মঙ্গলবার, ১৪ সেপ্টেম্বর ২০২১, ০২:৩৯ অপরাহ্ন

তালেবান উত্থানে ভারতের যেসব পরীক্ষা

তালেবান উত্থানে ভারতের যেসব পরীক্ষা

তালেবান উত্থানে ভারতের যেসব পরীক্ষা

শীলনবাংলা ডটকম :: রাজনীতিতে লাভ ক্ষতি থাকেই। দেশ দখলেও কারও লাভ আর কারও ক্ষতি থাকে। আফগানিস্তান ঘানির হাতছাড়া হওয়ায় ভারত পড়েছে নানা ধরনের পরীক্ষায়। দখল ঘটনার আকস্মিকতায় বিস্মিত হয়েছেন বিশ্বের কূটনৈতিক ও নিরাপত্তা বিশ্লেষকেরা। তালেবানের হাতে কাবুলের দখল চলে যাওয়ার পরপরই দেশগুলো আফগানিস্তানে থাকা তাদের কূটনীতিক ও নাগরিকদের দ্রুত ফিরিয়ে নেওয়া শুরু করে। আর ফেলে যায় আফগানিস্তানে তাদের দুই দশকের কাজ ও বিনিয়োগ।

তালেবানের জয় দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। পাকিস্তান ও চীনের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে উত্তেজনাপূর্ণ সম্পর্ক এবং সীমান্ত বিরোধের কারণে এটি ভারতকে বিশেষভাবে পরীক্ষায় ফেলতে পারে। কারণ, পাকিস্তান ও চীন আফগানিস্তানের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলেই ধারণা করা হচ্ছে।

আফগানিস্তান সীমান্তে পাকিস্তানের তেমন কড়াকড়ি নেই। তা ছাড়া দীর্ঘদিন ধরে পাকিস্তান তার উত্তরের এ প্রতিবেশী দেশের বিষয়ে সক্রিয় ভূমিকা রেখে আসছে। এখন চীনও আফগানিস্তানের বিষয়ে বেশ আগ্রহী হয়ে উঠেছে। গত মাসেই চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই জ্যেষ্ঠ তালেবান নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। সেখানে তিনি এটা স্পষ্ট করেছেন, বেইজিং আর চুপ করে বসে থাকবে না (আফগানিস্তান ইস্যুতে)।

আফগানিস্তান ও সিরিয়ায় ভারতের নিযুক্ত সাবেক রাষ্ট্রদূত গৌতম মুখোপাধ্যায় বলেছেন, সম্ভাব্য ভূরাজনীতির এ চেহারা ‘সবকিছু ওলট–পালট করে দিতে পারে’।

পশ্চিমা বিশ্ব এবং ভারতের মতো অন্য গণতান্ত্রিক দেশগুলোর সঙ্গে আফগানিস্তান সরকারের যে মৈত্রী ছিল, তা খুব জোরালো ছিল না। কিন্তু খুব শিগগির সম্ভবত পাকিস্তান, রাশিয়া, ইরান ও চীনকে এ খেলার পরবর্তী অধ্যায়ে দেখা যাবে।

ভারতের অনেকেই একে দিল্লির পরাজয় এবং পাকিস্তানের বড় জয় হিসেবে দেখছেন। কিন্তু সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক জিতেন্দ্র নাথ মিশ্র এভাবে ভাবতে নারাজ। তাঁর মতে, এটা খুব সরল ভাবনা। কারণ, পশতুন নেতৃত্বাধীন তালেবান কখনো আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের সীমান্তকে দুই দেশের সীমান্ত বলে বিবেচনা করে না। এটা ইসলামাবাদের জন্য সব সময় অস্বস্তির কারণ হয়ে আসছে। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তান চাইবে তালেবান এটাকে সীমান্ত হিসেবে বিবেচনা করুক। এটিই হবে তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

