শুক্রবার, ২২ নভেম্বর ২০১৯, ০৫:২৩ অপরাহ্ন

পুষ্টিহীনতা রোধে খাদ্য নিরাপত্তা

পুষ্টিহীনতা রোধে খাদ্য নিরাপত্তা

পুষ্টিহীনতা রোধে খাদ্য নিরাপত্তা

জিনাত আরা আহমেদ : দেশ আজ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে, কমেছে দারিদ্র্যতা। তারপরও জনসংখ্যার একটা বিরাট অংশ পুষ্টিহীনতায় ভুগছে। সুস্থ্য ও কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী তৈরিতে পুষ্টিহীনতা মারাত্মক চ্যালেঞ্জ, যা খাদ্য নিরাপত্তার সাথে জড়িত। একসময় খাদ্য নিরাপত্তার অর্থ ছিল জনসংখ্যা অনুপাতে যথেষ্ঠ পরিমাণ খাদ্য মজুদ থাকা। কিন্তু বর্তমানে জাতিসংঘের ফুড এন্ড এগ্রিকালচার অর্গানাইজেশনের সংজ্ঞানুসারে খাদ্য নিরাপত্তা হলো দেশের সব মানুষের জন্য নিরাপদ, পুষ্টিকর, পছন্দমাফিক ও প্রয়োজনীয় খাবার যথেষ্ঠ পরিমাণে প্রাপ্তির নিশ্চয়তা। অর্থাৎ স্বাস্থ্যকর জীবনযাপনে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সুবিধার নিশ্চয়তা।

কৃষিতে বাংলাদেশের অভূতপূর্ব উন্নতি চোখে পড়ার মতো। সে হিসেবে খাদ্যের উৎপাদন ও মজুদ জনসংখ্যানুপাতে আশাব্যঞ্জক। খাদ্য সংকটের কথাও মানুষ ভুলতে বসেছে। তারপরও লক্ষণীয় বিষয় গ্লোবাল হাঙ্গার ইনডেক্সে বাংলাদেশের পুষ্টি পরিস্থিতি সিরিয়াস (গুরুতর) শ্রেণিতে। বাংলাদেশ খর্বকায় শিশুর হার কমানোর যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল সেটা অর্জন করতে খর্বত্ব হ্রাসের পরিমাণ বছরে পাঁচ দশমিক তিন শতাংশ হওয়া উচিৎ, তার অনেক পেছনে আমরা আছি। লক্ষ্যণীয় বিষয় পৃথিবীতে প্রায় তিনজনের একজন ভুগছে অদৃশ্য পুষ্টিহীনতায়, অর্থাৎ পুষ্টিহীন মানুষের সংখ্যা প্রায় ২০০ কোটি। অথচ এসডিজি’র দ্বিতীয় লক্ষ্য হলো সব মানুষের জন্য বিশেষ করে দরিদ্র ও ক্ষুধার ঝুঁকিতে থাকা মানুষ এবং শিশুদের জন্য সারা বছর নিরাপদ, পুষ্টিকর এবং পর্যাপ্ত খাদ্য নিশ্চিত করা। এছাড়া ২০২৫ সালের মধ্যে অনূর্ধ্ব ৫ বছর শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি এবং মানসিক বিকাশের অন্তরায়সমূহ দুর করা এবং বয়ঃসন্ধিকালের মেয়েদের, গর্ভবতী মায়েদের, দুগ্ধদানকারী মায়েদের এবং সব বয়স্ক মানুষের পুষ্টির প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের অপুষ্টি দুর করা।

পুষ্টিহীনতা তথা নিরাপদ খাদ্যের অনিশ্চয়তা টেকসই উন্নয়নের অন্তরায়। বাংলাদেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করলেও দেশের সব মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে নিরাপদ খাদ্য প্রাপ্তির অনিশ্চয়তা প্রধান বাধা। চারপাশে ভেজাল আর বিষাক্ত খাদ্যের দাপটে মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে নানা ধরনের ঘাতক ব্যাধিতে। শিশুদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যহত হচ্ছে। আমরা নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ হয়েছি এবং ২০২১ সালের মধ্যে মধ্যম আয়ের দেশ হব। কিন্তু ব্যাধিগ্রস্ত ও অপুষ্ট মানুষের কাঁধে ভর করে এটা অর্জন করা কঠিন।

আমাদের পুষ্টিহীনতার পিছনে জীবনাচরণ অন্যতম বিষয়। এক্ষেত্রে সচেতনতার অভাব রয়েছে। এখনো আমাদের খাদ্য তালিকায় শষ্যজাতীয় খাবারের প্রাধান্য রয়েছে। অথচ খাবারে ভিটামিন এ, জিঙ্ক ও আয়রনের ঘাটতিতে বাড়ছে রক্তস্বল্পতা, অন্ধত্ব এবং সংক্রামক রোগ, শিশুর স্বাভাবিক বিকাশ ব্যহত হচ্ছে, ঝুঁকিতে থাকছে অন্তঃস্বত্ত্বা নারী। পুষ্টিহীনতা রোধে বয়স অনুযায়ী সঠিক খাবার যথাযথ পরিমাণে থাকাটা জরুরি বিষয়। ভ্রূনাবস্থা থেকে পাঁচ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুকে সুষম পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। কারণ এ সময়েই শিশু বিকাশের সব শর্ত তৈরি হয়ে যায়। শৈশব, কৈশোর ও বয়ঃসন্ধিকালের সঠিক বৃদ্ধি এবং পরবর্তীতে সুস্থ্য জীবনযাপনের জন্য যথাযথ মাত্রায় পুষ্টিকর খাবার প্রয়োজন। কিন্তু পর্যাপ্ত খাবারের নিশ্চয়তা থাকা সত্ত্বেও অনেকেই এসব বিষয় ভাবেনা। সঠিক পরিকল্পনার অভাবে অনেকেই সন্তানদের জন্য সঠিক খাবার নির্বাচন না করে ফাস্টফুড এবং বাজারের অস্বাস্থ্যকর খাবার কিনে আনেন। অথচ আজকের কিশোরী কিংবা তরুণীরাই আগামী দিনে সন্তানের মা। তাদের পুষ্টির ওপরই নির্ভর করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্বাস্থ্য।

