শুক্রবার, ০৩ এপ্রিল ২০২০, ০৭:১৭ পূর্বাহ্ন

নারী সমাজ ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

নারী সমাজ ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

নারী দিবস। কাঞ্চন দত্ত

নারী সমাজ ও বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

নারী আর পুরুষ দু’জনের সমন্বিত প্রচেষ্টায় গড়ে উঠেছে মানব সভ্যতার ইতিহাস। নারীর গর্ভেই সূচিত হয়েছে আমাদের আলোকিত জীবন। তাইতে নারী একাধারে অনেক কিছু। এটা আমরা ভুলে যাই। শুধু জন্মের বিষয়টি মাথায় রাখলেই নারীকে মর্যাদা আর সম্মান জানানোর জন্য আলাদা কিছুর প্রয়োজন হয় না এবং তাদের অধিকার আদায়ে আন্দোলনেরও প্রয়োজন হয় না।

নারী এগিয়ে যাচ্ছে একথা যেমন ঠিক, তেমনি প্রযুক্তির এ যুগে এসেও অনেক নারীকে পরনির্ভরশীল জীবনযাপন করতে হচ্ছে এটাও ঠিক। আমাদের চারপাশে বহু নারী রয়েছেন, যারা নিজের প্রচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন, দেশের উন্নয়নে অবদান রাখছেন। নারীর উন্নয়ন আর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ দুরন্ত গতিতে এগিয়ে যাচ্ছে। আবার এর বিপরীত চিত্রও আছে। কিছু ক্ষেত্রে নারীদের আত্মবিশ্বাসের অভাব, ‘আমি নারী তাই এ কাজ আমার দ্বারা হবে না’- এমন মানসিকতা তাদের পিছিয়ে দেয়; যদিও নারীদের এ মানসিকতার অনেক পরিবর্তন হয়েছে।

আধুনিক নারীরা এখন ভোক্তার চেয়ে উদ্যোক্তা হিসেবে পরিচিতি পেতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। বুটিক হাউজ, ইভেন্টম্যানেজমেন্ট, ক্যাটারিং ক্ষুদ্র কিংবা বড় যে কোনো ব্যবসা, চাকুরি, নিজের মেধা, মনন আর পরিশ্রমের বিনিময়ে সমন্বয় সাধন করে যাচ্ছেন নারীরা প্রতিনিয়ত। পরিবারের গতানুগতিক কাজের বাইরে এসেও নারীরা হাঁস-মুরগি পালন, সবজি চাষের মতো আয়বর্ধক কাজ করছেন, পরিবারে স্বচ্ছলতা অনছেন। পুরুষের পাশাপাশি সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রেও নারীর অংশগ্রহণ বেড়েছে উল্লেখযোগ্য হারে। ঘর বা কর্মস্থল সব মহলেই তাই নারীর সরব উপস্থিতি। একটি পরিবারকে সাফল্যমন্ডিত করে তোলার জন্য নারীর অবদান অনেক। সন্তানকে ভালো ছাত্রের চেয়েও ভালো মানুষ হওয়ার যে দীক্ষা মা-ই দেন সবার আগে।

আজ থেকে এক শতাব্দীরও আগে যে স্বপ্ন দেখেছিলেন নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত হোসেন, সে স্বপ্নের পথেই হাঁটছে বাংলাদেশ। নারী উন্নয়ন ও ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ এখন বিশ্বে রোল মডেল। বর্তমান সরকার দেশের নারী সমাজের সার্বিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতায়নে নিরলসভাবে কাজ করে চলেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ উদ্যোগের দশটি কর্মসূচির মধ্যে নারীর ক্ষমতায়ন একটি। এরই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন মন্ত্রণালয়গুলোতে জেন্ডার সংবেদনশীল বাজেট প্রণয়ন করা হয়েছে। নারীর ক্ষমতায়ন ও জেন্ডার সমতা নির্ধারণে সপ্তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনায় নারীর সামর্থ্য উন্নীতকরণ, নারীর অর্থনৈতিক প্রাপ্তি বৃদ্ধিকরণ, নারীর মতপ্রকাশের মাধ্যম সম্প্রসারণ এবং নারী উন্নয়নে সার্বিক পরিবেশ সৃষ্টির বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

আমাদের নারীসমাজ লিঙ্গবৈষম্যের শেকড় ছিঁড়ে মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠার অবকাশ পেয়েছে। এদেশের নারীরা আজ রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রশাসন, আইন-বিচার, শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি সবক্ষেত্রেই পুরুষের পাশাপাশি সমান গৌরবের অধিকারী। এটা সম্ভব হয়েছে শিক্ষাক্ষেত্রে অভূতপূর্ব সাফল্যের কারণে।

