শুক্রবার, ০৭ অগাস্ট ২০২০, ০৬:২৩ অপরাহ্ন

প্রত্যাশা পূরণের কৌশল শুদ্ধাচার

প্রত্যাশা পূরণের কৌশল শুদ্ধাচার

প্রত্যাশা পূরণের কৌশল শুদ্ধাচার

মো. রমজান আলী :: বাংলাদেশ একটি উদীয়মান, প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক, উন্নয়নশীল রাষ্ট্র। জন্মলগ্ন থেকে বাংলাদেশ তার জনগণের কল্যাণ প্রতিষ্ঠায় নিবেদিত। স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে জনগণের সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার নিশ্চিতকরণের কথা বলা হয়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠায় দুর্নীতি দমন ও শুদ্ধাচার প্রতিপালন অপরিহার্য। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ২৫ ডিসেম্বর, ১৯৭৪ সালে এক ভাষণে উল্লেখ করেন-‘সুখী ও সমৃদ্ধশালী দেশ গড়তে হলে দেশবাসীকে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়াতে হবে। কিন্তু একটি কথা ভুলে গেলে চলবে না, চরিত্রের পরিবর্তন না হলে এই অভাগা দেশের ভাগ্য ফেরানো যাবে কিনা সন্দেহ। স্বজনপ্রীতি, দুর্নীতি ও আত্মপ্রবঞ্চনার ঊর্ধ্বে থেকে আমাদের সকলকে আত্মসমালোচনা, আত্মসংযম ও আত্মশুদ্ধি করতে হবে।’

শুদ্ধাচারের ধারণাটি সুশাসনের (Good Governance) ধারণা থেকে উদগত। শুদ্ধাচার সুশাসনের পূর্ব শর্ত। এরা একে অপরের পরিপূরকও বটে। শুদ্ধাচার বলতে সাধারণভাবে নৈতিকতা ও সততা দ্বারা প্রভাবিত আচরণগত উৎকর্ষ বোঝায়। এর দ্বারা একটি সমাজের কালোত্তীর্ণ মানদণ্ড, নীতি ও প্রথার প্রতি আনুগত্যও বোঝানো হয়। ব্যক্তি পর্যায়ে এর অর্থ হলো কর্তব্যনিষ্ঠা ও সততা তথা চরিত্রনিষ্ঠা। শুদ্ধাচার কৌশল হচ্ছে প্রাতিষ্ঠানিক পর্যায়ে উন্নততর সেবা প্রদানের একটি উপায় বা প্রক্রিয়া।

এক কথায় বলা যায় শুদ্ধাচার হলো জবাবদিহিতা, দক্ষতা ও নৈতিকতার সংমিশ্রণ। দুর্নীতি হলো শুদ্ধচারের পরিপন্থী। জাতীয় শুদ্ধচার কৌশল হলো চারিত্রিক সাধুতা বা শুদ্ধতা অর্জন এবং দুর্নীতি দমনের মাধ্যমে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় জাতীয় কৌশলের একটি দলিল। যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক আইন কানুন ও বিধি-বিধানের সুষ্ঠু প্রয়োগ, পদ্ধতিগত সংস্কার ও উন্নয়ন, সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রতিষ্ঠান সংশ্লিষ্ট সকলের চরিত্রনিষ্ঠা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে গৃহীতব্য কার্যক্রম চিহ্নিত করা হয়েছে।

বর্তমান সরকার রূপকল্প ২০২১ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রণীত বাংলাদেশের প্রেক্ষিত পরিকল্পনা (২০১০-২০২১) শীর্ষক দলিলে দুর্নীতি দমনকে একটি আন্দোলন হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। সরকার সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি দমনের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছিলেন ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার (২০১১-২০১৫) মাধ্যমে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকার ২০১২ সালে শুদ্ধাচার চর্চা ও দুর্নীতি প্রতিরোধের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও সমাজে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করে সুখী-সমৃদ্ধ সোনার বাংলা গড়ার লক্ষ্যে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল প্রণয়ন করেছে। রাষ্ট্র এবং সামাজে শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা সরকারের সাংবিধানিক দায়িত্ব, তাই অব্যাহতভাবে এই লক্ষ্যে কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল প্রণয়নে সহায়তা করার জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ পৃথক ৩টি নির্দেশিকা প্রণয়ন করে। এই নির্দেশিকাসমূহ অনুসরণ করে দপ্তর/সংস্থাসমূহ ১ জুলাই ২০১৬ থেকে শুদ্ধাচার কর্ম-পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন অগ্রগতি পরিবীক্ষণ কাঠামো প্রণয়ন করে। ২০১৯-২০ অর্থবছরে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল কর্ম-পরিকল্পনায় পূর্বে অনুসৃত কাঠামো অক্ষুন্ন রেখে বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতিহারের আলোকে ও বাস্তব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় এনে কিছু কার্যক্রমে পরিবর্তন সাধন করা হয়েছে।

