও জঘন্য

তাওহীদের চেয়ে ইত্তিহাদ বেশি গুরুত্বপূর্ণ আর ফেরকাবাজি শিরকের চেয়েও জঘন্য

সগীর আহমদ চৌধুরী : আমাদের বাসার পার্শ্বস্ত প্রায় সবগুলো মসজিদই প্রচলিত সুন্নী চিন্তাধারার এবং স্থানীয়রাও সকলে বেরলবি মাসলাকের। একটি মসজিদের ইমাম সাহেব একটু কড়া এবং মুসল্লীরাও তাঁদের মাসলকে অত্যন্ত নিষ্ঠাবান। সেদিন আসরের নামায পড়েছি সেই মসজিদে। তাসবীহে ফাতিমী শেষ করেছি, সম্মিলিত মুনাজাত এখনো বাকি, আমি ওঠে যাচ্ছিলাম, সেই মুহূর্তে ইমাম সাহেব পবিত্র কুরআনের এ আয়াতটি তিলাওয়াত শুরু করেন,
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ يُصَلُّونَ عَلَى النَّبِيِّ يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا صَلُّوا عَلَيْهِ وَسَلِّمُوا تَسْلِيمًا (الأحزاب: 56)
অর্থাৎ “নিশ্চয় আল্লাহ ও তাঁর ফেরেশতাগণ নবীর ওপর দরুদ পেশ করেন, অতএব হে মুমিনগণ তোমরাও তাঁর ওপর দরুদ প্রেরণ কর এবং তাঁকে সালাম জ্ঞাপন কর।”

এখন আমি কি করি? আমিও তো মুমিন, ঈমান এনেছি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ওপর। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ নির্দেশ দিচ্ছেন তাঁর নবীর প্রতি দরুদ ও সালাম প্রেরণ করতে। সেই মুহূর্তে আল্লাহর এ নির্দেশ আমি কিভাবে এড়িয়ে যেতে পারি? আমি সাথে সাথে বসে পড়লাম, মুসল্লীদের সঙ্গে সমস্বরে আমি পড়তে শুরু করি,
صلاة يا رسول الله عليكم … سلام يا حبيب الله عليكم
অবশ্য সঙ্গে মাসনুন দরুদ শরীফও পড়েছি কয়েকবার। ঠিক বুঝতে পারিনি যে, ইমাম সাহেব পবিত্র কুরআনের এই আয়াত পড়ে আমার আবেগ-অনুভূতিকে কাজে লাগালেন কিনা! অর্থাৎ ইমোশনাল ব্লেক মেইল করলেন কিনা! সেই যা-ই হোক! কিন্তু প্রচলিত রীতি-রেওয়াজের বিরোধিতা করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় একেবারে অনুভূতিহীন হয়ে পড়ি। আল্লাহর নির্দেশ, প্রিয় নবীজির নাম ও তাঁর ওপর দরুদ শরীফের কথা শুনেও মুমিনের হৃদয় আবেগাপ্লুত না হয়ে কিভাবে পারে?

দ্বিতয়ত মুসল্লীদের অনেকেই আমার পরিচিত, ওঠক-বৈঠক হয় তাঁদের সাথে, তাঁদের দোকানে বজার-সদাই করি, হোটেলে খাই, তাঁদের বাড়িতে বসবাস করি। আমাকেও সম্মান-শ্রদ্ধা করেন, মাঝে-মধ্যে এলাকার ছেলেরা বিভিন্ন মাসআলা-মাসায়েলও জিজ্ঞাসা করেন, আমি যখন আন্দরকিল্লা শাহী জামে মসজিদের উত্তর গেইটে বিভিন্ন সমাবেশে বক্তব্য দেই এলাকার ছেলেরা অনেকে সেসব ধারণ করে পরে আমাকে শোনায়। ওয়াহাবী-সুন্নীর তফাৎ বলতে গেলে অনেকটা কমে গেছে সেখানে। এ অবস্থায় ইমাম সাহেবের উপর্যুক্ত কুরআন তিলাওয়াতের পর আমি একা মসজিদ থেকে বেরিয়ে যাওয়াটা ভালো দেখায় না!

