সোমবার, ২৬ অগাস্ট ২০১৯, ১২:১১ পূর্বাহ্ন

পরিবেশ, বনায়ন ও ইসলাম

পরিবেশ, বনায়ন ও ইসলাম

পরিবেশ

বনায়ন ও ইসলাম

আতাউর রহমান খান : পরিবেশ আমাদের জন্য বড় এক নিয়ামত। আমাদের চারপাশে যা কিছু আছে তা নিয়েই আমাদের পরিবেশ। চারপাশের অবস্থা, আকাশ-বাতাস, পানি-মাটি, গাছপালাসহ সম্প্রসারিত বিশাল দিগন্ত মিলে গড়ে উঠেছে আমাদের পরিবেশ।

প্রতিটি জিনিসের বিকাশ ও উন্নয়নে পরিবেশ এক অতীব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অনুকূল পরিবেশেই শুধু বীজের অংকুর উদগম ঘটে, গাছ- বৃক্ষ -তরুলতা বেড়ে উঠে, ফুল- ফল ধরে। পরিবেশ এদের আকার- আয়তন বর্ণ বৈচিত্র্য, স্বাদ- গন্ধ- পুষ্টি ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে। প্রতিকূল পরিবেশ সবকিছু ধ্বংস করে বিরাণ ভূমিতে পরিণত করে। তাই পরিবেশের সংরক্ষণ করতে হবে। বিভিন্ন কারণে আমাদের চারপাশের পরিবেশ পাল্লা দিয়ে দূষিত হচ্ছে। এ নিয়ে গোটা বিশ্বে চলছে ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনা। বিশ্বের তাবৎ চিন্তাশীল মানুষ এখন পৃথিবীর পরিবেশ রক্ষার কৌশল নিয়ে অহর্নিশ তৎপর। জ্ঞান-বিজ্ঞানে আজকের বিশ্ব উন্নতির চরম শিখরে আরোহণ করলেও পরিবেশ রক্ষায় তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি। পরিবেশ দূষণের ফলে আমাদের সমাজে চলছে ভাঙন ও বিশৃঙ্খলা। নষ্ট হচ্ছে জীবন ও সম্পদ। বাড়ছে অশান্তি ও অস্থিরতা। পরিবেশ দূষণের কারণে রোগ-শোক, জ্বরা-ব্যাধিতে আক্রান্ত হচ্ছে অগণিত মানুষ। তাই আমাদের চারপাশের পরিবেশ সুষ্ঠুভাবে সংরক্ষণ করতে হবে।

প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণে মহানবী সা.

মানুষের অদূরদর্শিতা এবং অমানবিক আচরণের কারণে প্রাকৃতিক যে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হয়েছে তা তাবৎ বিশ্বের মানুষের ওপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে। ফলে বায়ুতে বেড়েছে দূষণ, বেড়েছে তাপমাত্রা, বৃদ্ধি পেয়েছে রোগ-শোক এবং প্রাকৃতিক নানা দুর্যোগ। তাই এসব বিপর্যয় থেকে বাঁচার জন্য বিজ্ঞানীরা বন রক্ষা এবং বৃক্ষরোপণকে অন্যতম উপায় বলে অগ্রাধিকার দিয়েছেন। অথচ মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.) বৃক্ষ বা বন রক্ষার জন্য তাগিদ দিয়ে গেছেন সেই ১৪০০ বছর আগে। বৃক্ষ বা শস্য নষ্ট করাকে নিরুৎসাহিত করতে রাসুলুল্লাহ (সা.) মানুষকে উপদেশ দিয়েছেন।

গাছপালা, লতাপাতা মানুষ ও জীবজন্তুর জন্য খাদ্য সরবরাহ করে, মানুষ ও জীবের জন্য অক্সিজেন সরবরাহ করে এবং পরিবেশকে দূষণমুক্ত করে। গাছপালা ঝড়-ঝঞ্ঝা প্রতিরোধ করে এবং মাটির ক্ষয়রোধ করে। এ প্রসঙ্গে নবীজী (সা.) এক হাদিসে বলেছেন, ‘কোনো মুসলমান যদি একটি বৃক্ষের চারা রোপণ করে অথবা ক্ষেত-খামার করে, অতঃপর তা মানুষ, পাখি বা অন্য কোনো জন্তু ভক্ষণ করে, তা তার জন্য সদকার সওয়াব হবে।’ (মুসলিম : ৫৫৩২)।

হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী কারিম (সা.) বলেছেন, ‘যদি নিশ্চিতভাবে জানো যে কেয়ামত এসে গেছে, তখন হাতে যদি একটি গাছের চারা থাকে যা রোপণ করা যায়, তবে সে চারাটি লাগাবে।’ (মুসলিম : ৫৫৬০)।

তিনি আরও বলেন, ‘যে ব্যক্তি অনাবাদি জমি চাষ করে, সে সওয়াব পায়।’ (ইবনে হিব্বান : ৩৫২)।

হজরত আবু আইয়ুব আনসারি (রা.) বর্ণনা করেন, নবীজি (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি গাছ লাগায় সে গাছে যে পরিমাণ ফল ধরে সে পরিমাণ সওয়াব সে পায়।’ (মুসনাদে আহমদ : ৪৪৩)।

আল্লাহ তায়ালা বলেন,মানুষ তার খাদ্যের প্রতি লক্ষ করুক। আমিই প্রচুর বারি বর্ষণ করি, অতঃপর আমি ভূমিকে প্রকৃষ্টরূপে (ভালভাবে) বিদারিত করি এবং আমি উৎপন্ন করি শস্য,আংগুর, শাক-সবজি, যায়তুন, খেজুর, বহুবৃক্ষ, বিশিষ্ট উদ্যান, ফল এবং গবাদির খাদ্য, এটা তোমাদের এবং তোমাদের পশুগুলোর ভোগের জন্য। (সুরা আবাসা, আয়াত: ২৪-৩২)।

আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, ‘আমি মেঘ থেকে প্রচুর বৃষ্টি বর্ষণ করি এবং তা দিয়ে উৎপাদন করি শস্য, উদ্ভিদ ও পাতাঘন উদ্যানরাজি।’ (সূরা আননাবা : ১৪-১৬)।

সব নবী-রাসুল প্রকৃতি ও পরিবেশ উন্নয়নের পাশাপাশি সংরক্ষণ করেছেন এবং তাঁদের অনুসারীদের উৎসাহিত করেছেন। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করিম (সা.) বলেছেন, ‘সব নবী-রাসুলই ছাগল পালন করেছেন।’ (বোখারি : ২১৪৩)।

আল্লাহ তায়ালা পৃথিবীর প্রথম মানব হজরত আদম (আ.) কে সৃষ্টি করে প্রথমেই কৃষিপণ্য, ফলগাছ ও প্রকৃতি পরিবেশের ওপর শিক্ষা দেন। হজরত নুহ (আ.) মহাপ্লাবন থেকে রক্ষার জন্য সব পশুপাখি ও উদ্ভিদ জোড়ায় জোড়ায় নৌকায় উঠিয়ে সংরক্ষণ করেন। সেখান থেকে বর্তমান পৃথিবীর এত মানুষ, পশুপাখি, গাছপালা, বনজঙ্গল, জীববৈচিত্র্যের বিস্তার লাভ করেছে।

বনায়নে আমাদের করণীয়

সুজলা সুফলা শস্য শ্যামলা বাংলাদেশের সবুজ বনভূমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে আমাদের অজ্ঞতা, অসচেতনতা এবং লোভের কারণে। বন ধ্বংস করে যে আমরা আমাদের সুন্দর-সুস্থ ভবিষ্যৎকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছি, তা বোধহয় আমরা উপলব্ধি করছি না। আমাদের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সুস্থ সুন্দর জীবন যাপনের জন্য অবশ্যই বনায়ন করতে হবে। দেশের কোথাও যাতে অনাবাদি কৃষিজমি পড়ে না থাকে, সেজন্য রসুলুল্লাহ (সা.) এবং সাহাবায়ে কেরামগণ যথাযথ ব্যবস্থা অবলম্বন করেছিলেন। যার ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যেই দেশের অনাবাদি জমি আবাদ হয়ে গিয়েছিল।

হাদিস শরিফে এসেছে, যে ব্যক্তি কোনো বৃক্ষরোপণ করে, আল্লাহতায়ালা এর বিনিময়ে তাকে এই বৃক্ষের ফলের সমপরিমাণ প্রতিদান দান করবেন। (মুসনাদে আহমদ) হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত আছে যে, রসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যে জমির মালিক কেউ ছিল না সে জমিকে যে আবাদ করবে, সে-ই হবে তার সবচেয়ে বেশি হকদার (বুখারি)। এভাবে রসুল (সা.) জনগণকে বনায়নে উৎসাহ জুগিয়েছিলেন।
লেখক : শিক্ষার্থী ; মারকাযুল ফিকরি ওয়াল বুহুসিল ইসলামিয়া, ঢাকা।

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com