বৃহস্পতিবার, ২৩ মে ২০১৯, ০২:০৮ পূর্বাহ্ন

নীতিতে নারী অর্থেও নারী | ড. জোবায়দা আখতার

নীতিতে নারী অর্থেও নারী | ড. জোবায়দা আখতার

লেখক: সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব মালয়, কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া এবং জেন্ডার অ্যান্ড ইনক্লুসিভ এডুকেশন স্পেশালিস্ট

নীতিতে নারী অর্থেও নারী  :: ড. জোবায়দা আখতার

পৃথিবীকে যথার্থ সুন্দর আর বাসযোগ্য করে তোলার পূর্বশর্ত নারী-পুরুষের সমমর্যাদা নিশ্চিত করা। এটা সম্ভব হলে প্রয়োজন পড়বে না নারীর জন্য আলাদা কোনো দিবসের; বরং সমানাধিকারের সৌন্দর্যেই উজ্জ্বল হবে আমাদের পৃথিবী।

আজকের নারী এগিয়ে চলেছে, সে বুঝতে পেরেছে নিজের মর্যাদা নিজেকেই সংরক্ষণ করতে হবে—কোনো বাইরের শক্তি এসে নারীকে ক্ষমতায়ন দিতে পারে না, নিজেকেই নিজেরটা বুঝে নিতে হবে। আজকের নারী এগিয়ে চলেছে, সে বুঝতে পেরেছে নিজের মর্যাদা নিজেকেই অর্জন করতে হবে এবং সংরক্ষণ করতে হবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না সে নিজের শক্তিতে স্বাবলম্বী হবে, ততদিন তাকে পরমুখাপেক্ষী হয়েই থাকতে হবে। আজকের নারী চায় না অধস্তন হয়ে থাকতে, আত্মমর্যাদা নিয়ে বাঁচার আকাঙ্ক্ষায় তারা উচ্চশিক্ষা, কারিগরি শিক্ষা বা অন্য কোনো শিক্ষা নিচ্ছে; যার বিনিময়ে সে নিজে কিছু উপার্জন করবে, যা ব্যবহারের জন্য অন্য কারোর অনুমতি নিতে হবে না। নারী বুঝে গেছে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়া ছাড়া তার কাছে আর কোনো পথ খোলা নেই। বাঁচলে তো মানুষের মতোই বাঁচা উচিত। চ্যারিটি নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচা যায় না। নারী অতীতে শুধু বাঁচার জন্য পুরুষের ওপর নির্ভরশীল ছিল, ছিল না তার গলা উঁচু করে প্রতিবাদের ভাষা। কারণ ভাষা বিক্রি হয়েছিল মোটা দুইখানা কাপড় আর দুমুঠো ভাতের কাছে। মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার আর অন্যান্য অধিকার ভোগ করা তো দূরের কথা, এ সম্পর্কে নারীর কোনো ধারণাই ছিল না।

গৃহপালিত পশু আর তার মধ্যে ব্যবধান ছিল খুবই কম। পুরুষকে বলা হতো breadwinner of the family. নারী বুঝে গেছে আত্মমর্যাদা সংরক্ষণ না করলে এবং নিজের জীবনের অধিকার অন্যের হাতে তুলে দিলে সারা জীবন তাকে অবলা হয়েই থাকতে হবে। তাহলে কী করা? শিক্ষা অর্জন করতে হবে। যে শিক্ষা তাকে অর্থনৈতিক মুক্তি এনে দেবে। অর্থনৈতিক মুক্তি ছাড়া যেকোনো স্বীকৃতি, আইন নারীর জীবনে ক্ষণস্থায়ী প্রভাব ফেলতে পারে মাত্র। ইচ্ছাপূরণ, স্বপ্নপূরণ, স্বাস্থ্যরক্ষা, নিরাপত্তা এবং অন্যের কল্যাণ করতে গেলেও অর্থই মূল বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। বাঙালি নারী হলে তো কথাই নেই। নিজের উপার্জন দিয়ে পরিবারের সবার মুখে হাসি ফোটানোর জন্য সদাই প্রস্তুত। সেখানে আনন্দ অনেক, মর্যাদা অনেক—আমি কারো জন্য কিছু করতে পারছি—আমি মানুষ, আমি সব পারি, আমি আমার জন্য এবং সবার জন্য। এ উপলব্ধি থেকেই শুরু হয় নারীর ক্ষমতায়নের স্বপ্ন দেখা, বাস্তবায়নের লক্ষ্যে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করা, কর্মসংস্থানের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করা এবং নিজেকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করা। আর এ নেশায় মত্ত হয়ে নারী অনেক সময় বিয়েটাকে সেকেন্ডারি চয়েস হিসেবে দেখতে শুরু করে। ফলে নারী ধীরে ধীরে বিলম্বিত বিয়ের দিকে এগিয়ে চলেছে। একসময় মা-বাবা মেয়ের বিয়ে দিয়ে দায়মুক্ত হতেন এবং নিশ্চিত হতেন তাদের মেয়ের খাওয়া-পরার বিষয়টি নিয়ে। বিয়েই ছিল অর্থনৈতিক নিশ্চয়তার জায়গা।