এটা নবীজির প্রতি যেমন আবেগ-অনভূতিহীনতার প্রমাণ করে, একই সঙ্গে সামাজিক জীবনে এক ধরনের বিচ্ছিন্নতার তৈরি করে, অনৈক্য ও ফেরকাবাজির সৃষ্টি করে। আমি মনে করি, এসবের সংস্কারের প্রয়োজন, কিন্তু বিরোধিতা করে নয়। এমন বিরোধিতা মোটেও নয় যাতে সমাজে বিশৃঙ্খলার তৈরি হয়, মুসলমান ভাইয়ে ভাইয়ে হানাহানির পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি করে এমন সংস্কারের কোনো জরুরত নেই, এর চেয়ে বরং উম্মাহর ঐক্য, সংহতি ও ভ্রাতৃত্ব বজায় রাখাই বেশি জরুরি। আর এজন্যই হযরত মুসা (আ.)-এর অবর্তমানে বনি ইসরাইল গোবাচুরের পুজো শুরু করলেও হযরত হারুন (আ.) তাদেরকে নিবৃত্ত করেননি। রাগে-গোসসায় হযরত হারুন (আ.)-এর দাড়ি আর মাথার মুঠি ধরে হযরত মুসা (আ.) কৈফিয়ত তলব করেছিলেন, জবাবে হযরত হারুন (আ.) বললেন,
يَا ابْنَ أُمَّ لَا تَأْخُذْ بِلِحْيَتِي وَلَا بِرَأْسِي ۖ إِنِّي خَشِيتُ أَنْ تَقُولَ فَرَّقْتَ بَيْنَ بَنِي إِسْرَائِيلَ وَلَمْ تَرْقُبْ قَوْلِي [طه: 95]
অর্থাৎ “হে আমার মায়ের সন্তান!, আমার দাড়ি ও মাথার মুঠি ধরে টেনো না; আমি আশঙ্কা করেছি যে, তুমি বলবে, তুমি বনী ইসরাইলের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করেছ এবং আমার কথা স্মরণে রাখনি।”
উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি কতোটা গুরুত্বপূর্ণ এ আয়াত তারই তাৎপর্য বহন করে। প্রচলিত রীতি-রেওয়াজ কি জিনিস, খোদ আল্লাহর সাথে শিরকের মতো অমার্জনীয় অপরাধের বিরোধিতায়ও উম্মাহর ঐক্য ও সংহতির খেয়াল রাখতে হবে, এর প্রতি যত্নশীল হতে হবে।

হ্যাঁ! অবশ্যই প্রচলিত রীতি-রেওয়াজের একটা অ্যাকাডেমিক পর্যালোচনা থাকবে, সেটা হোক দারুল ইফতাগুলোয়, দরসে-তাদরীসের হালকায়, লেখালেখিতে, আহলে ইলম পর্যায়ে পরমতসহিষ্ণুতা, শান্তিপূর্ণ ও ঘরোয়া পরিবেশে বিতর্কে। সাধারণ পাবলিকের মাঝে বির্তক ছড়িয়ে দেওয়া, একদলকে অন্য দলের বিরোধিতায় লাগানো, পরস্পরকে গোমরা-কাফির আখ্যা দেওয়া এসব যারা করে এরা উম্মতের মুহসিন নয়, এরা ফেতনাবাজ, ফেরকাবাজ, উম্মাহর প্রতি দয়া-দরদ বলতে এদের হৃদয়ে কিছুই নেই। তাওহীদের প্রচার, বিশুদ্ধা আকীদা প্রসার এবং বিদআত বিরোধিতার নামে আজকাল যা হচ্ছে তার অধিকাংশই ফেরকাবাজি, এসবই উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি নষ্টের মূল।

লেখক : রাজনীতিক

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com