তবে এটাও সত্য, আফগানিস্তানে তালেবানের শাসন পাকিস্তানকে ভারতের বিরুদ্ধে কৌশলগত সুবিধা দেয়। ওয়াশিংটনভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক উইলসন সেন্টারের উপপরিচালক মাইকেল কুগেলমান বলেন, ইসলামাবাদ সব সময় যা চেয়েছিল, তা-ই পেয়েছে। তারা চেয়েছিল আফগানিস্তানে এমন একটি সরকার, যাদের সহজেই প্রভাবিত করতে পারবে। তিনি আরও বলেন, পাকিস্তানের কর্তাব্যক্তিরা এ ঘটনাকে ভারতের পরাজয় হিসেবে দেখাতে পারেন। কিন্তু এরপরও পাকিস্তানের আরও বড় কৌশলগত কিছু বিষয় থাকবে। এ মুহূর্তে তারা সত্যিই নিজেদের ওই অঞ্চলের সবচেয়ে বড় বিজয়ী হিসেবে দেখছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারত ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ক্রমে বিকাশমান সম্পর্কে খুশি ছিল না পাকিস্তান। আফগানিস্তানের ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনির পাকিস্তানের সঙ্গে ‘ধরি মাছ না ছুঁই পানি’র মতো করে সম্পর্ক রাখাও ঠিকভাবে নিতে পারছিল না ইসলামাবাদ। পাকিস্তানের অর্থনৈতিক দুরবস্থাও তাদের মাথাব্যথার একটি কারণ।

এখন নিজেদের জয়ী ভাবার একটা উপলক্ষ পেয়েছে ইসলামাবাদ। কারণ, আফগানিস্তান ইস্যুতে চীনের সঙ্গে তাদের বন্ধুত্ব কাজে লাগবে। এ ছাড়া বেইজিংও এখন আর নিজেদের শক্তি দেখাতে রাখঢাক রাখছে না। ভারতীয় কূটনীতিক জিতেন্দ্র নাথ মিশ্র বলেন, চীন এখন নিজেদের মতো করে খেলবে।

আফগানিস্তানে অর্থনৈতিক স্বার্থও রয়েছে চীনের। দেশটির খনিজ সম্পদ চীনের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে সাহায্য করতে পারে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো চীন তালেবানকে ইস্ট তুর্কিস্তান ইসলামিক মুভমেন্ট (ইটিআইএম) নিষিদ্ধ করার জন্য চাপ প্রয়োগ করতে পারে। চীনের মুসলিম–অধ্যুষিত জিনজিয়ানে বিশৃঙ্খলার জন্য ইটিআইএমকে দায়ী করে আসছে চীন। ধারণা করা হয়, আফগানিস্তান থেকেই কার্যক্রম পরিচালনা করে এ ধর্মীয় সংগঠন।

গৌতম মুখোপাধ্যায় বলেন, আফগানিস্তানে চীন ও পাকিস্তান একে অন্যের ঘাড়ে চড়ে বসতে পারে। তিনি বলেন, অতীতের অন্যান্য বিশ্বশক্তির মতো কোনো ফাঁদে না পড়ার বিষয়ে বেইজিংকে সতর্ক থাকতে হবে।
শুধু চীন, পাকিস্তান নয়; রাশিয়া ও ইরানও একই পথে হাঁটছে বলে মনে করা হচ্ছে। এই দুই দেশ আফগানিস্তান থেকে এখনো তাদের দূতাবাস সরিয়ে নেয়নি। উভয় দেশের কূটনীতিকেরা এখনো কাবুলে কাজ করছেন।

প্রশ্ন হচ্ছে, এ পরিস্থিতিতে ভারত কী করবে? আফগানিস্তানে ভারত কখনোই পাকিস্তান, যুক্তরাষ্ট্র বা রাশিয়ার মতো প্রভাব বিস্তার করতে পারেনি। যদিও দিল্লি বরাবরই নিরাপত্তা ও সাংস্কৃতিক বন্ধন উন্নয়নে কাজ করে গেছে। হাজার হাজার আফগান বর্তমানে পড়াশোনা, কাজ বা চিকিৎসার জন্য ভারতে রয়েছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে শীর্ষ পর্যায়ের এক বৈঠকে সিদ্ধান্ত হয়, বর্তমানে ভারতে থাকা আফগান নাগরিকদের সব রকমের সাহায্য করা হবে। দেখা হবে কেউ যেন অসহায় বোধ না করে। ওই বৈঠকে স্পষ্ট হয়, এ মুহূর্তে ঘটনাবলির দিকে নজর রাখা ছাড়া ভারতের করার কিছুই নেই।