প্রশ্ন উঠতে পারে, তারা কি সুখী ছিল না—বছরে দুটি শাড়ি, দুবেলা খাবার, নামমাত্র চিকিৎসা, দু-একটি সিনেমা দেখা! উত্তরটি হবে ছিল, কারণ তাদের চাওয়া-পাওয়ার গণ্ডি এবং দায়িত্ব ও প্রয়োজন ছিল সীমাবদ্ধ। প্রযুক্তির উন্নয়ন, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নারীনীতি নারীর সামনে জীবনের অর্থই বদলে দিয়েছে। নারী জেনেছে তার অধিকার কী। সে জেনেছে প্রযুক্তি ছাড়া সমাজে সে অচল, মানুষ হিসেবে পরিবারের প্রতি তার দায়িত্ব আছে, নিজের দায়িত্বও নিজেকেই বুঝে নিতে হবে। কারো বোঝা হয়ে থাকা যে এক ধরনের বিড়ম্বনা, আজকের নারী তা বুঝেছে। সে বিশ্বাস করছে বিয়ে হচ্ছে একটা সম্মানজনক পার্টনারশিপ, যার জন্য প্রয়োজন শিক্ষা ও অর্থ উপার্জন। ব্রিটিশ দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল বলেছেন, নারী-পুরুষের মধ্যে বুদ্ধিগত পার্থক্য থাকলে কখনো একটি সুখী দাম্পত্য জীবন গড়ে ওঠে না। যুগের পরিবর্তনের সঙ্গে নারীই এখন স্বপ্ন দেখে, ইতিবাচক পরিবর্তন চায়, নারী চায় একটি ভালো বই পড়তে, নারী চায় নিজের ইচ্ছায় নিজের পছন্দের জিনিসটি কিনতে, নারী চায় তার স্বাস্থ্যহানি হওয়ার আগেই স্বাস্থ্য রক্ষা করতে, নারী চায় প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে বিশ্বকে জানতে, নারী চায় ভ্রমণ করে বিশ্বকে জানতে, চায় পরিবারের মুখে হাসি ফোটাতে। সব আকাঙ্ক্ষা পূর্ণ করতে গিয়ে নারী আজ বিলম্বিত বিয়ের ধারায় চলতে শুরু করেছে। ধারাটি অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনেই শুরু হয়েছে। বিলম্বিত বিয়ে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ত্রিশোর্ধ্ব বয়সকেই বোঝায়, যা আগে কল্পনারও অতীত ছিল। জীবনসঙ্গী বাছাইয়ে মেয়েরা এখন অনেক সচেতন। সংস্কৃতবান, মানবিক বোধসম্পন্ন, উদার দৃষ্টিসম্পন্ন, ভাষা ব্যবহারে শালীন এবং সাম্য ও সমতায় বিশ্বাসী পুরুষই তাদের কাম্য। শুধু অর্থবান পুরুষ অনেক নারীকেই আকর্ষণ করতে পারে না।