নারী দিবসের পটভূমি ব্যাপক। এটি একটি দীর্ঘ সংগ্রামের ইতিহাস। মালিকদের অমানবিক আচরনের কারণে ১৮৫৭ সালের ৮ মার্চ নিউইয়র্কের সুতা কারখানায় কর্মরত নারী শ্রমিকরা সড়কে আন্দোলনে নামতে বাধ্য হন। বেতন বৈষম্য, নির্দিষ্ট কর্মঘন্টা আর কাজের বৈরি পরিবেশের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে নারী শ্রমিকরা একজোট হলে তাদের ওপর কারখানা মালিকেরা আর তাদের মদদপুষ্ট প্রশাসন দমন-পীড়ন চালায়। প্রায় পঞ্চাশ বছর পর ১৯০৮ সালে জার্মানীতে এই দিনটির স্মরণে প্রথম নারী সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯১০ সালে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক নারী সম্মেলন। এ সম্মেলনে বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় ১০০ জন নারী প্রতিনিধি অংশ নিয়েছিলেন। এ সম্মেলনেই প্রথমবারের মত জার্মান নারী নেত্রী ক্লারা জেটকিন প্রতি বছর ৮ মার্চকে ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ হিসেবে পালন করার প্রস্তাব দেন। এ প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ১৯১৪ সাল থেকে কয়েকটি দেশে ৮ মার্চ নারী দিবস হিসেবে পালিত হয়। ১৯৭৫ সালে জাতিসংঘ ৮ মার্চ দিনটিকে আন্তর্জাতিক নারী দিবস হিসেবে পালনের আহ্বান জানানোর পর থেকে বিশ্বব্যাপী দিনটির তাৎপর্য তুলে ধরে পালিত হয়ে আসছে।

নারী দিবসের রঙ নির্ধারিত হয়েছে বেগুনি এবং সাদা, যা নারী অধিকারের প্রতীক। বেগুনি এবং সাদা রঙ সুবিচার ও মর্যাদা নির্দেশ করে। ১৯৮৩ সালে পুলিৎজার পুরস্কারজয়ী মার্কিন কৃষ্ণাঙ্গ লেখক এবং নারীবাদী অ্যালিস ওয়াকারের প্রশংসিত উপন্যাস ‘দ্য কালার পারপল’ বইটি এই রঙ নির্ধারণে অনুপ্রেরণা জোগায়। এ বইতে তিনি নারীদের অধিকারের কথা তুলে ধরেছেন। ধারণা করা হয়, সেখান থেকেই নারীবাদী আন্দোলনের সঙ্গে জুড়ে গেছে বেগুনি-সাদা রঙ।
৮ মার্চ ‘আন্তর্জাতিক নারী দিবস’ সারাবিশ্বে অধিকার আদায়ের দিন হিসেবে সর্বাধিক গুরুত্ব পেয়ে আসছে, যার সংক্ষিপ্ত রূপ ‘আইডব্লিউডি’। যার আদি নাম আন্তর্জাতিক কর্মজীবী নারী দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদায় দিনটি উদযাপন করা হয়। এ বছর আন্তর্জাতিক নারী দিবস ২০২০ এর প্রতিপাদ্য বিষয় হলো ‘প্রজন্ম হোক সমতার : সকল নারীর অধিকার’। আর বাংলাদেশ সামাজিক প্রতিরোধ কমিটির এবারের প্রতিপাদ্য বিষয় ‘নারী ও কন্যাশিশুর প্রতি ধর্ষণসহ সকল প্রকার সহিংসতা বন্ধ কর’। সকল প্রকার বৈষম্য, নির্যাতনের বিরুদ্ধে নারীদের জাগ্রত করাই নারী দিবস পালনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। বিশ্বের একেক দেশে নারী দিবস উদযাপনের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হয় একেক রকম, তবে নারীর প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধাই মুখ্য হয় অনেক দেশে। আবার কোনো কোনো দেশে নারীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।

বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতিতে ২০২০ সালে আন্তর্জাতিক নারী দিবসে যে প্রতিপাদ্য গ্রহণ করা হয়েছে সেখানে বিশ্ব নেতারা উপলব্ধি করতে পেরেছেন, অগ্রগতি হলেও বিশ্বের অধিকাংশ নারীর ক্ষেত্রেই সত্যিকারের পরিবর্তন ঘটছে অত্যন্ত ধীরগতিতে। এখন পর্যন্ত পৃথিবীর কোনো দেশই পরিপূর্ণভাবে লিঙ্গ সমতা অর্জন করতে পারেনি। আইন, নীতি ও সংস্কৃতিতে থাকা নারী-পুরুষ সমতার বাধাগুলো কমবেশি সব দেশেই এখনও বিদ্যমান। এখনও নারী ও কিশোরীরা অবমূল্যায়িত হচ্ছে। বেশি কাজ করেও তাদের উপার্জন কম। এখনও অনেক ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের পছন্দ-অপছন্দ মূল্যায়ণ করা হয় না। বাড়িতে ও বাড়ির বাইরের জনপরিসর তাদের জন্য এখনও নিষ্কণ্টক ও নিরাপদ নয়।