এদিকে পাকিস্তানের যে পথ ধরে ভারত ও আফগানিস্তানের মধ্যে পণ্য আদান-প্রদান হয়ে থাকে, কাবুলের পতনের পর থেকেই তা বন্ধ রয়েছে। তালেবান নেতাদের হুকুমেই এ নিষেধাজ্ঞা। ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান এক্সপোর্ট অর্গানাইজেশনের পরিচালক অজয় সহায় এ কথা জানিয়েছেন। সংবাদ সংস্থাকে তিনি বলেছেন, দুবাই হয়ে কিছু পণ্যের বাণিজ্য হয়। সেই পথ অবশ্য এখনো খোলা রয়েছে।
মিশ্র বলেন, দিল্লির হাতে এখন আর কোনো ভালো সুযোগ নেই। এখন যা আছে, তা খারাপ এবং ভবিষ্যতে আরও খারাপ হবে।

ভারত সবচেয়ে বড় যে চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হবে, তা হচ্ছে তারা তালেবানকে স্বীকৃতি দেবে কি না। এ সিদ্ধান্ত নেওয়া তাদের জন্য কঠিন হবে। বিশেষ করে মস্কো ও বেইজিং যদি তালেবানকে স্বীকৃতি দিয়ে দেয়, তখন বিষয়টা আরও কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাকিস্তান ১৯৯৯ সালের পথেই পা বাড়াবে। তালেবান সরকার গঠন করলে তাদের স্বীকৃতি দিয়ে দেওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।

এ মুহূর্তে ভারতের সামনে সবচেয়ে ভালো যে সুযোগ, তা হলো তালেবানের সঙ্গে যোগাযোগের রাস্তা খোলা রাখা। কিন্তু এটা খুব সহজ সম্পর্ক হবে না। দিল্লি ও তালেবানের অতীত ইতিহাস তা-ই বলে। ১৯৯৯ সালে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইনসের একটি বিমান ছিনতাইকারীদের পালানোর নিরাপদ পথ তৈরি করে দিয়েছিল তালেবান। ওই ঘটনা এখনো ভারতীয়দের স্মৃতিতে ভেসে ওঠে। এরপর ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত তালেবানের বিরুদ্ধে লড়াই করা একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে দিল্লি।

তবে নিজেদের স্বার্থরক্ষার্থেই ভারত ওই ঘটনা আপাতত চেপে রাখতে চাইবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতেই তারা এমনটা করবে বলে মনে করা হচ্ছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে তালেবানের জয়ে অনুপ্রাণিত হয়ে জইশ-ই-মোহাম্মদ, লস্কর-ই-তাইয়েবার মতো জঙ্গি সংগঠন ভারতে হামলার পরিকল্পনা এবং তা বাস্তবায়ন করতে পারে।
যুক্তরাজ্যের ল্যানচেস্টার ইউনিভার্সিটির রাজনীতির অধ্যাপক অমলেন্দু মিশ্র আফগানিস্তানের ওপর একটি বই লিখেছেন। তিনি বলেন, ভারতকে এখন একটি ‘কূটনৈতিক রশি’র ওপর হাঁটতে হবে। কাশ্মীরের বিরোধপূর্ণ অঞ্চলটি মুজাহিদদের পরবর্তী ঘাঁটিতে পরিণত হবে না—ভারতকে এটি নিশ্চিত করতে কৌশলী হতে হবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ভারতকে তালেবানের সঙ্গে কথা চালিয়ে যাওয়া দরকার। কিন্তু ভারতকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে যে তারা তালেবানবিরোধী গোষ্ঠীর সঙ্গে কতটুকু জড়াবে। আভাস পাওয়া গেছে, তালেবানের ওপর চাপ তৈরি করতে পশ্চিমারা একটি যুক্তফ্রন্ট গঠন করতে পারে। যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ইতিমধ্যে পশ্চিমাদের ঐক্যবদ্ধ হয়ে তালেবানের জবাব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

এদিকে আফগানিস্তান যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা এবং চীন, রাশিয়া ও পাকিস্তানের মধ্যে আধিপত্যের লড়াইয়ের আরেকটি স্থান হয়ে উঠতে পারে বলেও আশঙ্কা করা হচ্ছে।

সুতরাং ভারতের হাতে আফগানিস্তান ইস্যুতে সহজ কোনো বিকল্প আপাতত নেই। কিন্তু ভারতের সিদ্ধান্তে ওপর অনেকটাই নির্ভর করছে আঞ্চলিক শান্তি এবং বৈশ্বিক ভূরাজনীতির পালাবদল।

বিবিসি অবলম্বনে

শেয়ার করুন...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

© All rights reserved 2018 shilonbangla.com
Design & Developed BY ThemesBazar.Com