ক্রয়ক্ষমতার সঙ্গে নারীর ক্ষমতায়নের সরাসরি এক ধরনের সম্পর্ক আছে। একজন নারী ক্রেতা বিভিন্ন ধরনের জিনিস ক্রয় করে পারিবারিক প্রয়োজনে। কিন্তু তা যদি অন্যের টাকায় ক্রয় করতে হয়, তা হয় অন্যের পছন্দ ও আর্থিক সঙ্গতির ওপর নির্ভরশীল। এখানে নারীর ভালো লাগা-মন্দ লাগা, ইচ্ছা-অনিচ্ছা বা স্বাধীনতা বিঘ্নিত হয়। নারী বুঝে গেছে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া তার জীবনের উন্নয়নের কোনো সম্ভাবনাই নেই। দিন বদলেছে। নারীর নিত্যব্যবহার্য জিনিস ব্যবহারে পছন্দ ও অপছন্দের মাত্রা যোগ হয়েছে। যেমন নিম্নমধ্যবিত্তরাও এখন চুলে সাবানের পরিবর্তে শ্যাম্পু ব্যবহার করে। কসমেটিকস ব্যবহারেও তাদের মধ্যে ভালো জিনিস ক্রয় করার একটা প্রবণতা দেখা দিয়েছে। স্বাস্থ্য নিয়েও তারা ভাবছে। তাদের মধ্যে অনেকেই স্বামীর কাছে একটি পয়সাও চায় না বা পায় না। সবার কাছে একটি মোবাইল আছে, সবার ব্যাগে যাতায়াতের ভাড়া থাকে, অনেক সময় তারাই তাদের স্বামীদের একটা ছোটখাটো ব্যবসা ধরিয়ে দেয়। মোট কথা, উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের পুরুষরা বুঝে গেছে সাধারণত নারী রোজগার করলে পুরো পরিবারের কল্যাণ ও শ্রীবৃদ্ধি হয়। তাই অনেকেই নারীর বিলম্বিত বৈবাহিক চিন্তাধারাকে স্বাগত জানিয়েছে। নারীর এ ধরনের মনোভাবকে যদি কেউ উগ্র নারীবাদ বলে, তবে তারা ভুল ভাবছেন। নারী কারো অধস্তন হয়ে থাকতে চায় না। বিবাহিত জীবনকে আরো টেকসই করার জন্য সে একটা সম্মানজনক সহ-অবস্থানে বিশ্বাসী, যেখানে থাকবে না কোনো নির্যাতন, কটু বাক্য প্রক্ষেপণ, ভাত-কাপড়ের খোটা; সেখানে থাকবে শুধু অর্থনৈতিক নিরাপত্তা ও পারিবারিক নিরাপত্তা। আমরা জানি, শুধু অর্থনৈতিক ক্ষমতাই সামাজিক নির্যাতনের জন্য দায়ী নয়।

সেখানে আছে পিতৃতান্ত্রিক মনোভাব, তথাকথিত ধর্মের অপব্যাখ্যা, নৈতিকতার অবক্ষয়, সনাতনী চিন্তাধারা। বেগম রোকেয়া, যাকে বলা হয় মুসলিম নারীবাদী লেখক, তিনি সেই সময়ে বসে ভেবেছিলেন আজকের নারীর কথা, যখন নারীর জন্য বাইরের পৃথিবী সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ ছিল। তিনি ছিলেন কালোত্তীর্ণ লেখক। তা না হলে সেই অন্ধকার যুগে বসে নারীর শিক্ষা ও অর্থনৈতিক মুক্তির কথা তিনি ভাবতেন না। তিনি বাল্যবিবাহ ও বহুবিবাহের সম্পূর্ণভাবে বিরোধী ছিলেন, যার প্রতিফলন দেখছি একুশ শতকে নারী প্রগতিবাদীদের ভাষায় এবং লেখনীতে। বেগম রোকেয়া সুলতানার স্বপ্ন গল্পটিতে একই চেয়ারে বসে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছিলেন মেয়েরা ঘরের বাইরে পা রাখছে, উচ্চশিক্ষা অর্জন করছে, বিজ্ঞানী হিসেবে কাজ করছে, নারী-পুরুষ সম-অধিকার ভোগ করছে; তার স্বপ্ন একই চেয়ারে বসেই শেষ হয়েছিল, তার স্বপ্ন লালন করেছে বাঙালি জাতি। তার স্বপ্ন কেবল স্বপ্ন থাকেনি, তা আজ সত্য হয়েছে। নারী বলছে, আমরাও মানুষ। তাহলে সম-অধিকার চাওয়ার কী আছে? এ অধিকার সম্পর্কে আগে মানুষ সচেতন ছিল না, শিক্ষা ও প্রগতি নারীকে বুঝিয়েছে—তুমি মানুষ, তুমিই শক্তি, তুমিই সমৃদ্ধি। মেরি উলস্টোনক্রাফট তার ‘আ ভিনডিকেশনস অব দ্য রাইটস অব উইমেন’ গ্রন্থে লিখেছেন, মেয়েরা প্রথমেই নারী হিসেবে, পরে মানুষ হিসেবে সমাজের কাছে পরিচিত। তিনি বিশ্বাস করতেন, শুধু সত্যিকার অর্থে শিক্ষা ও পারিবারিক শিক্ষাই পারে অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের মাধ্যমে নারীকে তার জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছে দিতে এবং বিয়েকে একমাত্র বাঁচার পথ হিসেবে না দেখে নিজস্ব বিচার-বুদ্ধি খাটিয়ে বেছে নেবে বেঁচে থাকার সম্মানজনক অবস্থান।