তবে আশার কথা, নারীর শিক্ষা এবং উন্নয়নের গুরুত্ব দেরিতে হলেও বুঝতে শুরু করেছে বিশ্ববাসী। নিজের অধিকারের জন্য পরিবার এবং সমাজে নীরব যুদ্ধ করে যাচ্ছেন এমন অনেক নারী আমাদের আশপাশে রয়েছেন। যোগ্যতা ও বৃদ্ধিমত্তায় নারী পুরুষের চেয়ে কোথাও কম নয়। আমাদের অনুধাবন করতে হবে নারী পুরুষের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়। পুরুষ হলো নারীর সহযোগী। একে অন্যের পরিপূরক। আমাদের মানতে হবে পরস্পরের সহযোগিতায়ই কেবল সুন্দর পৃথিবী গড়া সম্ভব। প্রত্যেকের অধিকার রয়েছে নিজস্ব মতামত প্রদানের, নিজের সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেয়ার। তাই পুরুষতান্ত্রিকতার বেড়াজাল ছিন্ন করতে হবে। নারীর ওপর চাপিয়ে দেয়ার মানসিকতা বন্ধ করতে হবে। তাহলে নারী আরও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠবে এবং নারীরাও যে একটি দেশের উন্নয়নে সহযোগী, তারাও পুরুষের সমান গুরুত্বপূর্ণ, এটা তারা নিজের ভিতরে লালন করতে শিখবে।

কৃষি, শিল্প-কারখানা, নির্মাণখাত, অফিস-আদালতসহ সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে যেভাবে নারীর কর্মক্ষমতা সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হচ্ছে তাতে নির্দ্বিধায় বলা যায় অর্থনৈতিক উন্নয়নে নারীর অবদান কতটা গুরুত্বপূর্ণ। বঞ্চনার আবর্তে শ্রমজীবী নারীরা আজও নারী দিবসের যথার্থ সুফল থেকে অনেকটা দূরে। পোশাক শিল্প দেশের অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি। সেখানে নারীদের ভূমিকা ব্যাপক। অথচ এখনও ব্যক্তি মালিকানাধীন কৃষি এবং শিল্পের উৎপাদনশীলতায় নারীরা বৈষম্যের শিকার, যা আন্তর্জাতিক শ্রম আইনের লঙ্ঘন। শ্রমঘন্টা ও কাজের ধরনের বেলায় কোনো ফারাক থাকে না, কিন্তু মজুরির বেলায় কম। কৃষিকাজে নারী কৃষকের ভূমিকা কোনো অংশে কম নয়। কৃষিক্ষেত্রে প্রায় ৬৭ ভাগ কাজ সম্পন্ন করেন নারীরা। সেখানেও মজুরি বৈষম্য। নারীরা শুধু যে দেশের উৎপাদনশীলতায় ভূমিকা রাখে তা নয় গৃহস্থালীর যাবতীয় কাজকর্মও একজন গৃহিণীকেই সামলাতে হয়। কিন্তু সে শ্রমের মূল্য অধরাই থেকে যায়।

নারীর পদচারণা কোথায় নেই। যুক্তরাষ্ট্রের শ্রমিক আন্দোলন থেকে শুরু করে মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সব আন্দোলন সংগ্রামে নারীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। নারীরা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও চ্যালেঞ্জিং পেশায় কাজ করছেন। কূটনৈতিক এবং শান্তি মিশনেও এদেশের নারীরা সমানভাবে সক্রিয়। বিশ্বের অনেক বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার নারী। ক্রীড়াক্ষেত্রে সফলতার স্বাক্ষর রাখছেন নারীরা। সাংবাদিকতার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ নারীরা করছেন। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা এবং নিজের চেষ্টায় সফল নারী উদ্যোক্তার সংখ্যাও দিন দিন বেড়ে চলেছে। নারীদের এসব অবদানের পেছনে পরিবার সর্বোপরি পুরুষরা অগ্রণী ভূমিকা রয়েছে।

বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিতে নারীর প্রতি পুরুষদের ধারণা অনেকটাই পাল্টে গেছে। দেশের অগ্রতিতে নারীর অবদান রয়েছে। পুরুষের সহযোগিতাও কোনোভাবেই খাটো দেখার নয়। আন্তর্জাতিক নারী দিবসের সুফল প্রতিটি নারীর কাছে পৌঁছাতে হলে নারী ও পুরুষের সম্মিলিত উদ্যোগ খুবই জরুরি। আর শুধুমাত্র তখনই কেবল আমরা আমাদের কাঙ্খিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারব, ক্ষুধা ও দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠিত করতে পারব।
লেখক : কলামিস্ট

নিউজটি শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com