বাংলাদেশ জাতিসংঘের United Nations Convention Against Corruption (UNCAC) এর অনুসমর্থনকারী দেশ। দুর্নীতি নির্মূলের জন্য আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ ও আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে দুর্নীতির প্রতিকার ছাড়াও দুর্নীতির ঘটনা যেন না ঘটে তার জন্য প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণকে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে এই কনভেনশনে। বাংলাদেশের ৬ষ্ঠ-৭ম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা, রূপকল্প ২০২১, প্রেক্ষিত পরিকল্পনা এবং ডেল্টা প্লান তথা ব-দ্বীপ পরিকল্পনা ও সমধর্মী কর্মসূচি চিহ্নিত করা হয়েছে। উক্ত কনভেশন ও পরিকল্পনাসমূহের লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল একটি সমন্বিত উদ্যোগ। সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য ও নাগরিকদের সেবা প্রাপ্তি সহজিকরণের জন্য জাতীয় শুদ্ধাচার কৌশল বাস্তবায়ন প্রয়োজন।

শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠা এবং দুর্নীতি প্রতিরোধের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রাজনৈতিক দল, গণমাধ্যম, সুশীল সমাজ ও এনজিও এবং শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান দুর্নীতি দমন ও শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা সকলের ভূমিকাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতিহারে দুর্নীতির বিরুদ্ধে বহুমুখী পদক্ষেপ গ্রহণের প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে সরকার সেই প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজ করে যাচ্ছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইতোমধ্যে বহুবিধ কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে। বিগত বছরগুলোতে সরকার ১৮০টি আইন ও ৩৩টি কর্মকৌশল ও নীতি প্রণয়ন করেছে। দুর্নীতি দমনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম যেসব আইন প্রণীত হয়েছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো: সন্ত্রাস বিরোধী আইন ২০০৯, তথ্য অধিকার আইন ২০০৯, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯, সরকারি অর্থ ও বাজেট ব্যবস্থাপনা আইন ২০০৯, জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০০৯, চাটার্ড সেক্রেটারিজ আইন ২০১০, জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট তথ্য প্রকাশ (সুরক্ষা প্রদান) আইন ২০১১, মানবপচার প্রতিরোধ ও দমন আইন-২০১২, মানি লান্ডারিং প্রতিরোধ আইন ২০১২, প্রতিযোগিতা আইন ২০১২, সরকারি কর্মচারী (শৃংখলা ও আপীল) বিধিমালা-২০১৮ ইত্যাদি। দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠায় এবং সুনির্দিষ্টভাবে দুর্নীতি দমন ও শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠায় এসব আইনের প্রয়োগ ও কার্যকারীতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

সুশাসন ও শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠায় অংশীদারিত্বমূলক ও জবাবদিহিতামূলক প্রশাসনের কোনো বিকল্প নেই। সরকারের প্রত্যাশা সরকারি কর্মচারিদের নিকট দাপ্তরিক কাজে গুরুত্ব দেওয়া, স্বচ্ছতা বজায় রাখা, ধর্মীয় অনুশাসনের চর্চা করা এবং নিজ ও অন্যান্য দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় রক্ষা করা। অতএব গণতান্ত্রিক সরকার ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থে স্বার্থের কথা না ভেবে দেশের কল্যাণে কাজ করবে এটাই জনগণের প্রত্যাশা। এতে ব্যক্তি বিশেষের সাময়িক ক্ষতি হলেও দেশ ও জনগণ উপকৃত হবে এবং সুশাসন ও শুদ্ধাচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে গণতন্ত্রের বিজয় হবে। রাষ্ট্র ও সমাজ হিসেবে বাংলাদেশ তার কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য ‘সুখী সমৃদ্ধ সোনার বাংলা’ গড়তে সক্ষম হবে।
০৫.১২.২০১৯

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com