মেরি উলস্টোনক্রাফট বলেছেন, ‘It is justice, not charity that is wanting in the world. বিশ শতকের ব্রিটিশ দার্শনিক জন স্টুয়ার্ট মিল বলেছেন, বৈষম্যপূর্ণ বৈবাহিক সম্পর্ক কখনো সাম্য ও সমতা এনে দিতে পারে না। মেরি উলস্টোনক্রাফট, জন স্টুয়ার্ট মিল ও হ্যারিয়েট টেইলর বলেছেন, একমাত্র নারী-পুরুষের সমতাই পারে একটি সুখী ও টেকসই দাম্পত্য জীবন উপহার দিতে। তারা বিশ্বাস করতেন নারী-পুরুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক ও মননশীলতায় মিল না থাকলে সুখী জীবনের স্বপ্ন শুধু স্বপ্নই থেকে যায়। বিয়ে হচ্ছে এক ধরনের শর্তহীন পার্টনারশিপ, যেখানে দুজনই হবে দায়িত্বশীল, শ্রদ্ধাশীল ও মানবিক। নারী-পুরুষের বায়োলজিক্যাল পার্থক্যকে পুঁজি করে পিতৃতান্ত্রিক সমাজপতিরা, কখনোবা নারী নিজেই নিজেকে পুরুষের অধস্তন ভেবেছে। দিন বদলে গেছে। বিশ্বাস জেগেছে যে বায়োলজিক্যাল পার্থক্য শুধু প্রকৃতিগত, আর সব হচ্ছে অর্জনের বিষয়। এ পার্থক্যই করেছে পৃথিবীকে সুন্দর ও মনোমুগ্ধকর। নারী বুঝেছে প্রকৃতিগত পার্থক্য কখনো বিভাজন তৈরি করতে পারে না, বরং বৈচিত্র্য তৈরি করতে পারে। তা না হলে পৃথিবীটাই হয়ে যেত বৈচিত্র্যহীন এবং একঘেয়ে। দার্শনিক জ্যঁ জ্যাক রুশো বলেছেন, নারী প্রথমে নিজেকে মানুষ হিসেবে জানবে, তারপর নাগরিক হিসেবে, পরে একজন নারী হিসেবে। তবেই হবে তার মানবজীবন পরিপূর্ণ।

আসুন আমরাও ২০১৯-এর নারী দিবসের প্রতিপাদ্যকে সামনে রেখে বলি, থিংক ইকুয়াল, বিল্ড স্মার্ট অ্যান্ড ইনোভেট ফর চেঞ্জ।

লেখক: সিনিয়র রিসার্চ ফেলো, ইউনিভার্সিটি অব মালয়, কুয়ালালামপুর, মালয়েশিয়া এবং জেন্ডার অ্যান্ড ইনক্লুসিভ এডুকেশন স্পেশালিস্ট

zobaida@gmail.com

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com