সঠিক পুষ্টির মাধ্যমে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়ে। আমাদের খাদ্য গ্রহণে পুষ্টিমান বিবেচনায় না রাখাটা অসচেতনতার ফসল। হোটেলগুলোতে প্রচুর তেল, ঝাল মসলাযুক্ত খাবারের চাহিদা এটাই প্রমাণ করে আমরা কতটা অপরিনামদর্শী। আমাদের দেশের হল এবং মেসে থাকা বিপুল সংখ্যক ছাত্র-ছাত্রী ও ব্যাচেলররা যে খাবার গ্রহণ করে তার মান খুবই নিম্ন পর্যায়ের। সহজপাচ্য, ভেজালহীন, পুষ্টিমানযুক্ত খাবারের অভাবে বিভিন্ন স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী কিভাবে আগামী দিনে জাতিকে নেতৃত্ব দেবে তা ভাববার বিষয়।

খাদ্য আর পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য উৎপাদন বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য অপচয় রোধে সচেতনতা গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই। ফসল উৎপাদন থেকে আহার পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে খাদ্য অপচয় যে কতভাবে হয় তা বর্ণনাতীত। এক সমীক্ষায় জানা গেছে, বিশ্বের জনগণ প্রয়োজনের তুলনায় ১০ শতাংশ খাবার বেশি খায় আর ফেলে দেয় আরো ৯ শতাংশের মতো। অকারণে খাদ্য অপচয় করা অনেকের কাছেই একটা সাধারণ ব্যাপার। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ঢাকা শহরের বর্জ্যরে প্রায় শতকরা ৬০ ভাগ অপচয়কৃত খাদ্য থেকে আসে। তাছাড়া ফসল উৎপাদন থেকে সংগ্রহ পর্যন্ত অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে যে অপচয় হয় তা উদ্বেগজনক।

আমাদের কৃষি উন্নয়নকে স্থায়ী করতে এবং খাদ্য ও পুষ্টি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খাদ্য অপচয় রোধে দরকার সমন্বিত ব্যবস্থাপনা। ফল ও সবজির পচন রোধে দরকার পর্যাপ্ত সংরক্ষনাগার। প্রান্তিক ও মধ্যম চাষী এবং উৎপাদনকারীদের জন্য তাদের উৎপাদিত ফল ও সবজি সংরক্ষণে পর্যাপ্ত হিমাগার স্থাপন করাসহ এসব প্রক্রিয়াজাত ও বাজারজাতকরণে সরকার ও অর্থলগ্নিকারী প্রতিষ্ঠানদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। শুধু তাই না পারিবারিকভাবে বিবেচনায় আনতে হবে খাদ্য অপচয় অত্যন্ত গর্হিত কাজ।

সুস্বাস্থ্যর অধিকারী স্বাভাবিক উচ্চতা সম্পন্ন তরুণ প্রজন্ম আগামী দিনের মানবসম্পদ। এজন্য ঘরে ঘরে গড়ে তুলতে হবে গণসচেতনতা। এছাড়া খাদ্য নিরাপত্তায় সাফল্য অর্জন সম্ভব না। দরিদ্র পরিবারে পুষ্টিমানসমৃদ্ধ বিকল্প খাবার এবং স্বচ্ছল পরিবারে ঘরে তৈরি পুষ্টিকর খাবার বাড়ন্ত শিশুর বিকাশে, শৈশব ও তারুণ্যে কিভাবে ভূমিকা রাখে এটা জানতে হবে মায়েদের।

নারীরা বিশেষত মায়েরা সচেতন হলে পারিবারিক অভ্যাস গড়ে ওঠবে। অতিরিক্ত তেল, চিনি, লবণ সুস্বাস্থ্যের অন্তরায়। সবাই যদি নামমাত্র তেল, লবণ দিয়ে রান্না খাবারের পারিবারিক অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন, তাহলে এ জাতীয় ভোক্তাদের জন্য উপযুক্ত হোটেল-রেস্তোরাঁও গড়ে ওঠবে। মেসে ও ছাত্রাবাসে খাবারের মান নিয়মিত চেক করার ব্যবস্থা থাকলে ছাত্রছাত্রীরাও সচেতন হয়ে উঠবে।

২০৩০ সাল নাগাদ দেশকে টেকসই উন্নয়নে সফল অংশীদার করার প্রত্যয়ে বাংলাদেশ। এসময়ের মধ্যে টেকসই খাদ্য উৎপাদনের ধারা নিশ্চিত করতে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সহনীয় কৃষি ব্যবস্থা বাস্তবায়ন সরকারের অঙ্গীকার। এরই সাথে খাদ্য ব্যবস্থাপনায় সমন্বিত পদক্ষেপ নেয়া হলে পুষ্টিহীনতা রোধে সার্বিক সাফল্য অর্জন সম্ভব হবে।
লেখক : কলামিস্ট
২৯.০৫.২০১৯

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com